লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ৯৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (সেপ্টেম্বর ২০১৫)

ffffffffffff
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

সংখ্যা

এনামুল হক টগর

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩১৯
কোন দোষত্রুটি ও বিচার ছাড়াই সতের বছর হাজত খাটার পর রাজিব কারাগার থেকে আজ বের হচ্ছে। কারাগার থেকে বের হয়ে কোথায় যাবে এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। সেই সতের বছর আগে পাবনার রূপপুর গ্রাম থেকে পুলিশের হাতে বন্দি হয়েছে। তখন তার সংসারে স্ত্রী দুই কন্যা আর এক ছেলে সন্তান ছিল।
তারা এখন কেমন ও কোথায় আছে কে জানে ? বন্দি হওয়ার পর কিছু দিন যোগাযোগ ছিল তারপর আর বহুবছর যোগাযোগ নেই। কারাগার থেকে বের হয়ে রাজিব রাস্তা দিয়ে হাটছে। চারিদিকে অবক্ষয় পাশব প্রবৃত্তির খেলা। বিশ্ব-পরিচালক যেন তার দায়িত্বভার দূর্নীতি সন্ত্রাসী আর অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছে। তাদের থেকে অনুশোচনা আর অসম্মান সারাক্ষণ পৃথিবীকে ঘিরে ধরছে। অভাবের সংসারে যেন অধিকাংশ মানুষই কেউ কারো খবর রাখে না।
ধান্দাবাজ স্বার্থপর আর কালো বাজারীদের অত্যুজ্জ্বল স্বর্ণখচিত প্রাসাদগুলোর ভেতর মানবতাহীন হিংসা আর ক্রোধ খেলা করছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাজিব কিছুক্ষণের মধ্যে পাবনার রূপপুর গ্রামে পৌছাবে। রূপপুর গ্রামের পাশ দিয়ে পদ্মানদী বয়ে চলেছে। অহিংসা কামনার বাসনা থেকে পাখিরা গান গাইছে, মস্তিষ্ক প্রসূত মানব হৃদয় থেকে ছলাকলার আশ্রয়ে নির্মম হয়ে উঠছে দেশ।
রাজিব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে যে, সতের বছর আগের ভিটে-মাটি ঘর-বাড়ি শূণ্য দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবেশী ফরিদ আলী হাঁটতে হাঁটতে রাজিবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন দীর্ঘ সময় দুজনের চেহারাকে মলিন করে দিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে রাজিব চিনে নিল ফরিদ আলী। তারা ছোট বেলায় এক সাথে স্কুলে গেছে খেলাধুলা করেছে নদীতে মাছ মেরেছে আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একই সাথে যুদ্ধ করেছে।
ফরিদ আলী মলিন কন্ঠে বললো আমি চিনতে পারছি তুমি রাজিব। কবে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছো, আমার বাড়ি স্ত্রী সন্তান ওরা কোথায়। ফরিদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, চোখে অশ্রু, কিছু বলতে চাইছে না, তারপরও রাজিব চিৎকার করে বলে উঠলো আমার স্ত্রী-সন্তানরা কোথায়। রাজিবের চিৎকারে প্রতিবেশী ফরিদ আলী বললো অভাবের সংসারে একদিন তোমার স্ত্রী ছয় মাসের ছোট মেয়েটি পাঁচশত টাকা বিক্রি করে দিয়েছিল, দুর নগরের এক বৃত্তবান তাকে নিয়ে গেছে, সে এখন কোথায় আছে কেমন আছে কেউ জানে না !
পশ্চিমের আকাশে পদ্মার পানি ঢেউয়ের উপর ঢেউ তুলছে অসভ্যতার মহাসংকেত জাতিকে আকড়ে ধরছে। কি ভাবে দেশ বাঁচাবে, মানুষ বিবেকবান হবে। রাজিব তাকিয়ে আছে গভীর উদ্বেগ আর ধ্বংসের মুখোমুখি। প্রতিবেশীর অন্তরে গভীর ব্যাকুলতা ও বেদনা। রাজিব উচ্চ কন্ঠে চিৎকার করে বললো আমার বড় মেয়ে আমার ছেলে তারা কোথায়। প্রতিবেশী রাবেয়া বললো তুমি যখন কারাগারে তোমার মেয়ে তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। লেখা পড়ার জন্য প্রতিদিন স্কুল যেত। এ বছর পরীক্ষায় সন্তোষজনক ভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। একদিন গভীর রাতে গ্রামের সন্ত্রাসীরা তোমার মেয়েকে ঘুমের ঘোরে তুলে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে। সে এক করুণ কাহিনী। তোমার স্ত্রী আর সন্তান তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে গ্রামের ক্ষমতাবানদের দাপটে তারা থাকতে পারিনি। রাতের আঁধারে ওরা পালিয়ে কোথায় কোন নগরে আশ্রয় নিয়েছে আমরা কেউ বলতে পারবো না।
রাজিব শুনছে আর বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছে ক্রোধ ও প্রতিহিংসার কালোমেঘ তাকে প্রবল করে তুলছে। কিন্তু প্রতিশোধ খুব কঠিন ব্যাপার, যারা ঘটনার সাথে জড়িত তারা খুবই শক্তিশালী। তারা ইতি মধ্যে জেনে গেছে রাজিব কারাগার থেকে বেরিয়ে গ্রামে এসেছে এবং কিভাবে রাজিবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় তার পরিকল্পনা করছে।
ফরিদ অশ্রুসজল চোখে বললো তুমি এই গ্রাম থেকে অনেক দুরে চলে যাও, যেখানে গেলো তোমার স্ত্রী সন্তানকে খুজে পাবে নইলে গ্রামের সন্ত্রাসীরা তোমাকে আঘাত করতে পারে। সময় যখন তোমাকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলবে তখন প্রতিশোধের নেশায় ফিরে এসো। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই তোমার সাথে থাকবে।
ফরিদ আলীর কথাগুলো বিবেচনা করে রাজিব গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এই গ্রাম তার অতি প্রিয় এই গ্রামেই সে তার মাতৃত্ব থেকে ভূমিষ্ট হয়েছে। অনেক বন্ধু স্বজন প্রিয়জন কেউ তার বিপদের সময় আসেনি। গ্রামের ক্ষমতাশীনদের বিরুদ্ধে একটি ডাকাতি মামলার সাক্ষী দেওয়ার কারণে। ক্ষমতাশীনরা তাকে অনেকগুলো মিথ্যা মামলা দিয়ে সতের বছর হাজত খাটিয়েছে।
তার জীবনবোধ সংসার প্রেম এখন বিচ্ছিন্নতার আড়াল থেকে বেদনাকে আলিঙ্গন করে। জীবন এক জটিল ও দরূহ বাস্তবতার সাথে মিশে গেছে। জাতির বোধ আর দীপ্ত চেতনা আজ ক্লান্ত। মুক্তির আভাস যেন আঁধারের সংমিশ্রণে কঠিন হয়ে উঠছে। রাজিব অনেক ক্ষুধা বুকে নিয়ে নগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে, হয়তো সেখানে গেলে তার স্ত্রী ও সন্তানকে খুজে পাবে, কোন বৃত্তবান তার ছোট মেয়েকে ক্রয় করে নিয়ে গেছে তারও সন্ধান মিলতে পারে।
পেছনে রূপপুর গ্রাম হাহাকারে তাকিয়ে আছে যেন আজন্ম দেশপ্রেম ভালোবাসার ব্যর্থ গ্লানি বুকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। কবে সুষমবন্টন সংস্কারের নতুন চেতনা দিয়ে সমাজে বিপ্লব হবে। এমনি এক ইতিহাসের মুখোমুখি রাজিব আর অত্যাচারীরা বিভক্ত। রাজিব একা আর অত্যাচারীদের সাথেই যেন অধিকাংশ।
তাই রাজিব ভাবে সময় কিভাবে জয়ী হবে। গাবতলি নেমে রাজিব দিকভ্রান্ত রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পেটে অসম্ভব ক্ষুধা। অন্যায়ের সাথে কঠিন বিরোধ করে পথ অতিক্রম করছে আর প্রতিরোধে দাঁড়াবার জন্য সময়কে তৈরী করছে। বিপদের অশনি পূর্বাভাস তাকে সব সময় সতর্ক রাখে। পথ চলতে চলতে সে এখন বুঝতে পেরেছে যে অসহিষ্ণুতার ক্রোধ আর হিংসাশ্রয়ীকে ধৈর্য্য দিয়ে পরাজয় করতে হবে। দেশও সমাজকে প্রগতিশীল ভাবে গড়ে তুলতে হলে ধৈর্য দিয়ে সময়ের সাথে লড়াই করাই মুক্তির পথ। স্বনির্ভরতার বোধ পৃথিবীকে বার বার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।
দেশ ও সমাজকে সুগঠন ও শিক্ষাকে বাস্তবতার চেতনা দিয়ে সত্যকে অগ্রজের পথে রূপান্তর করতে হবে। রাজিব হাঁটতে হাঁটতে নিউমার্কেটের পাশে এক খাবার হোটেলে ঢুকলো। অনাহারী শরীর যন্ত্রণায় জর্জর। টাকার অভাবে হোটেল থেকে দুইটি রুটি আর এক বাটি ডাউল নিয়ে খাওয়া সম্পন্ন করলো।
হোটেলের ভেতর থেকে একজন যুবক রাজিবকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে এবং ভাবছে কে
এই বয়স্ক লোক চোখে মুখে রক্তের টান দেহের ভেতর প্রাণের টান অন্তরে ভালোবাসার টান কে এই মাঝবয়সী লোকটি। কেন তার প্রতি এতো ভালোবাসার বিনয় ও শ্রদ্ধা। রাজিব খাওয়া দাওয়া শেষ করে হাঁটতে লাগলো পাশেই সিএনজি স্ট্যান্ড, একটু দাঁড়ালো, যদি মালিক রাতের প্রহরী হিসাবে এই ষ্ট্যান্ডে একটি চাকুরি দেয় তবে জীবনকে সম্মান দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করবো।
ষ্ট্যান্ডের একজন প্রহরীকে বললো একটু আশ্রয় চাই আর যদি দয়া হয় তবে পাহারাদার হিসাবে একটি চাকুরি দিলে জীবনটা বাঁচাতে পারবো। কর্তব্যরত প্রহরী জীবনের সাথে অনেক সংগ্রাম করে ঢাকা শহরে এসেছে এখনো সংগ্রাম করে বেঁচে আছে। রাজিবের দিকে তাকিয়ে বললো একটু বসো, কোথা থেকে এসেছো পাবনা রূপপুর গ্রাম থেকে। দেখে মনে হয় শরীরের ভেতর অনেক ব্যথা আর যন্ত্রণা। আজকের রাতটা আমার সাথে থাকতে পারো সকালে উঠে অন্য জায়গাতে চলে যাবে। রাজিব ভাবলো রাতটা পাড়ি দিলে অন্য চিন্তা করা যাবে।
রাত গভীর হচ্ছে কর্তব্যরত প্রহরী জেগে আছে সাথে রাজিবও জেগে আছে। প্রহরী বললো কোন কাজ জানো যে ঢাকা শহরে কাজের জন্য এসেছো। অল্প সময়ের মধ্যে সব কাজ শিখে নেবো। কিভাবে শিখে নিবে। যদি তুমি একটু সাহায্য করো। আমি তো অভাবগ্রস্থ মানুষ তোমাকে কি শেখাবো। পৃথিবীর অধিকাংশ জ্ঞানই অভাবগ্রস্থ মানুষগুলো তাদের চেতনা থেকে প্রকাশ করেছে। এতো জ্ঞানের কথা কিভাবে শিখেছো। পথ চলতে চলতে অনেক আঘাত আর প্রতিঘাতে।
প্রহরী বললো এই যে ঢাকার শহর দেখছো এই যে বৃত্তবানদের প্রাসাদ দেখছো প্রাসাদের ছায়ার নীচে ছোট ছোট ঘর দেখছো যেন অসাম্যের দীর্ঘ এক যন্ত্রণার সারি। স্বাধীনতার সময় মানুষ পুনরুজ্জীবন গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্ন দেখেছিল সাম্যের ঐক্যতে সবাই উদার হবে। অপরিহার্য উৎকর্ষ নিয়ে সুসামঞ্জস্য বাস্তবতাকে নিপুন ভাবে গড়ে তুলবে আর সবাই কঠিন আতœবিরোধকে অতিক্রম করবে। কিন্তু আমরা কি তা করতে পেরেছি ?
রাজিব একটু ভেবে প্রহরীর দিকে তাকিয়ে বললো স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলে প্রাসাদের নিচে ছোট ছোট ঘরগুলো ইট দিয়ে তৈরী হতো ওদের নিজেস্ব ভূমি থাকতো ওরা প্রগতির বাস্তবতায় হাঁটতো। রাজিব আরো বললো বিশ্বাস ভালোবাসাকে বুকে নিয়ে ওরা সব কিছুকে সত্য মনে করেছিল। কিন্তু মনের আকঙ্খা দাবী আর বাস্তবতাতো এক না। তাই আমি তুমি আর সবাই এভাবে সময়ের সাথে সংগ্রাম করে জেগে উঠতে হবে।
প্রহরী বললো রাত অনেক হয়েছে ঘুমিয়ে পড়ো। রাজিব বললো সারাজীবন জেগে থাকতে থাকতে ঘুম হারিয়ে গেছে। এখন জেগে থাকা আর ঘুমের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। রাত শেষের দিকে কিছু ক্ষণের মধ্যে আযানের ধ্বনি শোনা যাবে। ঢাকা শহরের গাড়িগুলো হর্ণ বাজিয়ে চলতে শুরু করেছে। প্রহরী রাজিবকে নিয়ে খাওয়ার হোটেলের দিকে নাস্তা করার জন্য রওনা হলো। রাজিব বললো আমার হাতে তো নাস্তা করার মত টাকা নেই। প্রহরী বললো অসুবিধা নেই। সারারাত তোমার ভালোভালো কথা শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি তুমি ইচ্ছে করলে আরো কিছু দিন এখানে থাকতে পারো।
রাজিব ও প্রহরী হোটেলে নাস্তা করছে আর যুবকটি তাকিয়ে তাকিয়ে রাজিবকে দেখছে। মাঝে মাঝে যুবকটি ভাবছে লোকটিকে জিজ্ঞেস করি বাড়ি কোথায় তার ছেলে সন্তান আছে কি, থাকলে তারা কোথায় ও কি করে ?
নাস্তা শেষ করে তারা দুইজন আবার সিএনজি ষ্ট্যান্ডের দিকে ফিরে যাচ্ছে। হোটেলের সহকারী ম্যানেজার যুবকটি তাদের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকলো এবং সিএনজি ষ্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌছালো। রাজিব রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটার ভান করে পাইচারী করছে। এমন সময় যুবকটি প্রহরীর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলো এই মাঝবয়সী লোকটিকে তুমি চেনো ? প্রহরী বললো না তবে পাবনার রূপপুর গ্রাম থেকে গতকাল ঢাকা শহরে এসেছে। যুবক বিষ্ময় বেদনায় তাকিয়ে রইলো আর বললো রূপপুর গ্রাম। আপনি কি ওই লোকটার নাম বলতে পারবেন। আমাকে বলেছে ওর নাম রাজিব।
যুবকটি অশ্রুঝরা চোখে আকাশের দিকে তাকালো আর মনে মনে বলতে লাগলো বিনা দোষে দীর্ঘ সতের বছর কারাগারি বন্দি থেকে পিতা আমার বেরিয়ে এসেছে। প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম তার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক।
জনি আর কণা দুই ভাই বোন প্রভাবশালীদের অত্যাচার জুলুম সহ্য করতে না পেরে মা-সহ ঢাকাতে চলে এসেছে। মা কিছু দিন আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে এখন শুধু আমি আর কণা। আমার একটি ছোট বোন ছিল মা তাকে পাঁচশত টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিল। এখন সে কেমন আছে আমরা কেউ বলতে পারবো না।
রাজিব পাইচারী করে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ স্ত্রী ও সন্তানদের কথা মনে পড়ে যায়। তারপর সে মনের অজান্তেই হাঁটতে থাকে এবং হাঁটতে হাঁটতে দূর বহুদূর পথের প্রান্তে গিয়ে পৌছায়। পেছনে ধু-ধু দীর্ঘ পথ, রাজিব কি ফিরে যেতে পারবে রাতে আশ্রয় দেওয়া সেই প্রহরীর কাছে ? এদিকে রাজিবের ছেলে জনি বাবার পরিচয় জেনে খুশিতে আতœহারা হয়ে ছুটে যায় বাসাবাড়ির দিকে সেখানে গিয়ে ছোট বোন কণাকে বাবার সন্ধান পাওয়ার খবর জানায়। ভাই ও বোন ছুটতে ছুটতে সিএনজি ষ্ট্যান্ডে এসে পৌছায় এবং বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকে।

প্রহরী বললো গতকালের আশ্রয় নেওয়া ওই মাঝবয়সী লোকটি তোমাদের বাবা আগে বলোনি কেন ? তিনি তো সকালে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় গেছে বলতে পারবো না, ফিরে আসলে তোমাদের খবর দেবো।
কাঁচা রোদের সকালে ঢাকা নগর পৃথিবীর সাথে একাতœ মিশে গেছে। দেশকাল চতুর্মাত্রার বাইরে যেন অতীন্দ্রিয় জগত পুত: পবিত্র হয়ে সত্য জ্ঞানীদেরকে দর্শন দিচ্ছে।
অপরদিক দুনিয়ার বিলাস অত্যাচারী ও অপরাধীদেরকে লোভ-লালসা বাসনা-কামনা হিংসা বিদ্বেষ মিথ্যা প্রতারণা পরশ্রীকাতরতা ও যৌনোত্তেজনায় মগ্ন করে রেখেছে।
দূর থেকে মহা প্রভূ তার বান্দাদের নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় থেকে আতেœাৎকর্ষ সাধনে আতœশুদ্ধিতে উপনীত হওয়ার জন্য আত্মতাত্ত্বিক গুপ্তরহস্যভেদের তাৎপর্যপূর্ণ জ্ঞান দিয়ে আতœাকে বিশোধন করার তাজাল্লি দিচ্ছে। যাদের জন্য রয়েছে ইহলৌকিক ও পরলৌকিক শুভসংবাদ।
রাজিব হাটতে হাটতে পথে ক্লান্ত হয়ে যায় তারপর হঠাৎ রাস্তা পার হতে গিয়ে এক ছোট গাড়িতে ধাক্কা খায় এবং আঘাত পেয়ে রাস্তয় পড়ে যায় গাড়ীর মালিক মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে হাসপাতালে পৌছে দেয় এবং বাড়িতে গিয়ে প্রিয় কন্যা সামান্তা মরিয়মকে রাস্তায় দূর্ঘটনার কথা বললে মেয়ে লোকটিকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মেয়ের মানবিক গুণ বিবেচনা করে তাকে সাথে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হয়।
এ দিকে রাজিবের ছেলে জনি ও বড় মেয়ে কণা সারা ঢাকা নগর পিতাকে খুঁজে ফিরছে। ভদ্রলোক ও তার কন্যা সামান্তা মরিয়ম হাসপাতালে পৌছালো-
রাজিব এখন সুস্থ। ভদ্রলোক রাজিবকে বললো আপনার বাড়ি কোথায়, পাবনা রূপপুর গ্রামে, ভদ্রলোক বিষ্ময়ে হতভম্ব হয়ে উপরের দিকে তাকালো তারপর চোখ নামিয়ে বললো নাম কি, রাজিব। কি করা হয়। সতের বছর বিনাদোষে কারাগারে হাজত খেটে কয়েক দিন আগে ঢাকা নগরে এসেছি। কেন ঢাকা নগরে এসছেন। আমি যখন কারাগারে বন্দি ছিলাম তখন সংসারে অভাবের যন্ত্রণায় আমার স্ত্রী এক বৃত্তবানের কাছে আমার ছোট কন্যাকে পাঁচশত টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন। গ্রামের প্রভাবশালীদের অত্যাচারে আমার বড় ছেলে ও মেয়ে পালিয়ে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে জানি না। আমার এই উদাস মন সব সময় বলে তারা সবাই ঢাকা শহরেই আছে। তাই এই নগরে এসেছি।
সামান্তা মরিয়ম রাজিবের দিক তাকিয়ে আছে সে বুঝে নাই যে এই রাজিবই তার পিতা। মা অভাবের সংসারে এই বৃত্তবানের কাছেই তাকে পাঁচশত টাকা বিক্রি করে দিয়েছিল।
ভদ্রলোক বুঝতে পারলো এই রাজিবই তার পালিত কন্যা সামান্তা মরিয়ম এর পিতা। কিন্তু সামান্তা মরিয়ম জানে যে তার পিতা এই বৃত্তবানই। বৃত্তবান ভদ্রলোক রাজিবের হাতে একটি কার্ড দিলো আর বললো এই কার্ডে আমার ঠিকানা লেখা আছে আপনি যখন খুশি আমার সাথে দেখা ও যোগাযোগ করতে পারেন। সামান্তা মরিয়ম পিতার পরিচয় জানেনা তারপর মমতার বন্ধন তাকে এই হাসপাতালে টেনে অনেছে।
ঘাত-প্রতিঘাত ত্যাগ-তিতীক্ষা ও প্রতিকুলতার ভেতর দিয়ে মানুষের জীবন অতিবাহিত হয়। আত্মোৎকর্ষ লাভের বিধি বিধানে পরষ্পরা রক্ত আতœদানে সজ্ঞীবিত হয়ে অনুকরণের প্রেমে আপনজনকে চিনে নিতে চেষ্টা করে। জ্ঞান দ্বারা সঠিক মর্মোপলদ্ধি স্থাপিত হলে অনাবিল আতœা মানুষকে সাহায্য করে।
বিশ্ব নিঃসঙ্গ একা একা কাঁদে স্বর্গীয় অপ্সরীর রূপ এসে সূর্যালোককে ম্লান ও নি®প্রভ করে দিচ্ছে। স্বর্গের বাতাস থেকে মধুর সুবাস ও সুরভি ছড়াচ্ছে। পরম সুখের জীবন যেন বর মহিমার দর্শনকে উপলদ্ধি করছে। বৃত্তবান ভদ্রলোক কন্যা সামান্তা মরিয়মকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে আর জীবনকে নিয়ে ভাবছে। তিনি মনে করেন জীবনের চেয়ে মৃত্যুর অনেক শক্তিশালী ও প্রবল। মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকার ইচ্ছা খুবই প্রিয়। তারপর মানুষ মৃত্যুকে বন্ধু ভেবে তার সাথে বন্ধুত্বের মতো বাস করে। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে চিন্তা করলো সামান্তা মরিয়মকে সব সত্য জানানো উচিত কেননা সত্যই জীবনের পরম বন্ধু।
এদিকে রূপপুর গ্রামের প্রভাবশালীরা রাজিবের কারাগার থেকে বের হয়ে আসায় চিন্তায় পড়েছে। রাজিব বেঁচে থাকলে তাদের সমস্যা হতে পারে তাই যে ভাবেই হোক রাজিবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। রাজিব কখন কোথায় কিভাবে আশ্রয় নিচ্ছে কোথায় হাটছে সব খবর রাখছে এবং রাজিবকে হত্যার জন্য অনেক টাকার বিনিময়ে পেশাদার খুনিদের ভাড়া করেছে। বঞ্চিত মানুষের অধিকার হরণকারীরা ক্ষমতাশীনরা পৃথিবী জুড়ে তাদের অন্যায় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
ভোগ বিলাস উগ্রতা ক্রোধ আর দূর্নীতি দিয়ে দেশ ও সমাজকে আঁকড়ে রাখতে চাইছে। আমিত্বের বিশ্রী লালসা দিয়ে তারা নিজেদেরকে দামী মানুষ ভাবছে।
বাড়ি ফিরে গিয়ে রাতের খাওয়ার শেষে বৃত্তবান ভদ্রলোক সামান্তা মরিয়মকে ডেকে বললো আজ হাসপাতালে যে ভদ্রলোককে তুমি দেখতে গিয়েছিলে জানো তিনি কে ? না বাবা কেমন করে জানবো ? তাকে তো আমি প্রথম দেখলাম। বৃত্তবান লোকটির নাম আরিফ। তিনি বললেন তিনি তোমার পিতা। সামান্তা মরিয়ম বিষ্ময়ে আরিফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল উনি আমার পিতা তবে তুমিকে ? পালিত পিতা। পালিত পিতা। হ্যাঁ পালিত পিতা। তোমার পিতা যখন কারাগারে তখন অভাবের সংসার থেকে তোমার মাতা তোমাকে পাঁচশত টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিল। তারপর শিশুকাল থেকে আমি তোমাকে পিতার স্নেহ দিয়ে সত্য মানুষ হিসাবে গড়ে তুলেছি। সত্য মানুষই নিগূঢ় বিশ্বাসী ও পরম বন্ধু হয়। সত্যকে বুকে ধারণ করেই মানুষের বেঁচে থাকা উচিত। সত্য গোপনকারী আজীবন যন্ত্রণায় জ্বলে আর পুড়ে তাই সব সত্য তোমাকে খুলে বললাম। সামান্তা মরিয়মের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে...।
পরের দিন বিকেলে রাজিব হাসপাতাল থেকে বের হয়ে স্ত্রী সন্তানের খোঁজে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আর গ্রামের প্রভাবশালীদের ভাড়া করা খুনিরাও রাজিবের পেছনে পেছনে হাঁটছে দূরপথ হাঁটতে হাঁটতে বিজয় স্মরণীর কাছে গিয়ে পৌছালো হঠাৎ রাস্তার পাশে আবর্জনার স্তুপে একটি শিশু চিৎকার করে কাঁদছে, রাজিব এগিয়ে যেতেই কয়েকজন খুনি তাকে আক্রমণ করলো তখন গোধূলির রক্তিম আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেলো। খুনিরা রাজিবকে মৃত্যু নিশ্চিত করে বীরদর্পে সংসদ ভবনের পাশের রাস্তা দিয়ে চলে গেলো। চারিদিকে নিঃশব্দ, ক্লান্ত রাজধানীর বুকে অসভ্য ক্ষমতাবানরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একটি ইটের বুকে সিমেন্ট বালু লাগিয়ে অন্য ইটকে জড়িয়ে ধরে ধনীরা বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেছে। খুনিরা পাশবিক প্রবৃত্তির লোভ লালসা বুকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাদের পাথর মনে একটু স্নেহ প্রেম প্রীতি সিক্ত ভালোবাসা বলে কিছু নেই।
পরের দিন সকালে রাজিবের মৃত্যুর সংবাদ দেশের সব কয়টা জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার সুবাদে রাজিবের ছেলে জনি কন্যা কণা ও সামান্তা মরিয়ম জানতে পারে যে তাদের পিতা খুন হয়েছে এবং লাশ বার্ডেম হাসপাতালে রাখা হয়েছে। সন্তানরা পরিচয় দেওয়ার আগেই রাজিবকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো। রাজিব তো ঢাকা শহরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আসেনি সে এসেছিল তার স্ত্রী সন্তানকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। তবে প্রভাবশালীদের টাকার বিনিময়ে খুনিরা রাজিবকে হত্যা করলো কেন ? এই হত্যাকান্ডের জবাব কে দেবে আর কে প্রশ্ন করবে হত্যাকারীকে ? আবর্জনার ভেতর ওই শিশুটিই বা কেন চিৎকার করছে। কে ওদের বাবা মা। এখন শিশুটি হাসপাতালে হয়তো অজ্ঞাত পরিচয় নিয়ে সে বড় হতে থাকবে।
খবরের কাগজে ও টেলিফোনে সংবাদ পেয়ে একদিকে সামান্তা মরিয়ম তার পালিত পিতা আরিফ এবং অপর দিকে জনি ও মেয়ে কণা বার্ডেম হাসপাতালে পৌছায়।
পিতার লাশ নেওয়ার জন্য একদিকে সামান্তা মরিয়ম আবেদন করে অপরদিকে জনি ও কণা আবেদন করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উভয়কে অফিসে ডেকে নেয় এবং বলেন যে আপনারা উভয়ই পিতা পরিচয় দিয়ে মৃতদেহ নিতে চাইছেন সেই ক্ষেত্রে একটি আবেদন হলেই চলবে। দুইটি আবেদনের প্রয়োজন নেই। সামান্তা মরিয়ম বললো মৃত ব্যক্তি আমার পিতা আবার জনি ও কণা বললো মরহুম আমাদের পিতা। কিন্তু তুমি কে ? সামান্তা মরিয়ম বললো আমি রূপপুর গ্রামের রাজিবের ছোট কন্যা। বাবা কারাগারে যাওয়ার পর অভাবের সংসারে মাতা আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিল, আমি সেই শিশু কন্যা।
জগত মলিন, বিশ্বমানবতার বেদনা বিধুর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন যেন অভয় শান্তিকে স্নিগ্ধ তাপদিয়ে জ্ঞানকে আর সত্যকে অঙ্কুরিত করছে।
জনি ও কণা একটু হেঁটে গিয়ে সামান্তা মরিয়ম হাত ধরে বললো আমাকে চিনতে পারোনি সেই ছোট বেলায় কত রাত আমার বুকে ব্যাকুল স্বপ্নে ঘুমাতে একটু ক্ষুধাতে চিৎকার করে উঠতে মা গভীর রাতে দুধ গরম করে দিতো, বাবা তোমার কান্না শুনলে অস্থির হয়ে উঠতো। সেই সামান্তা মরিয়ম এতো বড় হয়েছে রাজ কন্যার মতো সুন্দর হয়েছে মহৎ বৃত্তবান শিল্পপতি তাকে পিতার স্নেহ দিয়ে উপযুক্ত শিক্ষায় জ্ঞানী করে তুলেছে। তোমার সত্য জ্ঞান ও শিক্ষাই একটি অসভ্যতাকে ভেঙেচুরে আদর্শ সভ্যতার পথ দেখাবে। আইনের মাধ্যমে পিতার হত্যাকারীদের বিচার হবে।
দেখোনা আমরা দুই জন খুবই গরিব। শরিরের বিবেক শুধুই ফরিয়াদে কাঁদে। আর ধূর্ত অন্যায়কারীরা দেশ ও সমাজে ত্রাণকর্তার শিরোনাম হয়ে থাকে।
তিন ভাই-বোন কান্নায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তারপর একমত হয়ে পিতার মৃতদেহ নিয়ে রূপপুর গ্রামের দিকে রওনা হয়।
পশ্চিমে গোধূলির মেঘ। লাল আসমানের সাথে আলিঙ্গন করে পদ্মা নদীকে স্বাগত জানাচ্ছে আর কান্নার ঢেউ তুলছে। স্বাধীনতার আকাশ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতা রাজিবকে পৃথিবী যেন বিনয় শ্রদ্ধা দিয়ে মহামিলনের যাত্রা পথে নিয়ে যাচ্ছে।
সামান্তা মরিয়ম করুণ বেদনায় অশ্রুঝরা চোখে আর্তনাদ করে বলতে লাগলো বিভীষিকার শোষণ জুলুম থেকে পিতা আজ মুক্ত। রণক্ষেত্রের ক্ষতবিক্ষত তৃষ্ণার্ত সৈনিক অশনি বার্তার কালো প্রাচীর ভাঙতে পারিনি কিন্তু দেশপ্রেম ও মুক্তিযোদ্ধার ন্যায়পরায়ন তরবারি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছে।
জনি ও কণা সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললো এই আমাদের দেশ এই আমাদের গ্রাম। আর এই সমাজকে পরিশুদ্ধ করে প্রবল প্রতিবাদ প্রতিরোধে জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে যেন কোন ক্ষমতাধর প্রভাবশালীরা দেশের সাধারণ মানুষের উপর জুলুম করতে না পারে। সামান্তা মরিয়ম আবারো বললো এসো বন্ধু এসো দেশপ্রেমিক সময় ও সমকালের সাহসী মুক্তিযোদ্ধা মানবতার স্বপ্ন আর আমাদের স্বাধীনতার দাবীগুলো বাস্তবায়নের জন্য শোষণ সন্ত্রাস জুলুম দূর্নীতি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমস্বরে বলে উঠলো এই হত্যার বিচার চাই আমরা সবাই বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজিব হত্যার বিচার চাই...।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement