ফাগুন বসন্তের মিহি বাতাস বইছে। অরণ্য সবুজে ফুলের হালকা মৃদু গন্ধ। আকাশে জ্যোৎস্না ভরা মধুর চাঁদ হাসছে। বুকের ভিতরে অতীতের দিনগুলি ভেসে আসে। কিছু আলোকিত কিছু আচ্ছন্ন অন্ধকার। কিছু বলতে চায় কিছু না বলে চলে যায়।

এমন সময় নির্বিকার শিশু শাহরিন একা একা দেশের কথা ভাবতে থাকে। বয়সে শাহরিন খুব ছোট। বাবার কাছ থেকে দেশের কথা শুনেছে। যুদ্ধের কথা শুনেছে, স্বাধীনতার কথা শুনেছে।

আমাদের এই দেশকে নিয়ে ছোট্ট শিশু শাহরিন খুব গভীর ভাবে চিন্তা করে, কি ভাবে দেশের মানুষকে দারিদ্র মুক্ত করা যায়, স্বনির্ভর জাতি হিসাবে কি ভাবে পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশের মতো উচুঁ করে দাঁড়ানো যায়। দেশের মানুষের দারিদ্র ক্ষুধা তার বুকের ভিতর কাঁদে। ব্যর্থ জীবনের অকৃতকার্যতাই আমাদের পেরুতে হবে।

ধুসর কুয়াশার মতো নিবিড় চেতনাহীন মানুষের নিস্তব্ধ আশা গুলি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্ধকার আচ্ছন্ন ভয়ানক রাত্রি থেকে জাতিকে আলোর পথে নিয়ে যেতে হবে। চরম সত্যের সুপ্রভাত দেখতে হবে। এক দৃঢ় কঠিন বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে সে দেশের মানুষকে স্বনির্ভর করতে চায়।

পুরাতন পরিত্যক্ত ধুসর কুয়াশা ভেদ করে দিগন্তের সুদূর আকাশ দেখতে চায়। মানুষগুলো রংধনু নক্ষত্রের রশ্মি ভেদ করে উড়ে যেতে চায় সুদূর পথে। সমুদ্র পর্বত চূড়া অতিক্রম করে।

এভাবে ভাবতে ভাবতে শাহরিন চিন্তা করে একা একা তো আর এদেশের মানুষকে স্বনির্ভর করাতে পারবো না। আমাদের শিশুদেরকে একত্রিত হতে হবে। জ্ঞানীদের সংগে আমাদের পরামর্শ করতে হবে। অতীত ইতিহাস জানতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

ধৈর্যের সাথে পথ চলতে হবে। তীব্র চেতনার অন্তরালে জ্ঞানের আলো জাগাতে হবে। রাত্রির পর রাত্রি ঠিক মধ্যম রাত্রি সারা পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন শাহরিন জেগে জেগে দেশের কথা ভাবে মানুষের কথা ভাবে। দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের কথা ভাবে। মানুষের অভাব অনাহার দরিদ্রতা থেকে মুক্তির কথা ভাবে।
তার বুকের ভিতর নিঃশব্দ বেদনার কান্না বয়ে চলে। দেশকে আরও গভীর করে দেখে এবং সেই অনুভূতির আওয়াজ তাকে তীব্র বিহ্বল করে। মাঝরাতে চোখটা চেয়ে থাকে দেশের মানুষের দিকে। প্রতিনিয়ত চিন্তার মধ্যে সে দেশের শিশুদের সাথে যোগাযোগ করে। আস্তে আস্তে দেশের সকল শিশুদের কাছে তার কথা চিন্তা পৌঁছে দিতে থাকে।

শিশুরা আগ্রহের সাথে শাহরিনের সাথে যোগাযোগ করে। শাহরিনের সহপাঠী মেহেলী, দোলা, ইশা, তুলি, রিচি, মাহমুদ ও শ্রাবণ সব সময় তার সাথে থাকে। তাকে সব কাজে সাহায্য সহযোগিতা করে। কিভাবে তারা দেশকে স্বাধীন করেছে। স্বাধীনতার পরে কেন মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তি পায় নাই?

মাহমুদ ও শ্রাবণ পরামর্শ দেয় প্রবীণ জ্ঞানীদের সংগে যোগাযোগ করতে, কি ভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এদেশে সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল। সবার পরামর্শ শাহরিন গ্রহণ করে এবং আস্তে আস্তে সবাইকে নিয়ে পথ চলতে থাকে।

এ পথে বড় বাঁধা আসন্ন মৃত্যুর সংকেত ধ্বনি। চারিদিকে নিশ্চুপ মানুষের কান্না। আদর্শ বর্ণচোরার মতো নিস্তব্ধতা জীবনের গভীরে জীবনের স্পন্দন। অদৃশ্য অচেনা অন্ধকারের এই পথ।

শাহরিন ও তাঁর সহপাঠী হেঁটে যাচ্ছে। কালো অন্ধকার ভেঙ্গে নতুন সকালের আলো ফোটাবে। দৃশ্যমান ক্লান্ত মুহূর্ত তাদের বিপন্ন চোখ চেয়ে চেয়ে দেখে বিনিদ্র রাতের জোনাকি। শোনে ঘুমহারা পাখিদের গান। পৃথিবীর ইতিহাস বয়ে চলে পৃথিবীর পথে।

পাথরের বুকে ঝর্ণার বিদগ্ধ কান্নার বেদনা ব্যথা। ভারাক্রান্ত অনিশ্চিত জীবনের ভবিষ্যৎ। তীব্র যন্ত্রণার নীল কণ্ঠ দুর্বোধ্য নিরক্ষর গোলক ধাঁ ধাঁ চারদিকে। রক্তবর্ণ চোখ সংঘর্ষ আর ভয়ানক আতঙ্ক ভরা দিন।

এরই মাঝে হাঁটতে থাকে শাহরিন তার সহপাঠীরা হাঁটতে-হাঁটতে প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায়। আবুল হোসেন এখন বৃদ্ধ । ক্ষুধা তার নিত্য দিনের সাথী। ঘুমহীন রাতের মৃত্যু তাকে ডাকে। এমনি জীবনের শেষ মুহূর্তে হঠাৎ কয়েকটি শিশু তার সামনে এসে দাঁড়ায়।

কালো মেঘ তার চোখের সামনে থেকে একটু দূরে সরে যায়। সে দেখে মুক্ত সবুজ প্রকুতির পথ আঁকা বাঁকা নদীর বুকে শান্তির আগমন। হিমেল হালকা অনুভূতি তার মনের গভীরে ডাক দেয়। শিশুদেরকে জিজ্ঞেস করে কি চাও তোমরা কেন আমার কাছে এসেছো।
অপরূপ রাতের বাতাসে জোছনায় মুখ তোলে শাহরিন ও তার সাথে আশা শিশুরা সবাই বলে জ্ঞান চাই, শক্তি সাহস চাই, দারিদ্রতা থেকে মুক্তির দিক নির্দেশনা চাই।

বৃদ্ধের চোখের ভিতর যুদ্ধের ক্ষত রক্তাক্ত মাটির ভেজা পথ জেগে ওঠে। অসংখ্য ক্লান্ত মুখ কিছু চেনা কিছু অচেনা আত্মগোপন করে জীবনের গভীরে। বহু বছরের ঘুমন্ত স্বপ্ন আজ জেগে ওঠে গোধূলির আবছা অস্পষ্ট আলোয়। আজ জীবন কথা বলে শিশুদের দিকে চেয়ে।

পৃথিবীর বুকে মানুষ জন্মায় বেঁচে থাকে আবার মরে যায়। যথারীতি নিয়মের এক দৃশ্য আর অদৃশ্যের ভিড়ে। বৃদ্ধ ভাবে আমাকেও চলে যেতে হবে। কিন্তু যাওয়ার আগে যদি আমার জ্ঞান টুকু শিশুদের জীবনের ভিতর দিয়ে যেতে পারি তবে তা আগামী দিনে দেশের কাজে ব্যবহার হবে। শিশুরা মুক্তির পথ দেখতে পারবে। গভীর অন্ধকার গহ্বর ভেঙে আলো জ্বালাতে পারবে নগরে ও গ্রামে। এভাবে আমাদের দেশ একদিন আলোকিত শান্তিময় হবে।

ধীরে ধীরে প্রকৃতি রঙ বদলায়। প্রকৃতির সাথে মিশে শিশুরাও বদলাতে থাকে। জ্ঞান আহরণ করে প্রবীণ সেই ব্রিটিশ বিরোধী বৃদ্ধ হোসেন আলীর কাছ থেকে। শিশুরা নির্ভুল ঠিকানার সঠিক পথ খোঁজে। উচ্ছ্বাস মুখের সাহসী কণ্ঠ খোঁজে।

ঐ দূর পথ পাথর ভাঙা রাস্তা অতিক্রম করতে হবে। যেখানে দুর্বোধ্য জীবনের চাওয়া পাওয়া পড়ে আছে। জীবন প্রবাহের সহসা যাত্রা পথে। বিস্তৃত রাত্রির বুকে আলোর পদধ্বনি আর নতুন দিনের অভ্যর্থনা জানাতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বলে তোমরা চাঁদের পথে যাত্রা করো সেখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা জেগে আছে তোমাদের সাক্ষাতের প্রতীক্ষায়। সেখানে গেলে তোমরা আলো পাবে শান্তির পথ পাবে মুক্তির দিক নির্দেশনা পাবে।

শাহরিন ও অন্যান্য শিশুরা চোখ তোলে নীল দিগন্তের আকাশের দিকে কালের সীমাবদ্ধতা ভেঙে ওরা ছুটতে থাকে দূর চাঁদের পথে। সুদর্শন রাজপুত্রের মতো শক্তিধর সুন্দরে ।

সামনে সজীব সবুজ নীল আকাশ বিবর্ণ বিচিত্র আলোর পথ দূর থেকে উঁকি দেয়। শ্বেত পুষ্পিত জুই বকুল হাসনা হেনার গন্ধে যেখানে জেগে আছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা যেন সেই দূর অতিদূর শান্তিময় নীল আকাশ চাঁদের বুকে।

উদ্দাম জীবনের পথে শিশুরা ছুটে যাচ্ছে পরস্পর হাত দুলে গান গেয়ে কাকলি মুখর অভিন্ন যাত্রার নিজস্ব গন্তব্যে। যেখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আর শিশুদের সংলাপ হবে। স্বতঃস্ফূর্ত সুদীর্ঘ জীবনের আশা আর মুক্তির দিক নির্দেশনা নিয়ে।