লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ মার্চ ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৮টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪৪

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftব্যথা (জানুয়ারী ২০১৫)

মৃত্যু ফাঁদ
ব্যথা

সংখ্যা

মোট ভোট ৪৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪৪

নাজনীন পলি

comment ২৫  favorite ০  import_contacts ১,৩৯৮
এক
খাদিজা বেগমের ঘুম ভেঙ্গে যায় কতগুলো মানুষের সম্মিলিত চিৎকারে । দুপুরে খাওয়ার পর প্রতিদিনের মত আজও ছোট খোকনকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন । ঘুম ভাঙ্গার পর পাশ ফিরে দেখেন খোকন পাশে নেই । মা খাদিজা বেগম ছেলের দুষ্টুমি দেখে মনে মনে হাসেন । ছেলের বয়স চার হতে চলেছে এর মধ্যেই মাকে ফাঁকি দেওয়া শিখে ফেলেছে, বড় হলে না জানি কত দস্যি হবে ছেলেটা ! এ বয়সেই এমন বুদ্ধি খাটিয়ে মায়ের পাশ থেকে নিঃশব্দে উঠে পড়ে তারপর চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে দরজা খোলা সে কি কম কথা ! ছেলের কর্মকাণ্ডে মায়ের বুক গর্বে ভরে ওঠে । বাইরে মানুষের কোলাহল বেড়েই চলেছে । খাদিজা বেগম দরজার দিকে পা বাড়াতেই দরজায় দ্রুত কড়া নাড়ার শব্দ , বুবু দরজা খোলো । খাদিজা বেগমের বুক কেঁপে উঠে ভাইয়ের এমন ভয়ার্ত কণ্ঠ শুনে ।দরজা খুলতেই দেখেন অনেক মানুষের জটলা , বুবু খোকন কোথায় ? ভাইয়ের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে উৎসুক জনতার দিকে একবার তাকিয়ে নেন খাদিজা বেগম । সকলের চোখে যেন একই প্রশ্ন খোকন কোথায় ? খাদিজা বেগম কোন মতে বলেন ও তো আমার পাশেই ঘুমিয়ে ছিল তারপর কখন যেন উঠে বাইরে খেলতে চলে গেছে ।ভাইয়ের চোখ এইবার বিস্ফোরিত হয় ‘বুবু সর্বনাশ হয়ে গেছে’।


দুই
শাহজাহানপুর রেল কলোনির দেড় কক্ষের এই বাসাতেই থাকেন খাদিজা বেগম ও তার পরিবার। আজ সন্ধ্যায় পিঠা বানাবেন বলে চালের গুড়া-গুড়-নারকেলসহ সব উপকরণ রেডি করে রেখেছিলেন ।ছেলেমেয়েগুলো পিঠা খেতে খুব পছন্দ করে । বিশেষ করে ছোট সন্তান খোকন কদিন থেকেই ভাপা পিঠা খাওয়ার বায়না করছিলো ।এইতো আর কিছুক্ষণ পর খোকন খেলা শেষে ঘরে ফিরলেই তিনি পিঠা বানানো শুরু করতেন । কিন্তু এখন তিনি আলুথালু বেশে ছুটছেন , তার খোকা তাকে ডাকছেন মা মাগো আমাকে বাঁচাও । তিনি গন্তব্যে এসে থামলেন । চারিদিকে জনতার ভিড় । ভিড় ঠেলে তিনি খোকন খোকন বলে এগিয়ে যাচ্ছেন ।

তিন
খাদিজা বেগমের চার বছরের ছেলে খোকন চারটার দিকে অন্য শিশুদের সঙ্গে বাসার পাশেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পানির পাম্পের কাছে খেলতে যায় । তারপর খেলতে খেলতে পানির পাম্পের দেড় ফুট ব্যাসের খোলা মুখ দিয়ে নিচে পড়ে যায় । ছোট্ট খোকনেরতো জানা ছিল না তাদের এই খেলার স্থানে থাকতে পারে কোন মৃত্যু ফাঁদ ।খবরটা সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে । চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। মিডিয়া এই ঘটনার নিউজ পৌঁছে দিচ্ছেন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারা পৃথিবীজুড়ে । সরকারের বিভিন্ন বাহিনী থেকে বিশেষজ্ঞ লোকেরা এসেছে ছেলেটিকে মৃত্যু ফাঁদ থেকে উদ্ধার করতে ।কিন্তু কিভাবে বাঁচাবে তারা ছোট্ট খোকনকে । এই ফাঁদটা যে অনেক গভীরে ৬০০ ফুট নিচে গিয়ে শেষ হয়েছে ।খাদিজা বেগম দিশেহারা । ছেলেকে তিনি যে কোন মূল্যে বাঁচাতে চান ।তাকে সবাই ধরে রেখেছে । ছেলেকে বাঁচাতে তিনি এই মৃত্যু কূপে ঝাঁপ দিতে চাইছেন ।

চার
রাত গভীর হয়েছে তবে সরকারের বাহিনী এখনো ছেলেটিকে উদ্ধার করতে পারেনি ।উৎসুক জনতার ভিড় কমছে না । সারা দেশের মানুষ টিভিতে ছোট্ট খোকনকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা লাইভ দেখছে । এর আগে কোন লাইভ অনুষ্ঠানের এত দর্শক হয়নি । এ রকম লাভজনক অনুষ্ঠান বানানোর সাধ্য কারো ছিল না । একে একে সব টিভি চ্যানেল , অনলাইন পত্রিকা খবরটির আপটুডেট প্রচার করে চলেছে । ফেসবুকজুড়ে স্ট্যাটাস আসছে ‘ছেলেটির জীবনটা যেন বাঁচে’ । কিন্তু সরকারী বাহিনীর সব ধরণের অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে ।খাদিজা বেগম আশায় বুক বাঁধেন তার ছেলেকে ফিরে পাবেন । ছেলের কান্নার আওয়াজ শুনেছিলেন তিনি । নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তার ছেলেকে পাইপের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছেন । কিন্তু একি বলছে সরকারী লোকেরা তার ছেলে নাকি পাইপে নাই! তার ছেলে নাকি পাইপে পড়েই নাই । কোথাও গেলো তার নাড়ি ছেড়া ধন খোকন তাহলে?নাকি সরকারী বাহিনী তাদের অপারগতা ঢাকতে এসব কথা বলছে ? এইসব ভাবতে ভাবতেই খাদিজা বেগম জ্ঞান হারান ।


পাঁচ
টিভি দর্শক, অনলাইন পত্রিকার পাঠকেরা এই ঘটনায় ভীষণভাবে ক্ষুব্দ হয়েছেন । এটার কোন মানে হয় রাত জেগে লাইভ অনুষ্ঠানটা দেখলাম, ছেলেটার জন্য কত প্রার্থনা করলাম আর এখন কিনা বলছে ছেলেটা পাইপের মধ্যে পড়েই নি। মিডিয়ার এমন ফাজলামির মানে কি? মানুষ ক্ষোভ মানুষ প্রকাশ করছে ফেসবুক ও ব্লগে।
কিন্তু কেউ কেউ ছিলেন যারা এখনো বিশ্বাস করতে পারেনি যে ছেলেটি পাইপে পড়েনি । খাদিজা বেগমের জ্ঞান ফেরার পর আবার সবাইকে বলছেন কেউ আমার খোকনকে বাঁচান , আমার খোকনকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন। আমি তার কান্না শুনেছি এই পাইপের মধ্যে ।
মিডিয়াতে প্রচারিত আরেকটা ব্রেকিং নিউজে আবার সবার চোখ আটকে গেলো । তিনজন উদ্যমী যুবক নিজেদের উদ্ভাবিত একটা যন্ত্র দিয়ে খোকনকে মৃত্যু কুপ থেকে বাঁচিয়ে তুলেছে ।

শেষ
খাদিজা বেগম অ্যাম্বুলেন্সে করে ছুটছেন তার সোনা মাণিক খোকনকে কোলে নিয়ে । তার সন্তানের ঘুম ভাঙ্গানোর অনুরোধ করছেন ডাক্তারদের । ডাক্তার নার্সরা সব ছুটে এসেছেন খোকনের ঘুম ভাঙ্গাতে । জনতার ঢল নেমেছে ঢাকা মেডিক্যালে । সবাই দেখতে চায় খোকনের জাগ্রত মুখের হাসি ।
ডাক্তার খোকনকে কোলে নিয়ে ফিরে এসেছে খোকনের মা ও উৎসুক জনতার চোখ যেন এড়াতে চায়ছেন এই ডাক্তার । সেই নির্মম সত্যটা কি করে বলবে সে এই মমতাময়ী মা কে ? মা কি পারবে এই নির্মমতা সহ্য করতে ? ডাক্তার তারপর ও কথাটি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে এবং বলতে যেয়ে এই ডাক্তারের গলাও ধরে আসে । “ খোকন আর বেঁচে নেই , খোকন চলে গেছে না ফেরার দেশে” । খবরটা আবার মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সবখানে । অনেকে এই খবর শুনে ডুকরে কেঁদে ওঠে ।কেউ কেউ বিষণ্ণ দৃষ্টি মেলে শুধু তাকিয়ে থাকে ।
কিন্তু খাদিজা বেগম খুব স্বাভাবিকভাবে ঘরে ফিরে আসেন এবং রান্নাঘরে যান খোকনের জন্য পিঠা বানাতে। কিন্তু রান্না ঘরে রাখা পিঠার সব উপকরণ খেয়ে গেছে ইঁদুর তেলাপোকাতে । খাদিজা বেগম বুঝতে পারেন না কিভাবে এমন হল । এইতো দুঘণ্টা আগে তিনি খোকনকে নিয়ে ঘুমাতে গেলেন ঘুম থেকে উঠে পিঠা বানাবেন বলে । কিন্তু এরই মধ্যে ইঁদুর তেলাপোকাতে সব খেয়ে গেলো । তিনি মন খারাপ করে বসে পড়েন। খোকন খেলা শেষে ফিরে এলেতো পিঠা খেতে চায়বে, কি খেতে দেবেন তখন সে খোকনকে।
ঘরের বাইরে মিডিয়ার লোকেরা জড় হয়েছে খাদিজা বেগমের সাক্ষাৎকার নেবে। খাদিজা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন তার সাক্ষাৎকার কেন নিতে চায়ছে এরা ? সে হঠাৎ করে বিখ্যাত হয়ে গেলো কিভাবে আর এরা কোন দুর্ঘটনার কথা বলছে ?
গত ২৪ ঘণ্টার সমস্ত ঘটনা খাদিজা বেগমের স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছে ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement