লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ এপ্রিল ২০১৯
গল্প/কবিতা: ২৩টি

সমন্বিত স্কোর

২.৯৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকোমলতা (জুলাই ২০১৫)

রমাকান্ত নামা--স্মৃতির প্রশাখা
কোমলতা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৯৫

তাপসকিরণ রায়

comment ৯  favorite ০  import_contacts ৯৫৭
মন আর শরীর কি আলাদা ? হ্যাঁ হতে পারে, নিষ্প্রাণ দেহে মন থাকে না। আবার মনের মাঝেও আলাদা মনন হতে পারে। তা না হলে, মন বিবেকের দ্বন্দ্ব হয় কেন ! মন এক হলেও তার একাধিক ভূমিকা তো থাকতেই পারে। রমাকান্ত দেখেছেন, আজকাল তাঁর মাঝে ভাব-ভক্তির উদয় হচ্ছে। তাঁর বয়েস পঁয়ষট্টি চলছে। এখন তো এমন গদগদ ভাব আসতেই পারে। তিনি অন্যমনস্ক হলেই গাইতে থাকেন, মন হরি ভজো রে!...কতটা ভক্তি-মত্ততা জন্মেছে মনে ? ভেবে দেখেন তিনি। এখন সূচনা পর্যায় চলছে। এখনও তিনি স্বয়ং ভক্তির মাঝে প্রবেশ করেন নি। মন হরি ভজো রে, তার মানে, মনের প্রতি তার প্রার্থনা চলছে। তবে শরীর কি এখনও তাঁর অভক্ত ?
রমাকান্ত এখনও মনের চোরা টানগুলি টের পান। স্ত্রী শৈলবালা বহু দিন আগে মারা গেছেন। ঘরের সিকিউরিটি বজায় রাখতে ভদ্র মহিলা তাঁর ওপর টর্চার কিছুটা করে গেছেন বটে, তবু অর্ধাঙ্গিনী বলে কথা, সময়ে অসময়ে আশ্রয়-প্রশ্রয় তো তাঁর কাছেই ছিল। ভাব ভাবনাগুলি গদগদ হয়ে গেলে তাঁর প্রতিই তো ছিল সমর্পণ ! বিছানার আনন্দ, তৎ পশ্চাৎ সুখ নিদ্রার রাত্রি যাপন, সব, সবটাই এখন প্রায় লুপ্ত।
স্ত্রী শৈলবালার স্বর্গ বাসের পর ধীরে ধীরে বৈরাগ্য জীবনের দিকে পা বাড়াচ্ছিলেন রমাকান্ত। কিন্তু ওই সাধু-সন্ত হয়ে বনে তো তিনি যেতে পারেন না। আর্যরা যে নিয়ম বানিয়ে ছিলেন তার একটা মর্ম গাঁথা ছিল বটে--লাইফ স্টাইল ছিল, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ, সন্ন্যাস একেবারে প্রকৃতির সঙ্গে মিলে মিশে তৈরি হয়ে ছিল সে সমাজ ব্যবস্থা।
রমাকান্তর মনেও বাণপ্রস্থের ভাব এসে ছল, কিন্তু বাদ সেধে ছিল ওই সন্ন্যাসিনী। কোন কানা ঘুপচি ঘুরে ফিরে এসে আবার তার সঙ্গে সাক্ষাতের কি দরকার ছিল তার ? যে দিন এলো সন্ন্যাসিনী, দেহে গেরুয়া বেশভূষা, মুখে ছিল সংযম বুলি। রমাকান্ত জানতেন, এই সন্ন্যাসিনী ওরফে শ্যামলী, প্রেমিকাকে কামড়ে দেওয়ার রোগ আছে তার। রমাকান্তর কব্জিতে এখনও ওর কামড়ের দাগ বসে আছে। সে ছিল প্রথম বারের অপূর্ণ প্রেমের দাগ। তবু তিনি ভেবে ছিলেন, ও রোগ আর কত দিন থাকে, বিয়ের পরে স্বামী দাঁত-মুড়ো প্যাঁচিয়ে দু একটা দিলেই তো সব ঠিক হয়ে যায়!
রমাকান্তর ঘরে দু দিন ঘুরতে আসার পর সন্ন্যাসিনী শ্যামলীর কথায় বার্তায় মোড় ঘুরছিল। গেরুয়া মোড়ক থেকে আগের উচ্ছল শ্যামলী বেরিয়ে আসছিল। ধুম উদ্গিরণের জন্যে অবশ্য রমাকান্তও হাওয়া দিচ্ছিলেন এবং ইত্যাকারে শ্যামলীর সাথে দ্বিতীয় বারও প্রেম পেকে উঠছিল।
--তোমার ভালবাসা মরে নি এখনও?শ্যামলী আবেশিত হয়ে আসছিল।
--যতদিন মানুষটা বেঁচে আছে ততদিন ভালবাসা মরে না যে! দর্শন তত্ত্বের ধুম উড়ছিল রমাকান্তর মুখ থেকে। শ্বাসের উষ্মাঘ্রাণ পরস্পরের নাকে এসে ঠেক ছিল।
এক সময় প্রেম পেকে উঠতে লাগল। হঠাৎ রমাকান্ত দেখলেন, শ্যামলী আগের বারের মত হাঁ করল। আর সেই হাঁ-মুখ রমাকান্তর কব্জি ছুঁতে আসছিল। এক ঝটকায় তিনি সাফল্যের সঙ্গে পশ্চাদপসরণ হয়ে গিয়েছিলেন। প্রথমবার ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় বার শ্যামলীর দংশন থেকে সেদিন তিনি বেঁচে গিয়ে ছিলেন।

একদিকে জীবন যেমন সংক্ষিপ্ত, অন্যদিকে জীবনের দীর্ঘতা অনেকের কাছেই ধরা পড়ে। রমাকান্ত অনুভব করতে পারেন, একই মানুষের অনেক চেহারা--কোন চেহারায় সে ভালো, তার ভালো মনোবৃত্তিগুলি ফুটে ওঠে। আবার এমন একটা সময় আসে যখন সে উন্মত্ত এক মানুষ হয়ে ফুটে ওঠে--একই দেহের আয়নায় মানুষের রূপান্তরিত জীবন !
রমাকান্ত কখনও একলাটি যখন বসে থাকেন, জানলা দিয়ে উদাসী হওয়া তাঁর শরীর ছুঁয়ে যায়, আনমন ভাবনাগুলি আরও দিগদিগন্তে ছড়িয়ে যায়। স্ত্রীর কথায় মনটা হু হু করে ওঠে। একটা বিয়োগ ব্যথা মনের মাঝে বেজে ওঠে।
আবার কখনো জানলায় দাঁড়িয়ে বাইরের রং দৃশ্য তাঁর বৃদ্ধ জীবনকে ভুলিয়ে দেয়। অন্য জীবনের মাঝে নিজের অস্তিত্বও খেলা করতে দেখেন তিনি।
--দাদু! দাদু !!
সম্বিত ফিরল রমাকান্তর। সেই মেয়েটি। তুলতুলে চেহারার, দীঘল আয়ত চোখের সুন্দর সে মেয়েটি যে মেয়েটি মাঝে মাঝে এই জানলার কাছে এসে দাঁড়ায় যাকে দেখলে রমাকান্তর নিজের নাতনীর কথা খুব করে মনে পড়ে যায়।
--কি দাদু ভাই ?
--তোমায় ডাকছি--তুমি তো শুনছ না!
--ভুল হয়ে গেছে দাদু ভাই! রমাকান্তর একমাত্র ছেলে সপরিবারে আমেরিকায় চলে গেছে। বছরে একবার আসে তারা। রমাকান্তর একমাত্র নাতনী মালিনীর সঙ্গে সে সময়টা দেখা হয়।
--দাদু! আবার জোরে ডেকে উঠলো মেয়েটা।
--হ্যাঁ,দাদু, বলো?
--তুমি কি কানে কম শোনো ?
--হ্যাঁ, দাদু! রমাকান্তর মন ক্রমশ ভারাক্রান্ত হয়ে আসছিল। তাঁর মনে পড়ে গেল, মালিনীর জন্যে ঘরে এক প্যাকেট চকলেট রাখা ছিল, চকলেট খাবে, মনি মা ? এ মেয়েটির নাম, মনি।
--হ্যাঁ, একদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল মনি। মনি কখনো ঘরের ভেতর এসে বসে না। তার ঘর থেকে নাকি বারণ আছে।
মানুষের মনের কোন কোন্ থেকে কখন কি ধরনের ব্যথা উঠে আসে তা কেউ বলতে পারে না ! মনের মেঘগুলি এক জাগায় জড় হয়ে শেষে জলজ হয়ে যেতে চায়, রমাকান্ত বললেন, তুমি দাঁড়াও আমি চকলেট নিয়ে আসছি।
--তাড়াতাড়ি এসো, আমায় স্কুলে যেতে হবে, মনি যেন খুব ব্যস্ত।
আলমারির র্যা ক থেকে রমাকান্ত মালিনীর জন্যে রাখা চকলেটের প্যাকেটটা তুলে নিলেন। এই মুহূর্তে তাঁর কাছে মালিনী আর মনির মাঝে এক বিন্দুও ফারাক আছে বলে মনে হল না, এই নাও, জানলার শিক গলিয়ে চকলেটের প্যাকেট তুলে দিলেন মনির হাতে। তিনি মুহূর্ত মাত্র তাঁর হাত মনির মাথায় ছোঁয়ালেন।
মনি চকলেট নিতে নিতে বলে উঠল, জানো তো বাড়ি থেকে কারো কাছ থেকে কোন জিনিস নিতে মানা করেছে–কিন্তু তুমি ত আমার দাদু ! আমি চাইলে তোমার ঘরেও যেতে পারি, তোমার জিনিসও নিতে পারি ! কথা কটি বলে মুখ তুলে তাকাল মনি, আর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, এ কি ! তুমি কাঁদছ কেন দাদু ?
--কৈ না, না তো? জল জমাট মেঘলা মুখে রমাকান্ত হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করলেন।
সমাপ্ত

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement