আমি পালিয়ে আছি। নয় দিন হয়ে গেল এই এক ঘরে। একবারও বাইরে যাইনি। যাওয়া বারণ। ঘরটিতে কোন জানালা নেই। একটি মাত্র ঘুলঘুলি। আর দুটো দরজা। একটি লাগোয়া বাথরুমের। অন্যটি মূল বাড়িটির দিকে। ওপাশ থেকে বন্ধ। তিনবার এরা খাবার দিয়ে যায়। আমি এখনও কারও চেহারা দেখিনি। তবে দরজার ওপারে যারাই থাকুক না কেন, তারা রাত হলে অন্তত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। কেউ ডাকলে আসছি বলে সাড়া দিতে পারে। প্রাণ খুলে হাসতে পারে। আমি পারি না। গত নয়দিনে আমার পৃথিবী ছোট হতে হতে এই একটি বন্ধ ঘরে পরিণত হয়েছে। মাঝে মাঝে আমি দরজায় কান পেতে শুনেছি, ওপাশে কেউ একজন গুণগুণিয়ে গান গায়। খিলখিলিয়ে হাসে। নারী কন্ঠ। কিংবা কিশোরীর। বাইরের পৃথিবী থেকে এই একটি মাত্র কন্ঠই আমার কানে আসে। একেক সময় আমার খুব ইচ্ছে হয়েছে ডেকে দুটো কথা বলতে। জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছি, ঢাকার খবর সে কিছু জানে কিনা! বলতে চেয়েছি, শুনছেন? আপনার গানের গলাটি কিন্তু বেশ। করিনি। করা বারণ।
বর্ণনা শুনে নিশ্চই মনে হচ্ছে যে, আমায় বোধ হয় কেউ বন্দী করে রেখেছে। আসলে তা নয়। আমি সত্যিই পালিয়ে আছি। ঠিক নয় দিন আগে, ২৭ ডিসেম্বর, এই সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। ইকবাল টাওয়ারে নাহিদের অফিসে বসে চা খাচ্ছিলাম । সময়ের কথা মনে হওয়ায় ঘড়িটার দিকে তাকালাম। এটা জয়ার দেয়া। নাহিদের ছোট বোন জয়া - আমার গোপন প্রেমিকা। জয়ার থুতনীতে একটা তিল আছে। তবে আমার বেশী প্রিয় ওর বা কাধের একটু নীচে যে তিলটি সেটি। জয়ার গানের গলা খুব ভাল। বাবু বলে জয়ার গলা নূরজাহানের মত। আমি নূরজাহানের গান কখনও শুনিনি। তবে বাবুর কথায় ভরসা করা যায়। ও আমার ছোট বেলার বন্ধু। এক স্কুল। এক কলেজ। নাহ্ ভালয় ভালয় সব ঝামেলা মিটলে বাবুকে আমার আর জয়ার ব্যাপারটা বলতে হবে।
পাশ করে দুই বন্ধু মিলে শুরু করেছিলাম ব্যবসা। বাবার প্রভিডেন্ড ফান্ড আর মায়ের গয়না বন্ধকের টাকা মিলিয়ে সাকুল্যে এগার লাখ টাকা ছিল আমার পূঁজি। বাবুদের মেলা টাকা। ওর কোন সমস্যাই হয়নি। রাতদিন খেটেছি। মাত্র পাঁচ বছরে আমাদের নিজেদের একটি কারখানা হয়েছে। আমরা ঢাকায় চারটি আর চট্টগ্রামে একটি শোরুম খুলেছি। কখনও কখনও একা হলে আমার নিজেরই অবাক লাগে। এই সেদিনও খাবার টেবিলে বসে বাবা বলছিল, ‘আমার বোকা ছেলেটা যে আমাকেও ছাড়িয়ে গেল।’ মা বললেন, ‘তুমি এখনও বলবে ছেলে বোকা? ও তো বরাবরই একটু সরল সোজা। ওর সরলতাই ওর দূর্বলতা।’ আমি বললাম, মা দূর্বলতা বলছ কেন? আমার বন্ধুরা আমায় এই জন্যই তো এত ভালবাসে। ওরা জানে আমার মনে কোন প্যাচ নেই।‘ তবে সত্যি বলতে কি আমি আদতে একটু বোকাই। নইলে কি আর নীপার বিয়ের পরই আমি বুঝলাম আমি আসলে ওকে প্রচন্ড ভালবাসি। এক্কেবারে না পেলে বাঁচবোনা টাইপ ভালবাসা। তারপর কত কান্ড। ভাবলে এখন আমারই হাসি পায়।
বছর তিনেক আগে। আমরা সেবার সেরা উদ্যোক্তার পুরষ্কার পেয়েছি। হোটেল রেডিসনে এক জমকালো অনুষ্ঠানে আমাদের পুরুষ্কৃত করা হয়। সেখানেই নাহিদ মাহবুবের সাথে প্রথম পরিচয় হয়। আরও পরে পরিচয় হয় জয়ার সাথে। নাহিদ তখন একটি বানিজ্যিক ব্যাংকের ইনভেষ্টমেন্ট এনালিষ্ট। তার মত এমন দিল খোলা, আমুদে মানুষ আমি আগে কখনও দেখিনি। অল্প কয়েকদিনেই আমরা ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই। এতটাই যে আমরা তিনজনে আরও বড় ধরনের ব্যবসা করার পরিকল্পনা শুরু করি। মনে পড়ছে নাহিদই প্রথম প্রস্তাব নিয়ে আসে। জার্মান – অষ্ট্রেলিয়া ভিত্তিক এক কম্পানীর স্হানীয় এজেন্টকে নিয়ে আসে আমাদের বনানীর অফিসে। সৌর বিদ্যুত কেন্দ্র ও নানা ধরনের সোলার প্যানেল তৈরী করে কম্পানীটি। স্হানীয় উদ্যোক্তা খুঁজছে। আলোচনা সন্তোষজক হল। নানারকম আইনি বাধ্যবাধকতা, ব্যাংকের ঝামেলা থাকে। নাহিদ অত্যন্ত দক্ষ হাতে সব সামলেছে। প্রায় বছর দেড়েক হল আমরা প্রডাকশনে আছি। আমরা ঢাকা এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড হয়েছি। আমাদের প্রাইমারী শেয়ার গুলো সব ভাল দামে বিক্রি হয়েছে। টিভিতে, পত্রিকাগুলোতে আমাদের নানা পণ্যের বিজ্ঞাপণ যাচ্ছে নিয়মিত। আমি ঢাকা আর বাবু চট্টগ্রামের দিকটা আর কারখানা দেখে। নাহিদ মাকেটিং আর জয়া সব আইনী ব্যাপার গুলো সামলায়। জয়া বিলাতী ডিগ্রীধারী ব্যারিষ্টার। আমরা চারজনই কোম্পানীর ডাইরেক্টর। বাবু আমাদের চেয়ারম্যান।
রাজশাহীতে দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সরকার টেন্ডার আহ্বান করেছে। দেশের পত্র-পত্রিকাতে এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা দূর করবে। দেশের উন্নতি হবে। অমরাও তখন সেই স্বপ্নে বিভোর। প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট। তাই ডিসেম্বরে দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি আর বাবু অষ্ট্রেলিয়ায় গেলাম। যৌথ উদ্যোগের ব্যাপারে কথা বলতে। টেন্ডারের খুঁটি নাটি নিয়েও বিস্তর আলোচনা হল। ওরা বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। মনটাও তাই ফুরফুরে। অষ্ট্রেলিয়াতে ক্রিসমাসের উৎসব। সর্বত্র ছুটির আমেজ। ছবির মত এক দেশ। এরপরে জয়াকে নিয়ে আসতেই হবে। এই সব ভাবতে ভাবতেই ২৬ তারিখ রাতে দেশে ফিরে এলাম। বাবু রাতের ফ্লাইটেই চট্টগ্রামে চলে গেল। পরের দিন সকালে উঠেই আমি গেলাম নাহিদের অফিসে।
আজ সকাল থেকে দরজার ওপাশে কোন শব্দ পাচ্ছি না। কেউ সকালের খাবারও রেখে যায়নি। ঘড়িতে সময় দুপুর পেড়িয়ে গেল। ক্ষুধায় গা গুলাচ্ছে। কারও সাড়া শব্দ নেই। কখন যে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেই জানিনা। উঠে ঘড়িতে দেখি ১০টা। নিশ্চয়ই রাত। আর তখনই ক্ষুধাটা আবার ফিরে এল। দরজার কাছে গিয়ে দেখলাম। না কোন খাবার রাখা নেই। এই প্রথমবার আমি আতংক বোধ করলাম। দুশ্চিন্তায়, ক্লান্তিতে আবারও হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জানিনা কতক্ষণ।
২৭ তারিখ সকালে নাহিদের অফিস। নাহিদ ছিল না। আমি চা খাচ্ছিলাম। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে এল জয়া। সাথে ঠোঁট কাটা একটা লোক। আমাকে বলল, তোমাকে এক্ষুনি এর সাথে যেতে হবে।
আমি বললাম, কোথায়?
সেইফ হাউজে। বলে জয়া চট করে দরজার দিকে তাকাল। লোকটাকে বলল, আপনি গাড়িতে গিয়ে অপেক্ষা করুন। স্যার আসছেন।
লোকটি যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। চলে যেতেই উঠে জড়িয়ে ধরলাম জয়াকে। ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম। জয়া সাড়া দিয়েই মুখ সরিয়ে নিল। বলল, জান তোমাকে এক্ষুনি যেতে হবে। নয়ত দেরী হয়ে যাবে।
আমি বললাম, কি বলছ, কিসের দেরী। নাহিদ কোথায়।
জেলে, বলে জয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আমি ওর পীঠে হাত বুলিয়ে সান্তনা দিতে চাইলাম। কান্না জড়ানো কন্ঠে ও যা বলল, তা শুনে তো আমার ভীমরি খাবার দশা। কাল মাঝ রাতের পরে সামস খান খুন হয়েছে। সামস ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীর আপন ভাই। পুলিশ যারপর নাই রকমের তৎপরতার সাথে খুনীদের একজনকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে। আর সেই খুনীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নাহিদ আর বাবুকে হুকুমের আসামী হিসেবে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সপ্তাহ খানিক আগে সামসের সাথে আমাদের গন্ডগোল হয়। জয়াকে নোংরা ইঙ্গিত করায় আমি রেগে গিয়ে ওকে বলেছিলাম, খুন করে ফেলব। পুলিশ এখন আমাকেও খুঁজছে। আমার অফিসে, কারখানায় রেইড দিয়েছে। নাহিদ আর বাবুকে নাকি ভীষণ মারধোর করেছে। বাবুর বাবা মাকেও দেখা করতে দেয় নাই। বিপদ বুঝতে পেরে আমি আর সময় নষ্ট করিনি। ঠোঁট কাটা লোকটার সাথে জানালা বিহীন একটা ভ্যানে উঠে বসেছিলাম। তারপর থেকে এই ঘরে আছি।
কেউ কি আছেন? ঘুম ভেঙ্গে গেল। কে যেন ডাকছে। দরজার কাছে গিয়ে কান পাতলাম। আবারও কেউ কথা বলছে। বলছে, দরজাটা খুলে দিন। আমি আর এভাবে থাকতে চাই না । আমি চমকে উঠলাম। মনে হল বাবুর কন্ঠ। আমি নিশ্চই ভুল শুনেছি। তবুও বললাম, কে? বাবু? ওপাশের কন্ঠ জোড়ালো হয়ে উঠল, পিয়াল! পিয়াল তুই আমাকে নিতে এসেছিস? পিয়াল!
এরপরের সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে গেল। স্থানীয় পুলিশ এসে আমাদের উদ্ধার করে একটি পরিত্যাক্ত গুদাম থেকে। বিস্তারিত জানতে পারিনি। পরে জেনেছি, নাহিদ আর জয়া মোটেও ভাই বোন ছিল না। একটি সংঘবন্ধ চক্রের হোতা এই নাহিদ মাহবুব ও তার দল শেয়ার মার্কেট থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে পালিয়েছে। জয়া বাবুর সাথেও একই রকম ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। এবং ওকেও বলেছিল সম্পর্কের কথা গোপন রাখতে। আমাদের সরল বিশ্বাস এবং আরও কয়েকশ ছোট বড় বিনিয়োগকারীর আকাঙ্খাকে পূঁজি করে ফটকাবাজেরা প্রায় পনের হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। ব্যাবসা ও রাজনীতির অনেক রাঘব বোয়াল এই চক্রের নেপথ্যে ছিল। কোনদিনই হয়ত এদের বিচার হবে না। কত মানুষ যে নি:স্ব হয়ে গেছে। আইনী ঝামেলা কোন রকমে সামলে, আমি আর বাবু নতুন করে আমাদের আগের ব্যাবসায় মনোযোগী হয়েছি। বাড়িতে ইদানিং বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। বলেছি, এখনই না। কি করব? আমার যে এখনও জয়ার কাধের সেই তিলটির কথা মনে পড়ে। নিতান্তই রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, নয়ত সত্যি সত্যি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতাম। আর ফেললে খুব কি পাপ হবে আমার?