লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ ডিসেম্বর ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৫০টি

সমন্বিত স্কোর

২.১

বিচারক স্কোরঃ ০ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপরিবার (এপ্রিল ২০১৩)

আঁধারের স্বপ্নযাত্রা
পরিবার

সংখ্যা

মোট ভোট ২৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.১

তৌহিদ উল্লাহ শাকিল

comment ১৩  favorite ০  import_contacts ১,২২০
এক
শ্রাবণের দিন ছিল সেদিন। এস এস সি পরীক্ষা শেষ, প্রাক্টিক্যাল পরীক্ষা হচ্ছিল। দিনের বেশীর ভাগ সময় আকাশ মেঘলা থাকে সেই সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। পারু মানে ফারহানা পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরছিল বেশ খুশী মন নিয়ে। প্রতিদিন রিকশা নিয়ে আসে পরীক্ষার হলে কিন্তু আজ বেবী ট্যাক্সিতে করে এসেছে। রিক্সায় আসা যাওয়ায় খরচ হয় প্রায় পঁয়ত্রিশ টাকা। বেবী ট্যাক্সিতে হলে ত সাত চৌদ্দ টাকা লাগে মাত্র। ফারহানা জানে এই চৌদ্দ টাকা কিংবা পঁয়ত্রিশ টাকা জোগাড় করতে তার বাবার কত কষ্ট হয়। সংসারে তারা তিন বোন কোন ভাই নেই। বাবা রিক্সা চালক। সারাদিন ভাড়া করা রিক্সা চালিয়ে যে কয় টাকা আয় হয় সেখান থেকে মহাজনকে রিক্সার ভাড়া দিয়ে বাকি টাকা দিয়ে চাল –ডাল কিনে বাড়ি ফিরেন। ফারহানার বাবা যখন বাড়ি ফিরেন তখন ফারহানা শুধু জেগে থাকে। কাঁধের গামছার এক কোনে পুঁটুলির মত গোল করে গিট দিয়ে তাতে চাউল নিয়ে আসে তার বাবা।একহাতে থাকে কিছু তরকারি। বাঁশের হুড়কো দেওয়া দরজা খুলে দেয় ফারহানা বাবার গলা শুনে। এরপর যা প্রতিদিন হয় তেমনি করে বাপ মেয়ে দুইজন দু’জনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। মেয়েকে পড়তে দেখে বাবার মুখে হাসি আর সারাদিনের খাটুনির পর বাবাকে ঘরে আসতে দেখে ফারহানার খুশি সে এক অন্যরকম ভাবনা।মাটির বাসনে পরম মমতায় ফারহানা বাবাকে খেতে দেয়।আর নিজে বসে থাকে বাবার সামনে। বাবাকে ঘুমাতে দিয়ে আবার পড়তে বসে ফারহানা। ফারহানার মা আলেয়া বেগম অনেকটা মানসিক বিকারগ্রস্ত।সন্ধ্যে নামতেই ঘুমিয়ে পড়ে তাই বাপ বেটির দু’জনের কেউই তাকে অসময়ে ডেকে পরিবেশ নষ্ট করতে চায় না। ফারহানার বাকি দুইবোনের একজন একেবারে ছোট সবে মাত্র মাদ্রাসায় যাওয়া শুরু করেছে আর অন্যজন সুলতানা লেখাপড়া করে না ।সারাদিন সাজগোজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকে। ফারহানা তাকে যতই বুঝাতে চায় গরীবের এসব অভ্যাস থাকা ভালো নয় ,কিন্তু সুলতানা সেদিকে কান দেবার সময় নেই।সারাদিন পাড়াময় ঘুরে বেড়ায়।সেই সাথে মানুষের এটা সেটা নিয়ে আসে। অনেকে গরীব মনে করে কিছু বলে না কিন্তু আস্তে আস্তে ব্যাপারটা বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। গতপরশু সোলেমান মৃধার খেত থেকে বেশ কয়েকটা শসা নিয়ে আসে ।সন্ধ্যে বেলায় সোলেমান মিয়া এসে ফারহানাকে বলে যায়। ফারহানা লজ্জিত হয়ে সোলেমান মৃধাকে তার বাবার কাছে বলতে নিষেধ করে। সেদিন দুই বোনে বেশ কথা কাটাকাটি হয়। সুলতানা বলেই ফেলে তার লেখাপড়া করার কারনে নাকি তারা পেট পুরে ভাত খেতে পারে না। সুলতানার কথা শুনে ফারহানা চুপ হয়ে যায়।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে সিদিকে খেয়াল ছিলনা পারু’র।বাড়ির সামনে মানুষের জটলা দেখে বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠে। রাস্তা আর বাড়ির মাঝের বাকি পথটুকু যেন হাওয়ায় ভর করে পার হয় সে।ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ পারুকে জায়গা করে দেয়, সেই পথ ধরে পারু বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায়। মাটিতে বিছানো একটি পাটিতে চাদর মুড়ি দিয়ে কাউকে শুইয়ে রাখা হয়েছে,আর তার পাশে পড়ে আছে একটা দুমড়ানো মোচড়ানো রিকশা। রিকশা দেখে পারুর আর বুঝতে বাকি থাকে না কে শুয়ে আছে চাদর মুড়ি দিয়ে মাটিতে।
‘বাবা গো’বলে চিৎকার দিয়ে উঠে সে। বাড়ির ভেতর থেকে কয়েকজন মহিলা এসে ধরা ধরি করে বাড়ির ভেতর নিয়ে যায় ফারহানাকে।
দুই
মহানগর গোধূলি মেইল ট্রেই্নটি এই মাত্র ভৈরব রেলওয়ে ষ্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। হরতালের কারনে মেইল ট্রেনটিতে প্রচণ্ড ভীড়।সেই ভীড় ঠেলে অনেক কষ্টে মাথায় একঝাকা কমলার ঝুড়ি নিয়ে উঠেছে রফিক। কষ্টে সেই ভীড় ঠেলে বিচিত্র সূরে ফেরী করে কমলা বিক্রি করে চলেছে। প্রতি হালি কমলার দাম মাত্র চল্লিশ টাকা। হাঁটুর উপর বেশ অভিনব পদ্ধতিতে সে কমলার ঝুড়িটি রেখে প্যাকটে কমলা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ধুলো আর ঘামে মিশে ফর্সা মুখ অনেকটা মলিন হয়ে আছে। কিন্তু তাই বলে মুখে হাসির কমতি নেই।
‘এই কমলা নেন,সিলেটের মিষ্টি কমলা।এই যে ভাই খেয়ে দেখেন, মিষ্টি না হলে পয়সা দিবেন না’।বলেই আস্ত একটি কমলা খোসা ছাড়িয়ে আশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা বেঞ্চে বসে থাকা যাত্রীদের দিকে বাড়িয়ে ধরছে। গরম কিংবা ক্ষুধার জ্বালায় অনেকে সেই কমলা কিনে বেশ আরাম করে খাচ্ছে। রফিক আসলে ফেরীওয়ালা বলতে যা বুঝায় সে তেমন নয়। অভাবের সংসার বাবা মায়ের বড় ছেলে , গেল বছর ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেছে। ট্রেনে এটা সেটা বিক্রি করে নিজের পড়ালেখা এবং সংসার খরচ চালায়। এর মাঝে গতমাসে হরতালের দিন তাদের সংসারের একমাত্র সম্বল রিকশটা পুড়িয়ে দিয়েছে তথাকথিত হরতাল কর্মীরা । শুধু রিকশা জ্বালিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি দুর্বিত্তরা ,তার বৃদ্ধ বাবাকে বেধড়ক পিটিয়েছে। তার বাবা কাশেম এখন হাসপাতালে মৃত্যের সাথে পাঞ্জা লড়ছে। অবশেষে কোন উপায় না দেখে নিজের কাঁধে সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে। প্রথম প্রথম রফিকের কাছে একটু খারাপ লাগত। কিন্তু তার এক প্রতিবেশী তাকে সাহস জোগায়। সে বলে যে কোন কাজ মানেই কাজ। এতে লাজ শরমের কিছু নেই। আসলেই ঠিক লাজশরমের দিকে তাকিয়ে থাকলে কি আর সংসার চলে। সংসার চালাতে হলে কাজের বিকল্প কিছু নেই , কাজ মানেই টাকা আর টাকা মানেই বাবার চিকিৎসা পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা। টাকা ছাড়া শুধু গালি মেলে অন্য কিছু মিলে না । এই সবের মাঝে ও অনেকের জীবনে এমন কেউ আসে যার কথাবার্তা আচার আচরনে এক সাধারন মানুষ পরিবর্তিত হয়ে নতুন অন্য এক মানুষ হয়ে যায়। রফিকের জীবনে ফারহানা তেমনি একজন। রফিক যেমন সংসার নিয়ে সারাক্ষন চিন্তিত থাকে ফারহানা ও তেমনি। আজ থেকে মাস ছয়েক পূর্বে ফারহানার সাথে পরিচয় এক রোদেলা দুপুরে। কলেজে দুই গ্রুপের মাঝে মারামারির সময় তারা কয়েকজন মাঝখানে পড়ে যায় সেই সময় দুই গ্রুপের তাড়া খেয়ে ফারহানাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয় । ফারহানার পরিবার দারিদ্র কিন্তু এত কষ্টের মাঝে ও মেয়েটা লেখা পড়া করছে দেখে বেশ ভালো লাগে। সেই থেকে কলেজ যাবার পথে মাঝে মাঝে ফারহানাদের বাড়িতে আসে যায়। তবে ফারহানার ছোট বোনের দৃষ্টি তেমন ভালো নয়। রফিককে সে কেমন বাঁকা চোখে দেখে। রফিক নিজে ও গরীব ঘরের ছেলে এছাড়া বয়সের অভিজ্ঞতায় এসব ব্যাপার এড়িয়ে চলে স্বযত্নে। ট্রেন ষ্টেশনে এসে গেছে যাত্রীরা কে কার আগে ট্রেন থেকে নামবে সেজন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়ছে। রফিক সেই ভিড়ের মাঝে কৌশলে বেরিয়ে আসতে চায়। সেই সময় কেউ একজন বলে তার পকেট চুরি গেছে। সকলের সম্বলিত চিৎকার আর চেঁচামেচিতে ট্রেনের দরজার পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। চোর ধরা পড়ে যাবার ভয়ে রফিকের কমলার ঝুড়িতে মানিব্যাগটি ফেলে দিয়ে কেটে পড়ে । ক্ষুব্দ জনতার একজন রফিকের কমলার ঝুড়িতে ফেলে রাখা মানিব্যাগ দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠে। দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে নেয় ট্রেনের যাত্রীরা। রফিককে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ে হিংস্র নেকড়ের মত । অসহায় রফিকের সকল শততা হারিয়ে যায় বিক্ষুব্দ জনতার গন পিটুনিতে। কেউ তার কথা শুনে না সকলে চেষ্টা করে দু চার ঘা বসিয়ে দিতে। অসহায় রফিকের মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে চলক চলক করে। সারা শরীরের অনুভূতি লোপ পেতে থাকে ক্রমশ। রফিকের সামনে তখন ভেসে উঠে স্নিগ্ধ এক মুখের মায়াবী ছবি আর অসহায় পরিবারের কিছু ক্ষুধার্ত মুখ।

বাবা মারা যাওয়ার পর ফারহানার উপর পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে। সকলে মিলে যখন তার বাবার দাফনের জন্য দশ জনের কাছে সাহায্য চাইছিল তখন তার বেশ খারাপ লেগেছিল। কেন যেন মনে হয়েছিল এসবের জন্য সে নিজেই দায়ী। তার লেখাপড়ার খরচ যোগাতেই তার বাবার মৃত্য হয়েছে। তার বাবার মৃত্যের দুইদিন পর সংসারের অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে উঠল। যে গাড়িটি তার বাবাকে চাপা দিয়েছে তার কোন হদিশ পাওয়া যায়নি। সকলে অনেক খুঁজেছে কিন্তু কোন পাত্তা মেলেনি। সেই গাড়ির মালিককে ফেলে অসহায় পরিবারের জন্য কিছু ব্যাবস্থা করার কথা বলা যেত। এই দুই দিন গ্রামের কয়েকজনে তাদের পরিবারের সকলকে খাইয়েছে। কিন্তু আজ সকাল থেকে কেউ আসছে না। হয়ত আর কেউ আসবে না। বাড়ির সামনের ট্রেন ষ্টেশনে বেশ শোরগোল শুনে ছোটবোন সুলতানাকে ডেকে বলল ‘কি হয়েছে রে ষ্টেশন
‘চোর ধরেছে গো , বেশ পিটাচ্ছে নাকি। যাই গিয়ে দেখে আসি’।বলেই দৌড়ে চলে গেল। বাবার মৃত্যের কোন শোক তার মাঝে নেই। নেই রান্না বান্না করার ভাবনা। পারু বেশ চিন্তিত কি করবে ভেবে। ঘরের দরজার সামনে আনমনে অনেকক্ষণ বসে থেকে পাশের বাড়ির রুপা আপার সাথে কথা বলার জন্য তাদের বাড়ির দিকে রওনা হল।

রুপা আপা ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে । ভালো বেতন পায় । কিন্তু গ্রামের সকলে কেমন যেন বাঁকা চোখে তাকায়। পারুকে আসতে দেখে রুপা বেরিয়ে এসে বলে
‘কি ব্যাপার পারু এই সময়ে কই যাও’।
‘আপনার কাছে আসছি আপা, আপনে আমারে একটা কাজের ব্যাবস্থা করে দেন’।
‘কি কস বইন, আমি তোরে কি কাম দিমু,আমি নিজেই তো অন্যের কাম করে খাই’।
‘আপা আপনে আমারে কাম একটা দিতেই হইবো,নইলে আমি কই যামু।মা বোনগরে(বোন দেরকে ) লইয়্যা কই যামু, কি খামু কন দেহি’।
‘তাহইলে তো তোরে আমার লগে ঢাকা যাইতে অইবো’।
‘ঢাকা গেলে যামু কিন্তু অহন কি খামু’।
‘হেই চিন্তা অহন তোরে কইত্তে হইবে না,আমি দেখতাছি’।বলে রুপা ঘরের ভেতর চলে গেল। কিছুক্ষণ পর একটি পোটলা নিয়ে ফিরে এল। সেই পোটলা পারুর হাতে দিয়ে বলল
‘ধর এতে সের পাঁচেক চাইল আছে আর এই নে শ’পাঁচেক টাকা এগুলো দিয়ে আপাতত চাল, এরপর তোরে ঢাকা নিয়া যামু’।
পারু খুশি মনে চাউলের পুঁটলি আর টাকা নিয়ে বাড়ির দিকে হাটা শুরু করল। কিছুদুর যাবার পর রক্তমাখা একজনকে আসতে দেখল খুড়িয়ে খুড়িয়ে।তারপেছনে একদল ছেলে চোর চোর বলে চিৎকার দিচ্ছে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ধুক করে উঠল পারুর বুক।
‘আরে এই যে দেখছি রফিক ভাই’।বলেই রফিকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রফিকের চোখ তখন ঝাপসা সব কিছু ঠিকমতো ঠাহর করতে পারছে না। পারু রফিক কিছু না বলে ছেলেদের একজনের কাছ থেকে ঘটনা শুনল। কিন্তু কেন যানি তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই সে রফিকের হাত ধরে বাড়ির দিকে নিয়ে চলল লাজলজ্জার মাথা খেয়ে। উৎসুক ছেলের দল কথা না বাড়িয়ে যে যার কাজে চলে গেল। পারু’দের ঘরের দরজার সামনে এসে রফিক কোনমতে ‘পানি’ বলতে পারল। এরপর জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। সেই সময় পারুর বাহুতে আশ্রয় মিলল রফিকের।
০৪
সারারাত একরকম তন্দ্রা আর ঘুমের ঘোরে রফিক বারবার চিৎকার দিয়ে বলল
‘আমি চোর না , আমাকে মারবেন না’।
পারু রাতজেগে রফিকের সেবা করে গেল। পারু’র বুঝতে অসুবিধা হলনা এই ঘটনার পেছনে নিশ্চয় কোন রহস্য লুকিয়ে আছে। আর যাই হোক রফিকের মত এক শিক্ষিত যুবক এই কাজ কখনো করতে পারে না। পারু’র বোন অন্যদিন বাঁকা কথা বললে ও আজ কেন জানি রফিকের সেবা করতে সে ও জেগে রইল রাতভর। রফিক সারা শরীরে যখন ব্যাথা নিয়ে কাতরাচ্ছিল তখন দুই বোন মিলে টান কচু পাতার সেঁক দিচ্ছিল। রাত গভীর থেকে গভীর হয়। পারু সুলতানাকে ঘুমাতে বলে । কিন্তু পারু বলে উঠে-
‘তুই যা ঘুমাগে, আমি আছি দেখুমনে’।
কিন্তু সুলতানা একটু ও নড়ে না।
একসময় সুলতানা বলে উঠে –‘বুবু ঘরে তো খাওন কিচ্ছু নাই,কিভাবে চলুম’।
‘দেহিরে বইন, কি করন যায়’।
অনেকদিন পর সুলতানা পারু’কে বুবু বলে ডাকাতে পারু’র মনটা খুশীতে ভরে যায়।
এসব ভাবতে ভাবতে পারু কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে সে খেয়াল থাকেনা।
পাখির কিচির মিছির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে পারু’র। জেগে উঠে দেখে রফিকের একপাশে শুয়ে আছে সুলতানা। হৃদয়টা কেমন যেন নড়ে উঠে পারুর। কিন্তু কিছু বলে না। সুলতানাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগায় । সুলতানা চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে।
রান্না ঘরের এক কোনে রাখা ছাইয়ের মাঝ থেকে দু’বোন দুই চিমটি ছাই তুলে নিয়ে দাঁত মাজতে থাকে। পারুর হঠাৎ খেয়াল হয় , সুলতানা অনেক বড় হয়ে গেছে। সুলতানার হৃষ্টপুষ্ট শরীরের দিকে তাকালে সকলে পারু কে নেহায়েত ছোট বোন বলেই জানবে।
‘কি রে বুবু কি দেহস’।
‘নারে কিচ্ছু না, তুই অনেক বড় অইয়্যা গেছস’।
হাতমুখ ধুয়ে পারু রুপার কাছ থেকে আনা চাউল ধুয়ে রান্না করতে যায়। এই সময় সুলতানাকে বেশ সেজে গুজে বাড়ির বাইরে যেতে দেখে পারু বলে
‘কই যাস’।
‘আইতছি অহনি’। বলে সুলতানা চলে যায়।
চার পাঁচ দিনের সেবা শুশ্রূষায় রফিক সেরে উঠে।আসল ঘটনা শুনে তারা রফিক কে সান্ত্বনা দেয়। রফিক তার পরিবারের জন্য চিন্তিত হয়। সুলতানা এই কয়দিন সময় পেলেই রফিকের সেবা করেছে অনেক বেশী , পারুর অগোচরে। পারু নানা চিন্তার মাঝে আছে । রুপা আপা বলেছে আগামী সাপ্তায় নিয়ে যাবে ঢাকায়। প্রতিদিন বিকাল বেলায় রুপা আপার সাথে আলাপ করার জন্য রুপাদের বাড়ি যায় পারু। আর সেই সময়ে রফিকের সাথে নানা গল্পে মত্ত থাকে সুলতানা। রফিক তার সংসারের জন্য অস্থির হয়ে উঠে। রফিক জানে এখন আর ফেরী করার উপায় নাই। সকলে তাকে চোর ভাবে। রফিক মনে মনে ভাবে ঢাকায় যাবে গার্মেন্টেসে চাকুরী করতে। তার অসহায় পরিবার তাকিয়ে আছে তারদিকে।
সুলতানা রফিকের এই কথা শুনে নিজে ও ঢাকায় যেতে চায়। রফিক বলে পারু’কে বলতে । কিন্তু সুলতানা বলে পারুকে বলা যাবে না। সে রফিকের কাছ থেকে ওয়াদা করিয়ে নেয়, এই কথা ওরা দুজন ছাড়া কেউ যেন না জানে। রফিকের কেমন যেন অস্বস্তি হয় । কিন্তু তার যে অপবাদ হয়েছে তাতে কি পারু তাকে মেনে নেবে। আর পারু কি কখনো এই পরিবার ছেড়ে তার কাছে থাকতে পারবে? সেদিন পারু বলেছে সে এখনি বিয়ে টিয়ে নিয়ে ভাবছে না । তার উপর তার পরিবারের দায়িত্ব আছে। সে সেই দায়িত্ব আগে দেখবে। অন্য দিকে সুলতানা কথা দিয়েছে, রফিক যদি তাকে সঙ্গে নেয় এবং চাকুরী দেয় তাহলে সে রফিকের সাথেই থাকবে এমনকি রফিক চাইলে তাকে বিয়ে ও করবে।
আকাশের সুর্য তখন অস্ত যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুলতানা রফিকের খুব কাছে বসে আছে । সুলতানার বলিষ্ঠ শরীর যেন রফিক কে চুম্বকের মত টানছে। রফিক সেই আকর্ষন কে উপেক্ষা করতে পারছে না কিছুতেই। সুলতানা ব্যাপারটা বুঝতে পারল। সুলতানা বলল-
‘চলেন রফিক ভাই বাইর থেইক্কা ঘুইরা আই’।
দুজনে ঘর থেকে বের হয়ে পাশের জঙ্গলের দিকে চলে যায়। রুপাদের বাড়ি থেকে পারু এসে দেখে ঘরে কেউ নাই। আবারো মনের ভেতরে কেমন খচ করে উঠে। রুপাদি কথা দিয়েছে শুক্রবারে সাথে করে নিয়ে যাবে। এছাড়া তার আর কোন উপায় নাই। এই পরিবারকে বাঁচাতে হলে তাকে এতটুকু তো করতেই হবে।
০৫
চারদিকে বেশ নীরব নির্জন। গভীর রাত। আশে পাশে কোন সাড়া শব্দ নেইে। রাত জাগা কয়েকটা পাখির ডাক মাঝে মাঝে শুনা যায়। সেই রাতে দু’জন মানব মানবী অতি সন্তপর্নে ঘর ছেড়ে বেরোয়। দু’জনের মুখে কোন শব্দ নেই। একে অন্যের হাত ধরে হনহনিয়ে হেটে চলছে গ্রামের জঙ্গলে ঘেরা পথ দিয়ে লোকচক্ষুর আড়াল হয়ে। কিছুদুরেই রেলওয়ে ষ্টেশন । যে ষ্টেশনে আজ থেকে পাঁচদিন পুর্বে চোর বলে গন ধোলাই খেয়েছে রফিক। রাতের বেলায় নিস্তব্দতার লেশমাত্র নেই ষ্টেশনে। রাত জাগা যাত্রীরা এদিকে সেদিকে ঘুরা ঘুরি করছে, ষ্টেশন হকার গুলো চেঁচিয়ে তাদের পন্য বিক্রি করে চলছে।একেক ফেরীওয়ালা একেক ভাবে তার পন্য বিক্রি করছে।কেউ বলছে- ‘এই কেক আছে কেক খান, কেক খান পানি খান,কেক’।
আবার কেউ বলছে- ‘এই চা গরম, চা গরম, চা খান’।
ষ্টেশন বারান্দায় কেউ শুয়ে আছে শুধু মাত্র পরনের লুঙ্গি মুড়ি দিয়ে, কোন বালিশের দরকার নেই, কারো মাথার নিচে একটি ইট, কারো কাছে তাও নেই। সত্যিই কত বিচিত্র মানুষের জীবনধারা। কেউ প্রসাদসম অট্টালিকায় রাত যাপন করছে, আর কেউ ষ্টেশনে কিংবা এখানে সেখানে শুয়ে জেগে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। সত্যি আল্লাহ পাকের এই দুনিয়া বড় বিচিত্র। আর সবার চেয়ে বিচিত্র হচ্ছে মানুষ।
রাতের নীরবতাকে ছেদ করে কর্কশ শব্দ করে রাতের মেইল ট্রেনটি এসে ষ্টেশনে থামল। সেই ট্রেনে অগনিত যাত্রীর সাথে সকলের অগোচরে আরো দুইজন যাত্রী উঠে গেল বিনা টিকিটে। তাদের দুই চোখে তখন নতুন একটি পরিবারের স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন কতটা দোষের কতটা অন্যায়ের তা ভাবার সময় এই দু’জনের মাঝে নেই।
অন্য দিকে ঘুমের ঘোরে ছটপট করছে পারু। সে দেখছে কে যেন তার অতি প্রিয় একটি জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু সে কে তাকে চিনতে পারছে না। চেহারাটা কেমন চেনা চেনা লাগছে ।হুট করে ঘুম ভেঙ্গে গেল পারুর। পাশ ফিরে দেখে সুলতানা নেই। রাতে একসাথেই শুয়ে ছিল দুই বোন। আধো ঘুম আধো জাগরনে পারু ভাবে সুলতানা হয়ত বাইরে গেছে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। আবার কখন ঘুম জড়িয়ে আসে টের পায়না পারু।
হুইসেল দিয়ে ট্রেন ষ্টেশন ছাড়ছে, সেই সাথে চলে যাচ্ছে সুলতানা এবং রফিক । তারা দুইজন কি আদৌ গড়ে তুলতে পারবে একটি পরিবার? পারু কি পারবে যুদ্ধ করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে ? সেটা আসলে কেউ যানে না। যিনি জানেন তিনি তখন উপর থেকে বসে বসে সব দেখছেন নীরবে। আর ভাবছেন আসলেই তার সৃষ্টি মানুষ (মানব জাতি) সত্যিই কত ‘পিকুলিয়ার’ (অদ্ভুত)।



advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement