লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ ডিসেম্বর ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৫০টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৩৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৪৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৃষ্টি (আগস্ট ২০১২)

এটি কোন গল্প নয়
বৃষ্টি

সংখ্যা

মোট ভোট ৫৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৩৮

তৌহিদ উল্লাহ শাকিল

comment ২৩  favorite ০  import_contacts ৯৫৬
আতাহারের বউ পোয়াতি।পেট অনেক উঁচু হয়ে গেছে । বউকে দেখলে আতাহারের হাসি পায়। কিন্তু ভুলে ও বউয়ের সামনে হাসে না সে। এমনিতেই গতকাল রাতে পেটে ব্যাথা উঠেছে দেখে নীলা বলেছে
‘তোমার জন্যই তো এমন হল, তুমি তো বেশ আরামে আছ। এদিকে আমার প্রান যায় যায় অবস্থা’
কথাটা শুনে আতাহারের বেশ হাসি পায় । তারপর ও বহু কষ্টে হাসিটা চেপে যায়। পাছে নীলা কষ্ট পায়।বাচ্চার জন্য জেদ নীলা’ই ধরে ছিল । বাসাতে একা থাকতে ভালো লাগে না । একটা বাচ্চা থাকলে তাকে নিয়ে সময় কাটানো যেত।
নীলা দুইটি জিনিস খুব ভালোবাসে। এক রান্না করতে এবং বই পড়তে। রান্নায় যে সে অদ্বিতীয়া একথা বলার অপেক্ষা রাখে না । আতাহার মাঝে মাঝে বলে আমার আম্মা এর চেয়ে ভালো রাঁধত । আতাহারের কথা শুনে কেমন যেন একটা শুন্য দৃষ্টিতে তাকাবে নীলা । এরপর চট করে হাসি মুখে বলবে
‘ভাগ্যিস তিনি নেই , থাকলে তো আমাকে প্রতিযোগিতায় নামতে হত’
‘তা ঠিক বলেছ, তখন আমি বিপদে পড়ে যেতাম।কাকে বিজয়ী করব ভেবে’
নীলা এখন রান্না ঘরে পায়েস রাধছে।আজ ছুটির দিন শুক্রবার। নীলা জানে আতাহার পায়েস ভালোবাসে । তাই এমন শরীর নিয়েও পায়েস বানাচ্ছে । আতাহার অবশ্য নিষেধ করেছিল। বলেছিল
‘তোমার শরীরের যে অবস্থা , এখন কি এসব না করলেই নয়’
দু’জনের ছোট সংসার । মধ্যবিত্ত বলা চলে । ঢাকা শহরে চাকুরী করে আতাহার । সামান্য বেতনে দু’জনের বেশ চলে যায়। মাঝে মাঝে বসুন্ধরা সিনে কমপ্লেক্সে ছবি দেখতে যায় দু’জনে। আতাহার অফিসে চলে গেলে নীলা সারাদিন পার করে দেয় বই পড়ে । নীলার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ । হুমায়ুন আহমেদের চরিত্র গুলোকে একেবারে বাস্তব মনে হয় ।একেকটা চরিত্র যেন বাস্তবে একেকটা মানুষ । হিমু,মিসির আলী, রুপা এসব চরিত্র গুলো বেশ ভালো লাগে নীলার। নীলা অনেকবার চেষ্টা করেছে হুমায়ুন আহমেদের সাথে দেখা করতে । স্কুল, কলেজ জীবনে ব্যাস্ততার কারনে পারেনি দেখা করতে , বিয়ের পর সংসার আর নানা ব্যাস্ততায় আজ ও দেখা করতে পারেনি । বাইরে মুষল ধারে বৃষ্টি হচ্ছে , নীলার হাতে হুমায়ুন আহমেদের “বৃষ্টি বিলাস” বইটি । এই নিয়ে বইটা অনেকবার পড়েছে। যতবারই পড়তে শুরু করে শেষ না করে উঠতে পারে না ।মানুষের চরিত্র তিনি অনেক গভীর থেকে বুঝতে পারেন। আর পারেন বলেই আজ তার লেখা এত জনপ্রিয়।
হুমায়ুন আহমেদের কোলন ক্যান্সার হয়েছে বেশ কয়েকদিন হল । আমেরিকায় আছেন তিনি । সেদিন দেশে ফিরে এসেছিলেন । টিভিতে সারাক্ষণ বসে বসে হুমায়ুন আহমেদ কে নিয়ে রিপোর্ট টি দেখেছেন বারবার । কেমন যেন মনমরা মনে হল । নীলা ভাবছে ইস যদি এখন নুহাশ পল্লীতে যেতে পারতাম ।আতাহার এখনো ফিরেনি ।নীলা ভাবে যে মানুষ এত মানুষকে হাসায়, কাঁদায় তিনি নিশ্চয় অনেক বড় মনের মানুষ।নীলা ভাবে তার ছেলে হলে তিনি নাম রাখবেন হুমায়ুন আহমেদ । যদি ও তার ছেলে এই নামের যোগ্য নয় তারপর ও নীলা ভেবেছে সে এই নামই রাখবে তার আগত সন্তানের ।

রাত অনেক গভীর ।সচরাচর এতরাতে রাস্তায় কেউ বের হয়না, নেহায়েত কোন প্রয়োজন না হলে ।কিন্তু আতাহার কে হাটতে হচ্ছে । নীলা হাসপাতালে।আকাশে মেঘের জোরালো গর্জন । বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে থেমে থেমে । রাস্তা জুড়ে আধারের খেলা । অফিস শেষে বাসায় গিয়ে নিজ হাতে রান্না করতে হয় । তারপর নিজে খেয়ে নীলার জন্য খাবার নিয়ে ছুটতে হয় হাসপাতালে। তার মাঝে জোরালো বৃষ্টি রিক্সা অটো কিছুই মিলছে না । নীলার বাচ্চা নাকি পেটের ভেতর উল্টো হয়েছে। সম্ভবত সিজার না করলে বাচ্চা হবে না । পকেট একেবারে খালি । সীমিত আয়ের মানুষের যা হয় , বিপদ দেখলে দিশেহারা হয়ে যায়। আতাহারের অবস্থা ও এখন তেমন। কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছে না । কি করবে সেই চিন্তায় অস্থির। বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে আতাহার।
সাদা ধবধবে বেডসিটের উপর নীলা শুয়ে আছে। ফর্সা মুখ অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। চুল গুলো এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে আছে। নীলাকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে বেশ মায়া হল আতাহারের। তাদের বিয়েটা হুট করে হয়েছিল। যাকে বলে নীলা এক কাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। আতাহার কে প্রচণ্ড ভালোবাসত নীলা। আর বাবা মা যখন তার অমতে বিয়ে ঠিক করেছিল ঠিক সেই রাতেই ঘর ছেড়ে আতাহারের মেসে এসে দাঁড়ায় এমনি এক ঝড় বৃষ্টির রাতে। নীলা’কে সেদিইন না করতে পারেনি আতাহার। বন্ধুদের সহায়তায় সেই রাতেই কাজী ডেকে বিয়ে হয় তাদের। সেদিন সেগুন বাগিচার মেসে রাতে জম্পেশ পার্টি হয়েছিল । বন্ধুরা সকলে মিলে বাসর রাতের ব্যাবস্থা করেছিল । একটি খাটে ছেলেগুলি অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফুলশয্যার খাট সাজিয়েছিল। বাসর ঘরে প্রবেশের পূর্বে নীলা নিজের হাতের আংটিটি খুলে দিয়েছিল তার মেসের বন্ধুদের। বন্ধুদের সেই ভালোবাসার কথা আজো বলে নীলা ।

ঘুম ভেঙ্গে আতাহার’কে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে নীলা চুপ করে থাকে । আতাহারের জন্য কেমন মায়া হয়। সব জেনেশুনেই এই আতাহারকে ভালোবেসে ছিল নীলা । আতাহারের কিছু গুণ আছে যা অন্য ছেলেদের সাথে মিলে না । আর সেই ব্যাতিক্রমের কারনেই ভালোবাসা একদিন বিয়েতে রুপ নেয়। এখন কত কষ্ট করে আতাহার । মাঝে মাঝে ভাবে ‘আমার জন্যই বোধহয় আতাহারের এত কষ্ট’।
ভাবনা থেকে নীলার নড়াচড়ায় বাস্তবে ফিরে আতাহার। বলে উঠে
-এই কি দেখছ এমন করে।
‘না কিছু না,’নীলা বলে উঠে।
কেবিনের দরজায় কড়া নেড়ে নার্স এসে জানায় ডাক্তার ডাকছে ।আতাহার ডাক্তার এর কাছে ছুটে যায়। ডাক্তার জানায় এক দুই দিনের মধ্যে বেশ কিছু টাকা জোগাড় রাখতে।আতাহার মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসে ডাক্তারের রুম থেকে। বৃষ্টি তখন অনেক থেমে গেছে । মেঘ সরে গিয়ে আকাশে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে । হালকা বাতাসে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আমেজ। আতাহার বাসার দিকে পা বাড়ায়।

বাসায় ফিরে এসে টিভি ছেড়ে বসে । প্রত্যেক চ্যানেলে হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যের খবর দেখাচ্ছে। নীলা’র প্রিয় লেখক মারা গেছে নীলা নিশ্চয় খবরটা জানে না । এতরাতে কি আবার যাবে হাসপাতালে । না পরক্ষণে ভাবনাটা বাদ দেয়। সকালে অফিসে যাবার আগে বলে যাবে।দেয়ালের সাথে লাগোয়া সেলফের দিকে চোখ যায় আতাহারের । সেলফে সারি সারি ভাবে সাজানো আছে অনেক বই । সেখানে বেশীর ভাগ বই হুমায়ুন আহমেদের। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায় আতাহার। সেলফের সামনে গিয়ে একটি বই হাতে নেয় আতাহার। এরপর একের পর এক পৃষ্ঠা পড়ে যায় অদম্য কৌতূহলে । রাত তিনটা বাজে সেই সময় বইটি শেষ করে আতাহার। বসে বসে ভাবে ‘সত্যি বেটার লেখায় জাদু আছে, কখন এত রাত হয়ে গেছে খেয়াল হয়নি’।
পাড়ার সেলুনে সকালে দৈনিকে চোখ বুলায় আতাহার। টিভি চ্যানেলের মত পত্রিকা জুড়ে হুমায়ুন আহমেদের কথা, সেই সাথে অনেকের সাক্ষাতকার। কি ভেবে মন দিয়ে কয়েকতা রিপোর্ট পড়ে মগ্ন হয়ে আতাহার। অফিসের সময় হয়ে গেছে , তাই আর দেরি না করে পা বাড়ায় । প্রথমে হাসপাতালে যেতে হবে। নীলা কে খবরটা দিতে হবে। হাসপাতালে ঢুকার সময় ডাক্তারের সাথে দেখা হয় । ডাক্তার কে হুমায়ুন আহমেদের খবরটা বলে । কিন্তু ডাক্তার নীলা’কে এই সময় খবরটা দিতে বারণ করে। ভগ্ন হৃদয়ে আতাহার অফিসের দিকে পা বাড়ায়।
তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে এসে রান্নাচড়ায় আতাহার। আবার টিভি দেখতে বসে , হুমায়ুন আহমেদের মৃত দেহ দেশে আসবে । দেশের সাহিত্য প্রেমী মানুষ শোকে কাতর । হুমায়ুন আহমেদের জন্য কেমন যেন মায়া হয় আতাহারের ।
রাতে নীলার কাছে গিয়ে দেখে নীলা অনেকটা কস্টে আছে। মাঝে মাঝে পেটে ব্যাথা হচ্ছে। চেহারায় কষ্টের চাপ। আতাহার চুপচাপ সরে আসে। নীলার কষ্ট তার সহ্য হয়না ।
ডাক্তার বলে আগামীকাল সকালের মধ্যে টাকাটা জমা দিতে হবে। আতাহার কিছু চিন্তা করতে পারে না । পকেটে আছে মাত্র একশ একুশ টাকা। দুইজন কলিগের কাছে ছেয়েছে। কিন্তু সকলে নিজেদের সমস্যা দেখিয়ে না করে দিয়েছি ।
আগামীকাল হুমায়ুন আহমেদের মরদেহ আসছে । এখানে সেখানে মানুষের জটলা । আলোচনা একটাই হুমায়ুন আহমেদ।রাস্তার পাশের চায়ের স্টলে এক বৃদ্ধ লোক বলছে আমি হুমায়ুন আহমেদের সবগুলো বই কিনে একতা লাইব্রেরীতে দান করব। আগামী প্রজন্ম যেন হুমায়ুন আহমেদ কে জানতে পারে। কথাটা আতাহারের কানে যায়। আতাহার চায়ের স্টলের দিকে এগিয়ে যায়। এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয়। বৃদ্ধ লোকটাকে নজরে রাখে । বৃদ্ধ চায়ের দোকান থেকে বের হলে আতাহার বৃদ্ধের পিছু নেয়।

নীলা’র সিজার হয়েছে । ফুটফুটে একটি ছেলে হয়েছে। নীলা বেশ খুশী । ছেলের নাম রাখবে হুমায়ুন আহমেদ। আতাহার ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে । বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেয় । ছেলের চেহারাটা কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু কার চেহারার সাথে মিল মনে করতে পারে না।
নীলা বলে উঠে
-আমার ছেলেকে হুমায়ুন আহমেদের সব বই আমি পড়ে শুনাব। তুমি আমাকে প্রতি মাসে বেতন পেয়ে একটা করে বই কিনে দিবে।
আতাহার অপলক দৃষ্টিতে নীলা’র দিকে চেয়ে থাকে । সে জানে বাসায় এখন হুমায়ুন আহমেদের কোন বই নেই। গত রাতে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে সব গুলো বই সে বৃদ্ধ কে দিয়ে দিয়েছে। তবে হা হুমায়ুন আহমেদের ছবিটা রয়ে গেছে শুন্য তাকের একপাশে । চশমা পরিহিত ছবিটা নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। আজ হুমায়ুন আহমেদের দাফন হয়ে গেছে নুহাশ পল্লিতে। এই খবর নীলার এখনো জানা নেই। হঠাৎ করে ছেলের চেহারাটা আর সেলফের চেহারাটার মাঝে কেমন একটা মিল খুঁজে পায়। ছেলেটাকে নীলার কোলে দিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে বেরিয়ে আসে আতাহার।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement