সেই হাটি হাটি পা পা করে যখন এই পৃথিবীর পথে যাত্রা শুরু করেছি,সেই থেকে বাবার হাত ধরেই শুরু এবং এখনো এই অগ্রযাত্রার পথ প্রদর্শক আমার বাবা।জীবনের প্রতিটি সাফল্যে যেমন বাবার অনুপ্রেরনা পেয়েছি আবার ব্যর্থতায় তাকে পাশে পেয়েছি সমানে সমান।তিরস্কার সুচক কোন বাক্য কখনো ছুরেছেন কিনা আমার মনে পড়েনা।
মনে পড়ে, সেই ছোট বেলায় বাবা সারা অফিস করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ী ফিরতেন তখন তাকে একটু অবসরের সুযোগ না দিয়ে কাধে চড়ার বায়না ধরেছি,হাজারো অবান্তর প্রশ্নবানে বিরক্ত করেছি কিন্তু বাবা কখনো বিরক্ত না হয়ে বরং আদরের পরস বুলিয়ে দিয়েছেন আমার তুলতুলে গালে।

যদি কখনো অসুস্হ হয়েছি,মনে হয়েছে বাবার সমস্ত সুখের ঘরে যেন আগুন লেগেছে।কখন ডাক্টারের কাছে নিয়ে যাবে,নিয়ম করে ঔষদ খাইয়ে সুস্হ করে তুলবে,শত প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতো সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত।যদি কখনো বড় ধরনের অসুস্থ হয়েছি তাহলে পাশে থেকে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিয়েছে বাবা আর আরোগ্য লাভের জন্য সৃষ্টি কর্তার নিকট আকুল প্রার্থনা।

যখন পরিক্ষা ক্ষনিয়ে আসতো তখন আমার চেয়ে বাবার মুখে চিন্তার ছাপ বেশী পড়তো।আমার শরীরটা ঠিক আছে কিনা,পড়াশুনার চাপটা আমার উপর বেশী পরছে কিনা,কাঙ্খিত ফলাফল করতে পারবো কিনা এ রকম শত উদ্দিগ্নতা ছেয়ে ধরতো বাবার।

যদি কখনো বাড়ী ফিরতে বেশী রাত হয়েছে তাহলে এক মুহুর্ত ঘরে না থেকে আমার আড্ডার সমস্ত স্থান তন্ন তন্ন করে খুজে ঘরে ফিরিয়ে এনেছে আমাকে।চিন্তা একটাই কোন বিপদে পড়লাম কিনা।মাঝে মাঝে আমাকে ঘিরে বাবার এমন কান্ড দেখে মনে হতো আমিই বুঝি বাবার সমস্ত সুখের একটা পৃথিবী।
এরকম হাজারো স্মৃতি আজ তাড়া করে ফেরে আমাকে।

সম্ভবত ২০০২ সাল।আমি তখন রাজবাড়ীতে থাকি।বর্ষাকাল চলছে।একদিন মুষলধারে বৃষ্টি ঝড়া এক রাতে মা বারান্দায় বেরিয়ে দেখতে পায় বিশাল বড় একটা গোকড়া সাপ আমাদের বাড়ীর উঠান থেকে আমার শোয়ার ঘরের দিকে উঠে আসছে।মা তখন সাপটিকে একটি লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।আমাদের বাড়ীর আশে পাশে এমন ভয়ংকর একটা সাপের অস্তিত্ত পরিবারের সবাইকে আতংকের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো।এই ঘটনার কিছু দিন পর এক মধ্য রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আমার হাতের একটি আঙ্গুলে ব্যথা অনুভব করলাম,ধচমচিয়ে ঘুম থেকে উঠে লাইটটা জালিয়ে দেখি আমার হাত দিয়ে রক্ত ঝড়ছে।আমি ভীত সন্তস্থ হ্য় বাবা মাকে দ্রুত ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললাম।বাবা মা আমার কাছে এসে হাত দিয়ে রক্ত ঝড়া দেখে আতংকিত হয়ে চিৎকার করে আশে পাশের ঘুমন্ত মানুষদের জাগিয়ে তুলে সারা বাড়ী ভরিয়ে ফেললো।বাবা মায়ের ধারনা ঐ সাপটাই আমাকে দংশন করেছে।মা তাৎক্ষিক আমার হাতে ডোর বেধে দিয়েছিলো যাতে বিষ দ্রত আমার শরিরে ছরিয়ে না পড়ে।বাবা মায়ের উদ্দিগ্ন উৎকন্ঠা দেখে আমি ভীত সন্তস্থ হয়ে পড়েছিলাম।মনে হচ্ছিলো, হয়তো আর কিছুক্ষনের মধ্যে এই সুন্দর পৃথিবীকে ইতি জানাতে হবে আমাকে।আর বাবা মায়ের চোখে মুখে দেখছিলাম সন্তান হারানোর এক অগ্রিম শোকাবহ বেদনা।ঐ সময়টাতে বাবা ছিলো প্রচন্ড রকমের অসুস্থ,বিছানা থেকে ঠিক মত উঠতে পারতোনা,হাটতে পারতোনা,অনেক দিন অফিস ছুটি নিয়ে ঘরে পড়ে আছে।এমতবস্থায় বাবাকে বাড়ীতে রেখে,প্রতিবেশী লোকজন দ্রুত রিক্সায় করে আমাকে আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় তিন কিঃমিঃ দূরে বিন্দু পাড়ার এক উজার বাড়ীতে নিয়ে যায়।উজা যখন আমাকে ঝাড় ফুক করছিলো তখন আমার কানে ভেসে আসছিলো এক আত্নচিৎকার,বেহালার করুন সুরের মত ভেসে আসছিলো কিছু বাক্য,'খোদা এত বড় শাস্তি কেন দিলে আমায়,কোন পাপের প্রাশ্চিত্ত তুমি আমাকে দিয়ে করাতে যাচ্ছো'।কন্ঠটি আমার চির চেনা ও অতি আপন মনে হচ্ছিলো।উজার ঝাড় ফুক ও কবিরাজী দাওয়াই শেষ করে রাস্তায় এসে দেখি সে আর কেউ নয় সে আমারই বাবা।আমি আশ্চর্য্য হয়েছিলাম,যে মানুষটি অসুস্থতায় দাড়াতেই পারছিলো সে তিন কিঃমিঃ পথ রিক্সার পিছে পিছে দৌরে কিভাবে এলো।সেদিন আমার প্রান প্রদ্রীপ নিভে যায়নি,উদঘাটন হয়নি সেদিন সাপের কামরে আমার হাত দিয়ে রক্ত ঝড়ছিলো নাকি অন্যকিছু সেটা যাই হোক না কেন,সেদিন আমার বাবার চোখে মুখে যে আকুলতা দেখেছি,সন্তান হারানোর যে অগ্রিম হাহাকার দেখেছি তা আমি কখনো ভুলতে পারিনা।

আজ বাবাকে ছেড়ে সূদুর ফ্রান্সের প্যারিস শহরে আমার বসবাস তবুও প্রতিটি মূহুর্তে বাবার ছায়া আমাকে আচ্ছাদিত করে রাখে।
যদি কখনো কাজের ব্যস্ততায় ফোন করতে বিলম্ব হয় বাবা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,তোর কোন অসুবিধা হয়নিতো বাবা,সব কিছু ঠিকঠাক আছেতো।বাবা এখন চাকুরী থেকে অবসর জীবন যাপন করছে, তবুও কখনো মুখ ফুটে বলেনা,'আমার জন্য টাকা পাঠা বাবা'।সৃষ্টি কর্তা কাছে একটাই তার প্রার্থনা আমার প্রান বাযুটা যেন সব সময় সচল রাখে।
বাবার এই অকৃতিম অগাধ ভালোবাসার কিন্চিৎ প্রতিদান দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।প্রতিক্ষা শুধু, আবার কবে বাবার কাছে ফিরে যাবো, বাবার কমল বুকে বুক রেখে জরিয়ে ধরবো।
বাবা শত সুখের মাঝেও তোমার ঐ আদর মাখা হাতের স্পর্শের খুব অভাব অনুভব করি।