অনেক ছোটবেলায় মায়ের বিয়ে হয়। বাবা ছিলেন একজন কৃষক। যাকে বলে আপাদমস্তক কৃষক। কৃষকের রক্ত বয়ে বেড়াচ্ছে আমার প্রতিটি শিরা উপশিরায়। গ্রামের সহজ, সরল, সজ্জন, ধর্মপ্রাণ সম্মানী একজন মানুষ ছিলেন বাবা। কেউ কোনোদিন বাবার সাথে বড় আওয়াজে কথা বলতে দেখিনি। বাবা অতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠতেন। ওজু করে নামাজ আদায় করতেন। আমাদেরকেও নামাজের জন্য ডেকে দিতেন। এরপর অনেকক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করতেন। রাতে তাহাজ্জুদ নামাজও আদায় করতেন নিয়মিত। এটা এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার যে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি কুরআন তেলাওয়াত করা ছাড়া বাবা কোনোদিন ঘর থেকে বের হতেন না। যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই থাকুন না কেন। কুরআন তেলাওয়াতের পর লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে তবেই না তিনি মাঠের উদ্দেশ্যে বের হতেন। আমাদের ছিল দু’টো হালের বলদ আর একটা দুধের গাভী। জমি বলতে দক্ষিণের মাঠে দুই খন্ড আর পশ্চিমের মাঠে দুই খন্ড। এই ছিল আমাদের ধানি জমির পরিমাণ। আমরা ছিলাম সাত ভাই-বোন। এতগুলো ভাই-বোনের বছর ব্যাপী খাদ্যের জোগান দিতে বাবাকে রীতিমত হিমশিম খেতে হত।
মায়ের জন্ম হয়েছিল অবস্থা সম্পন্ন একটা পরিবারে। নানা ছিলেন ব্যবসায়ী মানুষ। ছোট থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত মাকে কোনোদিন অভাবের মুখ দেখতে হয়নি। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে অনেক নতুন পরিবেশের সাথে পরিচিতি হতে হয় তাঁকে। বিয়ের সময় আমার নানা ভাই মাকে এক জোড়া কানের জিনিস আর গলার গয়না উপহার দিয়েছিলেন। মা ছিলেন নানার পরিবারের সবার বড়। সবার বড় হওয়ার ফলে আদর যত্ন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। প্রভাবও ছিল ভীষণ। নানার বাড়িতে গেলে দেখতাম মামা-মামীরা কখনো মায়ের মুখের উপর কথা বলতেন না। মায়েরা ছিলেন ছয় ভাই-বোন। মায়ের মুখেই শুনেছি, নানার বাড়ি ছিল চর গোপালগাঁও। এটি ছিল ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার এক নং চরমজলিশপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম। নানার বাড়ীর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট ফেনী নদীর শাখা নদী। মা শিশুকাল থেকে সে নদীতে তার সম বয়সী সখীদের সাথে হৈ হুল্লোড় করে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঝাপ দিয়ে বড় হয়েছেন। নদীর তীরের কাশফুল ছিঁড়ে খেলা করেছেন। বর্ষার কদম ফুল নিয়ে চুলের খোঁপায় পরেছেন।
আমার নানা পাট, ধান, চাল, গরু, নারিকেল, সুপারির ব্যবসা করতেন। এ কারণে সব সময় তার কাছে গামছা ভর্তি টাকার বান্ডিল থাকত। বাজার থেকে লাই ভর্তি সদাই নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। আর নানার ছিল মাছ ধরার রাশি। নদীতে জাল ফেলে বড় বড় চিংড়ি, কোরাল, বোয়ায়, রুই মাছ ধরতেন নানা।
এদিকে অভাবের সংসারের গ্লানি টানতে টানতে বাবার অবস্থা কাহিল। চোখের সামনে বাবার এক করুণ অবস্থা দেখে মা বড় ভাবনায় পড়ে গেলেন। একদিন বাবা নানার দেয়া কানের জিনিস আর গলার গয়না বিক্রি করে দিলেন। এরপর মা যখন নানার বাড়িতে যেতেন তখন নানু জিজ্ঞেস করতেন ‘ কীরে মা, তোর জিনিসগুলো কোথায়? মা তখন উত্তর দিতেন, ‘রেখে এসেছি, সব সময় পরতে ভালো লাগে না।’ আসল কথাটা হল বাবা সংসারের ব্যয় বহন করতে না পারায় নিরুপায় হয়ে মা সেগুলো বিক্রি করতে দিয়েছেন বাবাকে।
আমার নানী ছিল রোমান্টিক প্রকৃতির একজন মানুষ। নানীর এক ধরণের বাতিক ছিল। তা হল তিনি প্রতি বেলা মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারতেন না। আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে এ বিষয়টা আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করতাম যে, পাতে মাছেল তরকারি না থাকলে উনি কেবল ভাতকে আচাড় দিতেন। কেননা উনি মাছের তরকারি ছাড়া ভাত খেতে পারতেন না। এমনকি গরুর মাংস, খাসীর মাংস, মুরগীর মাংস থেকেও তিনি মাছ তরকারিকে অনেক বেশি পছন্দ করতেন। নানী ভালো গল্প বলতেন। মনে পড়ে আমার মুসলমানীর অনুষ্ঠানে রাতে পেটের মধ্যে বালিশ বেঁধে গর্ভবর্তী নারীর ভূমিকার অভিনয় করেছিলেন। নানী এখন আর বেঁচে নেই। নানার বাড়িও গোপালগাঁও নেই। কবে যে সে বাড়ি নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে তার হিসেব নেই। এখন নানার বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। নানার বাড়ির পিছনে অবারিত অংশ জুড়ে কেবলই চা বাগান আর চা বাগান।
নদীর পানির মত সময় গড়িয়ে যায়। আমাদের অবস্থারও উন্নতি হতে থাকে। পারিবারিক অবস্থার উন্নতি হলে বাবা মা’কে একটি নাকফুল বানিয়ে দিলেন। সেদিন থেকে মা প্রায়ই সেই নাকফুল পরে থাকতেন। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আমার বড় ভাই এখন হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক। মেজে ভাই-ছোট ভাই সৌদি আরবে থাকেন। আর আমি সাব-এডিটর হিসেবে একটা নিউজ এজেন্সীতে কর্মরত আছি। অতীতের দিকে তাকালে এখন নিজের কাছে বড় অবাক লাগে। কোথায় ছিলাম! কোথায় এসে পড়েছি, কোথায় বা এর পরিনতি কে জানে। এ ক্ষুদ্র জীবনে কত কিছুই না দেখলাম। কত প্রিয় মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। কত মানুষের ভালবাসা পেয়েছি। কত মানুষের সাথে সখ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মনে পড়লে সৃষ্টিকর্তার কুদরতের সামনে আমার মাথা নুয়ে আসে। আসলে সমস্ত প্রশংসাই মহান আল্লাহ তাঁয়ালার জন্য।
আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজে বাংলায় অর্নাসে পড়তাম। একবার ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে এলাম। বাড়িতে যেতে যেতে সেদিন সন্ধ্যার নেমে আসে। রাতের অন্ধকার ঢেকে ফেলে পুরো গ্রামকে। আমার মা তখন অনেক সুস্থ সবল ছিলেন। তখন ছিল শীতকাল। আমি আবার কচু তরকারি ভীষণ রকম পছন্দ করতাম। সে কারণে মা আমার জন্য কচু তরকারি রান্না করে রেখেছেন। মা বললেন, ‘বাবা তুই বয় মা একটু তরকারিগুলান জাল দিয়ে আনি।’ মা তরকারীর পাতিল নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন। একটু পর আমিও মায়ের পিছু পিছু বান্না ঘরে গেলাম। বান্না ঘরে গেলে মা আমাকে একটা পিড়ি দিলেন বসতে। আমি বসে বসে মায়ের সাথে গল্প করছি। মা উনুনে তরকারি গরম করছেন আর আমার সাথে কথা বলছেন। কথা বললে আর থামাথামি নেই মায়ের।
কোথায় থাকি। এক রুমে কয়জন। কে রান্না করে। কয়জনে খায়। বাজার কে করে। কি কি তরকারি রান্না করে। তখন এসব কথা আমার কাছে খুবই সাধারণ বিষয় বলেই মনে হত। মনে মনে বিরক্ত হতামও। ভাবতাম এত কিছু থাকতে মা রান্নাবান্নার কথা কেন জিজ্ঞেস করেন। এখন বয়স হয়েছে তাই অনেক কিছুই বুঝি
উনুনের আগুনে বান্না ঘরে একটা আলো আধারি একটা দৃশ্য ধারণ করছে। আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি আর গল্প শুনছি। তখন ঘরের ভেতর উনুনের আলোয় মায়ের সুন্দর, পবিত্র মুখটি বারবার ভেসে ভেসে উঠতে লাগল আমার সামনে। উনুনের আলো আর রাতের আঁধারে মায়ের নাকফুলটি ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি খেলা করতে লাগল। মনে হচ্ছে চুলার আগুনে নয় মায়ের নাকফুলটিই আমাদের রসুই ঘরটি আলোকিত করেছিল সেই রাত্রিতে। এখনও আমি আমার মায়ের সেই নাকফুলের আলোয় পথ দেখে চলছি। নাকফুলের আলো আমাকে সত্য, সুন্দর, নির্মল, পবিত্র, ন্যায়ের পথ দেখিয়ে চলছে অবিরাম।