লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ জুন ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ১০টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৬৪

বিচারক স্কোরঃ ২.২৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftসরলতা (অক্টোবর ২০১২)

খরা
সরলতা

সংখ্যা

মোট ভোট ৯০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৬৪

মৌ রানী

comment ১৮  favorite ০  import_contacts ১,০৫৪
রাজার ছয় রানী। ছয় রানীই রূপবতী আর সরলতায় অতুলনীয়। রানীরা খুব ভাল ভজন সঙ্গীত পরিবেশন করে। তা-থই তা-থই নাচতে পারে। বড় বড় শঙ্খে ফুঁ দিয়ে অনেকক্ষণ দমরাখতে পারে। কোন রানীর বাচ্চা হয় না। তাই সাত নাম্বার পর্যন্ত যেতে হয়। আটখুরে গিরিশ চন্দ্র রাজাকে।

রাজ্যে কোন কিছুর অভাব নেই। সব প্রজার মনেই সুখ শান্তি আছে। অভাব শুধু একটা। কোন রানী রাজাকে একটি বাচ্চা দিতে পারেনি। রাজা পিতা হতে পারেনি। প্রজাদের মুখেও এই একটা কথা ঘুরে ফিরে বেড়ায়। রাজ্যে পান থেকে চুন খসলে রাজার দোষ হয়। আটখুরা রাজার জন্যই বলে প্রজারা গালাগাল করে।

গত বছর থেকে খরা শুরু হয়েছে। এখনো এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে না। মাটি ফেটে চৌচির। ঘাস ছোটবড় গাছগাছালী মরে গেছে। খাল বিল শুকিয়ে গেছে। নদী শুকিয়ে কাঠ। নদীর তলার বালি বাতাসের সাথে উড়ে। ক্ষেতে ফসল নেই। কারো চোখে ঘুম নেই। মনে সুখ নেই। আশপাশের রাজ্যের কোন লোক এ রাজ্যের দিকে চোখ তুলেও তাকায় না। প্রজারা অতিষ্ট হয়ে আটখুরা, গজব অপবাদ দিয়ে রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

আগামী দুই দিনের মধ্যে রাজ্যের প্রতিটি মৌজায় একটি করে পুকুর কাটার হুকুমদিচ্ছি - মন্ত্রীর দিকে আঙ্গুল উচিয়ে কথা বলা শেষ হওয়া মাত্রই। মন্ত্রী বাম হাত বুকে ঠেকিয়ে ডান হাতে সেলাম জানিয়ে মাথা নিচু করে কুর্নিশ করে পিছ পা হয়ে বলে - তাই হবে রাজা মশাই।

কয়েকদিন হয়ে যায় কোন দীঘিতেই পানি উঠে না। কুয়াতে একদিন পানি উঠলে দুইদিন পানি উঠে না। প্রজারা পানির অভাবে মুমুর্ষ। প্রখর রৌদ্রের তাপে গাছ তলে বসে বিশ্রাম নিবে। তেমন গাছও নেই রাজ্যে। বন উজার। যে দুএকটি বন ছিল তাও দাবানলে ছাই। আকাশে কালো ধোয়া উড়ে। কালো মেঘ উড়ে না। কোন পাখি উড়ে না। ভোরে পাখিরা গান গায় না। সকাল দুপুর রাতদিন একরকম। হাহাকার।

একরাতে রাজা স্বপ্নে দেখে সুন্দরী যুবতী একটি কুমারী মেয়েকে দীঘিতে বলি দিতে হবে। তাহলেই রাজ্যে বৃষ্টি হবে। খালবিল নদী কানায় কানায় ভরে উঠবে। ফলে ফসলে ভরে উঠবে ক্ষেত। সবুজে সবুজে ছেয়ে যাবে রাজ্য।

মন্ত্রী এই মুহূর্তে রাজ্যে এলার্ন করেদিন। আজ সূর্যডোবার আগে সুন্দরী কুমারী যুবতী মেয়েদেরকে রাজ দরবারে হাজির করতে। আরো বলেদিন এ রাজার হুকুম। কেউ যদি হুকুম না মানে তাহলে ঐ পরিবারের সকললের প্রাণ যাবে - তাই হবে হুজুর। মন্ত্রী বলে।

ঢোল বাজিয়ে সারা রাজ্যে ঘোষনা করে। কিন্তু কেউ তার মেয়েকে নিয়ে রাজ দরবারে আসে না। এদিকে সন্ধা প্রায় হয়ে আসে। আজ কালীসন্ধায় পুজা অর্চনার মধ্যে সুন্দরী যুবতী মেয়েকে দীঘির মধ্যে বলি দিতে না পারলে আর কোন দিন বৃষ্টি হবে না। এই রাজ্যে কোন মানুষ বাস করতে পারবে না। রাজ্য হবে জন শুন্য। রাজত্বও থাকবে না। রাজা ভীষণ রেগে যায়। চোখ বড় বড় করে গর্জে উঠে।

রাজ দরবারে হৈচৈ শুরু হয়। কান্নার রোল পরে। - এই নিন হুজুর আপনার হুকুম মোতাবেক রাজ্যের সুন্দরী যুবতী কুমারী মেয়েদের ধরে এনেছি। রাজার মনের খেয়ালের অভাব নেই। ভোগবিলাসীতার শেষ নেই। একান্তে রাজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে। যুবতীদের নাচ গানের মধ্য দিয়ে কালীসন্ধার পুজোয় বলিদান শেষ হয়। কিন্তু পানি উঠে না। ডাক পরে গোনকের।

আকাশে মেঘ জমে না। গুরুম গুরুম ডাকে না। বজ্রপাত নেই। কান্না নেই। বৃষ্টিও নেই। ভজন সঙ্গীত আর শঙ্খ ধ্বনিতে রাজদরবারে গুমগুম শব্দ তোলে। মন্ত্রী উজির নাজির প্রজা সবাই নাচের সাথে সাথে বসে বসে বৃষ্টি কামনা করে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ইসলাম সব ধর্মের অনুসারীরা নিজনিজ ধর্মমতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান তাদের নিয়ম অনুযায়ী পালন করে। রাজা সিংহাসনে বসে সুরা বৃষ্টির তালে তখনো দুলছিল। রাজ্যের সুন্দরী যুবতীরা এমনকি ছয় রানীও রাজ দরবারে ঘুঙ্ঘুরের ঝড় তুলছিল। কোন কোন গোত্রের লোক তাদের রীতি অনুযায়ী। বৃষ্টির জন্য যুবতী মেয়েদের উলঙ্গ করে ক্ষেতে, লাঙ্গল জোয়াল টানাচ্ছিল। কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই।

কালুরাম সর্দার। দেশ বিদেশ ঘুরে ঘুরে সার্কাস দেখায়। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। যখন যে দেশে যায় তখন সে দেশের মানুষের মতো করে সাজায় সার্কাসের একপাল মেয়েদেরকে। হাজির করে জন সমক্ষে। খেলা দেখায় মা মেয়েরা। বাবা ভাইয়েরা টিকেট বিক্রির টাকা গোনে।


বড়বড় বাদাম নামিয়ে গতি কমাতেই পাড়ে ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠে ঘুমন্ত সার্কাসের কর্মীদল। দ্বিতীয় নৌকায় রান্নারত চুলায় ধোঁয়া উঠা হাড়ি পাতিল নিয়ে মহিলারা পরে যাবার জো। সার্কাসের মালসামান তৃতীয় নৌকায়। ছয় মাসের খাদ্য বোঝাই চতুর্থ নৌকাটিও সর্বশেষ থেমেছে।

দুই-তিন বছর থাকার অনুমতি পেতে। রাজ দরবারে যাওয়ার আগেই অশ্বারোহী সৈন্য রাজার কাছে খবর পৌঁছে দেয়। রাজার দুলুনি তখনো ঘুমের ঘরে পৌঁছায় নি। রঙিন স্বপ্নে তখনো বিভোর। বাহিরে হৈচৈ শুনে রাজার তন্দ্রা ভাব না কাটতেই একজন এসে বলে রাজা মশাই রাজা মশাই বৃষ্টি শুরু হয়েছে, বৃষ্টি শুরু হয়েছে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বৃষ্টির ঝমঝম তালের সাথে ঘুঙ্গুরের ছন্দ মিশে যায়। কুমারীদের রক্ত ধুয়ে যায়। বলির দীঘিতে পানি জমে।

রাজার গলার মোতির ছোট মালাটি তার দিকে ছুড়ে দিয়ে বড় মালাটি দেয় গণকের দিকে। খরা শুরু হওয়ার পর রাজা গণকের কাছে বহুবার বৃষ্টির কথা জানতে চেয়েছে। কোন বারই গণকের কথা ফলেনি। তাই শেষ বারের মতো সুযোগ দিয়ে রাজা যখন গণকের কাছে জানতে চায় - কবে কখন বৃষ্টি হবে ? সঠিক গণনা করে বল হে গণক। মনে রেখ এবার ভুল হলে তোমার গর্দান যাবে। গণক অনেক গণনা গুণে দেখে। এই রাজ্যে বৃষ্টি নেই। এই তার শেষ সুযোগ। এবার ব্যর্থ হলে তার মাথা কাটা ছাড়া বাঁচার আর কোন পথ থাকবে না। কবে কখন বৃষ্টি হবে তারও খবর নেই। কিন্তু বৃষ্টির কথা না বললে তার গর্দান যাবে। তাই গণনার মাঝে অনেক ফন্দি-ফিকির করে। গণক ভেবে দেখে। এই অভাবের রাজ্যে কেউ আসবে না। সাবাই রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেশে দেশে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অন্য রাজ্যের কোন মানুষ এই রাজ্যে আসার সম্ভাবনা নাই। যখন রাজ্যের কোথাও বৃষ্টি হবে তখন নিশ্চই কেউ না কেউ আসবে। গণক গণনার ধ্যান থেকে জেগে বলে - আপনার রাজ্যে ভিন দেশী মেহমান আসলেই বৃষ্টি হবে। শর্ত হল, কোন মেহমানকে দাওয়াত করে আনা যাবে না। সেই কথাটা আজ ফলে গেছে। গণক নিজের প্রাণ ফিরে পেয়ে রাজার চাইতেও বেশী খুশি।

অনুমতি চাওয়ার আগেই রাজা তাদের যতদিন ইচ্ছা থাকার অনুমতি দেয়। সর্দার খুশি হয়ে রাজার সম্মানার্থে দরবারে সার্কাস দেখাতে চাইলে। রাজা সে দিনই সার্কাস দেখানোর অনুমতি দেয়। সর্দারের একটি মেয়ে। যেমন সুন্দরী তেমন তার গুণ। ত্রিফলা, বোর্ডে চাকু নিক্ষেপের সময় সেই চোখ বন্ধ করে মুর্তির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। একটি ফলা কিংবা একটি চাকু তার বুকে পেটে বিঁধলে জীবন শেষ। এমনকি এক’শ ফুট উঁচুতে চিকন দড়ির উপর হাটার খেলা একমাত্র সেই দেখায়। মেয়ে মানুষের শরীর নরম। সার্কাসের ডিকবাজী উল্টো বাজি সব মেয়েরাই দেখায়। নেচেনেচে গান শোনায়। পুরুষ মানুষ তখন চোখ বেঁধে চাকু ছোড়ে আর ঢোল বাজায়। অনেক গুণের অধিকারিনী গিরিবালা। রাজা মুগ্ধ হয়ে গিরিবালাকে রানীর বহরে যোগ করে। সেই থেকে গিরিবালা সাত নম্বর রানী।

অবলা আর সরলতায় গড়া মেয়েরা ধৈর্যশীল। বেশী পরিশ্রম করানো যায়। পুরুষের মনো রঞ্জনের পুতুল। তাই আবার সব ঠিকঠাক মতো চলতে থাকে। গোয়ালারা বাজারে দুধ নিয়ে যায়। গোয়ালিনীরা বাড়িতে দুধের মাখন উঠায়। কুমারেরা আড্ডামারে বউয়েরা মাটি কোপায়। কামারেরা হাটে যায় বৌয়েরা লোহা পিটায়। বেদেনিরা গ্রামে গ্রামে সাপ খেলা দেখায়, দাঁতের পোকা খসায়। মাজা ব্যথায় শিংগা লাগায়। পুরুষ মানুষেরা নৌকায় সারা দিন ঘুমায়। চাকুরী জীবিরা অফিসে গিয়ে চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমায়। বৌ বাড়িতে কাপড় কাচে। রান্না করে। বাচ্চা-কাচ্চা দেখে। জেলেরা ঘরে ঘুমায় জেলেনিরা জাল বুনায়। ধোপারা তাস খেলে ধোপানীরা কাপড় কাঁচে। পুরুষ শিক্ষকরা ক্লাসে হাইতোলে। মহিলা শিক্ষিকারা ছাত্রদের পড়ায়। ধুম-ধাম বিয়ে করে পুরুষেরা স্বামী হয়। স্বামীর ঘরে গিয়ে স্ত্রীরা দাসীবাদী হয়। পুরুষরা মেয়েদের নাচায়। পত্নী উপপত্নী বানায়। ছেলেরা স্কুলে যায় মেয়েরা গোবর ফালায়। বাঙ্কারে বসে পুরুষ সৈন্যরা মদ গিলেগিলে যুদ্ধের প্লান করে। মহিলা যোদ্ধারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসব করে। হাত পা বেঁধে পুরুষেরা লালসা মিটায়। সেই থেকে আজো ঠিক তেমন করেই পুরুষেরা কর্তৃত্ব ফলায় মেয়েদের সরলতায়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement