লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ৭৯টি

সমন্বিত স্কোর

৪.০২

বিচারক স্কোরঃ ২.২২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগভীরতা (সেপ্টেম্বর ২০১৫)

একটি সামান্য মৃত্যু
গভীরতা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.০২

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

comment ৫  favorite ০  import_contacts ১,০৩০
(এক)
বিলের নাম রনিয়া। শান্ত, সৌম্য ও স্নিগ্ধ জলের প্রতিমূর্তি। চারপাশে গ্রাম। যেনো একটি বিশাল দীঘি। ছায়া সুনিবিড়। শান্তির নীড়। এক সময় বিলের চারপাশের মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিলো এই রনিয়া। মমতাময়ী মায়ের আঁচলের মতো। মাছ দিয়ে, পানি দিয়ে, শাপলা দিয়ে,শালুক দিয়ে, কেওরহালি দিয়ে, ফসল দিয়ে, পশু পাখির খাবার দিয়ে এই বিল হাজার হাজার মানুষকে এক বিনে সুতোর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। এক সময় এই রনিয়ায় সারা বছরই পানি থাকতো। চারপাশের গ্রামবাসি জাল ফেলে, টাটা চালিয়ে, চানার দিয়ে মাছ ধরতো। মেয়েরা বড়শি হাতে ছোট-বড় মাছের সাথে মিতালি পাতাতো। শুষ্ক মৌসুমে বিলের উর্বর বুকে তৈরি করা খাদের মাছ; যেদিন ধরা হতো; সেদিন পুরো গ্রামের চিত্রই পাল্টে যেতো। সহজ-সরল মানুষ গুলোর মনে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো। দেশি নানা প্রজাতির মাছে ভরে উঠতো প্রতিটি বাড়ি। নিজেরা খেতো। প্রতিবেশিকে দিতো। বাজারে বিক্রি করতো। বর্ষা মৌসুমে বিলের পানি চার কুল ছাপিয়ে গ্রাম গুলোর পা ধুয়ে দিতো। পাল তোলা নৌকা ।ভাটিয়ালির সুর। পূর্ণিমা রাত। আসমান ভেঙে পড়া জোছনা।সকাল-বিকেলের সোনা রোদ; বিলের ছোট ছোট ঢেউয়ের পাহাড় গুলোতে আছড়ে পড়ার দৃশ্য; কার না ভাল লাগতো!

এই হলো রনিয়ার জীবনের কথা। যৌবনের কথা। এ গুলো এখন কেবলই স্মৃতি। সেই রনিয়াও নেই । আর
রনিয়া পাড়ের সহজ-সরল, সাদামাটা মানুষ গুলোও আগের মতো নেই। রনিয়া যেমন বদলেছে; তেমনি বদলেছে সব কিছু ! এখন সারা বছরই প্রায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকে । বর্ষাকালের দিন পনেরো কোনোরকমে তাঁর গলা ভিজে। এই রনিয়ার তীর ঘেঁষেই কুসুমের মামা বাড়ি। পূর্বপাশে। গ্রামের গ্রাম ভাঙেরগাঁও। গ্রামটি একহারা গড়নের শাড়ির মত লম্বাটে। উত্তরে-দক্ষিণে। কুসুম মামা বাড়িতেই থাকে। সেই শৈশব থেকেই। তাই যারা জানে না, তারা ভাবে এটিই কুসুমের নিজের বাড়ি। আর কুসুমও এই বাড়ির যা কিছু আছে সব---
হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে হাঁস,মুরগি, ছাগল, গরু, গাছ-পালা এমন কি পুকুরের মাছ পর্যন্ত সবকিছুকে
নিজের একান্ত আপন করে নিয়েছে।

কুসুম সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। করগাঁও ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়টি বেশ নামকরা। আশেপাশে আর কোনো উচ্চ বিদ্যালয় না থাকায় প্রায় পনের থেকে বিশটি গ্রামের ছেলেমেয়েরা এক সময় এই বিদ্যালয়ে
পায়ে হেঁটে পড়তে আসতো। এখন অবশ্য বিভিন্ন গ্রামে আরও কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে অবশ্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যায় কোনো প্রভাব পড়েনি। কারণ আগের তুলনায় শিক্ষার হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । বৃদ্ধি পেয়েছে জন-মানুষের সচেতনতা। কুসুম ভাল ছাত্রী। পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্ট ফুলে বৃত্তি পেয়ে
সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো এই মেয়ে। দেখতে খুব সুন্দরী নয়; আবার একবারে খারাপও নয়। গায়ের
রং শ্যামলা। তবে কোমনীয় মুখশ্রী। ষষ্ঠ শ্রেণিতে প্রায় দুই শত পঞ্চাশ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে তবেই সে সপ্তম শ্রেণিতে প্রমোশন পেয়েছে। শুধু পড়া-লেখা নয় খেলাধুলায়ও সে যথেষ্ট ভাল।
গত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সে তিনটি ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কুসুম
ছিল সকলের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দু। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবেশ স্যার কুসুমের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলেছেন,
“কুসুম, আমাদের বিদ্যালয়ের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। শুধু তাই নয়, একদিন সে আমাদের দেশ ও দশের মুখ আলোকিত করবে। আমি আমার শিক্ষকতা জীবনে কুসুমের মতো মেধাবি ছাত্র আর পাইনি। আমি তার সুখী
সমৃদ্ধ জীবন কামনা করি’’।
প্রিয় স্যারের পবিত্র মুখে এহেন কথা শুনে কোমলমতি কুসুম তার চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। আর মনের ভিতরের বড় হওয়ার, আলোকিত মানুষ হওয়ার স্বপ্নটা শতগুণে ডালপালা মেলতে শুরু করে। ইস্পাত কঠিন শপথ নেয়। যে ভাবেই হোক দেবেশ স্যারের স্বপ্ন সে পূরণ করবেই -- করবে। কুসুম একবার আকাশের দিকে তাকায়। আপন মনে। অনেকটা নিজের অজান্তে। যেন পরম করুণাময় স্রষ্টাকে সাক্ষীকে হিসাবে সাব্যস্ত করে।

বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীবৃন্দও কুসুমের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়। তাদের চোখে মুখেও ছড়িয়ে পড়ে গভীর
প্রত্যয়। আলোর দিশা। আমরা করব জয় ---- আমরা করব জয়-------। আর কুসুমের দুই চোখের তারায় ভাসছে আর একজন প্রিয় মানুষের মুখ। যার অক্লান্ত শ্রম সাধনা ও দিকপালে আজ কুসুম এই পর্যন্ত আসতে পেরেছে। অন্যথায় গ্রামের আর দশটা মেয়ের মতো তাকেও এই বয়সে বসতে হতো বিয়ের পিঁড়িতে। হাড়ি পাতিল, স্বামী, শ্বশুর এবং শাশুড়ি! সেই সাথে কমলার মতো ভাগ্য মন্দ হলে আত্নহত্যা ছাড়া তার
সামনে আর কোন পথ খোলা থাকতো না!

(দুই)
কুসুমের সেই আদর্শ মহাপুরুষের নাম আবুল কাশেম আনসারী। কেউ ডাকে কাশেম ভাই । কেউ আনসারী ভাই। আনসারী অবশ্য মদিনার আনসার নয় বা তাদের উত্তরসূরিও নয়। এটি আবুল কাশেমের উপাধি। এলাকার যে কোনো লোকের যে কোনো প্রয়োজনে আবুল কাশেম তাঁর সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করে দেন। সাধ্য মতো অর্থ দিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে। উপরন্তু মিষ্টি কথা, উত্তম আচার আচরণ দিয়ে তিনি সকলের পাশে
দাঁড়ান। আর এই জন্য গ্রামবাসি সকলে তাকে ভালবেসে আনসারী নামে ডাকে। তিনি নম্র, ভদ্র, অমায়িক ও সদালাপী টগবগে যুবক। মাঝারি গড়ন। গায়ের রং প্রায় কুসুমের মত। তবে একটু বেশিই কালো।কিন্তু এই কালোটা কালো মুখে কালো ভ্রমরের মতোই মানিয়ে গেছে। আধা-শিক্ষিত মানুষ। কৃতিত্বের সাথে এস এস সি পাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরে আর এগোতে পারেননি। অর্থাভাবে। এইচ এস সি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারেননি । টাকার অভাবে। অবশ্য গ্রামের সুদখোর মহাজন আম্বিয়ার বাপ দুইটির মধ্যে যে কোনো একটি শর্ত পালনের শর্তে টাকা দিতে চেয়েছিলেন।
(এক) আম্বিয়াকে বিয়ে করতে হবে। অথবা
(দুই) সুদে টাকা ধার নিতে হবে । এই দুই শর্তের কোনোটাতেই তিনি রাজি হননি। কর্জে হাসানার চেষ্টা অবশ্য অনেকের কাছেই করছেন। কিন্তু কেউ দিতে রাজি হননি। অবশ্য সেটা গরিব মানুষ বলে। কারণ
গরিব মানুষকে কেউ টাকা ধার দিতে চায় না। আর দিবেই বা কোন ভরসায়?যদি ফেরত দিতে না পারে!
এরচেয়ে বরং ফকির মিসকিনকে দেওয়া অনেক ভালো। ফেরত না পাওয়া যাক, সওয়াব তো পাওয়া যাবে!
এই হলো সাধারণ মানুষের বিশ্বাস!

অনেক জায়গায় ধর্না দিয়েও যখন আবুল কাশেম ফরম পূরণের টাকা কোনোভাবেই যোগাড় করতে পারলেন না; তখন তিনি অনেকটা সচেতন ভাবেই নিজের মনের ভেতর লালন করা লেখাপড়ার স্বপ্নটাকে একেবারে কবর দিয়ে দিলেন। কিন্তু ইহার এমনই শক্তি ছিলো যে, কবরস্ত হওয়ার পরও আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠলো। সেই শক্তি ও আলোর শিখা তিনি অন্য একজনের ভিতর সফল ভাবে জ্বেলে দিলেন। যা এখন জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। আর সেই অন্য একজন আর কেউ নয়; সে-ই আমাদের কুসুম! এই আবুল কাশেম আনসারী সাহেব কুসুমের আপন মামা । মায়ের আপন বড় ভাই। কুসুমদের বাড়ি ভিন্ন উপজেলায়। এটি এলাকার অনেকেই জানে না। অনেকেই কুসুমকে এই বাড়ির মেয়ে বলে ভুল করে।

আবুল কাশেম সাহেবের বাবা নেই। অনেকদিন বছর হলো তিনি ইহধাম ত্যাগ করেছেন। মা জমিলা খাতুন
আর কুসুমকে নিয়েই তার ছোট সংসার। এখনও বিয়ে থা করেননি। তবে এই বিষয়ে তিনি খুব চাপে আছেন। কথায় বলে না, উঠতি সংসারে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য বাপের অভাব হয় না।এ ব্যাপারে তাঁর স্পষ্ট সিদ্ধান্ত; এখন বিয়ে করবেন না। কিন্তু বিয়ের কথা মনে হলেই আম্বিয়ার জন্য মনটা শুধু কেমন কেমন করে। বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। খালি খালি লাগে। মায়া হরিণীর মত আম্বিয়ার মুখখানি তাঁর চারপাশে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। আম্বিয়ার চোখের সাগরে ডুবে মরতে তার খুব সাধ হয়!কিন্তু সমস্যা একটাই, আর সেটা হলো আম্বিয়ার বাপ। অত্যন্ত লোভী ও জঘন্য প্রকৃতির মানুষ। হায়েনার চেয়ে হিংস্র। শিয়ালের চেয়ে ধূর্ত। সুদ খেয়ে যে গ্রামের কতো মানুষকে তিনি সর্বস্বান্ত করেছেন; তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

আম্বিয়ার স্বভাব চরিত্র অবশ্য বাপের মতো নয়। একদমই আলাদা। যেমন মিষ্টি চেহারা তেমনি মধুর ব্যবহার। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করে। দশম শ্রেণি। ভাল ছাত্রী হিসাবে খুব নামকরা না হলেও, একেবারে খারাপ ছাত্রীও নয়। যথেষ্ট মেধা আছে। কিন্তু পরিবার থেকে সে কোনো ধরনের সহযোগিতা না পাওয়ায় নিজেকে সঠিক ভাবে বিকশিত করতে পারছে না। আম্বিয়াদের পরিবারে শিক্ষিত বলতে সে একাই। আর কেউ স্কুলের চৌকাঠ মাড়ায়নি। আম্বিয়া বেশ কিছুদিন আবুল কাশেমের কাছে প্রাইভেট পড়েছে। যদিও তখন সে বেশ ছোট। জালি লাউয়ের ডগার মতো কোমল তার মন। আর সেই কোমল মনে কখন যে,আবুল কাশেমের ছবি এঁকে রেখেছে; তা সে নিজেই জানে না।

তিন
বিকেল চারটা বাজে। কুসুম স্কুল থেকে ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। মামা বাড়িতে নেই। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এখনও গোসল করেনি। মামা কোথায় গেছে সে জানেও না। আর এইখানেই তার রাগের আসল কারণ। মামা
তো তাকে না জানিয়ে সাধারণত কোথাও যান না। তাহলে আজ কোথায় গেলেন? কেনো গেলেন? এসব ভাবতে ভাবতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো কুসুম। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত শরীর। এক সময় অনেকটা নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়লো।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় মামার ডাকে কুসুমের ঘুম ভাঙলো। আস্তে আস্তে চোখ মেলে মামার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। কারো মুখে কোনো কথা নেই। দু’জনেই মুখেই মিষ্টি হাসি। আর সেই হাসিতে হাসিতে অল্পক্ষণের মধ্যেই কী যে হয়ে গেলো! কুসুমের সমস্ত রাগ অভিমান বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়লো।আবুল কাশেম কুসুমকে জিজ্ঞেস করলো, কিরে খেয়েছিস? গোসল করেছিস? স্কুলের ড্রেস এখনও খুলিসনি কেন?
কুসুম মামার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হা হা হা করে হেসে উঠলো! আবুল কাশেম নিজেও সেই হাসিতে যোগ দিলেন।তারপর জিজ্ঞেস করলেন, কিরে এমন করে হাসছিস যে?
হাসব না তো কি কাঁদবো? তুমি এক নাগাড়ে এতোগুলো প্রশ্ন করলে আমি কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দেবো মামা? বলেই আবার হা হা হা করে হেসে উঠলো।

এমন সময় কুসুমের নানীর বাজখাই গলার আওয়াজ শোনা গেলো। মামা-ভাগ্নি দুজনেরই আজ খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, অথচ এখনও কারো নাওয়া-খাওয়ার কোন খবর নেই। এবার দুজনেরই টনক নড়লো। বাড়ির পেছনেই পুকুর। দু’জন একসাথে সেদিকে হাঁটা দিলো। কারো মুখেই কোন কথা নেই। কুসুমই প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করলো।
সারাদিন কোথায় ছিলে মামা?
কটিয়াদি গিয়েছিলাম।
কেনো গিয়েছিলে? তুমি তো আমাকে না বলে কোথাও যাও না!
একটু জরুরি কাজ পড়ে গিয়েছিলো। জমি-জমার ব্যাপার। ওসব তুই বুঝবি না কুসুম।
আমার ও সব বুঝার দরকারও নেই। শুধু বলো, আমাকে না বলে গিয়েছিলে কেনো?
তুই তখন ঘুমাচ্ছিলে। আমি অনেক সকালে রওনা দিয়েছিলাম। তাই তোকে আর জাগাইনি। ভেবেছিলাম, দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসতে পারব। কিন্তু ওসব জমি জমার কাজ অনেক ঝামেলা। বুঝলি কুসুম? বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কী রকম ঝামেলা মামা?
ওই যে আমি তখন অনেক ছোট। বাবা মারা যাওয়ার পর আমদের অনেক বিষয় আশয় আমার চাচারা দখল করে নিয়েছেন।নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়েছেন। ভুয়া দলিল-দস্তাবেজ তৈরি করেছেন। এমন কি তাদের নামে নাম খারিজও করিয়েছেন!
তাহলে তুমি এখন সেগুলো উদ্ধার করতে চাইছো মামা--- তাই না?
হুম। সে চেষ্টাই আমি করছি।
মামা একটা কথা বলি?
ঠিক আছে, বল।
ও জমি আর উদ্ধার করার দরকার নেই। ওরা অনেক খারাপ মানুষ। ওরা যদি তোমাকে মারে। তারচেয়ে তুমি ওসব জমির চিন্তা বাদ দাও মামা।
না কুসুম। এ আমি বাদ দিতে পারি না। এভাবে যদি একজনের অধিকার আরেকজনে কেড়ে নেয়; তাহলে তো সমাজের কোনো প্রয়োজন নেই। আইনের প্রয়োজন নেই। দেশের প্রয়োজন নেই।
খারাপ মানুষ আইন মানে না মামা। ওরা আইন ভঙ্গ করেই আনন্দ পায়।
কুসুমের মুখে এই কথা শুনে আবুল কাশেম একেবারে মুগ্ধ নয়নে কুসুমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একদম বড় মানুষের মতো কথা! অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ। তিনি কুসুমের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, তুই একেবারে ঠিক কথা বলেছিস কুসুম। তবে মনে রাখিস, ওরা যতোই শক্তিশালী হোক না কেন, আইন তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আইনের হাত আরও অনেক বেশি লম্বা।
কুসুম আর কথা বাড়ালো না। বললো, ঠিক আছে মামা। তুমি যা ভালো মনে কর তাই করো। এখন চল গোসল করে তাড়াতাড়ি খেতে যাই। নানী রাগ করছেন।
ঠিক আছে, তাই চল।
পুকুর ঘাটে গিয়ে তাদের চোখ ছানাভরা। পুকুরের সমস্ত মাছ পানিতে ভেসে আছে। মৃত। আবুল কাশেমের বুঝতে বাকি রইল না যে, কেউ বিষ দিয়ে মাছ গুলোকে মেরে ফেলেছ। তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।
কে করতে পারে এই কাজ তাও তিনি বুঝতে পারলেন। কিন্তু হাতে-নাতে না ধরতে পারলে তো কাউকে দোষ দেয়া যায় না। আবুল কাশেম কাউকে দোষ দিলেন না।মনে মনে স্রষ্টার কাছে নালিশ জানালেন।অসম্ভব শক্ত এই লোকটার নার্ভ। কোনোরকম উচ্চ বাচ্য করলেন না।কুসুমকেও চেঁচামেচি করতে দিলেন না। সেদিন তাদের আর গোসল করা হলো না।এখনি সমস্ত মাছ তুলে ফেলে দিতে হবে। তা না হলে পানি দূষিত হয়ে যাবে।

চার
পাচলী পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। খুব বড় নয়। আবার একেবারে ছোটও নয়।মাঝারি।
আবুল কাশেম আনসারী এই স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছেন। বারেক স্যার এবং রোমেনা আপার কথা মনে হলে এখনও তার দুচোখের কোণ ভিজে উঠে। এই মাঠেই আয়োজন করা হয়েছে আজকের অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ সভা।আয়োজক আবুল কাশেম আনসারী নিজেই। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের “একটি বাড়ি একটি খামার” প্রকল্পের সফল প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, তিনি এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সাড়া গ্রামে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। তার খামারে বেশ কয়েকজনের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা হয়েছে।এতে করে নিজের আয় উপার্জনের পাশাপাশি অন্যরাও উপকৃত হচ্ছেন।


সাড়া গ্রাম জুড়ে আজ উৎসবের আমেজ। আবুল কাশেম আজ একটি দৃষ্টান্ত। একজন গণ-মানুষের প্রতিনিধি। সকলের মুখে মুখে তার নাম। গ্রামের প্রায় সকলেই সভায় উপস্থিত হয়েছেন।ছেলে, বুড়ো, কিশোর, যুবা কেউ বাদ যায়নি। এমন কি বেশ ক’জন নারী উদ্যাক্তাও এসেছেন। স্কুলের প্রাঙ্গণটি লোকে লোকারণ্য। যেন তিল ধারণের ঠাই নেই। আবুল কাশেম সকলের মধ্যমণি। এখনি সভার কাজ আরম্ভ হবে। আবুল কাশেম সভায় উপ্সথিত সকলকে একটি বাড়ি এবং একটি খামার প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিবেন। সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। আবুল কাশেম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। পুরো মাঠে শত শত লোক দেখে গর্ব এবং অহংকারে গ্রামের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার চোখ ভিজে উঠলো।তিনি কি পারবেন গ্রামবাসীর এই অন্ত্যহীন ভালোবাসার প্রতিদান দিতে? এই প্রশ্নটিই ঘুরে ফিরে তার মনের মাঝে ঘুরপাক খেতে লাগলো। সহসাই তাঁর ভাবান্তর ঘটলো। তিনি উপস্থিত সকলের সামনে আকাশের দিকে মুখ তুলে খানিক ক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, সেই সাথে মহান স্রষ্টার দরবারে কৃতজ্ঞতা জানালেন এবং তাঁর কাছে শক্তি, সাহস ও ক্ষমা ভিক্ষা চাইলেন। অতঃপর
সভায় উপস্থিত সকলের প্রতি শ্রেনিমত সালাম ও আদাব জানিয়ে তিনি কথা শুরু করলেন।

আমি কোনো রাজনীতিবিদ নই।আপনাদের চেয়ারম্যান কিংবা মেম্বারও নই। নামী-দামী কোন ব্যক্তিও নই। তবুও আজ আপনারা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সকলেই একত্রিত হয়েছেন, এই জন্য আমি আপনাদের সকলের কাছে চির ঋণী হয়ে থাকলাম। আপনারা সকলে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ গ্রহণ করুন। উপ্সথিত সকলেই করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দিত করলেন। এমন সময় সভাস্থলের পূর্বদিকে কিছুটা শোরগোল শোনা গেলো। তিনি সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন। তাঁর চাচাত ভাই রাসেলসহ আরও কয়েকজন বখাটে তরুণ জটলা সৃষ্টি করছে।
রাসেল আবুল কাশেমের প্রায় সমবয়সী। অল্প কয়েকদিনের ছোট হবে। তবে সে তা স্বীকার করে না।বড় ভাই হিসাবে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকুও দেন না। বরং তাকে কিভাবে হেনস্তা করা যায়, সে চিন্তায় মশগুল থাকে। সেই রাসেল এবং তার সহযোগীরা অহেতুক সমস্যা করতে চাইছে। প্রথম নজরেই তিনি সব বুঝতে পারলেন। গ্রামের মুরুব্বী এবং অন্যান্য তরুণ সবাই তাদের উপর ক্ষেপে গেছে। আবুল কাশেম অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সবাইকে থামিয়ে দিলেন। তারপর রাসেলসহ অন্যদের দিকে তাকিয়ে শান্ত এবং ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
তোমাদের কারো কিছু বলার আছে? রাসেলের সাঙ্গপাঙ্গরা কেউ কথা বললো না। কেবল রাসেল ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসতে লাগলো। তার মুখে কোন ভয় নেই। কোনো ডর নেই। রাসেলের কালো কুচকুচে মুখটা রাগে আরও কালো দেখাচ্ছে। সে মুখে প্রতিহিংসার আগুন যেন ঠিকরে পড়ছে। আবুল কাশেম শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো, রাসেল কিছু বলতে চাও?
এই কথা শুনে রাসেলের হৃদয় যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললো, অবশ্যই বলতে চাই। তবে এখানে কিছুই বলবো না আমি। তুই নেতা হইবার চাস! তোরে, তোরে দেইখ্যা নিব। এই তোরা সবাই চলে আয়---- ইত্যাদি ইত্যাদি । বলতে বলতে তারা কয়েকজন হনহন করতে করতে সভাস্থল ত্যাগ করলো। গ্রামের অন্যান্য তরুণেরা প্রতিবাদ করতে চাইলো। আবুল কাশেম তাদের থামিয়ে দিলেন। সবাইকে শান্ত হয়ে বসার অনুরোধ করলেন। তারপর সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনারা কিছু মনে করবেন না। সকল ভালো কাজেই বাধা আসে। তবে আপনারা যদি আমার সাথে থাকেন, এই সব বাধা বিপত্তিকে আমি ভয় পাই না। আপনাদেরকে সাথে নিয়েই আমি আমাদের গ্রামকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আপনারা কি আমার সাথে আছেন?

উপস্থিত সকলেই করতালি দিয়ে তাদের সম্মতির কথা জানিয়ে দিলেন। তারপর আবুল কাশেম সকলকে প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে বললেন। সকলেই অধীর আগ্রহে শ্রবণ করলেন। সবশেষে তিনি বললেন, তাহলে আপনারা আজ থেকেই, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খামারের কাজ শুরু করে দেন। যে কোনো সমস্যায় অবশ্যই আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি আপনাদের সকলের জন্য সরকারের কাছ থেকে বিধি মোতাবেক ঋণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবো। যাদের একেবারেই আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদেরকে আমি আমার সাধ্য মতো সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।। এই কথা বলার সাথে সাথে মুহুর্মুহু করতালিতে আকাশ বাতাস কম্পিত হলো।। এরপর তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার কাজ শেষ করলেন।

পাঁচ
তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আশেপাশের কয়েকটি মসজিদ থেকে একযোগে ভেসে আসছে আযানের সুমধুর সুর। আবুল কাশেম হেঁটে যাচ্ছেন মসজিদ অভিমুখে। তাঁর সাথে আছেন গ্রামের আরও কয়েকজন উদ্যমী তরুণ। তাদের সবার চোখে মুখে স্বপ্ন। সে স্বপ্নকে তারা আবুল কাশেমের হাত ধরে বাস্তবে রূপায়িত করতে চান। এদের একজন হলো, সুজন। শিক্ষিত বেকার।সমাজকর্মে অনার্স মাস্টার্স পাস। অনেক চেষ্টা করেও কোনো একটি চাকুরী লাভ করতে পারেননি। এখন আর সরকারী চাকুরীর বয়স নেই। এই আবছায়া সন্ধ্যার মতোই তার জীবনেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিলো। এখন আবুল কাশেম তাকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন সরকারী চাকুরীই একমাত্র সুখের চাবিকাঠি নয়। সরকারী চাকুরী না করেও ভালোভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব।

তারা চুপচাপ হাঁটছিলেন। আবুল কাশেমের মনে রাজ্যের ভাবনা। একদিকে আজকের সফল মিটিং। অন্যদিকে রাসেলের অভাবিত আচরণ। সুজনই প্রথম মুখ খুললেন, কাশেম ভাই রাসেলের আচার আচরণ আমার কাছে ভালো ঠেকছে না। ও খুবই খারাপ ছেলে।
আমিও সে কথাই ভাবছিলাম সুজন ভাই। কি করা যায় বলুন তো?
আপনাকে কিছুদিন সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। ও করতে পারে না এহেন কাজ নেই।
ঠিকই বলেছেন সুজন ভাই। আমারই তো চাচাত ভাই। আমি ওদের নাড়ী-নক্ষত্র সব জানি। ওদের সাথে আমার সম্পত্তি নিয়েও একটা ঝামেলা চলছে।
তাই নাকি? এটা তো জানতাম না। তাহলে তো আপনাকে আরও অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।
পুলিশে জানিয়ে রাখবো নাকি?
তা জানিয়ে রাখা যায়।
আমার মনে হয়, পুলিশে জানালে ওরা আরও বেশি ক্ষেপে যেতে পারে-----বলল সুজনের বন্ধু নাসির।
তাও অবশ্য ঠিক। সুজন বলল।
ইতোমধ্যে তারা মসজিদের সামনে এসে পড়েছেন। এ নিয়ে আর কোনো কথা হলো না। নামাজ শেষে যে যার মতো নিজ নিজ বাড়ির পথ ধরলেন। কেবল সুজন আবুল কাশেমের সাথে ধীরে ধীরে হাঁটছেন। দু’জনের মুখই ভারাক্রান্ত। কিছুক্ষণ পরে আবুল কাশেম বললেন, আপনাকে আর আসতে হবে না সুজন ভাই। আমি একাই চলে যেতে পারবো।
না, আমি আরেকটু যাই।
থাক ভাই। আর দরকার নেই। আমি যেতে পারবো।
আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে আমি যাই। আপনি কিন্তু সাবধানে যাবেন।
ঠিক আছে। আপনিও সাবধানে যাবেন।

আবুল কাশেম আপন মনে হেঁটে যাচ্ছেন। পরিষ্কার আকাশ। কোনো মেঘ নেই। কয়েকটি তারা মিটমিট করছে। এখনও চাঁদ উঠেনি। হয়ত আর কিছুক্ষণ পরেই চাঁদ উঠবে। স্নিগ্ধ আলোয় ভরে উঠবে রনিয়া। এই রনিয়া যে আবুল কাশেমের মায়ের মতো। সমস্ত সুখ দুঃখের সাথী।এই রনিয়ার পূর্ব পাশেই তাদের গ্রাম। তাদের বাড়ি যাওয়ার পথেই আম্বিয়াদের বাড়ি। নিশ্চয় আম্বিয়া এখন তাদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। হয়ত আনমনে তার কথাই ভাবছে। তাকে ঘিরেই সুখের কল্পচিত্র আঁকছে। একটা অভাবিত সুখের আবেশ আবুল কাশেমের
সারা মন চষে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই তার নিজের অজান্তেই একটি দীর্ঘশ্বাস বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে গেলো।

ছয়
বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই হুলস্থূল কাণ্ড। আবুল কাশেমের মা জমিলা বেগম কাঁদছেন।আর কুসুম তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। আবুল কাশেম কিছুই বুঝতে পারছেন না। মায়ের পাশে আস্তে আস্তে বসলেন। মায়ের একটি হাত হাতে নিয়ে বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে মা? কাঁদছেন কেনো?
জমিলা বেগম কিছুই বললেন না। আগের মতোই কাঁদতে লাগলেন। আর কুসুম একবার মামার মুখের দিকে তাকায়। আরেকবার তার নানীর মুখের দিকে তাকায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সেও হতভম্ব হয়ে গেছে। আবুল কাশেম এবার কুসুমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে রে কুসুম? মা কাঁদছেন কেনো?
কুসুম বললো, তুমি আসার কিছুক্ষণ আগে রাসেল মামা এবং আরও কয়েকটি ছেলে এসেছিলো। তুমি নাকি তাদের নামে থানায় মামলা করবা, সেই জন্য নানীকে শাসিয়ে গেছে। অনেক অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। তোমাকে তারা দেখে নেবে বলে গেছে। এই জন্য নানী কান্নাকাটি করছেন।

আবুল কাশেমের মাথায় বাজ পড়লো। পুলিশে জানানোর বিষয়টি তো আজই মিটিং এরপরে কয়েকজনের সাথে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে তো আর কেউ কিছু জানে না। এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে এই কথা তাদের কাছে পৌঁছলো! কী আশ্চর্য এই দুনিয়া! নিশ্চয় ওখানকার কেউ মোবাইলে তাদের সাথে সাথেই জানিয়ে দিয়েছে।কী জঘন্য! আবুল কাশেম আর ভাবতে পারলেন না। অনেক কষ্টে মাকে সান্ত্বনা দিলেন। কিছুক্ষণ পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর কুসুম এসে মামার পাশে বসলো। আবুল কাশেম তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
কিছু বলবি কুসুম?
জী মামা।
তাহলে বলে ফেল।
কুসুম আস্তে আস্তে আবুল কাশেমের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো, মামা আম্বিয়া এসেছিলো।
আবুল কাশেম মনে মনে চমকে উঠলেন, কিন্তু মুখের ভাষা কুসুমকে পড়তে দিলেন না। মুখে বললেন, আম্বিয়া এসেছিলো তাতে আমার কী হয়েছে রে কুসুম?
সত্যি মামা, তোমার কিছু হয়নি?
এতে আবার সত্যি-মিথ্যার কি আছে রে? সেও এই গ্রামের মেয়েই মেয়ে। আসতে তো পারেই!
আচ্ছা মামা, আমাকে ছুঁয়ে বলতো তুমি খুশি হওনি?
এইবার আবুল কাশেম বিপদে পড়লেন। কুসুমকে ছুঁয়ে মিথ্যে বলা যে তার পক্ষে অসম্ভব। তারপর এক মুহূর্ত ভেবে বললো, ঠিক আছে রে পাগলী; ধরে নে খুশি হয়েছি।
এইবার কুসুম হা হা হা করে---- হেসে উঠলো। হেসেই একটি ভোঁ দৌড় দিতে চাইলো। আবুল কাশেম তার হাত টেনে ধরে বললেন, কেনো এসেছিলো কিছু বলেছে?
এবার কুসুম গম্ভীর কণ্ঠে বললো, তেমন কিছু বলেনি। তবে তোমাকে একটি খাম দিয়ে গেছে।
কোথায় এটা?
তোমার বালিশের কাভারের ভেতরে রেখেছি।
তোর দেখছি অনেক বুদ্ধি হয়েছে রে কুসুম। ঠিক আছে তুই এখন পড়তে বস। আমি একটু রেস্ট নিই।এই বলে আবুল কাশেম তার নিজ রুমের দিকে হাঁটা দিলো। যেতে যেতে একবার পেছনে মুখ ফিরিয়ে দেখলো কুসুম দুষ্টুমির হাসি হাসছে। আবুল কাশেম আর কিছুই বললেন না। রুমে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

তাঁর মনের ভেতরে কালবৈশাখীর ঝড়। কী আছে ঐ খামের ভেতর? সে যা ভাবছে তাই? নাকি অন্যকিছু? তার আর তঁর সইছে না। তাড়াতাড়ি বালিশের কাভারের ভেতর থেকে খামটি বের করে আনলেন। দু’পাশে আঁটা দিয়ে শক্ত করে লাগানো।তিনি একবার এপাশ-ওপাশ দেখে তারপর একটানে ছিঁড়ে ফেললেন খামের এক প্রান্ত। ভেতর থেকে বের হয়ে আসলো একটি ফুলস্ক্যাপ সাদা কাগজ। এর মাঝখানে হৃদয় আকৃতির একটি পানপাতা সুন্দর করে আঁকা। তার নিচে ইংরেজিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা I Love u . বেশ এতোটুকুই। আর কোনো লেখা নেই। আর কোনো ছবিও নেই। আবুল কাশেম যা ভাবছিলেন তাই হলো। তিনি চিঠিটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ভাবনার সাগরে ডুব দিলেন। এতো বছর পরে আম্বিয়া তার বুকে সযত্নে লুকিয়ে রাখা সোনার সিন্ধুকের দরজা খুলে দিলো। সেদিন সাড়া রাত তিনি দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি!! চোখ বুজলেই আম্বিয়া এসে হাজির হয়। বলে, I Love u. I love u -----------..

সাত
দুই দিন পর শেষ রাতের দিকে একটি দুঃস্বপ্ন দেখে কুসুমের ঘুম ভাঙলো। সে মামা মামা বলে চিৎকার করতে লাগলো। জমিলা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, কিরে কুসুম কি হয়েছে? দুঃস্বপ্ন দেখেছিস?
হ নানী। দেখলাম, বলে একটি ঢুক গিললো।তারপর বলল, মামার খুব বিপদ। মামাকে যেন কারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে।চল নানী একটু মামার ঘরে যাই।
তুই যে সেদিন রাসেল আসার পর থেকে এই চিন্তাই করছিস; সেজন্যই মনে হয় এমন দুঃস্বপ্ন দেখেছিস। এখন কাশেম ঘুমিয়ে আছে। তুইও ঘুমিয়ে থাক।
তুমি কিভাবে বুঝলে মামা ঘুমিয়ে আছে?
আমি কিছুক্ষণ আগে তোর মামাকে দেখে এসেছি। ঘুমাচ্ছে। কুসুম আর কথা বললো না।চোখ বন্ধ করলো। জমিলা খাতুন পরম স্নেহে কুসুমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

সেদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে আবুল কাশেমকে তার ঘরে পাওয়া গেলো না। সবাই ভাবলেন কোথাও হয়ত বেড়াতে গেছেন। তারপর সকাল গেলো, দুপুর গেলো, বিকেল গেলো, সন্ধ্যা গেলো, রাত গেলো আবুল কাশেম ফিরে এলেন না। ইতোমধ্যে খবরটি সাড়া গ্রামে রটে গেছে। আবুল কাশেমের বাড়িতে শতো শতো লোকের ভিড়। সেখানে এক ধরণের মাতম চলছে। জমিলা বেগমের সংজ্ঞা নেই। আর কুসুম যেনো নির্বাক পুতুল। একটি কথাও বলে না। কাঁদেও না।

পরের দিন গ্রামবাসির অনেক খোঁজাখুঁজির পর আবুল কাশেমের লাশ রনিয়া বিলের একটি গভীর খাদের মধ্যে
পাওয়া গেলো। তার বুক পকেটে ছিলো আম্বিয়ার দেওয়া সেই চিঠি।আরও একটি কাগজ তার পকেটে পাওয়া গেলো,তা হলো কুসুমের বার্ষিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র। কে জানতো এতোগুলো স্বপ্নের এমন নির্মম অপমৃত্যু হবে? সাড়া গ্রামবাসীর স্বপ্ন, জমিলা বেগমের স্বপ্ন, আম্বিয়ার স্বপ্ন, কুসুমের স্বপ্ন --- সব স্বপ্ন একসাথে রনিয়া বিলে সমাধি লাভ করলো।।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement