লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ মে ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৫৮টি

সমন্বিত স্কোর

৬.১১

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৫৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমুক্তিযোদ্ধা (ডিসেম্বর ২০১২)

দেয়ালের চারপাশে
মুক্তিযোদ্ধা

সংখ্যা

মোট ভোট ৫৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.১১

পন্ডিত মাহী

comment ৩৪  favorite ৪  import_contacts ১,৭১৭
এক
লাল মাটির বড় রাস্তাটা ডানে মোড় নিয়েই চলে গেছে অনেক দূর। মোড় ঘেঁসেই খেলার মাঠ। আর আমাদের স্কুল। নলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আশরাফ আর আমি ঐ স্কুলেই পড়েছি। সে কথা মনে হতেই বুকের মাঝে জলের কল্লোল ছুটে যায়। কি এক ভালো লাগার অনুরণন ভাসিয়ে নিতে চায়। স্কুলের পুকুর পাড়ে দুটো বিশাল বটগাছ আর সেখানে কত পাখির বাসা। মোটা মোটা শেকড় ছড়িয়ে কত আগে থেকে গাছ দুটো দাঁড়িয়ে আছে কেউ বলতে পারে না। গাছ দুটোকে নিয়ে কত কেচ্ছা কাহিনী। সবাই বলতো গাছ দুটোতে নাকি অনেক লম্বা লম্বা জ্বীন বাস করে। দিনের বেলায় অবশ্য তেমন কিছু মনে হয় না। গ্রামের বাচ্চা গুলোর অবশ্য জ্বীন-ভূতের বালাই ছিলো না কোনদিন। সারাদিন ওদের দেখছি গাছ বেয়ে উঠে বসে থাকে। মোট মোটা ডাল বেয়ে ওপরে উঠে দাপ-দুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুকুরে। কেউ কেউ অন্য পাড়া থেকে চুরি করা আম এনে গাছের উপর বসে খায়। আমি আর আশরাফ ওদের মাঝেই মানিক জোড় ছিলাম। গাছের জ্বীনের পাশাপাশি আমাদেরও বাস ছিলো ঐ বটগাছে।
আশরাফ ছিলো দুরন্ত আর ডানপিটে। পড়ালেখা নিয়ে কোন ভাবনা নেই। সারাদিন ছটফট করতো। কোথায় কার বাড়িতে কোন জিনিসটা ভালো আর তা কত সহজে চুরি করা যায়, সেটা ওর থেকে ভালো আর কেউ জানতো না। মাঝে মাঝেই ও তাই বুক ভুলিয়ে বলতো, “আমি বড় হয়ে মস্ত বড় চোর হবো”।
আমরা যারা ওর সাগরেদ ছিলাম, সবাই একবাক্যে স্বীকার করতাম, সেটা ও পারবে। মাঝে মাঝেই ও যখন পাগলী বাড়ির পাকা আম চুরি করে আনতো, আমরা হা করে থাকতাম। হিংসেও হতো। আমরা তো ওদিকে ভুলেও পা মাড়াতাম না। আশরাফ কিন্তু দিব্যি চলে যেতো। শুধু একটা জায়গায় ও কখনো যায়নি, গ্রামের মেম্বার বাড়ী। ও বাড়ীর ভেতর হরেক রকম ফলের গাছে বোঝাই। আশরাফ বলতো ওখানে নাকি আপেল আর কমলার গাছও আছে। আমাদের জিভে জল আসতো। কিন্তু দুই মানুষ সমান পাচিল টপকে আমরা কেউ যেতে সাহস পেতাম না। তাই সে কমলা আর আপেল কোনদিন খাওয়া হয়নি। তবে আশরাফ যে একদিন না একদিন সেগুলো নিয়ে আসবে সে আর বলার বাকি রাখে। আমাদের এমনি বিশ্বাস ছিলো।

আমাদের এমন মধুর দিন গুলো আরো মধুর হতে পারতো। অনেক দস্যিপনা করা যেতো। সবুজ ঘাসে দিনভর ফুটবল আর ডাঙ্গুলি খেলা, পুকুরে ঝাঁপিয়ে গোছল কিংবা দূর বিলে দল বেধে মাছ ধরতে যাওয়া। কিন্তু সেগুলো আর বেশী দিন করা গেলো না। আমরা যে দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলাম। আমার বাবার বেশ জমি-জমা ছিলো। তাই পরা-লেখা করতে কোন সমস্যা হয়নি। এক এক ধাপ করে কলেজে উঠে গেলাম। আশরাফ অবশ্য অত দূর যেতে পারেনি। মেট্রিকের পর ওর বাবা মারা যাওয়াতে সংসারের ভার ওর উপর এসে পরে। তাই সাদামাটা জীবনে ও আর দশজনের মতই একজন চাষা হয়ে গেলো। শুদ্ধ ভাষায় কৃষক। আরেকটা পরিচয় আমার কাছ থেকে কখনো মুছে যায়নি, আমার বন্ধু আশরাফ।

বর্ষাকালে দিনের আলো দিন থাকতেই কমে আসে কোন কোন দিন। ছোপ ছোপ আলো আর অন্ধকার মিলেমিশে আড়ালে আড়ালে ঘোরাফেরা করে। সুযোগ পেলেই জাঁকিয়ে বসে। আকাশে জমাট ঘন মেঘ মুখ গোমড়া করে জমতে থাকে। ফোঁটা ফোটা বৃষ্টি ভেজানোর আনন্দে ভেঙ্গে পড়তে চায় মর্তে। দূর মাঠে আশরাফ ওর পাকা ধানের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তখন। সবাই ছুটে চলে যায় আশ্রয়ের খোঁজে। আশরাফ শুধু হা করে চায় আকাশের দিকে। প্রথম প্রথম যে কেউ দেখলে ভাববে ছেলেমানুষি। বাচ্চারা যেমন হা করে বৃষ্টির ফোঁটা চেখে দেখে, সেরকম করছে বোধহয়। আমি জানি, আশরাফ তা করে না। পরম মমতায় বোনা ফসলের খেতে নতুন ফসল এসেছে। বৃষ্টিতে তা নষ্ট হবে সেটা ভাবাই যায় না। আশরাফ জোর হাত চালায়, পাশের কামলাদের হাঁক দেয়। সবাই মিলে ফসল তোলে। ওর সবুজ খেতের সোনার ফসল।
কোন কোন দিন বৃষ্টির মাঝে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেই ও হাঁক দেয়। আমার পরনে কলেজ ফেরত সাদা শার্ট আর নেভী ব্লু প্যান্ট। হাতে পলিথিনে মোড়া বই। আশরাফ সেখানে নিতান্তই সাধারণ। কাদা লাগা লুঙ্গি কাছা মারা, কুচকুচে কালো শরীরে ছাই রঙ্গা আকাশের বিবর্ণ বৃষ্টি ফোঁটা ফোঁটায় পড়েই পিছলে যায়। ও হাসে। লাজুক চোরা হাসি ঠোঁটের কোনায়-
“দোস্ত কেমন আছস? কলেজ থেইকা আইলি?”
আমি মাথা নাড়ি। ছেলেবেলার আম চোরের মতই কেমন করে যেন ও সব কিছু চুরি করে বুঝে নিয়েছে জীবনের। কখনো বিবর্ণ বৃষ্টির হাত থেকে ফসল, কখনো কষ্টের মাঝে থেকে অনাবিল হাসি। ওকে আসলেই মস্ত বড় চোর বলা যায়। আমি মনে মনে ভেবে অবাক হতাম, হিংসেও করতাম।

দুই
বছর দুই পরে। আমি তখনো কলেজে। পাশ করতে পারি নাই। সে বছর খুব শীত পরেছে। গাছে গাছে সবুজ পাতারা কুঁকড়ে থাকে। পাতার আড়ালে, ডালে ডালে দুধ সাদা কুয়াশা খেলে বেড়ায়। সারি সারি খেজুর গাছে রসের হাড়ি তোলা হয়। সেখানে কে যেন তার অনেক দিনের জমানো সুধা ঢেলে দেয়। রাতের বেলা শীতের প্রকোপ একটু বেশী। শীতের বুড়ী যেন ঘরে এসে আশ্রয় নেয়। হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি ঠেকানো যায় না কোনভাবেই। এমনি এক রাতে আমি ঘরের মাঝে টেবিলে বসে পড়ছিলাম। হারিকেনের আলোয় বইয়ের পাতার কপিলা আর কুবেরের গোপন কথা, বুক কাঁপানো চাহনি চোখের সামনে দুলতে থাকে। মনে মনে কুবেরের জায়গায় নিজেকে খুঁজি। গোপন প্রেম অভিসারে এতটাই মগ্ন হয়ে ছিলাম, দরজার শিকল নাড়ার শব্দ কান পর্যন্ত আসেনি। দরজায় খট খট শব্দ হচ্ছেই। এই শীতের মধ্যে কে এত সাধ করে বেড়িয়েছে! দরজা খুলতেই চাদরে মোড়া মুখ দেখে অবাক হই। আশরাফ ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢোকে।
“তুই! এই শীতে বেড় হয়েছিস! মরবি তো...”
আশরাফ টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ারে ধপ করে বসে। হারিকেনের পাশে দু’হাত নিয়ে ওম নেয়। বেজায় কষ্ট পাচ্ছে বেচারা।
“দোস্ত, কাইল তোর কলেজ আছে”
একটু জিরিয়ে মুখ খোলে ও।
“আছে”
আশরাফ শুনে মনে হয়ে হতাশ হয়। আমার মুখ থেকে না আসা করছিলো কেন বুঝলাম না। তাই অস্ফুট স্বরে বললাম, “ক্যান”
“না। থাক তাইলে”
“থাকবো ক্যান। কি হইছে আমারে ক”
“না মানে” ও ইতস্তত করে “পুব পাড়ার হাশেমরে তো চিনস?”
“হও”
“ওর ছোট বোনডারে খুব মনে ধরছে। জোবেদা খালারে দিয়ে হাশেমের কাছে কওয়াইছি। ওরা রাজি। এহন কথাবার্তা কওন দরকার। তুই যাবি?”
“ওরে হুমুন্দির পুত! যামু না মানে, একশবার যামু।”
“সত্য কস”
“হও সত্য”

সেই শীতে আশরাফ আর পুব পাড়ার হাশেমের বোন রেণুর সাথে বিয়ে হয়ে গেলো। রেণুর অনেক গুন। আর সেই সব গুনে আশরাফ মুগ্ধ হয়ে থাকে। আমাকে মাঝে মাঝেই ওদের বাড়ি যেতে হয়, আশরাফ টেনে নিয়ে যায়। রেণুর হাতে নতুন চালের পিঠা না হয় ক্ষীর, যেটাই হোক দারুণ লাগে। প্রথম প্রথম যেতে যে একেবারেই অস্বস্তি লাগতো না, তা নয়। ওইটুকু মেয়ের সামনে দাড়াতেই বুক কাঁপতো। আশরাফ হাসতো। পরে অভ্যাস হয়ে গেছে।
ওর বিয়ের পর ইচ্ছে করলেই তাই ওর বাড়িতে গিয়ে বসে থাকা যায় না, পারতামও না। এদিকে আমার বাড়িতে খুব একটা মন বসে না। সৎ-মায়ের ঘরে কত ভালো থাকা যায়। বাপটা সারাদিন জমি-জমা নিয়ে থাকে। মা সারাদিন কোন না কোন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিৎকার করতেই থাকে। ছোট, আমার সৎ ভাই, তাকে কখনো বাড়িতে পাওয়া যায় না। পড়া-লেখা লাটে তুলে সারাদিন সে রাস্তায় গুলি খেলে বেড়ায়। আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। বছর ঘুরে বছর আসে। সবার কপালে জুটলেও আমার কপালে কাপড় জোটে না। ছোটর পায়ে নতুন জুতো, ঘসে মেঝে যত্ন করে রাখে। আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করি মুচির হাতের কাজ কত নিখুঁত আছে, কতদিন থাকবে। আমি নাকি হাড়-গোড় খেতে পছন্দ করি। খাবারের বেলায় আমার পাতে তাই গোশত জোটে না। গোছানো সংসারে আমি ছিলাম অগোছালো আসবাব। বাড়িতে আমার মন টেকে না। ঘরে-বাইরে যে অশান্তি আর অশান্ত রাজনীতির কথা শুনি, এই চার পেটের সংসারেও তা কম ছিল না। ভালো করে কিছু চাইতে পারি নাই কারো কাছে। আমার আসল মা থাকলে হয়তো পারতাম, শিখে নিতাম। ছিনিয়ে নেবার কথা মনে আসলে রক্তের কথা ভেবে চুপ করে থাকতাম। কিন্তু কেউ কি বুঝবে না আমি কি চাই, কি চেয়েছি? ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার কথা শুনি। ঘরে কি দুর্গ গড়ে তুলবো, শেখানেই তো চলে শোষণের কারসাজি। সব ছেড়ে-ছুড়ে তাই পালাতে ইচ্ছে করতো।


তিন
শীত পেরিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। বসন্তও যায় যায়। জেগে ওঠা পাতার ফাঁক দিয়ে সোনালী আলো এসে পড়ে সবুজ ঘাসে। মাঠে মাঠে ফসলের ঘ্রাণ। নীলাভ আকাশে ছোপ ছোপ মেঘ গুলো পেঁজা তুলোর মত ঝুলে থাকে। সব কিছুতেই একটা মন ভালো করে দেওয়া দাওয়াই আছে। তবু ঘরে-বাইরে চৈত্রের উত্তাপ। খবর আসে শহরে শহরে উত্তাল টাল-মাতাল অবস্থা। গ্রাম বাদ যায় কি করে। শহরের সেই আগুনের তাপ গ্রামে এসে আছড়ে পরে। মনের মাঝে গিয়ে তীরের মত বেঁধে। মাঝে মাঝে রাস্তায় থেকে ঘুরে আসতাম। কলেজ ততদিনে পুরোপুরি বন্ধ। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের তেমন দেখা পাওয়া যেতো না। দোকান-পাট বন্ধ। যে দু’একটা চায়ের দোকান খোলা থাকে, সেগুলোতে মানুষ গিজ গিজ করে। সবাই কান পেতে রেডিওতে খবর শোনে।
মার্চের সেই উত্তাল দিন গুলোতে আমার পরীক্ষা নিয়ে ভাবার কথা ছিলো। হঠাৎ করেই যেনও সময়টা পালটে গেলো। রাস্তায় রাস্তায় মিছিল বের হতো প্রতিদিন। যত যাই এর আগে এরকম হয় নাই কিন্তু সব একসাথে স্থবির হয়ে গেলো।
মার্চের তিন তারিখ হঠাৎ কারফিউ শুরু হলো। তবু যারা মিটিং মিছিল করতো তারা রাস্তা ছাড়ল না। শহরের সেই সাইরেনের শব্দ যেনও গ্রামে এসেও পৌছায়, মনে মনে সে শব্দে আমি চমকে উঠতাম। বিকেল হলেই পাড়ার দোকানে গিয়ে রেডিওতে কান পেতে শোনার চেষ্টা করতাম। ঢাকা তখন উত্তাল, সব রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দল মিটিং করছে, নানা কর্মসূচী দিচ্ছে।
সেদিন সন্ধ্যের দিকে শুনি, কারফিউ ভেঙ্গে যারা মিছিল করেছে, তাদের উপর গুলি করা হয়েছে। অনেক লোক মারা গেছে। আমার কেন জানি নিজের ভেতর মনে হতো, শুধু দেশটা না, আমার পরিচিত জগতটাই ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। মাঝখান থেকে মিছিলের স্লোগান, মার্চের মুজিবের ভাষণ ভাঙ্গা টুকরো গুলোয় ঢেউ তোলে। যুদ্ধ কি হবেই?
প্রশ্নের উত্তর পেতে দেরী হয়নি। সেদিন আশরাফ আর আমি একসাথেই ছিলাম। ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় তাণ্ডবলীলা হয়ে গেছে। রাতের আধারে আর্মি যাকে পেয়েছে তাকেই মেরেছে। আমার ভেতরটা তখন গুলিয়ে এলো। উত্তপ্ত রক্ত ভেতরে ভেতরে বলল, প্রতিশোধ চাই, প্রতিশোধ।

আমাদের গ্রামে অনেকদিন পর্যন্ত যুদ্ধের সরাসরি আঁচ এসে লাগেনি। তবে বুঝতে পারছিলাম সময় ঘনিয়ে এসেছে। শুনেছি পাক আর্মিরা নাকি যুব বয়সীদের ধরে ধরে মারছে। সে কথা শুনে আমার সৎ মাও ভয় পেয়ে গেলো। আমার বয়সী ছেলেরা সব পালিয়ে চলে গেছে। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর হয়ে সীমান্তে। আমাদের গ্রাম তখন প্রায় শূন্য। হিন্দুরা অনেক আগেই চলে গেছে। যারা যায়নি তারাও যাবো যাবো করছে। জলের দামে নিজের হাতে গড়া বসত-ভিটা ফেলে পাড়ি জমাচ্ছে সীমান্ত হয়ে কলকাতা। অনেকে বিক্রিও করতে পারেনি, শুধু সাথে নিয়ে গেছে চোখের জল। আমাদের বাড়ির পাশের নড়েন ডাক্তারও চলে গেছে। বুড়ো মানুষটা সীমান্ত পাড় হতে পেরেছিলো কিনা জানতে পারি নাই। তাদের ফেলে যাওয়া বসত-ভিটা বেশীদিন পরে থাকলো না। গ্রামের মেম্বার সদল-বলে দখল করে নিলো। মেম্বার শান্তি কমিটি বানিয়েছে। আমার আর আশরাফকে যোগ দিতে বলে গেছে। আশরাফকে বললাম, ‘কি করবি দোস্ত?”
এক মুহূর্ত না ভেবেই আশরাফ বলে, “নিজের ভাইরে মারতে পারুম না”
তাই একদিন আমরা চললাম। সেদিন মে মাসের এক দুই তারিখ হবে হয়তো। সময়টা বহু আগে থেকেই থমকে গেছে। সারারাত ঘুম হয়নি। কথা বলার মত অবস্থাও ছিলো না। আশরাফ আর আমি ওর বাড়ীর উঠোনে দাঁড়ানো। আবছা আলো ঘুম ভেঙ্গে উঠি উঠি করছে। ভোর হতে বেশী দেরী নেই। সফেদা গাছের চাপা অন্ধকারে জমাট কষ্ট গুলো থমকে দাঁড়ায় আমাদের সামনে। বুক পেতে নেবার জন্য শক্ত হতে পেরেছিলাম কিনা জানি না। রেণু তখন অন্তঃসত্ত্বা। রেণু আমাদের দু’জনের হাতে দুটো খাবারের পোটলা ধরিয়ে দেয়। চোখের জল সামলে আশরাফকে বলে,
“পথে খাইয়া নিও। আর পথে-ঘাটে সাবধানে যাইও”
বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আমি মুখ ফিরিয়ে নেই। আমার কাউকে কিছু বলার ছিলো না। চোখের জল দেখার পরীক্ষায় আমি বসতে চাইনি। পাশ করতে পারবো না!
আশরাফ আর আমি হেঁটে চলি। ঝোপ-ঝাড়ে তখনো ঘুট ঘুটে অন্ধকার কাজলের মত লেপটে থাকে। পিছনের দিকটা খুব দ্রুত পরিষ্কার হয়ে আসে। সেখানে অস্তিত্ব প্রকাশের ভয়। জোরে পা চালাই দু’জন। অনেক দূর পথ। তার বোধহয় শেষ নেই। চিন্তা করতে গেলে ভালো লাগতো না। ভেতরের রস-কষ শুকিয়ে সেখানে খটখটে হয়ে যায়। একটা অচেনা ভয় মনের মাঝে মরীচিকার মত দুলতে থাকে। একটা আতঙ্ক নিয়ে আমরা আধো আলো আর অন্ধকারে ছুটে চলি। ভয় ছিলো, ফিরে আসতে পারবো তো!


চার
ক্যাম্পে আমরা একসাথে কুড়ি-জন ছিলাম। প্রতিদিন ড্রিল, এ্যাটেনশান, ফরোয়ার্ড মার্চ, রাইট টার্ন, লেফট টার্ন, আরো কত কিছু। হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। এক একটা দিন বছরের চেয়েও বেশী মনে হতো। ততদিনে পাকা সৈনিক হয়ে গেলাম। আশরাফ মেশিনগান চালানো শিখেছে। আমার ছিলো রাইফেল আর গ্রেনেড চালানো মোটামুটি রপ্ত হয়েছে। ক্যাম্পের অত্যাচার সহ্য করে আমরা হয়ে উঠলাম ইস্পাতের মত কঠিন, নির্মম যোদ্ধা। এসবের মধ্যে আশরাফের সাথে বন্ধুত্ব যেনও আরো গাঢ় হলো, আগুনে পোড়ানো নিখাদ সোনার মত।
এক একটা মিশনে যেতাম। ফিরেও আসতাম। যাবার সময় ভাবি এইবার বুঝি ফিরবো না। শেষমেশ ফিরে আসি। আশরাফ হাসতো,
“দোস্ত, মরতে এত ভয়!”
আমি হেসে বলতাম, “মরলে তো বেঁচেই যেতাম। মরি না বলেই তো ভয়।”
বাড়ির কথা মনে পড়তো। বৃষ্টির দিনে যখন বাতাসের ঝাপটায় জানলা দিয়ে বৃষ্টি আসতো। মা খুব বকতো। তবু কত দাঁড়িয়ে থেকেছি। টিনের চালে ঝম ঝম শব্দের সে কি তাল। মাঝে মাঝে আম পড়তো। ছুটে যেতাম কুড়িয়ে আনতে। মা বারণ করতো,
“যাইস না খোকা। ভিইজা যাবি”
এ্যাকশনে গেলে মাঝে মাঝেই বৃষ্টিতে ভিজতাম। সেই আগের মত ঝড়ো বাতাসের বৃষ্টি। উথাল পাতাল বাতাস উড়িয়ে নিতে চায়। হাতে ধরা রাইফেল ঠক ঠক করে কাঁপে। তবু একচুল নড়ি নাই জায়গা থেকে। কোমর পর্যন্ত পানি জমে যায় আধ-শোয়া গর্তে। মা থাকলে কি খুব বকতো! জ্বর আসলে কি মা পাশে বসে মাথায় জলপট্টি দিত! জানি না। আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু দেখতাম বৃষ্টি পড়ছে। মাকে ডাকতাম, মা তুই কোথায়? মনে মনে মায়ের ডাক শুনতাম। মা বলে,
“নড়িস না খোকা, ওরা আসছে। ওদের ক্ষমা করিস না”
তাই আমার হাতের রাইফেল জ্বলে উঠতো। জান্তব পশুর মত কেঁপে কেঁপে এক একটা বুলেট ছুড়ে দেয়। আশরাফের মেশিন গান ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ করে ছুড়ে দেয় তপ্ত সিসার ঝাঁক। মা যে ওদের সবুজ জমিনে বিচার করতে বলে গেছে।

এ্যাকশান না থাকলে সময় পেলেই আশরাফ কাগজ যোগার করে রেণুকে চিঠি লিখতো। ঘর বাড়ির কথা জানতে চাইতো। গরুগুলোকে ঠিকমত খাবার দেওয়া হলো কিনা। উঠোনে কি ধান শুকানো হলো কিনা, আরো কত কি! আমি দু’একবার বাড়িতে লিখেছি। কিন্তু কোন জবাব পাইনি। আশরাফও মনে হয় শেষের দিকে উত্তর পায়নি। দেশের অবস্থা দিন দিন শুধু খারাপ হতে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কাউকে ধরে হয়তো চিঠি পাঠানো যেতো, কিন্তু তাও একসময় বন্ধ হয়ে গেলো। বুকের মাঝে আমাদের নিঃশ্বাস আটকে থাকে। বাড়ির কথা মনে পড়লেই চাপা দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেড়িয়ে আসতো। বাবা-মা, ছোট ওরা কি ভালো আছে? ওরা কি সীমান্তের দিকে যেতে চেয়েছে। যেতে পেরেছে তো?
প্রশ্ন গুলোর তখন কোন উত্তর নেই।
খুব বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করতো। আশরাফ মাঝে মাঝে বলতো, “যুদ্ধ শেষ হইলে কি করবি?”
আমি চুপ করে থাকতাম। মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যেতো।
আমি বলতাম, ‘যুদ্ধ কোনদিন শেষ হবে না”
আশরাফ হাল ছাড়তো না, “ধর যদি থাইমা যায়”
“জানি না কি করবো। মনের ভেতরের যুদ্ধটা কি থামবে। আবার কি আগের মতো সব ফিরে পাবো?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উলটো অকে জিজ্ঞেস করতাম, “তুই কি করবি?”
“বাড়ি গিয়ে চাষবাস শুরু করবো”
আমি মনে মনে তাই ভাবতাম। ও ভেতরে ভেতরে খুব চিন্তায় থাকে। বাড়িতে এক রেণু ছাড়া জমি-জমা দেখার কেউ নেই। গরু গুলোর কি অবস্থা কে জানে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। উঠোনের খড় গুলো এখনো তোলা হয়নি।
আমি বলতাম, “আমার কিছু করার নেই। হয়তো গিয়ে পরীক্ষা দিতে বসবো। কিংবা নতুন কিছু করবো। লোকে বলবে দেখো, আমাদের বীর সন্তান। জানি না ওসবে কি ভেতরের সব মেরামত হয়ে যাবে কিনা।”
হঠাৎ করে আমরা চুপ হয়ে যেতাম। যুদ্ধ আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। ঘর-বাড়ি, স্বপ্ন- ফিরে পাবো কিনা তখনো জানি না। আমরা যেন অল্পতেই বুড়িয়ে গেছি। যে মুহূর্তে জীবনে স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। সেই মুহূর্তেই টুকরো টুকরো হয়ে গেছে সব। যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব আমরা পাইনি।


পাঁচ
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়। চারিদিকে মরা গন্ধ, লাশের ছড়াছড়ি। টহলে বের হলেই দেখতাম রাস্তায় রাস্তায় শত শত মানুষ মরে পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে উলটে পালটে দেখতাম চেনা কেউ আছে কিনা। আমাদের ক্যাম্পে মাঝে মাঝেই খাবারের টান পড়ে। ঠিকমত খাবার না আসলে মন মেজাজ ঠিক থাকে না। এসব ভেবে নিজের কাছে অবাক লাগতো। এত মৃত্যু দেখি তবু ঠিকই খিদে পায়। খাবারের থালা নিয়ে লাইন দেই। এখানে বসে খাবার, ঘুম, আর হাতে ধরা রাইফেল ছাড়া আর কিছুর কথা ভাবতে পারি না। যুদ্ধ আমাদের পালটে দিয়েছে। আসলে যুদ্ধের প্রথম বোমাটা পড়ে ঠিক মনের মাঝে।
ক’দিন থেকেই মন খুব খারাপ। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করতো। খবর পেয়েছি বাবা-মা-ছোট আর নেই। সীমান্তে যাবার পথে ওরা গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে আছে। আশরাফের মনের অবস্থাও ভালো ছিলো না। গ্রামের মেম্বার রেণুকে... না মুখে আসে না সে কথা। মেয়েটা মরতে মরতে জন্ম দিয়ে যায় আশরাফের মেয়ে। পাশের বাড়ির দাইবুড়ি মেয়েকে নিয়ে লুকায়। রেণু নেই। আশরাফ তাই বাড়ি ফিরবে। একদিন পরেই একটা বড় এ্যাকশান, তারপরেই। ফেরার টিকিট আমিও পেয়েছিলাম। কমান্ডার ছুটি দেয়।

এ্যাকশানে এক একটি ঘণ্টা দুঃস্বপ্নের মত মনে হতো। আক্রমণ আর পালটা আক্রমণ। ধ্বংসের পর ধ্বংস। প্রতিবারই এক দুটো বা দশটা লাশ জমা হতো, আহত হতো। আহতদের কোনরকমে টেনে আনি। গেরিলা হামলাই আমাদের প্রধান অস্ত্র। প্রতিবারের মতই সেবারও। সেবার বেছে নেওয়া হয়েছে একটা স্কুল ঘরের পাকিস্তানি ক্যাম্প। অস্ত্রের চালান ঠিক সময়ে পৌঁছে যায়। যুদ্ধ করতে করতে আমাদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। তবু বেশ কিছু সৈনিক যোগার করে আমরা তৈরি। আশরাফ তার মেশিনগান দিয়ে শুরু করে। অন্যদিকে একজন মর্টারের গোলা ফেলছে ক্যাম্পে। একটু পরেই পালটা গুলি বর্ষণ শুরু হয়। আমরাও পালটা জবাব দেই। একটা দল গুলি ছুড়তে ছুড়তে আমাদের দিকে আসছিলো। মর্টারের গোলায় অর্ধেকটা উড়ে যায়। আমরা তখন আরেকটু এগোলাম। মর্টারের গোলা তখন আমাদের মাত্র শ’খানেক গজ সামনে। ছুটে ঐটুকু রাস্তা পার হতে হবে। তারপর গ্রেনেড হামলা। আমার পাশ দিয়ে দৌড়ে গেলো আশরাফ। হঠাৎ করেই থমকে গেলো ওর শরীর। যেন কেউ পেছন থেকে টেনে ধরেছে হঠাৎ। তারপর এক ঝাঁক বুলেট বুক পেতে নিয়ে দু’পা এগিয়ে দড়াম করে মাটিতে পড়লো। এক পলকে সব দেখা হয়ে গেলো। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম অন্যমনস্ক হয়ে। এক ঝাঁক বুলেট শিস কেটে চলে গেলো পাশ দিয়ে, তারপর আরো এক ঝাঁক। তপ্ত সিসার ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম। শরীরের সমস্ত শক্তি এক নিমেষে শেষ হয়ে গেলো। বুকের মধ্যে হাজারটা হাতুড়ির ঘা পড়ে, গলা শুকিয়ে যায়। ঠোঁট দুটো চেটে ভিজিয়ে নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। তারপর তলিয়ে গেলাম অতলে।


“তারপর কি হলো বাবা!”
রহমান চোখ তুলে তাকায়। পাঞ্জাবীর হাতায় চোখ মোছে। সামনে থাকা মেয়েটাকে এই আধো আধো সন্ধ্যায় পরীর মত লাগছে। কি মায়াবতী চেহারা। ঠিক যেনও মায়ের মত। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে জীবনে। রহমান বাইরে তাকিয়ে দেখে। আকাশে পাংশু মেঘ ছাই ছাই রঙ ধরে স্থির। ঝড় আসার পূর্বাভাস। কিন্তু টিভির খবরে তা বলা হয়নি। বারান্দায় ভেজা কাপড় উড়ছে। রহমান বিক্ষিপ্ত মনকে লাগাম দেবার চেষ্টা করে।
“তারপর যুদ্ধ থামে একদিন। আমি ফিরে আসি। সবাই যুদ্ধের কথা জিজ্ঞেস করে। কেমন করে যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধে আমার এক পা অকেজো হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে যুদ্ধ আমার সব কিছু ধ্বংস করে দেয়।“
“তুমি কি করলে এরপর?” মেয়েটা অবাক বোধ নিয়ে বাবার মুখ চেয়ে থাকে।
“গ্রামের ফিরে নিজের বাড়ি যাই। ঘুরে বেড়াই। একদিন স্কুলটার কাছে গিয়ে দেখি,মেম্বারের লাশ বটগাছে ঝুলে আছে। পঁচা গন্ধে বমি আসে। রেণুর কবরটা আশরাফের বাড়িতেই দেওয়া হয়েছে।”
রহমান বুকের মাঝে চেপে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা মুক্ত করে দেয়। বাইরে এখন উথাল পাথাল বাতাস। ধুলোর ঘূর্ণি পাক খাচ্ছে। বলার জন্য আবার ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় আনমনে।
“গ্রামের মানুষ মানতে চায়নি। ওরা বলতো, রেণুর মেয়েটা নাকি আশরাফের নয়। ওটা জারজ সন্তান। বুকের মাঝে ক্ষোভের ঢেউ দানা বাঁধে। ততদিনে বিয়ে করেছি। ঢাকা চলে আসলাম সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে।”
“আর ফিরে যাওনি?”
“নাহ! কেন যাবো? কে আছে? জমি-জমা দেখার লোক আছে। সেটা নিয়ে আর ভাবনা চিন্তা করতে ইচ্ছে হয়নি। তোর মা ঢাকায় আসার বছর দেড়েক পরেই চলে গেলো। ওর পেটের সন্তান সাথে নিয়েই চলে গেলো।”
“বাবা!”
রহমান চুপ করে থাকে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকায়। কি এক বিশ্রী অভ্যাস হয়েছে। শুধু চোখ চলে যায় দূরে। বুকের মাঝে বুদ বুদের মত কষ্ট উঠে আসে। চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে সব ঘোলাটে আর অস্বচ্ছ। ওদিকে বাতাস বেড়েছে। মরা গাছের পাতা, ছেড়া কাগজ এলোমেলো উড়ে যায়। ঝড় আসবে কি! আসুক না, এক চিলতে ঝড় এসে উড়িয়ে নিক। আজ মনের কষ্টকে ছুটি দিতে ইচ্ছে করছে।
“বাবা! আমি...”
মেয়েটা কাঁদছে। হাত বাড়িয়ে রহমান মেয়েটাকে মমতায় বুকের কাছে টেনে নেয়। খালি বুকটা ঐতো ভরে রেখেছে এতদিন। বুকের ভেতরে তপ্ত সিসার ঝাঁক একের পর এক আঘাত করে। আহারে, মেয়েটা এত কাঁদে কেন। কবে থেকে এমন ছিঁচকাঁদুনী হলো। ঠিক যেন ওর মায়ের মত। সময়ের মনে শরীরটা বুড়ো হয়ে গেছে। শোককে স্বীকার করে নিতে কষ্ট হয়। সেই অন্ধকার থেকে আলোতে আসতে একটা ভয় ভেতরটা কুঁকড়ে দেয় অজান্তে। কাঁপা হাতে রহমান টেবিলের ড্রয়ার খোলে। আড়ালে ঢেকে রাখা সত্যি আজ জানিয়ে দেওয়াই ভালো। বুকের ভেতর লক্ষ লক্ষ পাথরের চাপ তাহলে একটু হলে যদি কমে!
“আশরাফ একটা নোটবুক রাখতো। এক পাতাই লিখেছিলো বেচারা”
পাঞ্জাবীর হাতায় চোখ মোছে রহমান।
“ওর মেয়ের নাম হবে বন্যা। সবাই যুদ্ধের পর সন্তানের কত নাম রাখে, মুক্তি, সবুজ...
আর ও রাখলো বন্যা। মেয়ের মাঝেই বুঝি সুখের বন্যা খুঁজতে চেয়েছিলো। পারেনি।”
নোটবুকটা বের করে টেবিলের উপর রাখে রহমান। এটা আগলে রাখার সময় ফুরিয়েছে। বন্যা তখনো কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে কেঁপে উঠছে। কে যেনও গোপনে সারা জীবনের চোখের জল আজকের জন্য জমা করে রেখেছিলো ওর চোখে। একদিন যারা ঔরসে পেয়েছিলো ভাষা, তার জন্য আজ আবেগে, বাতাসে বাতাসে চোখের জল পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে। আজ একটু শক্তি দরকার। খোদা কি শুনছে, আজ একটু শক্তি দরকার।
বন্যা হাত বাড়িয়ে নোটবুকটা তুলে নেয়। কোলের মাঝে রেখে হাত দিয়ে মলাটটা ছুঁয়ে দেখে। ওর চোখের মাঝে অলস জল টলমলে। নোটবুকের প্রথম পাতার এলোমেলো অক্ষর গুলো দল বেঁধে জীবন্ত হয়।

“রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যুদ্ধের পর কি করবি? ও বলে, যুদ্ধ কখনো শেষ হবে না। তাই কি হয়! আমার মেয়েকে দেখবো না!
কিন্তু আমার এখানে ভয় করে। কেন জানি মনে হয় আমি বাঁচবো না। হয়তো যুদ্ধের সময় এমনি মনে হয়। ভয় হয় খুব। দিনের পর দিন অস্থিরতা বাড়ছে। কবে শেষ হবে যুদ্ধ? খোদা রহমানের কথা যেনও সত্যি না হয়।
একদিন রেণুকে স্বপ্নে দেখলাম, সে সফেদা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমায় বলছে, “মাইয়াটারে দেইখা রাইখো”। ওর ছায়া ভেসে যায়, স্মৃতি ভেসে যায় মনের উপর দিয়ে। হুট করে হয়তো মরে যাবো। মরে গেলে কে দেখবে আমার বাবুটাকে! আমার সবুজ ক্ষেতের সোনার ফসল, আমার মানিকটাকে কে দেখবে!”

শরীরে জলের গন্ধ মেখে ক্লান্তি আসে, কোন বোধ নেই। বুকের চারপাশের কষ্টগুলোকে আজ আর উপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে না। বুক পেতে দেয় বন্যা। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায়। অনেক সময় কেটে গেছে। সময়ের দেয়ালে দেয়ালে কত ছোপ, ছবি, রঙ- গোপন কথা। সেখানে গোপন ভালোবাসা গুলো ধুলো কাদায় ঘুমিয়ে ছিলো। শুধু সাধ ছিলো একদিন সবুজ ঘাসে ঘাস ফুল হবে। অন্ধকারে মিশে থাকা চোখের জলে অনেক আগেই কে যেনও বুনে গেছে বীজ চেনা ঘরের বাইরে, দেয়ালের ওপাশে। চোখের জলে কখনো বন্যা হয় কিনা জানা নেই। বাইরে কোথাও একটা পথহারা পাখি ডেকে ওঠে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement