রফিক ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে এসে দাঁড়াল। রফিককে দেখতে পেয়েই ইরা খেলা ফেলে ছুটে আসল। রফিকের হাত ধরে বলল, “বাজান, আমারে না একখান লাল শাড়ি কিন্যা দিবা কইছিলা, হেইডা কই। আমি কইলাম শাড়ি ছাড়া মেলায় যামু না”। মেয়ের গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে রফিক বলল, “দিমুরে মা, কিন্যা দিমু। আইজকাই ফিরনের পথে হাট থেইক্যা কিন্যা আনুম”। “ হাচা ত, ভুইল্ল্যা যাইবা না ত আবার”। “নারে মা, ভুলুম না, যাও এহন খেলতে যাও”। হাতে এক খিলি পান নিয়ে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এতক্ষন বাবা-মেয়ের কথা শুনছিল মিনু। কথা শেষ হতেই রফিকের হাতে পানটা দিয়ে বলল, “মাইয়ারে তো আদর দিয়্যা দিয়্যা মাথায় তুলতাছ, কদিন আগেই না একখান ফরক(ফ্রক) কিন্যা দিছ, আবার শাড়ি কি দরকার শুনি?” রফিক হাসতে হাসতে বলল, “কিযে কও না বউ, একটাই ত মাইয়া আমাগো, ওরে না দিয়া কারে দিমু কও? আইচ্ছা যাও তোমার লাইগ্যাও একখান নয়া শাড়ি খরিদ করুম নে”। রফিকের এমন কথা শুনে মিনু কিছুটা বিরক্ত হল যেন। সে বলল, “ঐ দেখ আমি কি তাই কইছি নাকি!”
“ক্যান তুমি না কইলে কি আমি তোমার লাইগ্যা কিনতে পারি না? আইচ্ছা বাদ দাও, আমি গেলাম”। “ফিরবা কখন?” “বৈকালেই ফিরা আসুম, দুপুরে আমি ঐখানে খাইয়া নিমু”। “আইচ্ছা, ফী আমানিল্লাহ”।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। রাত বাড়তে লাগল। রফিকের ফেরার কোন নাম গন্ধও নেই।
অজানা আশংকায় মিনুর বুক ধুকপুক করছে। সে ইরাকে ডাক দিল। “ইরা মা, একটু শুইনা যা ত”। ইরা সাথে সাথেই সাড়া দিল আসছি মা বলে। ইরা মিনুর সামনে এসে দাঁড়াল,মিনু বলল, “সন্ধ্যা হইয়া গেল, তোর বাপে এহনো ফিরল না, একটু তোর গনি কাকার বাসা যা ত মা, খোঁজ নিয়া আয়”। “আইচ্ছা মা” বলেই ইরা বের হয়ে গেল একটি চার্জ লাইট হাতে নিয়ে। ফিরেও আসল একটু পরেই। জানাল তার গনি কাকাও এখনও ফিরেনি। তার বাসার সবাইও চিন্তা করছে।ইরার কথা শুনেই মিনুর মনটা কেঁপে উঠল। মনে মনে সে খোদাকে ডাকতে লাগল, “খোদা আমার আশংকা যেন সত্য না হয়”।
তারপর ইরাকে সাথে নিয়ে তাদের দুইঘর পরেই উসমানের বাড়িতে গেল। মিনুকে দেখেই উসমান ছুটে এল।উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে প্রশ্ন করল, “ভাবী আপনে এই অসময়ে? কি ব্যাপার?”
উসমানের কথা শেষ হবার সাথে সাথেই মিনু ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে লাগল। কেঁদে কেঁদেই বলল, “ইরার বাপে এহনো বাড়ি ফিরে নাই”। “ কন কি ভাবী, রফিক তো কইছিল আইজকা সকাল সকাল ফিরব, আইচ্ছা আপনে কোন চিন্তা কইরেন না, আমি দেখতাছি”। “ হ ভাই তুমি একটু দেখ”। “হ ভাবী আমি এহনই খোঁজ লইতাছি আপনি ঘরে যান”।
ইরার বয়স মাত্র পাঁচ। বয়স খুব কম হলেও সে বুঝতে পারছে তার বাবাকে নিয়ে কিছু একটা ঘটেছে। কিছু একটা যে ভালো কিছু নয় সেটাও সে বুঝতে পারছে।

রফিক এবং গনিকে BSF সেনারা ধরে নিয়ে এসেছে ওদের ক্যাম্পে। একটা অন্ধকার ঘরে ওদের আটকে রেখেছে। ধরে আনার সময় রফিকের পকেটে ছিল ১২ হাজার ও গনির পকেটে ছিল ৮ হাজার। সব টাকা ওরা নিয়ে নিয়েছে। টাকার পরিমাণ কম- এই অজুহাতে ওদের ফকিরনির বাচ্চা বলে গালাগাল করেছে। সেই দুপুর বেলা দুজনে মিলে কলা পাউরুটি খেয়েছিল। এরপর আর খাওয়া হয়নি। রফিক অনুমান করার চেষ্টা করল কটা বাজে। এখন ১১ বাজে বোধহয়। মনে মনে বলল সে। তীব্র পানির পিপাসা পেয়েছে তার। কিন্তু কাকে বলবে সে। গনির দিকে তাকাল সে। বেচারা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। এখন পর্যন্ত কোন কথাই বলে নি। হঠাৎ অন্ধকার ঘরটির দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল কয়েকজন BSF সেনা। তাদের হাতের টর্চ লাইটের আলোয় ঘরটি আলোকিত হয়ে গেল। এদের মধ্যে লীডার ধরনের একজন বলে উঠল, “ গোপাল, রঘু, এই ফকিরনির বাচ্চাদের সাইজ কর, যেন আর কোনদিন এত কম টাকা নিয়া বর্ডার ক্রস না করে। ইয়েস সার বলেই রঘু এবং গোপাল নামের দুইজন পিশাচ রফিক এবং গনির উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করল। প্রচণ্ড ব্যাথায় তারা চিৎকার শুরু করল। তাদের চিৎকার একসময় গোঙ্গানিতে রুপ নিল। একসময় গোঙ্গানিটাও বন্ধ হয়ে গেল।

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। সারাদেশ ভাসছে উৎসবের আনন্দে। কিন্তু ইরাদের পাড়ায় কোন আনন্দ নেই। তাদের পাশের গ্রামে বৈশাখী মেলা হচ্ছে। আজ তার বাবার সাথে সেখানে নতুন একটা লালশাড়ি পড়ে যাবার কথা। ইরা এখনও শাড়ি পড়তে জানে না। তার বাবাই তাকে পড়িয়ে দেয়। কিন্তু আর কোনদিন তার বাবা তাকে শাড়ি পড়িয়ে দিবে না।
গ্রামের কয়েক জন কৃষক ভোরে কাজে গেলে দেখতে পায় সীমান্তের কাটা তারের বেড়ায় ঝুলছে রফিক ও গনির লাশ।