লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৬৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপরিবার (এপ্রিল ২০১৩)

অন্নপূর্ণার সংসার
পরিবার

সংখ্যা

রীতা রায় মিঠু

comment ১১  favorite ০  import_contacts ১,২৮৫
এক.

পারমিতা

এখন ঘড়িতে কত বাজে জানিস? রাত ১টা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট হয়ে তেইশ সেকেন্ড। আর নিউইয়র্কে তোর বাড়ীর ঘড়িতে বাজে রাত ২টা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট হয়ে বিয়াল্লিশ সেকেন্ড। নিশ্চয়ই গভীর ঘুমে আছিস, আমিও ঘুমাবো, তবে আরও একটি ঘন্টা পরে। এখন খুব ভালো মুডে আছি, চোখের সামনেই সাজানো আছে এক বাক্স চকোলেট এবং দুখানা লাড্ডু। আঁতকে উঠিস না, চকোলেট আমি খাই না, মানস নিয়ে এসেছে আমার জন্য, তাই সাজিয়ে রেখেছি। কিন্তু লাড্ডু দুটো খাব। এটাও মানস নিয়ে এসেছে, তার পারমিতার মাসীর বাড়ী থেকে। আজ বিকেলে বাড়ী পৌঁছেই সবার আগে সে ব্যাগ খুলে লাড্ডুর বাক্স বের করেছে, তারপর যাত্রার ঢঙে গান করতে করতে বাক্স আমার পায়ের কাছে রেখে বলে,

“হে জননী, আমরা জানি, তুমি অসাধারণ, কিন্তু তোমার যে সখী, আমার সেই পারমিতা মাসী, উনি হচ্ছেন মহা অসাধারণ! তুমি যদি একা আমার জননী হও, তোমার সখী হচ্ছেন একশত সন্তানের জননী। বিশ্বাস করো জননী আমার, মাত্র দুই ঘন্টার মধ্যে তোমার সখী এই অতি সুস্বাদু লাড্ডুগুলো তৈয়ার করিয়াছেন, আমাদের মত ভুখা সন্তানদের জন্য। উনার বাড়ীতে গতকালকে যতগুলো সন্তান উপস্থিত ছিল, তাহারা এই লাড্ডুর উপর হামলে পড়েছিল। কিন্তু আমার অতি অসাধারণ মাসী কোন ফাঁকে যেন তাঁহার সখীর জন্য গুনে গুনে দশটি লাড্ডু সরিয়ে রেখেছিলেন। সেই লাড্ডুগুলোই আমি বহন করিয়া আনিয়াছি, আপনি গ্রহণ করিয়া আমাকে কৃতার্থ করুণ”।

মানস এগুলো বলেছে, ভাবতে পারিস!! হঠাৎ করেই ছেলেটা যেন বেশ ফিচেল টাইপ হয়ে যাচ্ছে। আগেতো মুখচোরা ছিল, এখন কেমন কায়দা করে কথা বলে। তোর বাড়ী যাওয়ার আগেও কত গোপনীয়তা, কত যে অভিনয় করেছিল আমার সাথে! আমি তো শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি যে ছোঁড়া নিজ থেকে তোর ওখানে বেড়াতে যেতে চাইছে। আসল কথা আমি জানি, ওর মনে অপরাধবোধ ছিল, মনে আছে তো তোর, প্রজেক্টের কাজে দু’মাস আগেই নিউইয়র্ক গেছিল, আমি কত করে অনুনয় করে বলেছিলাম যেনো তোর সাথে দেখা করে আসে। সেটা তো সে করেনি, আমি খুবই শকড হয়েছিলাম, এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটি করিনি। অন্য সময় পান থেকে চুন খসলেই ওদের সাথে কত রাগারাগি করি, এখনও চড়-চাপর লাগিয়ে দেই। সেই আমি একেবারে চুপ থেকেছি, কোন কৈফিয়ত চাই নি, ব্যাপারটা ওর কাছে খুবই আশচর্য্যজনক মনে হয়েছে। এ জন্যই এবার স্প্রিং ব্রেক শুরু হওয়ার আগেই আমাকে জানিয়েছে,
“মামনি, আমি কিন্তু স্প্রিং ব্রেকে নিউইয়র্ক যাচ্ছি”।
জবাবে বলেছি,
“আবার কোন প্রোজেক্ট নিয়ে যাচ্ছ? তা যাবে তো যাবে, তোর নিউইয়র্ক যাওয়া নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই”।
বলেছি ঠিকই, আবার মনে মনে খুব ইচ্ছে করছিল ওকে বলি, এবার যেনো ভুল না করে। কিন্তু বলার আগেই ওই বলেছে,

“মা ,এবার পারমিতা মাসীর বাড়ীতে যাচ্ছি। মাসীর সাথে আমার কথা হয়েছে, স্প্রিং ব্রেকে মাসীর ‘নিস’ আসবে ভার্জিনিয়া থেকে, আমরা খুব মজা করবো।

আচ্ছা, তোর সাথে কখন ওর কথা হলো, কখনইবা এত শলাপরামর্শ করলি, আমি কিছুই জানতে পারলাম না। আমি অবশ্য অনেক খুশী হয়েছি, পরে মনে হয়েছে, যা ঘটে তা মঙ্গলের জন্যই ঘটে। গত মাসে মানস গিয়েছিল ওদের কলেজের গ্রুপের সাথে, তোর বাড়ীতে গেলেও থাকা হতো না। এটাই ভালো হয়েছে, ওর তো নিউইয়র্ক বেড়ানোর খুব শখ ছিল, এবার নাকি শখ মিটিয়ে বেড়িয়েছে। পারিজাত থাকায় ওর খুব সুবিধে হয়েছে। আচ্ছা, পারিজাতের মা, মানে তোর সেই পূরবী দিদি কেমন আছে রে! কত আগে দেখেছিলাম। পারিজাত নামটাও তো তুই রেখেছিলি, তোর নামের আদ্যক্ষরের সাথে মিল রেখে। সব মনে আছে আমার। পূরবী দিদির মেয়ে এত বড় হয়ে গেছে? কী সুন্দর একা একা আমেরিকা চলে এসেছে! মানস তো খুব ভক্ত হয়ে গেছে পারিজাতের। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

“মানস, পারিজাতকে আমি সেই ছোটবেলায় দেখেছি, এতদিনে কেমন হয়েছে দেখতে কে জানে”!

“মাম্মি, পারিজাত অনেক সুন্দর দেখতে। ছবি এনেছি, দেখাবো। ও অনেক ভাল একটা মানুষ। গুড্ডি ওকে ‘দিদিভাই’ বলে ডাকে, আমিও গুড্ডির দেখাদেখি ওকে ‘দিদিভাই’ ডেকেছিলাম, কিন্তু ও ‘দিদিভাই’ ডাকতে মানা করেছে। বলেছে, আমার মত ইয়াংম্যানের মুখ থেকে ‘দিদিভাই’ ডাক শুনলে নাকি নিজেকে দাঁত ফোকলা বুড়ী মনে হয়। কী যে মজা করে কথা বলে। আমি বলেছি,

তোমার নাম ধরে ডাকবো?

-ও বলেছে, যদি পারিজাত নামের মানে বলতে পারিস, তাহলে আমাকে নাম ধরেই ডাকবি।

-মাম্মি, আমি কীভাবে উত্তর দিয়েছি গেস করো তো!

-পারছি না গেস করতে।

-তুমি প্রায় প্রায় একটা টেগোর সং করো, সেখানে বলে,

“পারিজাতের কেশর লয়ে
ধরায় শশী ছড়াও কী এ
ইন্দ্রপুরীর কোন রমণী
বাসর প্রদীপ জ্বালো! মাম্মি, পারিজাত তো বেহেশতের ফুল, তাই না?

=বাবা, শুনেছি পারিজাত হচ্ছে নন্দন কাননের ফুল, অর্থাৎ স্বর্গীয় উদ্যানের ফুল। ঠিকই বলেছো বাবা। তুই এতো কথা শিখে গেলি কবে? এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছিস কেনো?

-হা হা হা! বড় হলাম কোথায়, সারাটা সময় পারিজাত আমাকে ‘তুই’ ‘তুই’ করে কথা বলেছে। আমার অবশ্য খুব মজা লেগেছে। ও অনেকটাই তাপসীর মত, অনেক ভাল একটা মেয়ে। আমাকে দেখে নাকি ওর ছোট ভাইমনির কথা মনে পড়ে গেছে। ওর ছোট ভাই নাকি ওকে নাম ধরে ডাকে।


পারমিতা, মানস গানের সুরে এত চমৎকার করে উত্তর দিয়েছে, জানিস, আমার তখনই ইচ্ছে করছিল ওকে একটু আদর করে দিতে। কিন্তু, ছেলে এখন বড় হয়ে গেছে, এভাবে আদর করতে গেলে লজ্জা পাবে বলে বাদ দিলাম।

আজ অবশ্য ও খুব ক্লান্ত ছিল, বেশীক্ষণ গল্প হলোনা, কাল ঘুম থেকে উঠে নাকি গত চারদিনের হাজারো গল্প শুনাবে। তবে দুটি জিনিস আমাকে শুনিয়েছে, একটি হচ্ছে, তোর বাড়ীতে নিমন্ত্রিত এবং অনিমন্ত্রিতদের ভীড় নাকি লেগেই থাকে, যার যখন ইচ্ছে চলে আসে, খাওয়া দাওয়া আড্ডা গল্প করে যায়। এটা দেখে তো মানস খুব অবাক। আমাদের এখানে তো এমন দেখেনি কোনদিন। দেখবেই বা কোথা থেকে বল, হাতে গোনা দুই চারটা বাঙ্গালী পরিবার এখানে থাকে, তাদের কারোরই ওর বয়েসী ছেলে মেয়ে নেই। এজন্যই পারিজাতের সাথে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। পারিজাত নাকি ওকে বলেছে,

“আমার মাসীর সংসারটাকে বলে অন্নপূর্ণার সংসার। এ বাড়ীতে সদস্য সংখ্যা অফিসিয়ালী মাত্র তিনজন, মাসী, মেসো আর গুড্ডি। বাকী দু’জন থাকে অন্য স্টেটে, অথচ দেখ, মাসী প্রতিদিন প্রায় চৌদ্দ-পনের জনের জন্য রান্না করে রাখে। মাসীর বাড়ীতে এসে কাউকেই ভাত না খেয়ে যেতে দেখবি না। আছিস তো কয়েকদিন, খেয়াল করিস”।

জানিস পারমিতা, মানস যখন তোর এই ‘অন্নপূর্ণার সংসারের’ গল্প শোনাচ্ছিল, আমার মন চলে গেছে সেই সুদূর বাংলাদেশের ‘জনস্বাস্থ্য’ কেন্দ্রের ফেলে আসা দিনগুলোতে। তুই কতবার গেছিলি আমাদের সাভারের সেই বাড়ীতে। কবীর যখন জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চাকুরীতে জয়েন করেছিল, আমাদেরকে থাকতে দিয়েছিল ওখানের গেস্ট হাউজ বিল্ডিং এর চারতলায়। নীচ তলায় মেস ছিল, ঐ কেন্দ্রের সব কর্মীরা তিনবেলা ঐ মেসেই খাওয়া দাওয়া করতো। আর নীচতলায় একটা কোনে এক ভদ্রমহিলা থাকতেন। সকলেই উনাকে ‘খালাম্মা’ ডাকতো। ষাটের কাছাকাছি বয়স ছিল, মাথার চুল মেহেদীতে রাঙাণো ছিল, সব সময় ফিটফাট থাকতেন, কপালে বিরাট বড় এক টিপ পড়তেন। এতবড় টিপ আমি ইদানিং ফেরদৌসী প্রিয়ভাষীনিকে পরতে দেখি। শুনেছি, খালাম্মার স্বামীর মৃত্যুর পর উনার একমাত্র ছেলের কাছে থাকতে চেয়েছিলেন। ছেলে আর ছেলের বৌ দুজনেই ডাক্তার। কিন্তু উনার এই স্বাধীনচেতা স্বভাবের কারণেই বোধ হয় ছেলের সাথে বনিবনা হচ্ছিল না, তাই উনি ‘জনস্বাস্থ্য’ কেন্দ্রে চলে আসেন। এই কেন্দ্রের পরিচালক উনার ছেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। পরিচালক উনাকে খালাম্মা ডাকতেন, সেই থেকে কেন্দ্রের সবাই উনাকে ‘খালাম্মা’ ডাকতো।

আমি নতুন ছিলাম বলে কারো সাথে তেমন একটা পরিচয় হয়ে উঠেনি তখনও। বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা দৃশ্য দেখতাম। প্রতি বিকেলে খালাম্মা দারুণ সুন্দর করে সেজেগুজে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেন, ডেকে ডেকে সবার সাথে কথা বলতেন, ফেরার সময় দল বেঁধে তরুণ ডাক্তাররা খালাম্মার সাথে সাথে উনার ঘরে আসতো। কবীরও গিয়েছিল একদিন। শুনেছি, ছেলেমেয়েরা খালাম্মার ঘরে বসে চা-মুড়ি খেতো, এমনকি রাতের বেলা ভাতও খেত।

একদিন আমি নীচে গিয়ে খালাম্মার ঘরে টোকা দিতেই খালাম্মা নিজেই দরজা খুলে দেন। আমাকে পরম আদরে ঘরে ঢুকিয়ে চেয়ারে বসতে দিয়ে জিজ্ঞেস করেন,

“নতুন বৌমা, কী খাবে বলো”?

আমি বলেছি, আমি কিছু খাব না খালাম্মা, আমি এসেছি আপনার সাথে গল্প করতে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আপনি এখানে একা একা কীভাবে থাকেন? শুনেছি আপনার ছেলে ঢাকায় থাকে, তাহলে আপনার মন পোড়ে না ছেলের জন্য?

-বৌমা, ঢাকায় আমার একটা ছেলে, এখানে দেখো, কত ছেলেমেয়ে আমার। এই যে ডাক্তার ছেলেগুলো এখানে সারা দিনমান হাসপাতালে পড়ে থাকে, রুগী নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, ওদের তো আদর যত্ন করার কেউ নেই। আমি একা একা থাকতে পারি না, একা একা খেতেও পারি না। তাই এখানে তোমাদের সবার সাথে গায়ে গায়ে লেগে আছি। রান্না করতে ভালো লাগে, রান্না করি বেশী বেশী করে, বিকেল হলেই ছেলেগুলো আসে আমার কাছে, একটু ভালো মন্দ খেতে দেই, ওরা কী খুশী হয়। এটা দেখেই আমার সুখ লাগে। ঢাকায় তো আমার ছেলে তার সংসার নিয়ে ভালই আছে।

-খালাম্মা, আপনি যে এত সুন্দর পরিপাটি করে সাজেন, আমার খুব ভাল লাগে। আপনার বয়সে পৌঁছে আমি হয়তো একেবারেই বুড়ী হয়ে যাব।

-মা রে, সাজগোজ করে থাকলে মন ভাল থাকে। এই যে দেখো, তোমার খালু বেঁচে নেই, এটাই তো আমার কাছে অনেক বড় কষ্টের ব্যাপার, তার মধ্যে আমি যদি বিধবা সেজে সাদা শাড়ী পড়ে ঘরের ভিতরে বসে থাকতাম, কোন আশায় বেঁচে থাকতাম বলো! এই যে আমি সাজগোজ করি, তোমাদের মত ইয়াং ছেলেমেয়েদের মাঝে থাকি, এই জন্যই আমার শরীরও ভালো থাকে। আমি তো ঠিক করেছি, মৃত্যুর আগেও আমি সাজগোজ বন্ধ করবো না। গোপন কথা বলি শোন, তোমার খালু খুব চাইতেন, আমি যেন টিপ পড়ি, চোখে কাজল পড়ি, রঙীন শাড়ী পড়ি, তা সেটাই করি।

-খালাম্মা, ভালই হয়েছে, আপনি এখানে নতুন সংসার খুলে বসেছেন, সংসারের নাম ‘খালাম্মার সংসার’!

-হা হা হা! খুব সুন্দর কথা বলেছো তো। তা এখন থেকে তুমিও চলে এসো বিকেলবেলা, আমরা আড্ডা দেবো। আমি তো প্রতিদিন ছেলেদের কে গান গেয়ে শোনাই। ওরা হচ্ছে ডাক্তার, আমাদের জীবন-মরণ এদের হাতে সঁপে দেয়া থাকে। ওরা আমাদের জন্য এত কাজ করে, আমি আর কী বেশী করছি বলো!

পারমিতা, মাঝে মাঝেই খালাম্মার কথা মনে পড়ে। উনি এখনও বেঁচে আছেন কিনা কে জানে! কিন্তু ‘খালাম্মার সংসার’ টা আমার মাথায় এখনও বেঁচে আছে। আজ মানস যখন বলছিল, ‘অন্নপূর্ণার সংসার’ এর কথা, চট করে কতকাল আগের সেই খালাম্মাকে মনে পড়ে গেলো। খালাম্মাকে দেখে একটা ব্যাপার শিখেছি, বয়সের সাথে তারুণ্যের কোন সম্পর্ক নেই। ষাট বছরের খালাম্মাকে দেখেছি সাতাশ-আটাশ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের সাথে অনেক আনন্দেই থাকতেন। নিজের একটিমাত্র ছেলে থাকা সত্বেও কী অবলীলায় কেন্দ্রের শত শত ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার পেতেছিলেন।

ছেলে আজ বাড়ী ফেরার পর থেকে যতটুকু সময় ওর সাথে কথা হয়েছে, মাসীর কথা আর পারিজাতের কথা ছাড়াও গুড্ডুর কথাও বলেছে। গুড্ডুকেও নাকি ওর খুব ভালো লেগেছে। বড় হয়ে নাকি গুড্ডু একেবারে তোর ডিটো হবে। মোটকথা, তোর বাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে মানসের অনেক উপকার হয়েছে। খুব এনজয় করেছে কয়েকটা দিন। শোন, ভাল করে খেয়াল করিনি, মানস একফাঁকে বলেছিল,

“মাম্মি, পারিজাত তো আমার আগেই চলে গেছে, মানে কাল বিকেলেই চলে গেছে, কিন্তু আজ সকালে মাসীকে ফোন করে কিছু একটা খারাপ খবর দিয়েছে, আমাকে মাসী কিছু বুঝতে দেয়নি, কিন্তু আমি বুঝেছি। তুমি জিজ্ঞেস করলে হয়তো তোমাকে বলবে”।

কী খবর দিয়েছে রে পারিজাত? মাসীমা ভালো আছেন তো? উনাকে অসুস্থ দেখে এসেছিলি। মানসের কাছ থেকে সব মজার গল্প শুনছিলাম, কিন্তু শেষের এই কথাটুকু শোনা অবধি আমার মনটা ভাল লাগছে না। ফোনে জিজ্ঞেস করিনি, ভয় লাগছিল তোর মুখ থেকে খারাপ সংবাদ শুনতে। তেমন ধরণের সংবাদ হলে আমাকে জানাতে হবে না।

ভালো থাকিস, এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে। লাড্ডু দুটো যে কোন ফাঁকে শেষ করে ফেলেছি খেয়াল করিনি। এত ভাল মিষ্টি তুই কী করে বানাস বলতো! এর আগেরবারও কালোজাম পাঠিয়েছিলি, তুই পারিস বটে! দাদা খুব ভাল জহুরী, দামী রত্ন বেছে নিয়েছে, সেই তুলনায় কবীর একটা হাবারাম, আমার রূপে মজেছে, গুণের খোঁজই নেয় নি। এখন আফসোস করে, উঠতে বসতে খোঁটা দেয়।

ভালো থাকিস জানু। মন খারাপ করে থাকিস না, তোর জন্য সব সময় প্রার্থণা করি, তোর জীবনে কোন রকম বালা মুসিবত থাকতে পারবে না, থাকা উচিৎ না। তোর মন খারাপ কেটে যাবে, অন্নপূর্ণার সংসার যেন যুগ যুগ বেঁচে থাকে।

মানসী



দুই.

মানসী,

সেদিন এয়ারপোর্টে পৌঁছেই মানস আমাকে কল করেছে, তোদের আগেই ও জানিয়ে ফেলেছে তার পৌঁছ সংবাদ। আমার এত ভালো লেগেছে ব্যাপারটা, খুব খুশী হয়েছি। হ্যাঁ রে! মানস অনেক মিশুক হয়েছে, ও আসাতে আমরাও কয়টা দিন খুব ভালোই কাটিয়েছি। বিশেষ করে গুড্ডি আর পারিজাত তো একেবারে আনন্দে আটখানা ছিল। এই স্প্রিং ব্রেকে আমার অন্য দুই শ্রীমান তো আসেনি, আমরাই এই ক’জনে কাটিয়েছি সময়। তুই এলে কত ভালো হতো। কবীর ভাইকে নিয়ে চলে আসতে পারতি, আমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য হলেও। এলে পারিজাতের সাথেও দেখা হয়ে যেত। ও খুব ভালো রেজাল্ট করছে এখানে। দুই বছর আমার কাছে ছিল, এখন ভার্জিনিয়া টেকে পড়ছে, ওখানেই অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকে। ফুল স্কলারশীপ পাচ্ছে তো, সেই টাকাতেই ওর ভালোভাবে চলে যায়। ছুটি পেলেই চলে আসে আমার কাছে। হ্যাঁ, তোর দেখি মনে আছে ওর নামটা আমিই রেখেছিলাম।

হ্যাঁ, এখানে যে কয়দিন মানস ছিল, আমার বাড়ীতে প্রায় প্রতিদিনই আড্ডা জমতো। বাঙালী ছেলেমেয়েদের আড্ডা। বিরাট কোন ব্যাপার না। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে বেশ কিছু বাংলাদেশী এবং কলকাতার ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে। এদের অনেকেই আমাকে ‘আন্টি’ বা ‘কাকী’ ডাকে। যখনই ওদের একটু ডাল আর ভাত খেতে ইচ্ছে হয়, আমাকে ফোন করে, তোর দাদা গিয়ে ওদের নিয়ে আসে। ডাল আর ভাত খেয়ে ওরা চলে যায়। কী ব্রাইট ব্রাইট ছেলেমেয়ে সব। কতদূর চলে এসেছে বাবা মা’কে ছেড়ে। ওদের কেউ কেউ ফাঁকে ফাঁকে নানা অড জব করে, দেশে টাকা পাঠাতে হয়, মাহিন নামে এক ছেলে আছে, ও এখানে গণিতে পিএইচডি করছে। প্রতি মাসে ওকে টাকা পাঠাতেই হয়, নাহলে ওদের সংসারের চাকা নাকি থেমে যায়। কলি নামের একটি মেয়ে আছে, আমার কাছে ঘুরে ফিরে আসে, আমার চেহারায় নাকি ওর মা’কে দেখতে পায়। এমন কথা শুনলে কেমন লাগে বল! ভীষণ মায়া লাগে না! আমি ওদের সবার জন্য দরজা খোলা রেখেছি। মাঝে মাঝে এমনও হয়, ওরা দল বেঁধে আসে, আমাকে সোফার মধ্যে বসিয়ে রাখে, নড়তে দেবে না, নিজেরাই রান্না বান্না করে, থালায় ভাত সাজিয়ে আমাকে খেতে দেয়, তারপর ওদেরটা নিয়ে বসে। আংকেলকেও নিজেদের দলে টেনে নেয়।


মানসী, ব্যাপারটা খুব বেশী কিছু না, আবার অনেক বেশী মনে হয়। এই যে চেনা নেই জানা নেই, কতগুলো ছেলেমেয়ে আমাকে মায়ের মত ভালোবাসে, এ কত বড় পাওয়া বল! তোর গল্পের সেই খালাম্মার মত অবস্থা আর কি! আমি তো তেমন কিছুই করি না। ভালো মন্দ রান্না করতে গেলেই আমার নিজের দুই ছেলের কথা মনে পড়ে যায়। ওরা কী খায়, তা ঈশ্বর জানেন। ছুটিছাটায় যখনই বাড়ী আসে, প্রতি বেলাতেই আমার ছেলে দুটো হামলে পড়ে খায়, দেখে কী মায়া লাগে! এজন্যই আমি এখানের বাঙালী ছেলেমেয়েদের বাড়ীতে ডেকে এনে খাওয়াই। ওদেরও তো খাওয়া দাওয়ার কোন ঠিক নেই। তাছাড়া, শুধু তো বাঙালী ছেলেমেয়েরাই না, পারিজাতের অনেক নন বেঙ্গলী ফ্রেন্ড আছে, তাদেরকেও মাঝে মাঝে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াই। ভার্জিনিয়া যাওয়ার আগে পারিজাতের সাথে ওরা অনেকবার এসেছে আমাদের বাড়ীতে। চেনা হয়ে গেছে। এমনও হয়েছে, আগের দিন হয়তো বাড়ীতে পার্টি ছিল, খাবার দাবার বেঁচে গেছে অনেক, পারিজাত সেগুলো প্যাকেট করে বন্ধুদের জন্য নিয়ে গেছে। ওর দেখাদেখি ওর বন্ধুগুলোও আমাকে মাসী’, মাসী’ ডাকে। আমেরিকান ছেলেমেয়েদের মুখে ‘মাসী’ ডাক শুনতে কী যে ভাল লাগে! এভাবেই আমার দিন কেটে যায়।

একদিন কী হয়েছে শোন, পারিজাত তখন আমার বাড়ীতে থেকেই ইউনিভার্সিটিতে যেত। কোন একদিন ও ওর এক ভারতীয় বন্ধুর ডর্মে গেছিল। সেই বন্ধুর নাম অভিষেক। অভিষেকের রুমে গিয়ে দেখে, একটা ছেলে ফ্লোরে বসে ভাত খাচ্ছে, টমেটো সস দিয়ে মেখে। অভিষেক রুমমেটের সাথে পারিজাতের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ছেলেটির নাম মেহেদী হাসান খান, পাকিস্তানের ছেলে। আমেরিকা এসেছে ইংলিশ লিটারেচারে মাস্টার্স করতে। এসব তথ্য পারিজাতের কানে ঢুকছিল না, তার মাথায় গেঁথে গেছে, মাসী যদি দেখতে পেতো, একটি ছেলে এভাবে টমেটো সস দিয়ে ভাত খাচ্ছে, না জানি মাসী কী করতো! সেদিন পারিজাত কিছু না বলে চলে এসেছে।

পরদিন ছিল শনিবার। আমাদের তিনজন বন্ধুকে খেতে বলেছিলাম। আমি রান্না করতে ভালোবাসি, তাই নানা রকম আইটেম রেঁধেছিলাম। রবিবার সকালে পারিজাত আমার কাছে কিছু খাবার চেয়ে নিয়ে প্যাকেট করছে দেখে জিজ্ঞেস করেছি,

“খাবার নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস? রবিবার দিনটাও ঘরে থাকতে পারিস না?

-মাসী, যাব আর আসবো। গত পরশু অভিষেকের ডর্মে গেছিলাম, ওর একটা রুমমেটকে দেখেছি টমেটো সস দিয়ে ভাত খেতে। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। ওরা তো কখনও রান্না করেনি, তাই এখানে ওরা রাইস কুকারে শুধু ভাত আর ডিম সেদ্ধ রান্না করে খায়। আর আলু সেদ্ধ খায়। সেদিন নাকি ওদের ঘরে ডিম, আলু দুটোই ফুরিয়ে গেছিল। তাই আর কিছু না পেয়ে টমেটো সস দিয়ে ভাত খেয়েছে।

বললাম, আচ্ছা, নিয়ে যা, বেশী করে নিয়ে যা, কয়েকদিন রেখে যেন খেতে পারে। বলিস, খেতে ইচ্ছে হলেই যেন তোকে জানায়।

মানসী, আমি তখনও জানতাম না, মেহেদীর নাম ধাম, পরিচয়। পারিজাত ফিরে এসে আমাকে বলেছে, ও যখন খাবার নিয়ে পৌঁছেছে, তখন তখনই নাকি দুই রুমমেট হাত ধোয়ার জন্যও অপেক্ষা করেনি, গপাগপ করে খেতে শুরু করেছে। এমন কথা শুনে আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। এ গুলো যখন শুনছিলাম, তখনই আমার ফোনে একটা কল আসে। অপরিচিত নাম্বার। ধরলাম ফোন, দেখি একটি ভরাট পুরুষ কন্ঠ আমাকে বলছে,

“মাসী, মাই নেম ইজ মেহেদী হাসান খান, আই অ্যাম ফ্রম লাহোর। পারিজাত ইজ আওয়ার ফ্রেন্ড, নো নো, শী ইজ মাই সিস্টার, সুইট সিস্টার। শী সেভড আওয়ার লাইভস, শী ইজ সো কাইন্ড, সো সুইট। শী ব্রট অল ইয়াম্মি ফুড ফ্রম হোম। ইউ সেন্ট ফুড ফর আস। ডু ইউ নো, আফটার সিক্স মান্থস, আই গট দ্য টেস্ট অব মাই মাম্মি’স ফুড। সো, ইউ আর মাই মাদার ইন আমেরিকা। ফ্রম টুডে, আই উইল কল ইউ,’মাম্মি’।

একনাগাড়ে কথা কটি বলে ছেলে থামলো। আমি ওর সাথে কথা বলে জানলাম, পাকিস্তানের লাহোরে ওদের বাড়ী। বিশ্বাস কর মানসী, তোর কাছে মিথ্যে বলবো না, পাকিস্তান শুনেই আমার মনটা দমে গেছে, কটমট করে পারিজাতের দিকে তাকিয়েছি। ও তো বুঝতে পারছে না, আমি কেন ওর দিকে কট মট করে তাকিয়েছি। মেহেদীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখেই পারিজাতকে নিয়ে পড়লাম।

‘-এই মেয়ে, কবে থেকে তোর এমন পাখা গজিয়েছে বল। তোর মা-বাবা তোকে এই দেশে পাঠিয়েছে পড়ালেখা করার জন্য, ঘুরে ঘুরে আর্তসেবা করার জন্য তো পাঠায় নি।

আমার কথা শুনে ও হকচকিয়ে গেছে। বলে,

“মাসী, আমি তো বুঝতে পারছি না, তুমি রেগে গেছো কেনো? আমি তো তোমাকে জিজ্ঞেস করেই খাবার নিয়ে গেছিলাম। ছেলেটা অনেক ভদ্র বলেই তো তোমাকে ফোন করে ধন্যবাদ দিয়েছে”।

-তা দিয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু তুই কী বুঝে পাকিস্তানী ছেলের পাল্লায় পড়তে গেলি!

-মাসী, হোয়াট ডু ইউ মিন বাই পাকিস্তানী ছেলের পাল্লায় পড়েছি? মাসী, তুমি এভাবে রিঅ্যাক্ট করছো দেখে আমি অবাক হচ্ছি। হোয়াট’স রঙ উইথ ইউ?

-চুপ থাক, আমার সাথে ইংলিশ কপচাবি না। তুই জানিস না যে মুক্তিযুদ্ধের সময় তোর দাদুকে পাকিস্তানী মিলিটারীরা মেরে ফেলেছিল?

-কাম অন মাসী, জানবো না কেনো? খুব জানি। কিন্তু এই মেহেদী অন্য রকম। ও একজন কবি, কেমন একটু পাগলাটে টাইপ, আমাকে ওর বোন ডেকেছে। মাসী, একজন যদি বোন ডাকে, তার সাথে কী অভদ্রতা করা যায়?

-না তা ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের মনে দগদগে ঘা হয়ে আছে। তাই প্রথমটায় ওভাবে রেগে গেছিলাম। কিছু মনে করিস না। ও খুব খেয়েছে, নারে! আমাকে বলছিল, ছয় মাস পর তৃপ্তি করে খেয়েছে। আহারে! সোনা মানিক ছেলে, ওর মা জানি কত কষ্ট বুকে চেপে আছে। ঘরে যার এত খাবার, সে কিনা টমেটো সস দিয়ে ভাত খায়!

-এই তো আমার মাসীর মত কথা। আমিও তো বলি, তুমি হচ্ছো, এতিমদের মাতা, এখানে যতগুলো ছেলেমেয়ে আছে, সবাই তো বলতে গেলে এতিম, এমনকি আমিও এতিম। তুমি আছো বলে আমাদের মত ভুখা মানুষগুলোর পেটে কিছু দানা পানি পড়ে। তোমাকে রেগে যেতে দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি।


এরপর থেকে পারিজাত যতদিন নিউইয়র্কে ছিল, প্রায়ই মেহেদী আর অভিষেকের জন্য খাবার দাবার নিয়ে যেত। বলে রাখি, পারিজাত খুবই মায়াবতী এক মেয়ে। একেবারে ওর মায়ের মত। আমার পূরবী দিদিও এমনই পাগলাটে স্বভাবের। শুধু মানুষের উপকার করে বেড়ায়। ভার্জিনিয়া যাওয়ার আগে একদিন পারিজাত বলেছিল, মেহেদী নাকি আমাদের বাড়ীতে আসতে চায়। এইবেলা আমি আর রিস্ক নেই নি। তোর দাদা তো পাকিস্তানের নামই শুনতে পারে না। এর মধ্যে যদি মেহেদীকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে আসা হয়, বলা তো যায় না, তোর দাদা কী বুঝতে কী বুঝবে। সে তো আর জানে না, মেহেদী পারিজাতকে ছোট বোনের মত ভালোবাসে, আমাকে ‘মাম্মি’ ডাকে। পারিজাতকে বুঝিয়ে বললাম, ওর মেসোর ব্যাপারটা। এরপর পারিজাত চলে গেলো ভার্জিনিয়া টেকে। মেহেদী আর অভিষেকের কপালও পুড়লো। একদিন মেহেদী ফোন করেছে,

“মাম্মি, আই’ম লিভিং টুডে! উইল নেভার ফরগেট ইউ। আই উইল্ কাম অ্যাগেইন জাস্ট টু সী মাই মাম্মি। ইট’স নট ফেয়ার দ্যাট আই হ্যাভ টু লীভ আমেরিকা উইদাউট সিয়িং মাই মাম্মি’স ফেস”।

বলেছি, বেটা, উইশ ইউ গুড লাক। ওয়ান ডে, উই উইল সী ইচ আদার! কনভে মাই সালাম টু ইয়োর মাম্মি।

-সিওর! প্রে ফর মি মাম্মি।



এক বছর আগে মেহেদী পাকিস্তান চলে গেল। সেখানে সে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসার হিসেবে জয়েন করেছে। এর মধ্যেই সে একটি ইন্টারন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছে। মাঝে মাঝে আমাকে ই-মেইল করে, খুব আন্তরিকভাবে মাম্মি ডাকে। আমার মন থেকে সব কালিমা দূরে চলে যায়। আমি ছেলেটির প্রতি মমতা টের পাই। খুব অপরাধ বোধে ভুগি। ছেলেটি আমাকে লিখেছে যে আমার বানানো ‘রসমালাই’ খেয়ে নাকি তার মনে হয়েছে, বেহেশতের খানাও বুঝি এত সুস্বাদু হয় না। সে তার মায়ের কাছে আমার গল্প করেছে, সে তার বন্ধুদের কাছে আমার গল্প করেছে। এগুলো শুনলে কেমন লাগে, তুইই বল।

এই ছেলে তো যেন তেন ছেলে না। এ তো জন্ম কবি। আমেরিকা আসার আগে পাকিস্তানেই মেডিক্যাল কলেজে পড়তো। তিন বছর পড়ার পর সে ডাক্তারী পড়া ছেড়ে দিয়ে আমেরিকা চলে আসে থিয়েটার, লিটারেচারের উপর মাস্টার্স করতে। এখানে সে এসেছিল ‘ফুল ব্রাইট’ স্কলারশীপ নিয়ে। পড়া শেষ করে গিয়েই সাথে সাথে ইউনিভার্সিটিতে চাকুরী পায়। ইন্টারন্যশনাল এওয়ার্ড পায়, আমিও জেনে সুখী হই, আমার ছেলেটা খুবই ভাল করছে। ভেতরে ভেতরে কাঁদি, পাকিস্তানী বলে ওকে আমার বাড়ীতে আনিনি। পারিজাত আমার উপর খুব অভিমান করে আছে এই ব্যাপারে।

এখন আসি মূল কথায়। মানস যেদিন রওনা দিল আমার বাড়ী থেকে, সেদিন সকালেই পারিজাত আমাকে ফোন করে জানায়, পাকিস্তান পুলিশ মেহেদীকে অ্যা্রেস্ট করে জেলে ঢুকিয়েছে। সে নাকি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ক্লাসে কী সব বলেছে। ক্লাসের কিছু ছাত্র এতে ক্ষেপে গিয়ে হুলুস্থূল বাঁধিয়েছে, ভার্সিটিতে ভাংচুর, ককটেল ফাটিয়েছে। তারা নাকি বলেছে, মেহেদী ফেসবুকেও ইসলাম বিরোধী কথা লিখে।

পারিজাত পত্রিকার একটি লিঙ্ক পাঠিয়েছে, সেখানে স্পষ্ট করে মেহেদী হাসান খানের অ্যা্রেস্টের খবর লেখা আছে। ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ ওকে সাথে সাথে চাকুরীচ্যুত করেছে, ওর সকল ডকুমেন্টস, কাগজপত্র পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে।

মানসী, আমার ছেলেটাকে ওরা মেরে ফেলবে, তাই নারে? ছেলেটাকে আমি আমার বাড়ীতে আনিনি, ও আমার মুখটা দেখতে চেয়েছিল, তোর দাদার ভয়ে ওকে আসতে দেই নি। জানিস, ও খুব ভাল কবিতা লিখতো। ওর কবিতায় ভরে থাকতো ওর ফেসবুক ওয়াল। আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল শুরুতেই, আমার ছবির নীচে সব সময় ও দুই লাইনের ছন্দ লিখে দিত। ও আমাকে কী যে ভালোবাসতো রে মানসী। আমি বুকের মধ্যে ভাঙণের শব্দ শুনছি। কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, আমার ছেলেটাকে পাকিস্তানী পুলিশ বেদম পেটাচ্ছে। মানসী, আমার মেহেদী কখনও উলটো পালটা লিখতেই পারে না। আর যদি লিখেও, সেটাও নিশ্চয়ই ভদ্রতার সীমা লংঘন করবে না।

আমি অনেক কষ্ট করে ওর এক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করেছি। জানিস, বন্ধুটি জানিয়েছে, মেহেদীর পরিবারকে নাকি সরিয়ে নিয়ে গেছে কোন এক গোপন আস্তানায়। মেহেদীর কোন খবর কেউ জানে না। পারিজাত আর মানস মিলে আমার সংসারটাকে ‘অন্নপূর্ণার সংসার’ নাম দিয়েছে। মানসী, আমার ঘরে আজ দুই দিন ধরে রান্না বন্ধ। তোর দাদাকেও বলেছি মেহেদীর কথা, তারও খুব মন খারাপ। আর পারিজাতের গলার স্বর বদলে গেছে। ব্লাসফেমি আইনে নাকি ওর বিচার হবে। মানসী, আমি ধর্ম বুঝি না, আমি আল্লাহ বুঝি না, ভগবান বুঝি না, আমি যীশু, বুদ্ধ কিছুই বুঝি না, বুঝতেও চাই না। আমি শুধু আমার অদেখা ছেলেটির মুক্তি চাই। মেহেদীর মত স্কলার ছেলের গায়ে হাত তুলছে কতগুলো অশিক্ষিত আর্মি অফিসার, ভাবা যায়? আমার অন্নপূর্ণার সংসারে ছেলেটাকে আনিনি শুধুমাত্র ঐ পাকিস্তানী নরপশুদের প্রতি একাত্তরের জমে থাকা ঘৃণার কারণে।

আমার মেহেদী পারিজাতের কাছে তো নিজমুখে একাত্তরের জন্য ক্ষমা চেয়েছিল, ওর দেশের তরফ থেকে। মেহেদীর বন্ধু আমাকে জানিয়েছে, ইউনিভার্সিটির টিচারদের মধ্যে একদল টিচার নাকি মেহেদীর ব্যাপারে জেলাস ছিল। এই ছেলে অনেক কম বয়সে নানা একাডেমিক এওয়ার্ড পেয়েছে যা তারা এত বছরেও পায় নি। ওরাই নাকি ফেক ছবি ছাপিয়েছে, সব আপত্তিকর ইসলাম বিরোধী মন্তব্যসহ লিফলেট চারদিকে ছড়াচ্ছে। একেবারে আমাদের দেশের চিত্র। ব্লগারদের বিরুদ্ধে যেভাবে নোংরা লিফলেট প্রচার করা হচ্ছে, একই কায়দায় মেহেদীর বিরুদ্ধেও অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই ছেলেটা পাকিস্তানের রত্ন, আমেরিকা এসেছিল ফুল ব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে। আমার মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। কী অভাগা দেশ, এমন রত্ন যার ভান্ডারে সজ্জিত আছে, সেই কিনা আজ ধূলায় লুটায়!

আমি মেহেদীর সেই মায়াময় কন্ঠের ‘মাম্মি’ ডাক কিছুতেই ভুলতে পারছি না। আমার দুই দিন ধরে চোখে ঘুম নেই। পারিজাত অনুরোধ করেছে, মেহেদীকে নিয়ে ফেসবুকে যেন কিছু না লিখি। আমি কিছুই লিখিনি, আবার লিখেছিও। আমি আমার বন্ধুদের কাছে মেহেদীর জন্য দোয়া চেয়েছি। তোর কী মনে হয়? আমার মেহেদী সুস্থদেহে ফিরবে তো! কিরে, ফিরবে না? ও যে বলেছিল, আমাকে দেখার জন্য আমেরিকা আসবে। আমি তো কখনও কারো খারাপ চাই না। আমি শুদ্ধমনে, চোখের জলে ভগবানের কাছে প্রার্থণা করে চলেছি, “মেহেদীকে মুক্ত করে দাও ভগবান, আমাকে ও মাম্মি ডেকেছে, আমার বুকের ভেতর ক্ষরণ হচ্ছে, মায়ের ক্ষরণ। ওকে রক্ষা করো জালিমদের হাত থেকে। আমি যেন আবার শুনতে পাই, ওর কাছ থেকে সেই ভরাট গলায় ‘মাম্মি’ ডাক। আমার এত সাধের ‘অন্নপূর্ণার সংসার’ যেন আবার এই তরুণ-তরুণীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে।

অনেক কথা লিখে ফেললাম। আমার মন ভালো নেই। আমি খুব কাঁদছি। বিপদগ্রস্ত সন্তানের জন্য মা যেভাবে কাঁদে। জাহানারা ইমামের ভেতর কী বেদনা চাপা ছিল তা যেন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছি। তোর গল্পের সেই খালাম্মার অন্তরের বেদনা টের পাচ্ছি। আমার জন্য দোয়া করিস।

ভাল কথা, লাড্ডু যেভাবে পরম যত্ন করে খুঁটে খুঁটে খেয়েছিস, আমার লাড্ডু বানানো সার্থক হয়েছে। তবে এত রাত অবধি জেগে থাকিস না বোন। আমাদের বয়স হচ্ছে, শরীর ভাঙ্গার সময়। শরীরটাকে ভাঙতে দিস না। আগের চিঠিতে লিখেছিলাম, তুই অংকে কাঁচা রয়ে গেছিস। আমার কথা তুলে নিচ্ছি। ঘড়ির সময় যেভাবে দিয়েছিস, আমি মুগ্ধ হয়েছি। তোর ওখানে যখন রাত ১:৩৫:২৩ সেকেন্ড, আমার এখানে তখন ২:৩৫:২৩ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তুই লিখেছিস ২:৩৫:৪২। অর্থাৎ এই কটা শব্দ টাইপ করতে গিয়ে তোর সময় লেগেছে ১৯ সেকেন্ড। দারুণ দেখিয়েছিস, অংকেও মাথা খুলেছে, টাইপিং স্পীডও দারুণ বেড়েছে।

স্বাধীনতা দিবসের রক্তিম গোলাপ শুভেচ্ছা তোর জন্য।

পারমিতা

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • আজিম হোসেন আকাশ
    আজিম হোসেন আকাশ বেশ ভাল লাগল।
    প্রত্যুত্তর . ৪ এপ্রিল, ২০১৩
  • ম তাজিমুল ইসলাম
    ম তাজিমুল ইসলাম ভাল লাগলো..............
    প্রত্যুত্তর . ৪ এপ্রিল, ২০১৩
  • সুমন
    সুমন চিঠি, কতটা আবেগ ধারন করতে পারে সেটা আনার গল্পগুলো পড়লে বেশ বুঝতে পারি। অনেক ভাল লাগল গল্প।
    প্রত্যুত্তর . ৪ এপ্রিল, ২০১৩
  • এফ, আই , জুয়েল
    এফ, আই , জুয়েল # সরল রৈখিক গল্প । ফ্রী ষ্টিইলে লিখতে লিখতে অনেক বড় হয়ে গেছে-----, পাঠক যেভাবে পারে পড়ে নিবে---এই আর কি । অভিজ্ঞতা , সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবোধের মিশেলে এক দারুন প্রকাশ । হৃদয়ের গভীর স্তরের ভাবনা মেশানো এ গল্পের মানবিক ও শিক্ষনীয় দিকটা অতি চমৎকার । =...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৮ এপ্রিল, ২০১৩
    • রীতা রায় মিঠু আমার জুয়েল ভাই ফ্রী স্টাইলে অনেক বড় গল্পটি পড়েছে, এতেই আমি ধন্য হয়েছি। হা হা হা! আমার একটি সুপ্ত ইচ্ছে আছে, তা এখানে উপত করে দিচ্ছি। আমার অবসর বলে কিছু নেই, অদূর ভবিষ্যতে অবসর পাওয়ার কোন সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছি না। তাই যা লিখবার মন চায়, এক সিটিং এই লিখে ফেলি। যা লিখি, সবই বাস্তবকে ঘিরে লিখি, কল্পনাশক্তি খুবই কম। তাই ডকুমেন্ট হিসেবে থাকুক, কারো না কারো উপকারে আসবে, এই আশায় আমার প্রিয় পাঠক ভাইবোন গুলোর ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাচ্ছি!!!
      প্রত্যুত্তর . ৯ এপ্রিল, ২০১৩
  • আরমান হায়দার
    আরমান হায়দার অনেকদিন পর গল্প পড়লাম। খুব ভাল লাগল।
    প্রত্যুত্তর . ১০ এপ্রিল, ২০১৩
    • রীতা রায় মিঠু কেন আরমান ভাই, অনেকদিন পর কেন পড়লেন আমার লেখা গল্প? আমি আগের মত নিয়মিত ঢুকতে পারছি না গল্প কবিতায়, তাই কারো লেখাতে মন্তব্য করাও হচ্ছে না। বর্তমান প্রজন্ম আন্দোলন নিয়ে কী যে এক মায়ার জালে জড়িয়ে গেলাম, আমার অন্দর-বাহির সব একাকার হয়ে গেছে! আমি আপনাদের সকলের কাছে অপরাধী হয়ে আছি। কারোর লেখাই পড়ে দেখার সুযোগ পাচ্ছি না। তবে আপ্রাণ চেষ্টা করছি গল্প কবিতার আসরে ফিরে আসতে।
      প্রত্যুত্তর . ১৫ এপ্রিল, ২০১৩
  • তাপসকিরণ রায়
    তাপসকিরণ রায় গল্পের সারাংশে মার কথা বুকে বড় বাজে--মায়ের কথা মনে পড়ে যায়--আপনার গল্পের মা তো বিশ্ব জননীর সমকক্ষ--গল্পটি বড় মর্ম গাঁথা হয়েছে।ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ১৩ এপ্রিল, ২০১৩
    • রীতা রায় মিঠু শুভ নববর্ষ দাদা! জানিনা, কেন যে আমার কথায়, লেখায় শুধুই 'মা' চলে আসে, বুঝি না। ব্যাপারটি ধরতে পেরেছেন, আমি কৃতজ্ঞ!
      প্রত্যুত্তর . ১৫ এপ্রিল, ২০১৩
  • খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি
    খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি আমি মাঝে মাঝে অবাক না হয়ে পারিনা রিতাদি .... আপনার প্রতিটি লেখায় একটা রিতা রিতা গন্ধ থাকে যা কিনা একজন লেখবের খুবই দরকারী বিষয়.....আপনার মন্তব্য কিম্বা মন্তব্যের উত্তর যাই বলিনা কেন সব খানেই আপনার সতন্ত্র ভাব প্রকাশ পায়.....খুব ভাল লাগলো এক কথায় মুগ্ধ হলা...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১৪ এপ্রিল, ২০১৩
    • রীতা রায় মিঠু হা হা হা!! জ্যোতি দাদা গো!!!!!! আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম যে! এত বেশী প্রশংসা পেয়ে যদি আত্মহারাই হয়ে যাই, তাহলে এরপর আমার লেখায় তো কোন রিতা রিতা গন্ধ থাকবে না!! হা হা হা !! অনেক ধন্যবাদ জ্যোতি দাদাভাই, অনেক ধন্যবাদ। কী যে সব মন কাড়া মন্তব্য করেন!!
      প্রত্যুত্তর . ১৫ এপ্রিল, ২০১৩
  • মোঃ আক্তারুজ্জামান
    মোঃ আক্তারুজ্জামান জ্যোতি ভাই ঠিক বলেছেন, দিদি আপনি নিজেকে সার্থক স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। আপনার প্রতিটি লেখাই তাই অনন্য হয়ে উঠে। অনেক শুভ কামনা।
    প্রত্যুত্তর . ১৬ এপ্রিল, ২০১৩
  • নিলাঞ্জনা নীল
    নিলাঞ্জনা নীল অসাধারন লাগ্ল গল্পটা !
    প্রত্যুত্তর . ১৯ এপ্রিল, ২০১৩
  • মিলন  বনিক
    মিলন বনিক আপনার পত্র টাইপের আত্মজীবনীমূলক গল্পগুলো ভীষণ ভালো লাগে....ভালো লাগাটা অনেক বেশি কারণ জীবন ঘনিষ্ট চরিত্র গুলো খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠে আপনার মোহনীয় জাদুতে....অনেক অনেক ভালো লাগা আর শুভেচ্ছা....
    প্রত্যুত্তর . ২৯ এপ্রিল, ২০১৩

advertisement