লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৬৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftদুঃখ (অক্টোবর ২০১৫)

স্থায়ী ঠিকানা
দুঃখ

সংখ্যা

রীতা রায় মিঠু

comment ১১  favorite ০  import_contacts ১,৩৯৭
স্থায়ী ঠিকানা

প্রতিদিন সকাল সাতটায় ‘টিং টং, টিং টং’ ছন্দে বালিশের পাশে রাখা এলজি নিওনে অ্যালার্ম বেজে উঠে, আজও বাজলো। ঘুম চোখে আলতো করে বাটনে চাপ দিয়ে জয়া নিওনের অ্যালার্ম অফ করে দিল। চোখ বন্ধ রেখেই টের পেল সুজিত বিছানায় নেই, রান্নাঘর থেকে চায়ের কাপে চামচ নাড়ার টিং টিং শব্দ ভেসে আসছে, চায়ের কাপে চামচ নাড়ার শব্দটি জয়ার খুব প্রিয়। উইক ডে’র সকালে অফিসে বেরোবার আগে সকালের চা টুকু সুজিতই বানায়। উইক এন্ডে চা বানায় জয়া।

চোখ বন্ধ রেখেই একটুক্ষণ ভাবলো জয়া, “আজ কি বার? আজ বুধবার। ক’টায় যেতে হবে কাজে? আজ তো আমার অফ ডে, কাজে যেতে হবেনা, ইয়াহু! আজ আমাকে কাজে যেতে হবেনা। ইস! কী মজা, আজ সারাদিন বিছানায় থাকবো, রাঁধবোনা, খাবোনা, চুলও বাঁধবোনা”।
কোলবালিশটাকে বুকে জড়িয়ে জয়া পাশ ফিরে শুলো। অন্যদিন ঘড়িতে টিং টং বাজতে শুরু করলেই জয়া বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়ে। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে রেডি হতে হয়, কারণ সকাল আটটায় ওকে অফিসে লগ ইন করতে হয়। সকালের ঘুম জয়ার খুব প্রিয়, কিন্তু গত দশ বছর যাবৎ সকালটুকু শান্তিতে ঘুমাতে পারেনা জয়া। দশ বছরের উপর জয়া চাকুরী করছে লোকাল পত্রিকা অফিসে, সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে ছুটি নেই। প্রতিদিন সকাল আটটায় ওকে ডেস্কে বসতে হয়, অফিসের হিসেবপত্র নিয়ে কাজ ওর, মূলতঃ কেরানির আজ। শনি, রবিতেও ছুটি নেই। এই নিয়ে জয়ার মনে অনেক দুঃখ, বরের সাথে উইকএন্ডে একটু সিনেমায় যাবে, শপিং-এ যাবে নাহয় সমুদ্র সৈকতে, সে উপায় নেই। ওর অফ ডেগুলো সাধারণতঃ সোম বা বুধবার ধরে হয়, কোন কাজে আসেনা। তাই অফ ডে’তে জয়ার আলাদা কোন প্রোগ্রাম থাকেনা। ঘড়ি না ডাকলে জয়ার সকালের ঘুম ভাঙ্গবেনা, ঘড়িতে সকাল সাতটার পারমানেন্ট অ্যালার্ম সেট করা আছে, অফ ডেতেও সকাল সাতটায় ঘড়ি ডেকে ওঠে, জয়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছু করারও নেই, বাস্তবতাকে মেনে নেয়া ছাড়া।

সেদিন জয়া ফেসবুকে লিখেছিল, “ প্রতি সকালে ঘুম ভেঙ্গেই ভাবি, আজ কি বার? আজ কখন কাজে যেতে হবে? আমি কি লেট হয়ে গেলাম? কাজে যেতে হবে মনে হলেই রাতে দেখা সুন্দর স্বপ্নের কথা ভুলে যাই। যেদিন অফ ডে থাকে, সেদিন মনে হয়, আজ আমি দাতা কর্ণ! কেউ এসে যদি আমার বিশাল শাড়ির ভান্ডার থেকে একখানা শাড়ি চায়, তাকে আমি তক্ষুণি তিনখানা শাড়ি দিয়ে দেব। তিনখানা কেন? কারণ তিন আমার জন্য শুভ নাম্বার, আমি বাপ মায়ের তিন নাম্বার সন্তান, শ্বশুর শাশুড়ির তিন নাম্বার বৌমা, এস এস সিতে মেয়েদের মধ্যে তৃতীয় হয়েছিলাম, আন্তঃস্কুল প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় তিন বার প্রথম স্থান পেয়েছি, গত তিন বছরে তিন খানা উপন্যাস লিখেছি। ওহো, আরেকটা তিনের গল্প আছে, লেখকডটকম নামের একটি নামকরা ওয়েবসাইটের গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় সাহিত্যের ছাত্রী না হয়েও তিনবার প্রথম স্থান পেয়েছি। তাহলে কি দাঁড়ালো, তিন আমার জন্য শুভ নাম্বার”।


এসব এলোমেলো ভাবনায় জড়িয়ে জয়া বিছানা ছাড়তে একটু গড়িমসি করছিল, ‘গল্প লেখায় তিনবার প্রথম হয়েছি’ মনে হতেই জয়ার মনে পড়ে গেলো, আজ বেলা বারোটা বাজবার আগেই লেখকডটকমে নতুন লেখা গল্পটি জমা দিতে হবে। বারোটার পর গল্প জমা দেয়ার সময়সীমা পেরিয়ে যাবে।



লেখকডটকমে লগ ইন করে মেসেজ বক্স ওপেন করতেই জয়ার চক্ষু স্থির হয়ে গেলো, ইনবক্সে পাঁচটি মেসেজ জমা হয়েছিল। একটি মেসেজ এসেছে লেখকডটকমের এডমিনের কাছ থেকে। প্রায় এক মাস আগে এডমিন থেকে এই বার্তা এসেছে, জয়া এতদিন ওয়েবসাইটে লগ ইন করেনি বলে বার্তাটি চোখে পড়েনি। বার্তাটিতে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন হুমকী আছে।
“ সম্মানিত লেখক, আপনার ব্যক্তিগত প্রোফাইলে আপনার স্থায়ী ঠিকানা, ফোন নাম্বার যোগ করুন, নইলে এরপর থেকে আপনার কোন লেখা আমরা ছাপবোনা”।





তিন বছর ধরে এই ওয়েবসাইটে জয়া লিখছে, সত্যি কথা বলতে কি, জয়ার গল্প লেখার শুরু এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। একাউন্টিং এর ছাত্রী জয়া, স্কুল জীবনে প্রবন্ধ লিখেছে অনেক কিন্তু গল্প-কবিতা কখনও লিখেনি। কলেজ-ভার্সিটিতে গতানুগতিক লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে, অন্য কোনদিকে নজর দেয়ার সুযোগ মেলেনি। সাধারণ মধ্যবিত্তের সংসারে বাবার কড়া নির্দেশ ছিল, “ মন দিয়ে লেখাপড়া করতে হবে, শখের ডিগ্রি নয়, কাজের ডিগ্রি নিতে হবে। আমি তোমাদের জন্য বাড়ি, গাড়ি, জমিজিরেত রেখে যেতে পারিনি, ভাড়াবাড়িতে কাটিয়ে গেলাম সারা জীবন, তোমাদের জন্য স্থায়ী কোন ঠিকানাও রেখে যেতে পারলামনা। আমি চাই, নিজের যোগ্যতাবলে স্থায়ী ঠিকানা তোমরা নিজেরাই খুঁজে নিবে”।


যদিও ভাড়াবাড়ি তবুও ছোটবেলা থেকেই মোক্তারপাড়ার এই ভাড়া বাড়ীটাকেই জয়া নিজের বাড়ি হিসেবে জানতো। এই বাড়ির ঠিকানায় এক সময় সকল চিঠিপত্র আসতো, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে রেজিস্ট্রেশান করার সময়, পাসপোর্ট করার সময়, বিয়ের কার্ডে ২২ নং জে সি দেব রোড, মোক্তারপাড়া, কিশোরগঞ্জ লেখা হয়েছে। জয়াদের গ্রামের বাড়ি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচাতে সকলে ইন্ডিয়া চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবাই ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এসে দেখে, বাড়িতে অন্য লোক। কাউকেই জয়ার দাদু চিনেনা, প্রতিবেশী জোবেদ আলীর কাছে জানতে পারে, জয়ার দাদুরা চিরতরে ইন্ডিয়া চলে গেছে ভেবে ফজল মাতবর জয়াদের বাড়ির দখল নেয়। নিজের গরীব আত্মীয় স্বজন দিয়ে জয়াদের বাড়ি ভর্তি করে ফেলে।

ফজল মাতবরের সাথে দেখা করার পর ফজল মাতবর জয়ার দাদুর পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, “ বাবু, আপনারা ছিলেননা, আপনার এমন সুন্দর বাড়ি যেন দশজনে লুটে পুটে না নিতে পারে, সেইজন্যই আমি গ্রাম থেকে আমার ভাইয়ের পরিবারকে এনে এই বাড়িতে পাহারা বসিয়েছিলাম। এখন আপনারা চলে এসেছেন, আপনাদের বাড়ি আপনাদের হাতেই তুলে দিব। তবে এতদিন ধরে এরা আছে, নতুন ঠিকানা জোগাড় না করা পর্যন্ত যদি এদের থাকবার অনুমতি দেন, বুঝেনইতো, ওরা এতদিন পাহারা দিয়ে রেখেছে, বাড়ির উপর কিছুটা আবদার তো জন্মাইতেই পারে।“

জয়ার দাদু, কাকা, পিসীদের জন্য উত্তর দিকের একটা ঘর ওরা ছেড়ে দিয়েছিল, অন্য জায়গায় ঘর জোগাড় হলেই ওরা চলে যাবে বলেছিল। কিন্তু ওদের ঘর জোগাড় হয়নি কোনদিন, এক রাতে জয়ার ছোট পিসীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা। দুই দিন পর জয়ার দাদু ছোট কন্যাকে অর্ধ নগ্ন অবস্থায় দেখতে পায় গোয়ালঘরের পিছনে, মাথা নীচু করে বসে আছে।

জয়ার মনে আছে স্পষ্ট, দাদু কেমন উদভ্রান্তের মত ছুটে এসেছিল জয়াদের শহরের বাড়িতে। সেটাই দাদুর সাথে শেষ দেখা, বাবার সাথে দাদুর কিছু গোপন বৈঠক হয়েছিল, কয়েক মাস পর জয়া শুনতে পায়, দাদু-ঠাম্মারা ইন্ডিয়া চলে গেছে। তখন থেকে জয়াদের গ্রামের বাড়ি ‘নাই’ হয়ে যায়, হারিয়ে যায় স্থায়ী ঠিকানা।





জয়ার শ্বশুরবাড়ি জামালপুর, শ্বশুরবাড়িতে সুজিতের মেজদাদা অজিত থাকতেন পরিবার নিয়ে। বাকীরা সকলেই ইন্ডিয়াতে থাকে। সুজিতরা তিন বোন তিন ভাই। সুজিত সবার ছোট। বিয়ের আগে সুজিত বলেছিল, মেজদাদা বাদে ওর অন্য দাদা-দিদিরা দেশভাগের আগেই ইন্ডিয়াতে চলে যায়, সুজিত আর ওর মেজদা অজিতকে নিয়ে বাবা-মা গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুজিতরাও ইন্ডিয়া চলে গেছিলো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাবা-মা ফিরে আসেননি, সুজিত আর অজিত ফিরে এসেছে। ওরা এসে দেখে, শূন্য ভিটে, শূন্য উঠোনে দুই চারটা তক্তা, টিন পড়ে আছে। কে বা কারা যেন ওদের দোচালা ঘরের বেড়া খুলে নিয়ে চলে গেছে।

দুই ভাই আবার নতুন করে ঘর বাঁধে, সুজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, অজিত গ্রামে থেকে যায়। অজিত বিয়ে করে, সংসারে তিনটি ফুটফুটে বাচ্চাও জন্ম নেয়। বড় ছেলে রাজন লেখাপড়াতে খুব মেধাবী ছিল, ক্লাস ফাইভে গ্রামের স্কুল থেকেই টেলেন্টপুলে বৃত্তি পায়। ও যখন ক্লাস সিক্সে পড়ে, খেলার মাঠে গ্রামেরই এক ছেলের ছোঁড়া গুলতির গুলী এসে লাগে ওর মাথায়। বেকায়দায় লেগেছিল নিশ্চয়ই, কারণ রাজন ওখানেই মারা যায়। ছেলের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে অজিত আর তার স্ত্রী পাগলপ্রায় হয়ে যায়। ঠিক ঐ সময়টাতেই সুজিতের সাথে জয়ার বিয়ে হয়।

শ্বশুরবাড়িতে জয়া গিয়ে দেখে তিন ভিটে ফাঁকা পড়ে আছে, শুধু এক ভিটের উপর বেড়ার তৈরী ঘর। জয়ার খারাপ লাগেনি, তবুওতো নিজেদের বাড়ি, বাপের ভিটে। জয়াদের তো সেটিও নেই। শ্বশুরবাড়িতে সুজন আর সীমা নামের দুটি শিশুকে দেখে জয়ার ভাল লেগে যায়। ওরাও নতুন কাকীমাকে পেয়ে খুব খুশী হয়। ধীরে ধীরে ফাঁকা ভিটেয় পাকা দালান তৈরী হয়, বছরে তিন চারবার জয়া শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসে।
রাজনের মৃত্যুর পর অজিত এবং তার স্ত্রী বাকী দুই ছেলেমেয়েকে খুব বেশী আদর আহ্লাদ দিয়ে বড় করতে থাকে। আদর পেয়ে সুজন ধীরে ধীরে বখে যায়। পাশের বাড়ির আমজাদ মেমবারের মূর্খ কন্যা সখিনার সাথে মহব্বত হয়ে যায় এবং সখিনাকে নিয়ে একদিন সুজন উধাও হয়ে যায়।
জয়ারা তখন ঢাকায় থাকে, জামালপুর থেকে এক গ্রামবাসী সুজিতকে ফোন করে জানায়, “ শীগগীর গ্রামে আসো, তোমার দাদা-বৌদিরে বাড়ি ঘেরাও দিয়া রাখছে আমজাদ মেমবারের লোকজন, মাইরা ফালাইবো। সুজন আর সখিনারে পাওয়া যাইতাছেনা। দুইডায় পলাইছে।“

জয়া এখন আর সেসব কথা মনে করতে চায়না। কী ভয়ংকর দিন পার করেছে ওরা। ফোন পেয়ে সুজিত জামালপুর রওনা দিয়েছে, সুজিতকে জয়া একা ছাড়তে চায়নি। ও নিজেও সাথে গেছে, গিয়ে দেখে কী হট্টগোল চারদিকে। থমথমে অবস্থা, সুজিতকে দেখা মাত্র গ্রামের লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়, “ সুজিত আইছো, তাড়াতাড়ি কিছু বিহিত করো, নাইলে অজিতরে ওরা মাইরা ফালাইবো”।

একসময় আমজাদ মাতবরের বউয়ের সাথে অজিতের বউয়ের খুব দোস্তানি ছিল। তখন মাতবর জীবিত ছিলেন, জয়াদের ঢাকার বাসায় কয়েকবার বেড়াতেও গেছিলেন। মাতবরের মৃত্যুর পর মাতবরের বউ হয়েছে মাতবরের চেয়েও এক কাঠি উপরে। যাই হোক, সেই বিকেলেই সুজিতদের বাড়ির উঠোনেই উপস্থিত মানুষদের সভা বসে। কিন্তু সেই সভায় আমজাদ মাতবরের বউ দোস্তানি ভুলে গিয়ে অজিতের বউকে গালিগালাজ করতে থাকে আর বলতে থাকে, “ মালাউনের বাচ্চার এত্ত বড় সাহস, আমার বেডিরে লইয়া ভাগছে, আমার বেডিরে আমি ফেরত চাই, নাইলে মালাউনের বাচ্চার কল্লা লইয়া ছাড়মু, আপনেরা সবাই আওয়াজ দেন”।

গ্রামবাসীরা হই হই করে উঠলো, কেউ কেউ বলল, “নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর”। এসব দেখে জয়ার তখন ভয় লাগছিল, জেদও লাগছিল জায়ের উপর। ছেলেকে আহ্লাদ দিয়ে মাথায় তুলে ফেলেছে, এখন ঠেলা সামলাও। উত্তেজিত জনতার নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর ধ্বণিতে কেমন যেন হিসহিসানি ভাব থাকে, কিছুটা হিংস্রতা থাকে, ভয়ে জয়ার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। গ্রামবাসীর কারো মুখের দিকে তাকাতে সাহস হয়না, মনে হয় চোখে চোখ পড়লেই জয়াকে ওরা টেনে হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে চাপাতি দিয়ে গলা কেটে ফেলবে। সুজিত এই গ্রামের অহঙ্কার, মেট্রিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিল, পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছিল, এই গ্রামের নাম লেখা হয়েছিল। সুজিতকে গ্রামবাসী খুব ভালোবাসে, সুজিতের দাদা বলেই এখনও জিত আর তার বউয়ের উপর আক্রমণ করেনি, নাহলে এতক্ষণে উঠোনে অজিত আর তার স্ত্রীর লাশ পড়ে থাকতো।


জয়া এগিয়ে গেলো আমজাদ মাতবরের রাক্ষুসী চেহারার বউটার কাছে। বউয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, “ আপা, আপনি শান্ত হোন, আপনার যেমন মেয়ে, আপনার দোস্তানিরও ছেলে। ছেলে-মেয়ে মহব্বত করেছে, বাপ-মায়ের কষ্টের কথা ভাবেনি। আপনার দোস্তানি কি ছেলেকে শিখিয়ে দিয়েছে আপনার কন্যার সাথে প্রেম করতে? প্রেম হইছে দুই জনে, ভেগেও গেছে দুইজনে, দোষ যা কিছু তার সবই দুইজনের। ছেলে যেমন বড়, আপনার মেয়েও সাবালিকা, তাদের অপকর্মে বাপ মায়েরা দায়ী হয় কেমনে? আপনে বলবেন যে ছেলেরে তারা ভাল শিক্ষা দেয় নাই। আপনিত মেয়েরে ভাল শিক্ষা দিছেন, তবুও মেয়ে কেন হিন্দু ছেলের সাথে পালিয়ে গেল?

ভয়ংকরী বলে উঠলো, “ ছোট বৌদি, আপনার নিজেরও মাইয়া আছে, আপনার জায়েরও মাইয়া আছে, আপনেরা নিশ্চয়ই বুঝতাছেন মাইয়া হারানোর যন্ত্রণা”।

জয়া বলেছিল, “ আপা, অবশ্যই বুঝতে পারছি আপনার কষ্ট। সন্তান না হওয়া যেমন কষ্টের, সন্তান হলেও কষ্টের। এখন মনে হচ্ছে, আপনার দোস্তানির সন্তান না হলেই ভাল ছিল। এক ছেলে অল্প বয়সে মারা গেল গুলতির আঘাতে, ছোট ছেলে হয়তো মারা যাবে আপনার লোকজনের চাপাতির আঘাতে, বাকী থাকলো সীমা। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মেয়েটাকে নিশচয়ই কেউ না কেউ পাটক্ষেতে নিয়া ইজ্জত নষ্ট করবে, তাহলে আপনিই বলেন, আমার জায়ের সন্তান নাহলেই ভাল ছিলনা?

-বেডা মাইনষের ক্ষতি হয়না, আমার মাইয়ার ইজ্জতের দাম কে দিব? আর কেউ ওরে বিয়া করব?

সাথে সাথে মাতবরের শালা বলে উঠলো, আমগোর মাইয়ারে অন্য জায়গায় বিয়া দেওনের দরকার কি, সুজইন্নারে খতনা কইরা মৌলবী দিয়া মুসলমান বানায় দিলেই মামলা ডিশমিশ, কী কন আপনেরা?

গ্রামবাসি মজা দেখতে এসেছে, এমন মজার প্রস্তাব শুনে তারা উল্লাস প্রকাশ করলো।

জয়া চাইছিল মাতবরের বউকে ঠান্ডা করতে, বলেছিল, আপা, আমিও মা, আপনি নিজেও মা, আপনার ক্ষতি আমি বুঝতে পারছি, আপনিও চেষ্টা করুন আপনার দোস্তানির ক্ষতি বুঝার।

-এত কথা বুঝিনা, আমি মাইয়া চাই, ক্ষতিপূরণ চাই।

-অবশ্যই আমরা সব সামাল দেয়ার চেষ্টা করব, তার আগে আপনার লোকজনকে সরে যেতে বলুন। ঘরের ভেতর তিনটি মানুষ গতকাল থেকে বন্দী, খাওয়া নেই, ঘুম নেই, প্রস্রাব পায়খানা করার উপায় নেই। এটা কেমন নিষ্ঠুরতা?

এরপর আমজাদ মাতবরের বউয়ের সাথে রফা হয়, সুজিতদের ধানী জমিগুলো মাতবরের মেয়ের পক্ষে মেয়ের মা’কে লিখে দেয়া হয়। মাতবরের বউ তার লোকজন সরিয়ে নিয়ে যায়। মাতবরের লোকজন জানতো সুজন আর মাতবরের মেয়ে কোথায় আছে, জমি আদায়ের পরেই লোকজন গিয়ে মাতবরের মেয়েকে নিয়ে আসে, সুজনকে অবশ্য সেখানে পাওয়া যায়নি। সুজন কোথায় গেছে কেউ বলতেও পারেনি। জয়ার মনে সন্দেহ জাগে, সুজন কি আসলেই মেমবারের মেয়েরে নিয়া ভেগে গেছে নাকি সুজিতদের জমি জিরেত আত্মসাত করার পরিকল্পনায় সুজনকে স্কেপগোট বানানো হয়েছে? সুজনকে মেরে ফেলেনিতো?

অজিতের বউ পরিবার পরিকল্পনা অফিসে চাকরী করতো, ভয় পেয়ে সেই চাকরী ছাড়তে বাধ্য হয়। সীমা কাঁদে, অজিত বাবু ভয় পায়, পরিবার পরিকল্পনা অফিসেরই এক ছেলে রশিদ অজিতের বউকে প্রস্তাব দেয়, তাকে যদি বাড়ির একটা ঘরে থাকতে দেয় তাহলে সে রাত জেগে বাড়ি পাহারা দিবে। অজিতের বউ রাজী হয় এবং রশিদ বাড়িতে ছেলের মত থাকতে শুরু করে।


এতবড় ঘটনা সুজিতের অন্তর দগ্ধ করে ফেলে, দেশের বাড়ির প্রতি সুজিতের ছিল রক্তের টান। ভাতিজার এমন ঘটনায় সুজিত গ্রামের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং আমেরিকা যাওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করে। ফরম ফিল আপ করার সময় স্থায়ী ঠিকানার ঘর পূরণের সময় সুজিত দ্বিধাগ্রস্ত হয়, গ্রামের বাড়ির ঠিকানা দিতে গেলে কলম থেমে যায়। গ্রামের ঠিকানা নিয়ে এক সময় জয়ার সাথে অহঙ্কার করতো।
বিয়ের পর জয়ার পাসপোর্ট করানোর সময় স্থায়ী ঠিকানার ঘরে অভ্যাসবশতঃ জয়া ২২ নাম্বার জে সি দেব রোড, মোক্তারপাড়া, কিশোরগঞ্জ লিখেছিল, সুজিত বলেছিল, “ ভাড়াবাড়ি আবার স্থায়ী ঠিকানা হয় নাকি? স্থায়ী ঠিকানার ঘরে আমাদের গ্রামের ঠিকানা দাও”। জয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেছিল, বলেছিল, “ ছোটবেলা থেকে ঐ বাড়িতে আছি, ওটাই স্থায়ী ঠিকানা মনে করতাম”।
সুজিত বলেছিল, “ ভাড়া বাড়ি হলো বর্তমান ঠিকানা, পিতৃভূমি হলো স্থায়ী ঠিকানা।“
খুব আহত মনে জয়া বলেছিল, “ আমারও পিতৃভূমি ছিল, বেদখল হয়ে গেছে, এখন আমার কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই।“

ফরমে স্থায়ী ঠিকানা লিখার সময় সুজিতকে ইতস্তত করতে দেখে জয়া বলেছিল, “সুজিত, ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনলে কেমন হয়? মাতবরের বউ ধানি জমি নিয়ে নিল, রশিদ ভিটেয় খুঁটি গেড়েছে, আমাদের তো স্থায়ী ঠিকানা বলে আর কিছু নেই। এসো, ঢাকা শহরের একতি ফ্ল্যাটে আমরা স্থায়ী ঠিকানা তৈরী করি।“

ফ্ল্যাট কেনার কথা সুজিত ভাবছিল, নামী ডেভেলপারের সাথে কথা বলা শুরুও করেছিল, ২০০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটের দাম চেয়েছিল পঁচিশ লাখ টাকা। পনেরো বছর আগে পঁচিশ লাখ টাকা খুব সস্তা ছিলনা।

ঠিক এমন সময় আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকুরীটা সুজিত পেয়ে যায়। বুক ভরা অভিমান নিয়ে সুজিত নিজের পরিবার নিয়ে আমেরিকা চলে আসে, পেছনে ফেলে আসে স্মৃতিময় স্থায়ী ঠিকানার মায়া। আর যোগাযোগ রাখেনি গ্রামের বাড়ির সাথে, তবে গ্রামেরই এক বন্ধুর মারফত জানতে পেরেছে, রশিদ নামের ছেলেটি বাড়ির অর্ধেকের বেশী জুড়ে পাঁচিল তুলে নিজেকে বাড়ির ঐ অংশের মালিক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। অজিতের মেয়েটি গ্রামের বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে পাবনা মাসীর কাছে, সেখানে থেকেই লেখাপড়া করেছে। ছোটখাটো একখানা চাকরীও পেয়েছে। মেয়েটি খুব সুশীলা, খুব ভালো একটি ছেলের সাথে পরিচয় হয়, নিজেরাই মন্দিরে গিয়ে বিয়ে সেরে ফেলে। ঢাকা শহরেই একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে ওরা।

কিছুদিন আগে ফেসবুকেই জয়াকে খুঁজে পায় সীমা, নিজের কথা, বিয়ের কথা কাকীমাকে খুলে বলে। সীমার কাছেই জেনেছে, সুজিতের মেজদাদা আর তার স্ত্রী প্রায়ই মেয়ের কাছে থাকে, সীমার বরই নাকি শ্বশুর-শাশুড়িকে গ্রামের সেই একটেরে ঘরে আর থাকতে দিতে চায় না।





বছর সাতেক আগে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এই বাড়ীটি কিনেছিল সুজিত, দলিলে জয়ার নাম প্রথমে দিয়েছে, এরপর নিজের নাম। দলিল তৈরী হওয়ার পর দলিলটি জয়ার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, “তোমার স্থায়ী ঠিকানা”।

সেদিনও জয়া মুখ কালো করে বলেছিল, “ অনেক বছর আগে পাসপোর্টে স্থায়ী ঠিকানার ঘরে আমাদের কিশোরগঞ্জের মোক্তারপাড়ার বাসার ঠিকানা লিখেছিলাম, তুমি বলেছিলে , ওটাতো ভাড়া বাড়ি, ভাড়া বাড়ি কখনও স্থায়ী ঠিকানা হয়না, ওটা হয় বর্তমান ঠিকানা। তাহলে এই যে বাড়ির দলিল আমাকে দিয়ে বললে, এটা স্থায়ী ঠিকানা। আমি যদি বলি, এটিও ভাড়া বাড়ি!

সুজিত বলেছিল, কীভাবে?

-আমরা ব্যাংকের কাছ থেকে ত্রিশ বছরের জন্য লোন নিয়ে বাড়ি কিনেছি, আরেক অর্থে আগামী ত্রিশ বছরের জন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছি।


একথায় সুজিত মুখ কালো করে বলেছিল, “ আসলে আমাদের স্থায়ী ঠিকানা নেই”।








জয়া কী বোর্ডে হাত রাখলো, টাইপ করতে শুরু করলো,


“সম্মানিত এডমিন কর্তৃপক্ষ, আমি আপনাদের ওয়েবসাইটে গত তিন বছর ধরে লিখছি। তিনবার প্রথম স্থান পেয়েছি, আরও কয়েকবার দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান পেয়েছি। আমার জন্য এ স্বীকৃতিটুকু পরম পাওয়া। লেখকডটকম আমার লেখক সত্তার উৎস, শেকড়। পুরস্কার পাব বলে কখনও ভাবিনি, লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। পুরস্কার না পেলেও হয়তো লিখতাম, কিন্তু পুরস্কার পাওয়ায় আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। ঠিকানাবিহীন আমি এই প্রথম স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি যেন।

পুরস্কার হাতে না পেলে আমারই লোকসান, কিন্তু পুরস্কার গ্রহণ করতে পারছিনা বলে আমাকে আর লিখতে দিবেননা অথবা আমার লেখা ছাপাবেননা, এমন কথা আপনাদের কাছ থেকে শুনবো, কল্পনা করিনি। আগে পত্রপত্রিকাতে কলাম লিখেছি, সম্পাদকদের মর্জির উপর নির্ভর করে কিছু লেখা ছাপা হয়েছে কিছু হয়নি। লেখা ছাপা হলে খুশী হতাম, ছাপা নাহলে কষ্ট পেতাম, মেনে নিতাম সম্পাদকদের সীমাবদ্ধতার দিকটা। কিন্তু লেখকডটকমে কোন সীমাবদ্ধতা ছিলনা, কারো মন রক্ষার ব্যাপার ছিলনা, পত্র পত্রিকায় লেখালেখি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র লেখকডটকমের ঠিকানাটুকু ধরে রেখেছিলাম।

আমি আমেরিকা প্রবাসী, দেশে আমার কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। আত্মীয় স্বজন যারা আছেন, তাদের সকলেই ভাড়া বাড়িতে বাস করেন। তাদের ঠিকানায় আমার পুরস্কার আদৌ পৌঁছাবে কিনা আমি নিশ্চিত নই। তাই তাদের ঠিকানা দিতে পারছিনা।

ঠিকানাহীন হওয়া বড়ই বেদনার, অত্যন্ত কষ্টের, ভীষণ দুঃখের। কারো স্থায়ী ঠিকানা না থাকা অপরাধের পর্যায়ে পড়েনা, এটি একটি সামাজিক এবং রাষ্ট্রিয় ব্যর্থঁতা। দেশে আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল, বাড়ি ছিল, স্থায়ী ঠিকানা ছিল। সামাজিক এবং ধর্মীয় বৈষম্যের কষাঘাতে সে ঠিকানা বেদখল হয়ে গেছে। আমার ঠিকানা বেদখল হয়ে গেছে, কিন্তু আমার মেধা, আত্মসম্মান বোধ বেদখল হয়ে যায়নি।
স্থায়ী ঠিকানা দিতে পারিনি বলে আমাকে যদি আপনাদের ওয়েবসাইটে লিখবার সুযোগ না দেন, তাতে আমি আহত বোধ করবো, কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ার যন্ত্রণায় কাতরাবো, তবুও প্রোফাইলে স্থায়ী ঠিকানা দিতে পারবোনা। যা নেই তা কোত্থেকে দেব? তার চেয়ে পুরস্কার আপনাদের জিম্মায় থাকুক, যখন দেশে বেড়াতে যাব, আপনাদের কাছ থেকে নিজ হাতে সে পুরস্কার গ্রহণ করে স্থায়ী ঠিকানা না থাকার যন্ত্রণা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য মুক্তি পাব।
গল্প লিখে ‘পুরস্কার পেয়েছি’,লেখকের জন্য পাঠকের কাছ থেকে পাওয়া এই স্বীকৃতিটুকুই অনেক বড়, এই স্বীকৃতিটুকুই আমার স্থায়ী ঠিকানা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement