স্নেহাশীষ যারা তারা ক্ষমা যোগ্য, গুরুজনের দয়া ও করুনার পাত্র। দয়া ও মাপ করে দেয়া মহত্ব, দয়া মানুষকে অভিশাপ দূর্বিসহ জীবন থেকে হালকা করে একটা স্বাধীন জীবন যাপনে সহায়ক ভুমিকা রাখে। মানবতাবোধ ও জাগ্রত বিবেকবান ক্ষমা প্রাপ্তরা নিজেকে শুধরিয়ে তুলে মানব ও সমাজকে আলোতে করে উদ্ভাসিত।
জেবিন মা বাবার বড় সন্তান। জেবিনের ছোট এক বোন আর তিন ভাই মা বাবা নিয়ে তার খুব সুখের পরিবার। অভাবহীন পরিবারের সুখের ভাগাভাগি উপভোগ করার মত। যারা লবন আনতে পান্থা যোগাড়ে ব্যর্থ তারা একটু বেশিই বিত্তবানে চিত্তের উৎকর্ষ অনুধাবনে সামর্থ্য। জেবিনের বাবা প্রবাসে ছিলেন বহুদিন। ছেলে মেয়ের সুখের কথা ভেবে তিনি সাত সমুদ্রের ওপারে রুটি রুজির সন্ধানে কাটাচ্ছেন অনেক দিবস রজনী। মাজেদ সাহেব মাঝে মাঝে দেশে আসেন স্ত্রী ও জেবিন, মন্নি, সোহাগ, মোহন, নয়নের সাথে বাবা হিসাবে সঙ্গ দেয়া আর ভালবাসায় জীবনের সুখ দু:খটুকু ভাগা ভাগি করতে। জেবিন কে বেশি ভালবাসতেন বললে ভুল হবে কারণ সব বাবা মা-ই প্রতিটি সন্তানকে সমান ভালবাসেন। কানা, বোবা, ফোড়া, লেংড়া যাই হোক সন্তান তো সন্তানই। নাড়ী ছেড়া ধন। এখানে একজনের প্রতি ভালবাসা বেশি আর এক জনের প্রতি কম এটা হয় কিভাবে ? হয় না। হয়তো কোন ছেলে মেয়ে বাবা মা-র কাছে সান্নিধ্য লাভ ও সাহচার্য্য বেশি পায় সময় ক্ষেপনে মা বাবার সঙ্গ ও বেশি ভোগ করে।
আজও কোন বাবা মাকে বলতে শুনিনি আমি আমার ঐ ছেলে বা মেয়েকে ভালবাসি না কিংবা ওঠা আমার অপ্রয়োজনীয়। সন্তানের প্রতি তুলনার সর্ব উর্দ্ধে মা বাবার ভালবাসা। এ ভালবাসার সাথে পৃথিবীর কোন ভালবাসারই পরিমাপ হয় না। যাক জেবিনের বাবা এক সময়ে দেশে ফিরে এলেন। আর প্রবাসে যাবেন না। জেবিন ক্লাশ নাইনে পড়ছে তখন। মুন্নি ক্লাশ সেভেনে। আর ছোট ভাইগুলো প্রাইমারীতে।
হঠাৎ করে মাজেদ দেশে ফেরাতে পরিবারের একটু অভাব ধাওয়া করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরেক ভালবাসার লাটি চার্জে অভাবটা জানালার ফুটো দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলো মামার বাড়ির কারণে। যুক্তরাজ্যে দশজনের ফ্যামেলী নিয়ে বসবাস করতো জেবিনের মামার পরিবার। প্রতি মাসে মামার পাঠানো একটি টাকার অংকে অভাব বলতে জেবিন দের ছিলই না। জেবিন বাড়ন্ত শরীরের এক অপরূপ সুন্দরী। গঠন ঘাটনে যে কারো মন হরণের হরিনী। স্কুল কামানোর জীবনে পাড়া, এলাকার ছেলেরা যে কত প্রেম নিবেদন করেছে তার কোন পরিসংখ্যান হিসাবের খাতায় গোনা হয়নি। উৎশৃংখল যুবকদের যন্ত্রনায় শেষ পর্যন্ত এস এস সি পরীক্ষাটাও জেবিনের কপালে জোটেনি। বড্ড কষ্ট নিয়ে জেবিন ভাবে এ কেমন পুরুষ শাসিত সমাজ ? কোথায় শাষনওয়ালা অভিভাবক শ্রেণী ? উত্তর নেই, জানি না সুদুত্তরের অপেক্ষায় আর কত থাকতে হবে পথ চেয়ে। কেন করছে না,কেন খোজ নিচ্ছেনা কেমন আছে যুবক যুবতীরা এ সমাজে। সবাই সচেতন হলে তো নারী বা যুবতীদের পুরুষ কর্তৃক এত ইভটিজিং এর শিকার হতো না কেউ। জেবিন মা বাবাকে সাফ জানিয়ে দিল সে আর লেখা পড়া করবে না। কারণ হিসাবে বলল আমার ইজ্জত ও আমার জীবনের চাইতে লেখা পড়া বড় মনে করি না। তাই হলো মা বাবার সায় সূচক সমর্তনে। জেবিন রান্না বান্নার কাজটুকু তার কাঁধে তুলে মাকে দিল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ। জীবনে পরিপূর্ণতার ডাক প্রকৃতির নিয়মেই আসে যা থেকে জেবিন ও বাহিরে নয়। মানুষ সব সময় সঙ্গী প্রবন, সঙ্গী প্রিয়। একা থাকতে পারে না একা থাকা যায় না। কাউকে কাছে পাওয়ার তাড়না অনুভব করে জেবিন। প্রেম, আবেগ, উদ্ধেগ, তাকে অতিমাত্রায় আবেগাফ্লুত করে সাথীর সন্ধানে। জানা নেই কি হবে জীবন খাতার হিসাবে, ভাল না মন্দ হবে ভবিষ্যতে যেমন অন্য দশ জনও ভাবে না। সুখ পাখি তাকে নিয়ে অজানায় উড়াল দিল। দিলো মা বাবা ভাই বোন থেকে আলাদা করে। এত সুখের সাজানো সংসার একটু ভুলে কি চিরতরে মুছে যাবে তা ছিল না জানা। অবিশ্বাস্য হলে ও মানুষের জীবনে মাত্র এক পলকে বা এক বারের দেখাতে যে প্রেম ভালবাবাসা জন্ম নেয় নিতে পারে তার উজ্জ্বল প্রমান জেবিনের জীবন বাস্তবতা। প্রবাসী এক যুুবক দেশে এসে বন্ধুর নিমন্ত্রনে জেবিনের গ্রামে যায়। দূর থেকে মাত্র দুজনের একবার দেখা বেশ এইতো ? মোবাইলের মাধ্যমে দুজনের মন বিনিময় অনেক কাছে টেনে নিয়ে আসে দু-জন কে। ভালবাসায় সম্পর্ক গড়ায় দুজনের। অভিরাম পরিবারের অলক্ষ্যে দুজনের কথা চলতো ফোনে। ছুরি করে কত থাকা যায়, ধরা তো পড়তেই হবে। জানাজানি হলো দু পরিবারেই। জেবিন জুনেদ দুজনেরই সিদ্ধান্ত বিয়ে করে ঘর বাঁধবে। বাধ সাধলো প্রথমেই জুনেদের পরিবার, তাদের কথা জেবিনে অভাবী ঘরে সম্মন্ধ করা সুখকর হবে না। প্রবাসী জুনেদ কসম খেয়ে বসলো যদি সে জেবিন কে না পায় তবে আত্ত হত্যা করে মরবে। মিথুন জুনেদের ফুফুত ভাই মাত্র দুই মাসের ছোট। ছোট থেকেই বন্ধু সুলভ পরিবেশে একে অন্যের মনের কথা শেয়ার করে বড় হয়েছে। জুনেদ মিথুনকে জানালো জেবিনের সাথে সম্পর্কের কথা। জুনেদ যা বলে তাই করে, বড় জেদি, তাই মিথুনের মনে জুনেদের সুইসাইটের কথা বার বার স্মরণ হচ্ছিল। জেবিন কে না পেলে জুনেদ...। কি করা যায়। চিন্তা করতে করতে জুনেদের পরিবারকে রাজি করিয়ে জেবিনের পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেল মিথুন, কিন্তু কোন লাভ হলো না। এখন জেবিনের পরিবার হলো উল্টো। এক কথায় তাদের আতœীয়তা এই পরিবারের সাথে হবে না।
এলাকার গন্য মান্য লোকে অনুরোধ ব্যর্থ হলে ও মিথুনের হাল ছাড়া সম্ভব নয় কারণ মিথুন হার বলতে কিছু বিশ্বাস করে না। তার চেষ্টা জেবিন জুনেদকে এক করে দেয়া পরিবারকে বুঝানো। দেখতে দেখতে জুনেদের ছুটির দিন গুলো শেষ হয়ে গেল, কিন্তু সে আর প্রবাসে যাবে না। মিথুন জুনেদকে প্রতিশ্র“তি দিলো যেমন করে হউক জেবিন কে সে পাইয়ে দিবে। মিথুনের প্রতি জুনেদের বিশ্বাস ছিল প্রবল তাই জুনেদ প্রবাশে চলে গেল। জেবিনের সাথে জুনেদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে দু-দেশে দু-জন না পাওয়ার বেদনা তে অতি কাথর। দীর্ঘ এক বছর পর জেবিন জুনেদের কৌশলে যোগাযোাগ হলে সিদ্ধান্ত নিলো যেমন করেই হোক তারা ঘর বাঁধবে। শুধু জুনেদের দেশে প্রত্যাবর্তন আর জেবিন ঘর থেকে চলে আসা, পরিবারের সবার অজান্তে বেরিয়ে আসতে হবে জেবিন কে। ভালবাসা কলংকের উর্দ্ধে। এক ঝড় তুপানের রাত্রে জেবিন বেরিয়ে এলো জুনেদের ভালবাসার ডাকে। হায় ! কি প্রচন্ড ঝড় আর বজ্রপাত। পর দিনই জুনেদ দেশে চলে আসে, এরপর কোর্টের মাধ্যমে বিয়ে করে সংসার জীবনের বৈধতা লাভ করে। সামাজিক অন্ধত্ব এবং পারিবারিক উল্টোতার কারনে জেবিন জুনেদ দুজনই পিত্রালয়ে বা শশুরালয়ে পায়নি স্থান। কিন্তু তারা দুজনই তাদের সংসার সাজায় একান্ত দুজনের মত করে। চলতেই থাকে দিনের পর দিন। কিছু দিনের মধ্যে জুনেদ জেবিন কে দেশে রেখে প্রবাসে চলে যায়। জেবিন মিথুনের সহযোগিতায় শহরের একটি ভাড়াটে বাসাতে থাকে। ভালবাসার মানুষ জেবিনের দায় দায়িত্ব জুনেদ যাচ্ছে পুরুটাই পালন করে তাদের মধ্যে কোন দু:খ নাই। বছর পর জেবিনের মায়ের সাথে সমঝোতা হলে ও বাবার সাথে হলো না। তিনির একটাই কথা জেবিন কেন এভাবে জুনেদের সাথে চলে গেল, তিনি কিছুতেই জেবিন কে ক্ষমা করতে পারছেন না। জুনেদের পরিবারতো আরো দূঢ়তর কঠিন, জুনেদকে ত্যাজ্যের তালিকায় রেখেছেন। জেবিন মাকে ফোন করে ভাই বোন ও বাবা কেমন আছে খোজ খবর রাখে। বাবার সাথে ফোনে কথা বলতে চায় কিন্তু তিনি কথা বলেন নি। মাকে দিয়ে বুঝাতে চায় তিনি বুঝতে যান না। সাহানা ও মাজেদ কে বুঝান মেয়ে দোষ করেছে ক্ষমা চাচ্ছে তাকে ক্ষমা করা মহত্ব কিন্তু তিনি শুনতে চান না। বহু কষ্টে ও চেষ্টায় ফোনে জেবিন একদিন শুধু বলল বাবা......। এই যে দু প্রান্তে কি কান্না। মাজেদ ফোন রেখে চলে গেলেন। জেবিন আবার ও চেষ্টা করছে এক বাহক দিয়ে এক টুকরা কবিতা পাঠালো বাবার কাছে যদি বাবা ক্ষমা করে দেন এই আশায়।
বাবা: সেই ছোট্ট বেলার কথা
ও গুলো আজও মনে পড়ে।
বাবা তুমি বড় করেছো আমায়
কত না যতনে আদরে।
সকালে মেঠোরোদে উঠোনে খেলা
ঝলমলে বেড়ে যেত বেলা
তাড়া তাড়ি বেনি করে দিতে
চুমুতে চুমুতে আমায় কুলে নিতে।
পাঠশালার পথে যে দিন থেকে হলো শিখন
প্রথম শিক্ষক তুমিই ছিলে তখন।
আমার যা পছন্দ ছিল, তোমার ও ছিল তাই
তুমি আমার বাবা, তোমার তুলনা যে নাই।
সেই শৈশব থেকে আজ অবদী
বাবা তোমাকে কতো শ্রদ্ধা করি।
তোমার সে আর্দশ বাণী আজও মনে পড়ে
ফেলে আসা স্মৃতি গুলো চোখের পর্দায় নড়ে।
তুমি কি সে সব ভুলে গেছো সহজে ?
সামান্য ভুলটুকু ক্ষমা করতে পারছ না আমাকে।
তোমাকে কষ্ট দেয়া অন্যায়,
বিবেক আমাকে আজ কাঁদায়
নিরবে প্রতিদিন এই বুক আমার
চোখের জলে ভেসে যায়,
তুমি কি ক্ষমা করবে না আমায় ?