যখন ছোট ছিলাম, তখন আমি ‘মা’ ‘মা’ করে মায়ের কোলে চড়েছিলাম; মাকে অনেক বিরক্ত করেছিলাম; মায়ের সাথে খুনসুটিতে মেতেছিলাম; মায়ের কাছে ছোট ছোট আবদার করেছিলাম; মায়ের কথার অবাধ্য হয়েছিলাম; খাওয়ার সময় খাবার কেড়ে নিয়ে মাটিতে ফেলেছিলাম। কিন্তু ‘মা’ আমাকে এবং আমি ‘মা-কে’ অনেক ভালবাসি।

তখন আমি তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। একদিন প্রতিবেশী এক বন্ধুর সাথে খেলাধুলা করতে গিয়ে একটু ঝগড়া করেছিলাম। ‘মা’ ঝগড়া পছন্দ করতেন না। তাই ঝগড়া করার কারণে ‘মা’ আমাকে শাসন করেছিলেন। এরপর আমি মায়ের উপর রাগ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করে ঘরের ভিতর পড়ে রইলাম। কিছুক্ষণ আমার সাড়া-শব্দ না পেয়ে ‘মা’ আমাকে খুঁজতে লাগলেন। ঘরের ভিতর এমনভাবে পড়ে থাকতে দেখে তিনি আমাকে ওঠাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। কোন হা-হুতাশ না করে তেমনি পড়ে রইলাম। ‘মা’ মনে করলেন আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছি। সাথে সাথে মায়ের চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। চিৎকার শুনে পাশের বাড়ির প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে গেল। আমাকে পড়ে থাকতে দেখে জ্ঞান ফেরানোর জন্য তাঁদের এক এক জন এক এক রকম চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো। সেই সময় ‘মা’ যে কি পরিমাণ কান্না করেছিল তা বলে বোঝাতে পারবো না। কেউ আমার চোখে-মুখে পানি ঢালছেন, আবার কেউ মুখের ভিতর লেবুর রস ও লবণের পানি দিতে চেষ্টা চালাচ্ছেন, আর কেউ কেউ আমার হাত-পা নাড়াচ্ছেন ও পাখার বাতাস করছেন। কিন্তু আমি মন দিয়ে সবার সবকিছু শুনছি আর নিজের দু-পাটি দাঁত শক্ত করে আটকে রেখেছি যাতে কেউ মুখের ভিতর কিছু দিতে না পারে । কিন্তু টানা অনেকক্ষণ চেষ্টার পর দুই-তিন জন মিলে আমার দুই দাঁতের পাটি একটু আলগা করে মুখের ভিতর লেবুর রস ও লবণের পানি দিলেন। আমি সাথে সাথে চিৎকার দিলাম ও জোড়ে নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম। লেবুর রস ও লবণের পানির তেজে দাঁতের দু-পাটি আর শক্ত করে আটকে রাখতে পারলাম না। সবাই তখন বুঝতে পারল আমার জ্ঞান ফিরেছে। সকলে বুঝিয়ে বলার পর ‘মা’ আশ্বস্ত হলেন যে, ছেলের জ্ঞান ফিরেছে । তবে ‘মা’ সেদিন অনেক কষ্ট পেয়েছিলো। এরকম একটা অভিনয় করতে পেরে সেদিন আমি খুব মজা পেয়েছিলাম । তারপর ‘মা’ আমাকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন এবং নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলেন । ‘মা’ নিজে নিজে বলতে লাগলেন, “আমার কারণে আজ ছেলেটার এই অবস্থা”। সেই ঘটনার পর থেকে ‘মা’ আর কোনোদিন আমাকে শাসন করেনি। সেই দিনের সেই ঘটনার মাধ্যমে আমি বুঝতে পারলাম যে, ‘মা’ তাঁর সন্তানকে অনেক বেশি ভালবাসেন যা পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যাবে না।

যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করার জন্য মা-কে ছেড়ে বাড়ি থেকে শহরে চলে আসি, তখন ‘মা’ যে কি তা হারে হারে বুঝতে পারি । প্রতি মুহূর্তে মায়ের কথা মনে পড়ত আর রাতে ঘুমাতে গেলে মায়ের কথা ভেবে ভেবে কান্না পেত। ‘মা’ ব্যতীত অন্য যেখানেই ছিলাম সেখানেই পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া ও আদর-স্নেহ প্রভৃতিতে কেমন যেন কৃত্রিমতার আভাস পাওয়া যেত। তখনই বুঝলাম ‘মা’ শব্দটি কেন এতো মধুর, কেন কেউ হঠাৎ কোনো ব্যথা পেলে ‘মা’ শব্দটি মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে।
‘মা’, তোমার কাছে আমি এতই ঋণী যে, সহস্র জনমে তোমার সেবা করলেও সেই ঋণ শোধ হবে না। তবে এটুকু বলতে পারি যে, আদর্শ মায়ের আদর্শ সন্তান হতে পারলেই মায়ের সেই অকৃত্রিম ত্যাগ কিছুটা সার্থক হবে। ‘মা’, তুমি ছিলে, আছো এবং থাকবে, যতদিন এই পৃথিবী নামক কিছু থাকবে। ‘মা’ আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যদি কোন একটি শব্দ উচ্চারণ করতে হয় তবে সেটি হবে .....................‘মা’।