মারুফ সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে দেখল, বাড়ির দরজায় একটা ছোট্ট সাদা খাম পড়ে আছে। কোনো ঠিকানা নেই, শুধু তার নাম লেখা—‘মারুফ’। খামটা হাতে নিয়ে তার বুকটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। স্বর্ণা রান্নাঘর থেকে ডাকল, “কী হলো? দেরি করছ কেন?”
“কিছু না,” বলে মারুফ খামটা পকেটে লুকিয়ে ভিতরে ঢুকল। রাতে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে সে বারান্দায় গিয়ে খামটা খুলল। ভিতরে একটা পুরনো ছবি। ছবিতে সে আর উর্মি। সতেরো বছর আগের। উর্মি হাসছে, তার চোখে সেই অদ্ভুত আলো। ছবির পিছনে লেখা: “আমি ফিরে এসেছি। আজ রাত দশটায় পুরনো আম গাছটার নিচে। —উর্মি”
মারুফের হাত কাঁপতে লাগল। উর্মি। লাবনীর ছোট বোন। সেই মেয়েটা, যাকে দেখে প্রথমবার তার বুকের ভিতরটা যেন উল্টে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সেই দিনগুলো। লাবনী তার বান্ধবী ছিল। উর্মি প্রায়ই আসত তাদের সঙ্গে। মারুফ কখনো সাহস করে বলতে পারেনি। তারপর একদিন উর্মিরা অন্য শহরে চলে গেল। সতেরো বছর। কোনো খোঁজ নেই। আর আজ?
স্বর্ণা ঘুমিয়ে পড়ার পর মারুফ চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ল। পুরনো আম বাগান এখনো আছে, শহরের কিনারায়। গাছটার নিচে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। উর্মি! সময় তার সৌন্দর্য কেড়ে নেয়নি, বরং একটা গভীর রহস্যময়তা যোগ করেছে।
“তুমি কেমন আছো, মারুফ?” উর্মির গলা একই রকম মিষ্টি।
“কেন এসেছ?” মারুফের গলা শুকিয়ে গেল।
উর্মি হাসল। “সতেরো বছর আগে তুমি যা বলতে পারোনি, আজ বলবে?”
মারুফ চুপ করে রইল। উর্মি একটা ছোট্ট ডায়েরি বের করল। “এটা আমার। প্রতিদিন তোমার কথা লিখতাম। কিন্তু তুমি কখনো জানোনি। আমি জানতাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো। লাবনীও জানত।”
“লাবনী?” মারুফ অবাক হলো।
“হ্যাঁ। সে আমাকে বলেছিল, ‘মারুফ তোর দিকে তাকায় যেভাবে, সেভাবে কখনো আমার দিকে তাকায়নি।’ কিন্তু তুমি কখনো বলোনি। আমি অপেক্ষা করেছিলাম। তারপর বাবা আমাদের নিয়ে চলে গেল।”
মারুফের মাথা ঘুরছিল। “তাহলে এখন কেন?”
উর্মি তার হাত ধরল। তার হাত ঠান্ডা। “কারণ আমি মরে গিয়েছিলাম, মারুফ। সতেরো বছর আগে। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে।”
মারুফ পিছিয়ে গেল। “কী বলছ তুমি?”
উর্মি হাসল, কিন্তু তার চোখে জল নেই। “তুমি যে ছবিটা দেখলে, সেটা আমার শেষ ছবি। আমি তোমাকে দেখা দিতে এসেছি। কারণ তুমি এখনো আমাকে ভুলতে পারোনি। তোমার সংসার আছে, স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। কিন্তু রাতে যখন একা থাকো, তখনো আমার নামটা মনে পড়ে।”
মারুফের শরীর কাঁপছিল। “এটা স্বপ্ন।”
“না।” উর্মি তার কাঁধে হাত রাখল। হাতটা ভারী নয়, যেন বাতাস। “আমি তোমাকে একটা সুযোগ দিতে এসেছি। বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসতে। একবার অন্তত বলো।”
মারুফের চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। “আমি... তোমাকে ভালোবাসতাম, উর্মি। আজও বাসি।”
উর্মি হাসল। তার শরীর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। “ধন্যবাদ। এবার আমি শান্তিতে যেতে পারব।”
“উর্মি!” মারুফ চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। শুধু আম গাছের পাতায় হাওয়া বইছিল।
বাড়ি ফিরে মারুফ দেখল, স্বর্ণা জেগে আছে। “কোথায় গিয়েছিলে?”
মারুফ কিছু বলতে পারল না। সে শুধু স্বর্ণাকে জড়িয়ে ধরল।
পরদিন সকালে খবরের কাগজে একটা ছোট্ট খবর বেরিয়েছিল। সতেরো বছর আগে মারা যাওয়া এক তরুণীর ছবি। নাম—উর্মি। খবরটা ছিল, তার বোন লাবনী সেই ছবিটা অনলাইনে শেয়ার করেছে, কারণ তারা উর্মির স্মৃতি খুঁজে পেয়েছে।
মারুফের হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।
সে বুঝতে পারল, গত রাতের উর্মি সত্যিই এসেছিল। শুধু একবার শেষ দেখা দিতে। আর তার অপেক্ষার অবসান ঘটাতে।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
আমার লেখা গল্পের সাথে বিষয় এর সামঞ্জস্যতা রয়েছে।
১৬ নভেম্বর - ২০১১
গল্প/কবিতা:
৮৮ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
বিজ্ঞপ্তি
“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।
প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী