লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ অক্টোবর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ২৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftসরলতা (অক্টোবর ২০১২)

সরলতার ফাঁদ
সরলতা

সংখ্যা

ইয়াসির আরাফাত

comment ১৮  favorite ০  import_contacts ৯৫৫
মাতলা নন্দিপুর গ্রামের এক সাঁওতাল ।

বয়স প্রায় ২০ এর আসে পাশে হবে ।তাঁর তেল চিটচিটে কৃষ্ণ বর্ণ থেকে একটি উজ্জল আভা দৃষ্টি গোচর হয় । কিন্তু নিজের জীবনের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা অনেক। সারাদিন ধনুক নিয়ে বোনবেড়াল ও ইদু্রের পিছু ছোটা এবং বাংলা মদ পান করে জমিদার তাঁরাচাঁদ বাবু ও ভগবানকে গালি দেয়া তাঁর নিত্য দিনের কাজ ।মাতলার মনে করে ভগবান তাঁরাচাঁদ বাবুর থেকে কয়েক বস্তা ধান ঘুষ খেয়েছে তাই মাতলার মাকে ধর্ষণের বিচার ভগবান করেনি ।মাতলার বাবার উপর মিথ্যে টাকা চুরির দ্বায় চাপিয়ে ,প্রচন্ড মারধোর করে তাঁরাচাঁদ বাবু ও তার লোকেরা । ভগবান শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছে সেই দৃশ্য , দুর্গা ,কালীরা তখন ঠুমরীর তালে অকারন নিত্যে মেতে উঠেছিলো ।মাতলা মন্দিরের ঘণ্টা বাজিয়েও ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি কোন অদৃশ্য শক্তির ।কাঠের পুতুলের মত গ্রামবাসী দেখেছে সেই দৃশ্য কিন্তু প্রতিবাদের সাহস কারো হয়নি । প্রতিবাদের সাহস হবেই বা কিভাবে ? সাপের অঙ্গ শীতল হলেও যে তাঁর বিষ কঠিন বেদনাদায়ক ।

তাছাড়া ,মাতলারা সাঁওতাল, সাঁওতালরা বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্য হলেও,এই সমাজ তাদের মনথেকে মানুষ ভাবেনি কখনো ? তাদের বলদের মত ভারী কাজ করিয়ে কুকুরের মত আলাদা প্লেট এ অল্প পরিমানে খাবার দেয়া হয় ।

সাঁওতালরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্ষেতে কাজ করে তপ্ত দুপুরে বিশ্রামের সময় বসেবসে জাল বোনে , কেউ যদি একটু সহানুভূতি দেখিয়ে বলে একটু বিশ্রাম করো দুপুর বেলা , তাঁরা উত্তর দেয় বসে বসে জাল বুনছি বিশ্রাম তো হয়ে যাচ্ছে ,মাটিতো খনন করছিনা !

একটি হিসেব মেলাতে পারিনা বিভিন্ন কাজের জন্য সাঁওতালরা তাঁরাচাঁদ বাবুর বাসার প্রবেশ করলে বাসায় গঙ্গা জল ছেটায় কিন্তু তাঁরাচাঁদ বাবু বেডরুমে সাঁওতাল রমণীদের দেহ ভোগ করে কি ভাবে ?যাদের সাথে খাবার খেলে ধর্মের নাক কাটা যায় তাদের অধিকার হরন ,অবজ্ঞা করা,খুন ,ধর্ষণ , মুসলিমদের উপর অত্যাচার , হিন্দুদের সাথে ব্যভিচার , অধিক খাজনা ,নানা ছলে সাধারন কৃষকদের জমি লিখে নেয়া , ইত্যাদি দুষ্ট কর্মের সময় কি ধর্মের নাক কাটা যায়না ? মাঝে মাঝে মনে হয় ঠোট কাঁটাদের ভীরে তাঁরাচাঁদ বাবুর মত মজনুরা মানিয়েছে বেশ ।

২.........

এক পেটি লাল ফিতে কোমড়ে গুজে মাতলা প্রায় একঘণ্টা কষ্ট করে কয়েকটি প্রজাপতি ধরেছে সুধার খোপায় দেবার জন্য । গতকাল সে নীলগঞ্জের মেলায় কিছু রমণীর বেনীতে রঙিন প্রজাপতি বসে থাকতে দেখেছিলো ।সুধাদের বাড়ি যেতে যেতে শুধু ভাবছে সে সুধা খুব খুশি হবে , তার কালো কেশে লাল ফিতে বনফুল ভেবে প্রজাপতিরা বসবে খুশি হয়ে ।গোলাপেরা হয়ত মুখ লুকাবে লজ্জাবতীর মত সুধার সুন্দর রূপ দেখে ।সুন্দর করে সেজেগুজে সুধা আজ বনবাদরে ঘুরে বেড়াবে মাতলার হাত ধরে ।

কিন্তু,সুধাদের উঠোনে পা দিতেই মাংস –পোলাও এর ঘ্রান পেয়ে বুকটা দুরু দুরু করতে লাগলো মাতলার । বারান্দায় তালপাতায় বসেবসে বাংলা গিলছে ও শ্যামা সংগীত গায়ছে,সুধার বাবা নরাধম শিং । মাতলাকে দেখে খুব খুশি ভাব নিয়ে তাঁরাচাঁদ বাবুর জয়জয়ধবনি করতে লাগল । তাঁরাচাঁদ বাবুর নাম শুনে মাতলার বুক অনেক বেশী দুরু দুরু করছে ,রক্ত কণিকাগুলো তুফান মেইলের মত ছুটছুটি করতে লাগল । তাঁর শরীরে জ্বর ও ব্যথা অনুভব করছে সে ।মাতলার মনে হচ্ছে ফল ভারে বৃক্ষ মাথানত করে আর মানুষ মাথা নত করে টাকার ভারে ,প্রয়োজনে বা লোভে ?

নরাধম শিং এর কথার আগামাথা বুঝতে পারলনা মাতলা কিন্তু অনুভব করল নরাধমের দুর্বলতা ও সরলতার সুযোগ খুব ভালভাবে নিয়েছে তাঁরাচাঁদ সয়তানটা ।
সুধা পুকুর থেকে জলনিয়ে এসে মাতলার হাত ধরে ঘরে নিজে যেতে যেতে বলতে শুরু করল - তাঁরাচাঁদ বাবু তাকে চারটি শাড়ি কিনেদিয়েছে ,সিনেমার নায়িকারা যে সকল উপকরন দিয়ে সাজগোজ করে সে গুলো কিনে দিয়েছে ।ওর বাবাকে অনেক টাকা দিয়েছে বিয়ের জন্য ।সারাজীবনের মত সুধাদের জমির খাজনা মাফ করে দিয়েছে লিখিত দলিলে টিপসয় নিয়েছে কারন পৃথিবীর কোন জমিদার যেন খাজনা চাইতে না পাড়ে সুধাদের কাছ থেকে ।

আজ সন্ধ্যায় তাঁরাচাঁদ বাবু ও তাঁর কিছু বন্ধু সুধাদের বাসায় বেড়াতে আসবে । তাই সুধা মাতলাকে রাতে এসে দুটো ভালো মন্দ খেয়ে যাবার অনুরোধ করল । মাতলা সুধা কে বোঝাতে চেষ্টা করল জমিদার তাঁরাচাঁদ অসুরের চেয়ে খারাপ মানুষ ।


সুধা মাতলার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলল জমিদার আমার কাকাবাবু হয় । বাইরে সে খারাপ হতে পারে ? অনেক আগে তোর পরিবারের সাথে যা ঘটেছে তা ভুলে যা । একটা মানুষ সবসময় খারাপ থাকেনা ।

মাতলা ব্যাঙের মত লাফাতে লাগল , তুই মরবি সুধা মরবি ? অরুনের বোনের বিয়ের দুই দিন আগে কি হয়েছিলো ভুলে গেছিস ।আমার বাবা মায়ের সাথে কি করেছিলো সে ভুলে গেছিস । চল আমরা গাঁ ছেড়ে পালিয়ে যায় ? দলিলে টিপসয় দিয়ে তাঁরা চাঁদ তোদের সব জমি লিখেনিয়েছে । ও তোদের সরলতার ফাঁদে তোদের বন্দী করেছে ।মাতলার কোমর থেকে ফিতের পেটিটি মাটিতে পড়ে গেল ।তা মাতলা বুঝতে পারেনি ।

সুধা রেগে বললঃ আমাদের সুখ দেখে তোর হিংসে হচ্ছে । তোকে ভালোবাসি তাই কিছু বললাম না । নয়ত বঁটি দিয়ে তোকে কেটে ফেলতাম ।কাকাবাবুকে নিয়ে খারাপ কথা বলছিস !

মাতলা চেঁচিয়ে বলল – মা কালির দিব্বি আজ যদি তাঁরাচাঁদকে না কুপিয়েছি আমার নাম মাতলা না ।বলেই হন হন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল মাতলা । সুধা ওর ফিতের পেটিটি ঢিল ছোঁড়ার মত করে ছুড়ে বলল তোর ফিতে নিয়ে যা , পারলে আমাকে কোপাস কাকাবাবুকে না ।


সন্ধ্যা ঘনিয়েছে । পিঠের ময়লায় কালো হয়ে যাওয়া ,কোথাও কোথাও হুকা ও তামাকের ছায়ে পোড়া দাগ এক অন্য রকম কারুকাজ এর সৃষ্টি করেছে মাতলার শীতল পাটিটিতে, মনে হচ্ছে কোন এক চারুকারু শিল্পের প্রতিযোগিতায় মাতলার এই পাটিটি প্রথম পুরষ্কার পেয়ে যেতে পারে ? কারন,রঙ তুলির ঘষাঘষির শিল্পকর্মের চেয়ে জীবন সংগ্রাম এর ঘষাঘষির এমন শিল্পকর্মের মুল্য কি একটু বেশী নয় ?

শীতল পাটিতে বসে ,একটি কাঠের টুকরোর উপর সিদ্ধি রেখে লড়ুন দিয়ে কুচি কুচি করছে মাতলা , আজ কোন বিষ পাতা সে ফেলেনি সে কলকিটা সাজিয়ে আগুন ধরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এই সময় রাম ,ভাঁড় ভর্তি দারু নিয়ে এলো । মাতলা জল চৌকিতে কয়েক ফোটা দারু ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিল। দারুর ভেজাল পরীক্ষা শেষে মাতলা খুব খুসি হল ।ইচ্ছে মত পান করে ,হুকাতে কয়েকটি টান মেরে । দা নিয়ে সুধাদের বাড়ির দিয়ে রওনা হলো ।

সুধাদের বাড়ি যেতে অনেক রাত হয়েগেল ।চারপাশে ঘুট ঘুটে অন্ধকার ,কয়েকটি জনাকি পোঁকা দেখা যাচ্ছে , দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে যার শব্দ ভেসে আসছে মাতলার কানে বাঁশ ঝাড়ের মরমর কটকট শব্দ আজ একটু অন্য রকম লাগছে । চাটায়ের দরজাটার দড়ির বাঁধন খুলে ভিতরে প্রবেশ করল মাতলা ।উঠনে নিবু নিবু লন্ঠনের আলোয় স্পট বোঝা যাচ্ছে সুধার বাবা গিলতে গিলতে বেহুঁশ হয়ে গেছে । কুকুরে এসে ওর পা চাটলেও সুধার বাবার ঘুম ভাঙবার নয় ।ঘুট ঘুটে অন্ধকারে মাতলার চোখ সুধাকে খুঁজছে ,একসময় শুধা চিৎকার করে ডাক দিলো বাবা ও বাবা ...... সুধার ডাকে সাড়া দেবার সাধ্য নরাধম শিং এর নেই ।এখন জীবনের সাথে জুয়া খেলায় ব্যস্ত নরাধম শিং এটা মাতলা খুব ভালো করে জানে ।

মাতলা দৌড় দিয়ে দক্ষিনের ঘরে ঢুকেই তাঁরাচাঁদ বাবুর পীঠে দা দিয়ে একটি কোপ বসিয়ে দিলো । তাঁরাচাঁদ বাবু গলাকাটা মুরগীর মত ছটপট করতে লাগলো ।তাঁরাচাঁদ বাবুর কষ্ট দেখে মাতলা থমকে দাঁড়ালো , নিজেকে পাপী ভাবতে লাগল সে । তাঁরা চাঁদের লোকেরা এসে মাতলাকে লাঠিপেটা করতে লাগল ।

সকালে গ্রাম্য বিচারের রায় হলো মাতলা হলো সুধাদের সুখের অসুখ । সুধার সরলতার সুযোগ নিতে রাতের বেলা গিয়েছিলো মাতলা । তাঁরাচাঁদ বাঁধা দেয়ার জন্য রাগ করে মাতলা, দা দিয়ে কোপিয়েছে তাঁরাচাঁদকে ।গ্রামের নারীদের সন্মান রক্ষার জন্য জমিদারের হুকুম মাতলাকে গ্রামছেড়ে চলে যেতে হবে । জমিদারের সুন্দর বিচারে গ্রামের মানুষ খুশি । অনেকে বলে ফেলল তাঁরাচাঁদ শেষ বয়সে একটি ভালো কাজ করল ।

মাতলা সত্য প্রকাশ করলে কেউ বিশ্বাস করলনা মাতলার কথা । মাতলা কাঁদতে কাঁদতে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভগবানকে গালি দিতে গিয়েও দিলনা ,মাতলার নিজের জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে ভগবানকে গালি দিতে ভাললাগছেনা নষ্ট অতীতের কথা ভেবে কাঁদতেও ইচ্ছে করছেনা ।বিচারের রায় মাথা পেতে নিয়ে মন্দিরে গিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে মাতলা বলল – আমার ভাবনায় ভুল ছিলো । আমি মানুষ তবু সুযোগ পেয়েও একটির বেশী কোপ জমিদারের পীঠে মারতে পারিনি ।আর তুমি তো দেবতা !তুমি খুন করবে কিভাবে ?ওদের শাস্তি দেবে কিভাবে ? মানুষ মারতে অমানুষ হতে হয় ,আমি তা পারবোনা ক্ষমা কর আমায় ।।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement