এক.
শরীরের বহুলাংশ রোষ্টে পরিণত হবার পর আসলে তার মৃত্যু হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত, তার উপর এর সাথে তার যাপিত জীবনের দারিদ্রতা, আমাদের সরকারী হাসপাতালের উদাসীন দৈন্যতা ইত্যাদি বাস্তবতা সংযুক্ততো ছিলই। উপরোন্ত এইসব তথাকথিত অকারণ অপমৃত্যু এ দেশের রাজনীতির মাঠে খুবই গুরুত্ব বহন করে, টক শোর গরম উপাত্ত হয়ে ওঠে আর কিছু কবি সাহিত্যিকের জন্য তো লেখালেখির হয়ে ওঠে চরম উপাত্ত।

তিনদিন বেঁচে ছিলো হাসপাতলের বেডে লোকটি। টিভির পর্দায় স্ক্রীনের নিচের নিউজ স্ক্রলে, কিংবা পত্রিকার পাতায় কিংবা ফেসবুক কিছু একটা তো হবে আমার চোখে খবরটা ধরিয়েছিল। কিন্তু ওটুকুই। নাম পরিচয় অত বিস্তারিত পড়া হয়নি। বাস-ট্রাক , টেম্পুতে আজকাল হরতাল ধর্মঘটে যেভাবে অহরহ আগুন লাগানো হয় আর ঝলসানো হয় মানুষের সজীব চামড়া, শিহরণ মনে এমন ভাবে সঞ্চিত হয়ে গেছে, ভাবান্তর হয়েছে এমনটা ভাবতে চাই না আমরা দূর্বল মানুষ জন। নিজের ভেতর নিজে পালাই যেন। আর ওদিকে সবল মানুষগণ নিশ্চিয় এসব কেয়ারই করে না। দূর্বল অংশে থাকি বলে আমিও ভাবান্তর না ঘটানোর মাধ্যমে শান্তি খোঁজার প্রয়াস খুঁজি। সেই ছোট থেকে দেখে আসছি দেশের এইসব অস্থিরতা, তান্ডব আর তার বিষ বাষ্প। আর কত! একমাত্র বড় ভাইয়া ছাড়া আমার পুরো পরিবারই থাকে ইউএসএ। একা আমি এই ছয়তলা বাড়ি পাহাড়া দেই। একাকী বাড়িওয়ালা কাম কেয়ারটেকার এর কাজটা ভালই লাগে। আর ভাল লাগে ইউএস এর ডাকটা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা। হয়ে যাবে। চলে যাব আশা করছি শীঘ্রই। ভাইয়া অবশ্য যাবে না। ভাবী আর বাচ্চাদের নিয়ে তিনি নিজের ফ্ল্যাটে থাকেন গুলশানে। বড় ব্যবসায়ী তিনি। যাত্রাবাড়ীর এই দিকের এই ঘিঞ্জি পরিবেশ আর ধূলাবালি ওনাদের খুবই কষ্ট দেয়। আমার এতে ভালই হয়েছে, স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ হয়েছে। কেউ নেই খবরদারী করার। একটা বুয়া ঠিক করা আছে, রোজ আসে, রান্না বান্না আর বাকী কাজ করে দিয়ে চলে যায়, আমি খাই দাই, বন্ধু বান্ধব আর আমোদ ফুর্তি নিয়ে কাটাই দেশের শেষ ক’টা দিন।

লোকটা মারা যাবার দিন একটা ছবি ছেপেছিল পত্রিকা। চোখ দুটো দেখেই আমি ভরকে গেলাম। তখন আর নাম না পড়ে কোন উপায় ছিল না। ভাবান্তর না ঘটানোর কোন উপায় ছিল না। পানি যখন নিজের গায় এসে লাগে তখন আর তা না মুছে উপায় কি। এই তো এ অঞ্চলের ন্যাচারাল স্বভাব। নিজের গায় না লাগলে আমাদের টনক নরবে কেনো। আমরা আজকাল জটিল দেশপ্রেমিক হয়েছি, কিন্তু তাল গাছ আমার প্রথমে লাগবেই তারপর নিচের দিকে মানে দেশের মাটি, কেউ ভাবি না মাটি না থাকলে, দেশ মা না থাকলে গাছ যতই বড় হোক তা পেয়ে আর কিই বা রক্ষা হবে। অথচ সবাই তাল গাছে উঠেই ক্ষমতাবান হতে চায়। কিন্তু না লোকটাকে চিনে ফেললাম, নামটা পড়ে নিশ্চিত হলাম। এতো কাশেম, কাশেম মাছ ওয়ালা।

গত দুই দুটো বছর ধরে এই লোকটা আমাকে মাছ এনে খাইয়েছে। প্রতি শুক্রবার আর মঙ্গলবার সকাল ৯ টা বাজতেই দরজায় এসে হাজির হতো কাশেম। মাথা থেকে মাছের বড় গামলাটা নামিয়ে কলিং বেল বাজিয়ে আমার ঘুম ভাঙাত। তাকে বলা ছিল আমি ৯ টার আগে ঘুম থেকে উঠি না। সে কোন দিন ৯টার এক মিনিট আগেও আসতো না। আমাকে খুব পছন্দ করত। ফরমালিন যুক্ত মাছ আমি খেলেই টের পাই। সে আমার কথা রাখত। খুঁজে খুঁজে আমার জন্য সত্যি সত্যি ফরমালিন মুক্ত মাছই নিয়ে আসত। বলত, ভাইজান আপনে ভালা মানুষ, আমার কথা বিশ্বাস করেন, বোঝেন তাই জানেন ফরমালিন ছাড়া মাছ নিয়া আইতে টাকা বেশি লাগে, অন্যরা তো বুঝবার চায়না, ফরমালিন ছাড়া মাছ সবার জন্য আনমু কেমনে কন তো? কিন্তু সত্যি ভাইজান আমার কষ্ট হয়, মানুষগুলা সব বিষ খাইতাছে, আমি বেচতাছি। কি রকমু?
এই হলো আমাদের অবস্থা। হাত পা বাধা দেশপ্রেম। জেনে বুঝেও দেশের জন্য ভাল কিছু করাটা কত জটিল হয়ে গেছে। অথচ আমিতো কাশেমের পোড়া শরীরটার জন্য যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারতাম, সৃষ্টিকর্তা সেই পরিমাণ আর্থিক সক্ষমতা আমাকে বেশ দিয়েছে। কই, পারলাম কই! পত্রিকায় লিখেছে কাশেমের স্ত্রী সু চিকিৎসার জন্য মানুষের দারে দারে ঘুরেছে এই দুদিন। না খেয়ে থেকেছে। আমি কি কাশেমের বউটাকে খুঁজে বের করতে কি পারি না? কেমনে খুঁজব- ঠিকানা?

দেশে কি কাশেমের বউ এই একজন। আরও তো কত জন মরল। ঐ যে এক ট্যাম্পু ড্রাইভার অগুনে পুড়ে পঙ্গু হলো, তার পরিবার কেমনে চলছে। কে দেবে আমাকে ঠিকানা তার? পত্রিকা অফিসে খোঁজ খবর নিলে হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু ক’জনের খোঁজ নেবো, ক’জনের। এসব তো ঘটেই চলেছে। আরও কতকাল চলবে কে জানে?

সত্যি আমি খুব কষ্টে আছি। পুরো দেশের চিন্তায় না হয়তো আসলে কেবল কাশেমের জন্যই। দুপুরে আমি কিছু খেতে পারিনি। আমি কাশেমের বউকে খুঁজে বের করবোই। যে পত্রিকায় খবরটা দেখেছিলাম সে পত্রিকা অফিসে খোঁজ নিলাম। পরামর্শ দিলো হাসপাতালে খোঁজ নিতে। হাসপাতালে ফোন করে কোন লাভ হলো না। তবে জানালো আগামীকাল আসতে সকালে। সকালে উঠেই দৌড়ালাম হাসপাতালে। উপায় নেই। রাতে ভাত খেতে গিয়ে ইলিশ মাছের বড় টুকরোটা মুখে দিতে পারিনি। ও মাছে কাশেমের হাতের স্পর্শ ছিল। আচ্ছা বাস যখন আগুনে পুড়ছিল তখন কি করছিলো কাশেম? একটু বেটে ছিল সে। স্বাস্থ্য ভালো। পেটানো দেহ। ও নামতে দেরী করলো কেনো? নাকি কাউকে নামতে সাহায্য করছিল। খুব ভাল লোক ছিল। আমার সাথে দেশ দশের কত গল্প করত। বলত, সব নষ্ট করে ফেলতাছি আমরা। আগে কত বড় বড় মাছ খাইতাম। হেইসব মাছও দেশ থেইক্যা উইঠা যাইতাছে। সব গজব। ভাগ্য!
আমি হাসতাম। অথচ সে নিজেই উঠে গেলো। আমি ঘুমাতে পারি নি সারারাত কেবল মিথ্যে কলিংবেলের আওয়াজ শুনেছি।
সকালে উঠেই চলে গেছি হাসপাতালে। কেউ কোন কথাই বলে না। বরং সন্দেহের চোখে দেখে; ভাবে আমি পুলিশের লোক, একজন জিজ্ঞেস করেই ফেললো, ভাই কোন দলের লোক আপনে, সরকারী না বিরোধী?

ঠিকানা পাওয়া গেলো না হাসপাতালে। তারপর আরও তিন দিন কেটে গেলো। আমি একটু একটু করে ঘুমানের চেষ্টায় সফল হবার চেষ্টা করতে লাগলাম।


দুই.
নতুন জেনারেশনের আধুনিক চিন্তার মানুষ আমি। প্রেম, সম্পর্ক এসবে অতটা কনজারভেটিভ মোটেও নই। তার উপর এক পা দিয়ে রেখেছি ইউ এস এ। লাইফ এনজয় করতেই বেশি ভালবাসি। কেবল এক কাশেম মাথায় ঢুকে এত কষ্ট দিচ্ছে। আসলে কাশেম না হয়ে আর কেউ হলে এতটা কি হতো? মনে হয় হতো না। কেমন জানো নিজেকে এই কথা ভাবার পর স্বার্থপর মনে হয়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় এত এত সমস্যা, এত এত ঝামেলা দেশে, কে কাকে নিয়ে ভাবে, কে কাকে বিশ্বাসই বা করে এ দেশে? নিজেকে নিয়েই সবাই ব্যস্ত। এইতো বাস্তব। দেশ নিয়ে, অন্য কে নিয়ে ভাবার সময় কোথায়।
সীমী নামে আমার এক গার্ল ফ্রেন্ড আছে। খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক। আমার মতই ওর মাঝেও কোন কম্লিকেসি নেই। আমার ফ্ল্যাটে ও মাঝে মাঝে আসে। আমাদের সম্পর্কের তথন কোন সীমারেখা থাকে না। আমাদের মধ্যে অবশ্য বিয়ের কোন কমিটমেন্ট হয়নি কখনও। কিন্তু ভবিষ্যত নিয়ে আমরা ভাবি নি। অন্ততঃ আমি তো নই। ভবিষ্যত পরে দেখা যাবে।

কাশেমের বউকে নিয়ে হঠাৎ নিজেক নতু রূপে আবিষ্কার করার এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতেই কি নাকি সহজাত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকেই সকাল সকাল সীমিকে কল দিলাম। বললাম আসতে পারবে কিনা। আমি জানি ও আমাকে সত্যি অনেক ভালবাসে। তাছাড়া আমিও ওর জন্য কি না করি। যা চায় তাই দেই। বরাবরের মত ও না করলো না। ভার্সিটির জন্য জন্য বের হচ্ছিল। আসাটা তাই সহজ হয়ে গেলো। আধ ঘন্টা অপেক্ষা করতেই ও চলে এল।

এসেই প্রথমে তার চোখে ধরা পরে গেলাম। চোখের কালি তাকে বুঝিয়ে দিলো কয়েকদিন ঘুমাই নি। বারবার জিজ্ঞেস করল। কিন্তু কি বলব বুঝলাম। না। ‘কাশেম মরে গেছে’...এ কথায় সে কি বুঝবে। কাশেম কে? এসব তাকে বুঝাতে ইচ্ছে করছেনা। বললাম, আগে একটু চা করে খাওয়ায়। সব বলছি।

ঠিক তখই কলিং বেল বেজে উঠল। ঘড়িতে দেখলাম ঠিক ন’টা বাজে। আজ মঙ্গলবার। চমকে উঠলাম। ঘরে সীমি আছে সে জন্য চমকালাম ভাবছেন, তা না। আমার বাড়ীর ভাড়াটিয়ারা অনেকেই জানে সীমির বিষয়। ইনফেক্ট তার বাবা মাও জানে। সীমিকে বকেছে ওনারা অনেকবার, সীমি আমার মতই বেপরোয়া, যা মন চায় তাই করে। এটা কিন্তু আজকালের জেনারেশনের একটা বড় সমস্যা। হঠাৎ দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মনে হলো এই সমস্যাটাই তো নতুন জাগরণ হয়ে উঠতে পারে, দেশের প্রয়োজনে জন্য নতু প্রজন্ম এই ড্যাম কেয়ার দেশপ্রেম নিয়ে যদি এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত। হঠাৎ কি হলো, এসব কেনো ভাবছি। চলে যাব দেশ ছেড়ে, দেশ গোল্লায গেলে আমার কি!

তারপর, দরজার পিপিং হোল দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম একজন কালো ত্রিশোর্ধ্ব বয়সের লোক দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাস করলাম , কে?

উত্তর এল, স্যার মাছ নেবেন, মাছ, ভাল মাছ আছে।

আবার চমকালাম। কিন্তু খুললাম দরজাটা। ঠিক যেখানটাতে মাঝের গামলাটা নামিয়ে রাখত কাশেম সেখানে গামলাটা রেখে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল, ‘স্যার, কাশেম তো মরছে, শুনছেন না, খবরে কতবার দেখাইলো। হেরে কত কইরা কইলাম হরতালে যাওন লাগবোনা। আমি গেলাম না। সে বাইর হইবোই। কইলো বান্ধা কাসটোমার আছে তার, হেগোর জন্যি মাছ নেয়াই লাগবো। কপাল ভাইসাব। সব কপাল। আপনার খুব প্রশংসা করত। একবার আমি হের লগে আইছিলাম আপনার বাসায়, মনে আছে না আপনার।

আমি লোকটাকে এবার চিনলাম। কাশেমের চাচাতো ভাই । নাম হাসান। বললাম, কাশেমের বউ কোথায়, তার সংসার চলছে কি করে এখন? ওর না দুইটা ছোট ছোট বাচ্চা। চল আগে কাশেমের বউয়ের কাছে যাব।

পিছনে সীমি এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, কাশেম কে, তার বউর কাছে তোমার কি?

আমি কিছু বলার আগেই হাসান বলে উঠল, স্যার, ওরা খুব খারাপ অবস্থায় ছিল, ঘর থেইক্যা বাড়িওয়ালা বাইর করা দিতাছিল। খাওনের কোন টাকা ছিল না। কাশেমের লাশ দাফন করতে গিয়া সঞ্চয় সব শেষ কইরা ফেললো। শেষে রাস্তা থেইক্যা আমি আমার ঘরে নিয়া আশ্রয় দিছি, এইতো গতকালকাই ওরে আমি বিয়া করছি। মাইনসে ছিঃ ছিঃ করতাছিল। না কইরা উপায় ছিলনা, একা মাইয়া ছাওয়াল।

আমার মুখে অনেকদিন পর যেন সত্যি সত্যি হাসি ফুটল। আমি হাসান কে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম একটু দাঁড়াও। বেডরুমে ঢুকে মানিব্যাগ থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করলাম। সেটা নিয়ে হাসানের হাতে দিয়ে বললাম, যদি কিছু মনে না কর এই টাকাটা নাও, কাশেমের বউ আর ছেলে মেয়ের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যেও।

এইটা কেন ভাইজান?

কেনো আবার শান্তির জন্য। কাশেমের জন্য। কাশেমের জন্য। ও বুঝবানা। বড় ভালা লোক ছিলো তোমার ভাই। এই সামন্য টাকা কাশেমের আত্মত্যাগের জন্য। আমার মাঝে মনুষ্যতের পরশ দেয়া জন্য। সে যাক। শোন হাসান, আজ আমার আর ওর বিয়ে। কাল দুপুরে তুমি আর কাশেমের মানে তোমার বউ আর বাচ্চা দুটো কে নিয়ে চলে আসবে, আমরা কোথায় বসে একসাথে খাব। তোমার ঠিকানাটা দিয়ে যাও, না আসলে আমি সত্যি নিজে গিয়ে কিন্তু ধরে নিয়ে আসব।

হাসান টাকাটা নিয়ে মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। মুহূর্তে সীমি আমার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে উঠল, সত্যি সত্যি বলছ নিমিখ, সত্যি তুমি আমাকে বিয়ে করবে? আমার কি যে খুশি লাগছে। কখন করবে, কখন?

সত্যি, খুব সত্যি। একটু পড়েই সব ফোনে ফোনে ব্যবস্থা আমরা কাজী অফিসের দিকে পা বাড়াব। তুমি রেডি তো?

রেডি মানে। আমি তো অলওয়েসই রেডি। কেবল তোমার মুডের কারনে জোর করতে পারি না। তা কাশেম টা কে এবার বলতো। কে আমার এই এত বড় উপকার করল?

কাশেম! কাশেম হলো আত্মত্যাগী পুরুষ, বিবেকের জাগরণ। এক কাশেমের আত্মত্যাগে সত্যি যদি সবার বিবেক জেগে উঠত!