( বিঃদ্রঃ গল্পটি গল্পের স্বাভাবিক ধারায় লেখা হয়নি। গল্পটি লেখার চেষ্টা করা হয়েছে ভবিষ্যত কাল এ। এটা এই ক্ষুদ্র লেখকের এক ধরণের এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে ধরতে পারেন। আমার আগে অনেক বিখ্যাত লেখকও এমন করেছেন। জানা মতে প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮) নামে একজন বিখ্যাত বাংগালী লেখক ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ নামে একটি গল্প পুরোটাই ভবিষ্যত কালে লিখেছিলেন। আমি তার ধারে কাছে পৌঁছাতে না পারলেও , আমার মত চেষ্টা করেছি। পাঠকের কাছে কঠিন মনে হলে ক্ষমা প্রার্থী)

আজ থেকে বছর পনেরো-ষোল পরে, এই ধরা যাক ২০৩০ সালের কোন এক সময়, ভীষণ অস্থিরতায় আমি একটা বই লিখে খেলব এবং আর্থিক লস ধুকে ধুকে টিকে থাকা অথচ ভালবাসার প্রানন্ত ইচ্ছায় কোন এক প্রেস তা ছাপিয়ে দেবে, বইটির নাম হবে ‘শহরটা হারিয়ে গেলো’।

কিন্তু পাঠক কোথায় পাব? তরঙ্গ যুগ আরও বেগবান হবে আর তা ভেবে প্রযুক্তির সহজ সহযোগিতায় সে বইটির সফট কপি ইন্টারনেটে ছড়িয়েও দেবো তাতেও হয়তো কারও চোখে পড়বে। চোখে পড়বে হয়তো অথচ কেউ তা পড়বে না। উন্নতির ক্রমধারায় লক্ষ লক্ষ গাড়ির সাথে মেট্রো ট্রেন, এক্সপ্রেস রাউন্ড হাইওয়ে, শহরের ব্যপ্তি সেই পূর্বাচল ছাড়িয়ে ওদিকে নরসিংদি আর অন্যদিকে মাওয়া পদ্মা ব্রীজ অবধি ছড়ালেও লোক সংখ্যা তখন এই শহরে এত এত বেশি হবে গায়ের সাথে গা লেগেই রবে সবার তা সে হাঁটার পথে কিংবা কোন পরিবহণেই। পথেই সময় সব লীন হয়ে যাবে, কেউ হয়তো খুব কষ্ট করে ল্যাপটপটা খুলে অনলাইনেই অফিসের কাজ কর্ম করে ফেলবে, ঘামবে, বই পড়ার শখ আর কারও থাকবেই না, জাগার প্রশ্ন তো পড়ে, অথচ আমি একটা ছোট ঘরে বসে বসে তখনও সেই বই লেখার নেশায় দিন পাড় করেই দেবো; ‘শহরটা হারিয়ে গেলো’ উল্টে পাল্টে ভুলে যাব এই শহরেরও প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন ছিল, ইচ্ছা ছিল, আশা ছিল, অথচ অবশিষ্ট শুধুই বেঁচে থাকার চেষ্টা।

সবাই সেই সময়ের বর্তমানে গা ভাসিয়ে দিলেও নিজেকে লেখক ভাবার মানসিক বিকারগ্রস্থ রোগের কারণে আমি অতীতের অনেক কিছুই রোমন্থন করে লুকিয়ে একাকীত্ব উপভোগ করতে থাকব। বইটি হাতে নিয়ে কোন এক বর্ষার বিকেলে বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে শুনতে হাই ভলিউমে শুনব অনেক পুরানো এক গান, প্রিয় সেই শিল্পী সুমনের ...

'ইচ্ছে' হলো একধরণের গঙ্গা ফড়িং ,
অনিচ্ছেতে ও লাফায় খালি তিড়িং বিড়িং ...

আমার পাশের ফ্ল্যাটে এক তরুণ দম্পতির ছোট সংসার থাকবে। একেতো বৃষ্টি তারপর নিরিবিলি ক্ষণ; দম্পতির পুরুষ ব্যক্তিটির নাম ধরলাম অনিকেত আর নারীটি ইলোরা। অনিকেত স্ত্রী কে ফোন করে জানাবে বৃষ্টিতে শহরের সব রাস্তা ঘাট ডুবে গেছে,সে ফিরতে পারবে না।

এ শহরে এ নতুন কিছু কেনো হবে, যানজট আর মানব বটের যে যন্ত্রনা তাতে অনেকেই এক সপ্তাহ অফিসে কাটিযে সপ্তাহ শেষে একদিনের জন্য বাড়ি ফিরবে।

গানের হাউ ভলিউমে ইলোরার ইচ্ছা প্রাণে দোলা লাগতে পারে, ফড়িং হবার সাধ হতে পারে, যাই হোক, সে এসে আমার দরজায় নক করবে, বলবে, মঞ্জুর ভাই গান টাতো বেশ, কে গেয়েছে?

চিনবে না, ও তোমাদের সময়ের না, ত্রিশ চল্লিশ বছর আগের গান।

সে বলবে, সবাইকে এক পাল্লায় ফেলবেন না মঞ্জু ভাই, গলাটা আমি চিনি, আমি পুরাতন গান শুনিতো, নেটে অনেক সাইটেই পাওয়া যায়। এই শিল্পী ঐ যে তোমাকে চাই, শুধু তোমাকে চাই...উনি না?

মাথা নাড়াব, ইলোরা ঘরে ঢুকে বসবে। আমি কফি বানাতে চাওয়া মাত্র লক্ষ্মী ইলোরা উঠে গিয়ে দু’জনের জন্য কফি নিয়ে আসবে। আমরা কফির ধোঁয়ার তাকিয়ে থাকব। ইলোরা আমার কাছে রাজ্যের আবদার করবে। লেখক জীবনের গল্প শুনতে চাইবে, আমি বলব, সে সব আজ বলার ইচ্ছেই মরে গেছে। এই শহরে কেউ কিছু লিখতে পারে না, সে তো বহু আগে থেকেই, প্রকৃত যে লেখা সে লেখা কেউ লিখলেই গলার টুটি চেপে ধরা শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই ধীরে ধীরে, অব্যবস্থাপনার মাত্রা এতই চরম হয়েছিল আর অর্থের পাল্লায় মানুষ মাপার পার্থক্য মানে বিত্তবান আর গরীবের তফাৎটা মানুষের বলার সাহসও কেড়ে নিলো , আজ কেউ কিছু লেখে না, কেউ লিখলেও কেউ পড়ে না।

হু মঞ্জু ভাই, সেই সোনার বাংলার স্বপ্ন যা আজও দেখানোই হয়, সে কি কোন পার্থিব বস্তু তবে নয়, সেও কি স্বর্গ নরকের মতই অপার্থিব?

তুমি তো বেশ ভাবো। ব্লগ ট্লগ লেখো নাকি?

এত মডারেশেনে কি কিছু লেখা যায়?

তাহলে জানো সেটা।

জানবো না কেনো,. ফেসবুকে মাঝে মাঝে দুএকটা প্রতিবাদী কমেন্ট বা স্ট্যাটাস এখনও পড়ে, কযেক মিনিটেই সেটা ব্লক হযে যায়। প্রযুক্তি কিন্তু উন্নত হযয়ছে।

হয়েছে নাকি? তাহলে এই দেখো , এই যে আমার এই ‘শহরটা হারিয়ে গেলো’ এখনও তাদের চোখে পড়ল না কেনো ? আমি কিন্তু আপলোড করে দিয়েছি।

কই মঞ্জু ভাই, আপনার নতুন বই। একাডেমিকের বাইরে শুনেছি আজকাল কেউ বই টই লেখে না। কোন লাভ হয় না। আপনি সত্যি নতুন বই লিখেছেন। আপনাকে কেউ ধরবে না। আপনি প্রতিষ্ঠিত লেখক অনেক আগে থেকেই।

বইটি ইলোরার হাতে দিয়ে বলব তখন, এই দেখো মেয়ে এই যে আনকোরা নতুন বই। সে পাতা উল্টাবে। প্রথম পাতা, মাঝের কোন অংশ, কিছু সময় আমি মেয়েটার টানা টানা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব। সেখানে রাজ্যের কৌতুহল। কিন্তু সত্যি কোন ভীতি নেই। কত অজনা সত্য আমার সে বইটিতে থাকবে। সেগুলোও মেয়েটাকে আনন্দ দেবে। আমি জানি মেয়েটাও ভাবুক শ্রেণীর। আরও বছর পনের আগে তার এই বয়স থাকলে সেও হয়তো লেখক হতে চাইতো।

...হঠাৎ দেখব ইলোরা শেষের পাতায় চোখ আটকে রাখবে। আমি কৌতুহলী হব আরও। সে বলবে, মঞ্জু ভাই শেষের লাইন দুটো খুবই চরম হয়েছে। ইচ্ছে করছে এখনই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দেই।

আমি হাসলাম, বললাম কি দরকার, শুধু শুধু বিরাগ ভাজন হবে কারও?
মনে মনে বললাম, ওটাই তো আমার ইচ্ছে। দিয়ে দাও না। আর কত। একটা সমাপ্তি দরকার। সেই পঞ্চাশ বছর ধরে শহরটাকে হারিয়ে যেতে দেখতে দেখতে ক্লান্ত।

ও এতই আপ্লুত হবে, ওত ভাববে না, কচি প্রাণ, বয়স আর কত, এই বড়জোড় বিশ হবে। সে মুহূর্তে মোবাইল খুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দিলো আমার বইয়ের শেষ দু লাইন,

‘শহরটা হারিয়ে গেলো, সমাজের উপর থেকে নিচের প্রায় সকলেই যে যার মত করে ধর্ষণ করেছে সেই স্বাধীনতার পর থেকেই শহরটাকে, একবারও কেউ ভাবেনি শহরটার সতীত্ব রক্ষারই দায়িত্ব ছিল বরং সবারই।’- মঞ্জুর ইমন।

হাসলাম। উক্তির শেষে আমার নামটা সে লিখবে আমি আগেই জানব। সে আমার ভক্ত কোন এক কারণে। এর আগেও সে আমার কথা বা লেখা অনেক উক্তি ষ্ট্যাটাস দিয়েছিল তাও আমি জানব। কিন্তু কচি বয়স, ওতটা বুঝবে কি করে, বুঝবে কি করে তার একাউন্টটিও ব্লক হয়ে যাবে, নিজের ইচ্ছে পূরণে, পরিসমাপ্তির স্বপ্নে ইলোরার এই ক্ষতিটুকু আমি কিছু বেশি মনে করবো না। হাজার হোক আমিও এই শহরে বসবাস করছি গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ধর্ষকের মিছিলে আমার অবস্থান কোন এক কোনায় অবশ্যই অবাস্তব নয়।

...বৃষ্টি রাত আটটার দিকে শেষ হয়ে যাবে। ইলোরা চলে যাবে ওর ঘরে। আমি এক সাথে রাতের খাবারটা খেয়ে যেতে বলব। কিন্তু ইলোরা বলবে, সে রাতে ডিনার করবে না। অনিকেত অফিসে কী খাচ্ছে সে কি করে জানবে। ওকে ছাড়া তার মুখে খাবার উঠবে না।

আমি ঐ সময়ে ওমন দপ্ততি, ওমন ভালো একটা বউ দেখে জীবনে নতুন করে আশার সঞ্চার ঘটাতে পারব ভাবি, কিন্তু আমি আর বাস্তবতার অনাচারে দৃষ্টি মেলতে পারব না। আমি তখনও বিশ্বাস করব-সমাজে অনেক অনেক ভালো মানুষ ছিল, তখনও থাকবে। আর থাকবে বলেই সারা শহর বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে যাবার পরও এখানে মানুষ বৃষ্টির পানি হাতে নিয়ে মুখে হাসির রেখা খুঁজে পাবে।

সকালে উঠেই ইলোরা ছুটে আসবে। বলবে, মঞ্জু ভাই আমার ফেসবুক ব্লক করে দিয়েছে। আমি কেনো একটু ভাবলামনা। আমি না হয় নতুন আইডি খুলে নেবো, কিন্তু আপনার যে সামনে বিপদ। এ আমি কি করলাম! সব জেনে বুঝেও, আপনি আমাকে ঠেকালেন না কেনো, আমি তো ভাবাবেগে ভেসে গিয়েছিলাম...

আমি বলবো, ঠিক করেছো মেয়ে, আমি যা চাইছিলাম তাই করেছো।
ওটাই আমার ইচ্ছা ছিলো। বরং তোমার একাউন্ট টা ব্লক করে দিলো

আমার জন্য, আমি সত্যি দুঃখিত ।

পারলে মাঝে মাঝে কফি নিয়ে দেখতে যেও আমাকে ...যদি অনুমতি পাও। আকাশে আবার মেঘ করছে। এখনও শহর পানির তলায়। অনিকেত কে বল, নৌকা নিয়ে বিকেলে চলে আসতে। না হলে আমি কিন্তু ওকে ফোন করে বলে দেবো তুমি না খেয়ে আছ...

আপনি কী মঞ্জু ভাই, একটুও ভয় পাচ্ছেন না? আপনি সত্যিই একজন লেখক, সত্যিকারের লেখক।

লেখক! ও প্রাণী সমাজ থেকে কবেই হারিয়ে গেছে।

ইঞ্জিন বোটের আওয়াজ পাওয়া গেলো। একটু পরে সিঁড়িতেও পায়ের আওয়াজ।

বলব, ইলোরা ওরা মনে হয় চলে এসেছে। তুমি ঘরে যাও। আমি সত্যি চাই, ওটাই আমার ইচ্ছা, আমি আর এই মৃত্য শহরের কান্না সহ্য করতে পারছি না, আমাকে বাঁচতে দাও। তুমি যাও...

... ওরা আমাকে ধরে নিচে নামাবে। তারপর ওদের ইঞ্জিন নৌকায় উঠঠে বসে অনুমতি নিয়ে কানে মোবাইলের ব্লু টুফ চালু করে নেবো আমি আর শুনব সেই গানটাই...

'ইচ্ছে' হলো একধরণের পদ্য লেখা ,
শব্দে সুরে ইচ্ছে মত বাঁচতে শেখা ....