দিনটি ছিল শনিবার । ফাংশন হলের ৩য় সারির একটি চেয়ারে বসে ঘরির দিকে তাকিয়ে ছিল সময় । অনুষ্ঠান শেষ হবার অপেক্ষায় ছিল সে । আজ সময়ের বাবাকে এক জন সার্থক শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত করা হবে। ওদের স্কুলে এর আগে এরকম সম্মান কাউকে দেয়া হয় নি ।সময়ের বাবার বয়স এখন পঞ্চাশ এর ঘরে । তিনি এক জন সার্থক শিক্ষক । তাকে তার সব ছাত্র ছাত্রীরা ভালবাসে । তাদের কাছে তিনি এক জন সার্থক শিক্ষক । তিনি এক জন সৎ মানুষ অনেক কষ্টেও তিনি সততাকে ছাড়েননি । তার বাবাকে এত বড় সম্মান দেয়া হবে এই ব্যপার এ তার কোন আগ্রহ নেই । সময়ের বাবা একজন স্কুল টিচার । ছেলে মেয়েদের খুব বেশি কিছু দিতে পারেননি তিনি । সময়ের বাবা যে বেতন পান তা দিয়ে তার পরিবার খুব সাচ্ছন্দে দিন কাটাতে পারে না । তিনি প্রাইভেট পড়ান কিন্তু খুবই কম টাকায় যেন তার দরিদ্র ছাত্ররাও পড়ার সুযোগ পায় । সময়ের কাছে এগুলো নিতান্তই অযুক্তিক মনে হয় ।সময়ের অনেক বন্ধু আছে যাদের বাবা টিচার এবং তারা হাজার টাকা আয় করে ফেলছেন প্রাইভেট পড়িয়ে । তার সব বন্ধুরা কত ভালো আছে । তার কি এক জন স্কুল টিচার এর ঘরেই জন্ম নিতে হত ??? তার বাবা যদি মহাত্তা গান্ধী না সাজতে চাইতেন তাহলে সে আজ অনেক ভালো থাকতে পারত । কত ভালো ভালো অফার পেয়েছে বাবা জীবনে কিন্তু কোনটাই গ্রহন করেন নি । সময় বর্তমানে ইন্টার ১ম ইয়ার এ পড়ে । ওর চিন্তা জীবনে আর যাই করুক সে টিচার হবে না । দারিদ্রতা থাকতে দিবে না সে তার জীবনে ।
মাইকে একজন মহিলার গলা শুনতে পেয়ে ষ্টেজ এর দিকে তাকাল সময় । মাইকে সময়ের বাবার নাম ঘোষণা করা হল । চারপাশে করতালি বেজে উঠল । সময়ের বাবা স্টেজে উঠলেন । তার হাতে একটা ক্রেস তুলে দেয়া হল । আবার চার পাশে করতালি বেজে উঠল । মাইকে আবার সেই মহিলার কণ্ঠ ভেসে আসলো । মহিলাটি সময়ের বাবাকে কিছু বলার অনুরোধ জানালেন ।সময়ের বাবা মাইকের সামনে এসে দাড়ালেন । একটু কেশে গলা ঠিক করে নিলেন এরপর বলতে শুরু করলেন “ধন্যবাদ । ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে । আমার সকল ছাত্রদের । আজকে এত বড় সম্মান আপনারা আমাকে দিলেন এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ । আমি আমার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই তোমরা পড় জ্ঞান অর্জন কর । জ্ঞান তোমাদের অনেক উপরে নিয়ে যাবে ।কিন্তু তোমরা যাই কর কখনো সততাকে ছাড়বে না । বিবেকের কাছে ঋণী হবা না ।তাহলে জীবনের শেষ পর্যায় এসে তোমাকে অনেক আফসোস করতে হবে ।মনে রেখ মনের শান্তিই বড় শান্তি সব সময় তা টাকা দিয়ে কেনা যায় না । জীবনে আমার অনেক উত্থান পতন ঘটেছে কিন্তু আমি সততার হাত ছাড়িনি । সততার হাত ধরে চলা সহজ না । আমি চলতে গিয়ে অনেকবার হোঁচট খেয়েছি আবার উঠে দাঁড়িয়েছি আবার হোঁচট খেয়ছি কিন্তু সততার হাত ছারিনি । এর জন্য আমি আমার স্ত্রীকেও ধন্যবাদ দিতে চাই । সততার সাথে চলতে সেও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে । আমি জানতাম একদিন আমি আমার কষ্টের ফল পাব । সেই দিন টি বোধহয় আজ । আজ আপনারা আমাকে যে সম্মান দিলেন আজ নিজেকে সার্থক মনে হচ্ছে । ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে । ”
সময়ের বাবা তার বক্তব্য শেষ করলেন । সময় এতক্ষণ তার বাবার কথাগুলো শুনছিল । এরকম কথা সে এর আগেও শুনেছে কিন্তু সেগুলো তার কাছে সবই অহেতুক মনে হয়েছে কিন্তু আজ তার বাবার কথাগুলো পরম সত্য মনে হচ্ছে । কিছুক্ষন আগ পর্যন্ত তার বাবার যে সব কাজের জন্য সে তার বাবার উপর অভিমান করেছিল সেই সব কাজগুলোর জন্যই এখন তার বাবাকে নিয়ে গর্বিত বোধ হচ্ছে । সময় দাড়িয়ে হাত তালি দিল । সবাই সাথে দাড়িয়ে হাত তালি দিল ।সাময়ের বাবা ষ্টেজ থেকে নেমে এলে সে তার বাবাকে জরিয়ে ধরল । সময়ের বাবা একটু হতভম্ব হলেন তারপর ছেলেকে জরিয়ে ধরলেন। সময় বুঝতে পারল বাহ্যিক দরিদ্রতা দূর করার চেয়ে মনের দরিদ্রতা দূর করা বেশি জরুরী ।