প্রিয় অদৃতা,
কেমন আছিস? জানি তুই স্বামী-সংসার নিয়ে ভালই আছিস। আমিও চাই তোরা সবসময় এমনি করেই ভালো থাক। অদৃতা কতদিন তোর সাথে দেখা হয় না বলতো!! প্রায় এক যুগ তো হবেই। সেই যে এস.এস.সি. পরীক্ষার পর আমরা বিচ্ছিন্ন হলাম, আর কখনও দেখাই হলো না আমাদের! অথচ কথা ছিল আমরা একই কলেজ/ভার্সিটিতে ভর্তি হবো, আজীবন আমরা একই সাথে বন্ধুত্বের বাঁধনে বাঁধা রবো। তুই কি আমায় ভুলে গেছিস? তা কি করে হয়? তুই তো ভুলো মনের ছিলিনা কখনই, বরং আমিই সব কিছু ভুলে যেতাম আর তুই আমাকে মনে করিয়ে দিতি! আর আজ দেখ আমি কিছুই ভুলিনা। জানিস আমি এখনও তোর কথা ভাবি, কারণে অকারণে ভাবি। এই এক যুগ আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও তুই কিন্তু আমার কাছ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে সরে যাসনি। তুই আছিস আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। আমি তোর সাথে প্রতিনিয়তঃ কথা বলি। তোর হাত ধরে এখনও শিশির ভেঁজা ঘাসে হেঁটে যাই, ভোরবেলায় এখনও সেই বকুল তলায় বসে ফুল কুড়াই। রোজ সেই ফুলে মালা গাঁথি আর ভাবি তুই এসে তা খোঁপায় জড়াবি নয়তো বেণীর বাঁধনে জড়াবি। আমি দূর থেকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখবো তোর মুখখানা। জানিস এই এক যুগ ধরে তোর নামে যতগুলো মালা গেঁথেছি সব আমি যত্ন করে তুলে রেখেছি তোর হাতে তুলে দেবো বলে। মালাগুলো শুঁকিয়ে গেছে, আগের মত আর সুবাস ছড়ায়না! তবু আমি ওগুলোকে ফেলতে পারিনা শুধু তুই এসে দেখবি বলে। মাঝে মাঝে মনে হয় তুই আমার সাথেই আছিস, কিন্তু যখনই ঘোর কেটে যায় তখনই তোর জন্য বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। খুব শুন্য শুন্য লাগে নিজেকে!!

অদৃতা তোর মনে আছে? তুই মায়ের হাতের আমের আচার, কুলের আচার খেতে বড় ভালবাসতিস? আর আমি রোজ মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে তোর জন্য আচার এনে দিতাম। তুই মজা করে তৃপ্তির সাথে খেতি আর আমি মুগ্ধ চোখে তোর সেই সুন্দর হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, ইশ! আমার যদি একটা বড় ভাইয়া থাকতো তবে ঠিক আমি তোকে আমার ভাবী বানাতাম। আচ্ছা অদৃতা বলতো, আমার একটা বড় ভাই হলোনা কেন? জানিস, এখন আমি মায়ের মতই মজাদার আচার বানাতে শিখে গেছি। যখনই আচার বানাই আগেই তোর জন্য বরাদ্দ আচার আলাদা বৈয়ামে তুলে রাখি, তুই এসে খাবি বলে। এভাবে করতে করতে ঘরে কত রকমের ছোট-বড় আচারের বৈয়ামে যে ঘর ভরে উঠেছে তার ইয়ত্তা নেই। সবাই আমাকে পাগল বলে, বলে তুই নাকি আর আমার বানানো আচার খেতে আসবিনা! বল তাই কি কখনও হতে পারে? একবার এসে ওদের দেখিয়ে যা না!! বল তুই আসবি।
আমি যে তোর পথ চেয়ে বসে আছি!

তোর মনে আছে অদৃতা, আমাদের স্কুলে যখন টিফিনের ঘন্টা বাঁজতো তুই আর আমি তৎক্ষণাৎ কিছু মুখে গুজে
দিয়েই স্কুলের মাঠটায় দৌঁড়ে যেতাম সেখানে আমাদের সঙ্গী হতো রঙবেরঙের ঘাস ফড়িং! আমি ঘাস ফড়িঙের পিছু
ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম তখন তুই কিভাবে যেন ঘাস ফড়িং ধরে আমার জামায় বসিয়ে দিতি! আমার কি যে ভালো লাগতো! ফড়িংটাও ভয় না পেয়ে চুপ করে বসে থাকতো। এখন আমায় এমনি করে কেউ ঘাস ফড়িং ধরে দেয়না। জানিস অদৃতা স্কুলের সেই পুরনো বটগাছটা এখনও আছে যেখানে আমরা দু’জন মিলে আজীবন বন্ধুত্ব ধরে রাখার শপথ করেছিলাম। সেই স্কুল পাশের পর একে একে আমি কলেজ/ভার্সিটির গন্ডি মাড়িয়ে এখন আমাদের সেই গ্রামের স্কুলেরই শিক্ষিকা হয়েছি। যখনই একা থাকি তখনই তোর স্মৃতিগুলো এসে আমাকে নাড়া দিয়ে যায়। তোর আর আমার স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলো আমি এখনও স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পাই। রাতের তারার কাছেও প্রশ্ন করি অদৃতা তুই কোনটা? আমাকেও তোর কাছে নিয়ে যা না। তুই ছাড়া যে আমি বড় অসহায়, একা, তুই ছাড়া আর কে কবে বুঝেছে আমায়? অদৃতা, তুই যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস। শুধু এই আমাকে মনে রাখিস। ফিরে আয় অদৃতা, আমি যে তোরই অপেক্ষায় আজো পথ চেয়ে থাকি............... কবে আসবি তুই? কবে ছুটি?

ইতি
তোর চিরজনমের বন্ধু
অদিতি


চিঠিটা লিখতে লিখতে অদিতির দু’চোখ বেয়ে ক’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সে যে অদৃতাকে চিঠি লিখেছে সে আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই, সড়ক দুর্ঘটনায় সে এস.এস.সি. পরীক্ষার রেজাল্টের দিন মারা গেছে কিন্তু অদিতি আজও তার ছায়া বয়ে বেড়ায়, কল্পনা করে সে আজও বেঁচে আছে। অদিতির মতই তারও একটা সুখের সংসার হয়েছে। অদৃতার অভাব সে সারাজীবন ধরে অনুভব করে। তাই সে অদৃতার পছন্দের সব কাজগুলো করে আর সেই কাজগুলোর মধ্যে অদৃতার তৃপ্ত হাসিমুখ দেখতে পায়। তাদের এ বন্ধুত্ব যেন চির অম্লান আর অক্ষয় হয়ে আছে আজও সেই বকুলের মালা আর আচারের বৈয়ামের স্তুপের মাঝে। আজও অদিতির প্রতিটি দিন যায় অদৃতার ফেরার প্রতীক্ষায়!!!