আমি যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই? অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও প্রতিটি মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁদের মনটাকে পড়ার চেষ্টা করি। এটা যেন একটা বদাভ্যাসে পরিণত হয়েছে! মাঝে মাঝেই কপাল কুঁচকে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়সী সবার চোখে চোখ রাখি। সবার মুখভঙ্গি দেখে অনুমান করার চেষ্টা করি তাঁর বর্তমানকে। যদিও এই কাজে নিজেকে কখনো পারদর্শি ভাবতে পারিনি। বরং এই বদাভ্যাস আমাকে কষ্ট দিয়েছে বহুবার। জীবনে আমি নিজেই বহুবার মানুষ চিন্তে ভুল করেছি! যাকে মনে হয়েছে ভালো পরবর্তীতে দেখে গেছে সে খারাপ। আবার যাকে ভেবেছি সুখী পরে দেখা গেছে গহীন দুঃখের সাগরে পড়ে সে কিনার খুঁজে চলেছে! কষ্ট হলেও জানিনা সবার কষ্ট ব্যথা,সুখ দুঃখ ভেবে এক রকম আনন্দ খুঁজে চলি। এই বিকৃত আনন্দ...! হ্যাঁ বিকৃতই তো...। এই আনন্দ খুঁজে খুঁজে অনেক সময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ভাবি এই ছোট্ট জীবনে মানুষের আসলে চাওয়ার কী আছে? আর পাওয়ার আশাই বা কি!? এই একটা খোঁজই মুখ দেখে মন পড়ার অভ্যাসটাকে অনেক বেশি জেঁকে ধরেছে।

আমার পাশ দিয়ে যখন কোন শিশু হেঁটে যায়? তাঁর ঠোঁটের মিষ্টি হাসি পড়ে বুঝে নিতে পারি। সে কতটা ভালো আছে। এমনই একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। আমার পাশে পাশে স্ট্রলারে একটা আঁট দশমাস বয়সের শিশুকে বসিয়ে স্ট্রলার ঠেলে ঠেলে হেঁটে যাচ্ছে একজন যুবতি মেয়ে। স্ট্রলারের গতি মাঝে মাঝেই থমকে যাচ্ছে! মাঝে মাঝে হেলেদুলে ডানে বাঁয়ে ছুটে যাচ্ছে! তারমানে মেয়েটি নিজেকে সামাল দিতে পারছে না। আর তাই মাঝে মাঝেই আমি স্ট্রলারটাকে পিছনে ফেলে সামনে চলে যাচ্ছি। এক সময় পিছন ফিরে শিশুটির মুখের দিকে তাকাতেই আমার মনের ভীতরে মেঘ জমতে শুরু করল! বাচ্চাটার দু গাল বেয়ে বৃষ্টি অঝরে ঝরেছে কিছুক্ষণ আগে! সে বৃষ্টি শুকিয়ে গেলেও একটা স্পষ্ট চিহ্ন রেখে গেছে। এবার তাকালাম ওর চোখের দিকে...! ব্যথাভরা দুটো লাল চোখ! যা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে ওর কষ্টের পরিমাণ। যার ছোঁয়া এসে ঝাঁপটা দিল আমার মনের ভিতে। ঝাপটাটা এতো জোরালো ছিল যে আমি কেঁপেই উঠলাম। মুহূর্তেই এক ঝটিকায় তাকালাম স্ট্রলার টেনে নিয়ে যাওয়া মেয়েটার দিকে! মেয়েটার চোখদুটো ঢুলু ঢুলু,লাল হয়ে ফুলে একেবারে জবাফুলের মত হয়ে গেছে। মেয়েটা অনেক কেঁদেছে! ওখানেই আমি থমকে দাঁড়ালাম! ছবির মত ভেসে উঠলো আমার ভুলের ছায়াছবি-

মনে পড়ে একটা সময়ে বন্ধু মহলে সবাই মাঝে মাঝেই,একেবারে হাত দুইখানা আমার সামনে বাড়িয়ে ধরে বলত "এই নে সায়ান আমার হাত দেখে আমার ভাগ্য বলে দে!" একবার বন্ধু সাজ্জাদ খুব মন খারাপ করে বসে আছে। পাজি সোহেলটা ওকে একরকম টেনে হিঁচড়ে আমার কাছে এনে বলে "এই সায়ান সাজ্জাদের হাত দেখে বলে দে তো,ওর এবারের ইন্টার্ভিউতে চাকরিটা পাবে কিনা! শোন শোন যদি তোর বলা কথা সত্যি না হয় তোরে কিন্তু খুন করব।" পাশ থেকে রিমি ফোড়ং কাটে "আর যদি সত্যি হয়ে যায়!?" রিমিকে ক্ষেপানর জন্য স্বর্ণা বলে উঠে "তাহলে তোর বিয়েতে সবাই গিফট ছাড়া যাবো!" সবাই একসাথে হো হো করে হেসে দেয়। কিন্তু সাজ্জাদের মুখে কোন হাসি নেই। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সেদিন ঠিক আজকের মত আমার মনে ব্যথার মেঘ জমেছিল। ওদেরকে কীভাবে বুঝাই আমি আসলে কোন হাত টাত দেখে ভাগ্য বলতে পারিনা। আমি শুধু বন্ধুদের মনোযোগ কাঁড়ার জন্য মজা করে যাই।

চাকুরীর যে আকাল পড়েছে। তাতে যে হাজারে হাজারে সাজ্জাদরা ধুঁকে ধুঁকে হতাশায় ভুগছে। তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি জানি ওর আর্থিক অবস্থা কেমন। সেদিন সাজ্জাদের মুখে হাসি আনার জন্য? ওর মনটা ভালো করে দেবার জন্য? কিছু মনগড়া মিথ্যে বলেছিলাম। বলেছিলাম-"ওর এবারের চাকরিটা হবে না। তবে বিদেশে যাবার ভিসা হবে। সাজ্জাদ খুব শীঘ্র আমাদেরকে ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেবে।" আমার কথা শেষ হতেই সাজ্জাদ আমার দিকে কেমন দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছিল! ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি যেন ওর মনটা পড়ে ফেললাম! আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় ঘণ্টা বাজিয়ে বলে দিল সাজ্জাদ আমাকে যেন বলছে "বন্ধু মসকারা করিস আমার এই অবস্থা নিয়ে!? অভাবের জ্বলন্ত আভার স্পর্শ তুই কীভাবে বুঝবি ধনীর দুলাল!?" আমি ওর মনের ভাষা ওর চোখে দেখতে পেয়ে ভীষণ লজ্জিত হয়েছিলাম। আমার সমস্ত শরীর মন থরথর করে সেদিন কেঁপে উঠেছিল! আমাকে ধিক্কার জানিয়েছিল এই মজা করার জন্য। কিন্তু আমার সেই কথা যে সত্যি হয়ে যাবে আমি কোনদিন ভাবতে পারিনি। সত্যিই সাজ্জাদের সেই চাকরিটা হয়নি। হতাশা,অভাব অনটন আর বৃদ্ধ বাবার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে? আমাদের বন্ধু সাজ্জাদ আত্মহত্যা করেছিল। ও যে এভাবে আমাদেরকে ছেড়ে যাবে ভাবতে পারিনি। সেই থেকে হাত দেখার যে মিথ্যে অহংকার আর ফাজলামো আমার,তা আর কোনদিন করিনি। তবে ইদানীং সবার মন পড়তে পারি আমি। কিন্তু কাউকে কিছু বলি না। ভয় হয় ভীষণ...। শুধু ওদের কষ্ট অনুভব করে যাই।

আমার ঠিক পাশ কেটে যেন একটা দমকা হাওয়া ছুটে গেলো। আমার ভাবনার তার টাং করে ছিঁড়ে যায়! কী হল!? সামনে তাকিয়ে দেখি সেই যুবতি মেয়েটা স্ট্রলারটা নিয়ে শাঁ শাঁ করে অনেক দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে। বাচ্চাটার কান্নার আওয়াজ পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে বাচ্চাটা ওর সাথে কী ঘটতে যাচ্ছে তা যেন টের পাচ্ছে! আমি যখন মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম আমি দেখেছি সে চোখভরা অজস্র ঘৃণা! ওর চোখ দেখে ওর মনের ভীতটা পড়ে নিলাম! সমস্ত মন জুড়ে ওর এই যে বেঁচে থাকা তার প্রতি তীব্র অনীহা! ওর জীবনের প্রতি ওর কোন ভালোবাসা নেই...!

ভালোবাসা নেই!? ঠিক এমন কিছুই যেন আমি সাজ্জাদের চোখে দেখেছিলাম। আমি চমকে উঠলাম! দেখি মেয়েটি স্ট্রলারটাসহ ধীরে ধীরে রাস্তায় নামছে! ওর কোনদিকেই খেয়াল নেই। যেন মনে হচ্ছে কেউ ওকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ওর কাছে ওর নিজের কোন কন্ট্রোল নেই! "হায় আল্লাহ...! একী করছে মেয়েটা!?" সামনে তাকাতেই আমার সমস্ত শরীর হিম হয়ে আসে। ঠিক ওদের বিপরীত দিক থেকে হর্ন দিতে দিতে একটা বাস ছুটে আসছে। আমি ততক্ষণে দৌড়ে একদম স্ট্রলারের কাছে এসে গেছি। বাচ্চাটার দিকে তাকালাম। ওর চোখ বলছে "আমার মাকে তুমি ধরে রাখো। আমার মাকে তুমি মরতে দিও না!" মনে হল সাজ্জাদ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলছে "সায়ান...আমাকে ধর...! প্লিজ আমাকে বাঁচা সায়ান।" আমি আর কিছুই ভাবতে পারিনি...। এক হাতে স্ট্রলারটা ধরলাম খুব শক্ত করে। আর আরেকহাতে মেয়েটিকে ধরতে গেলাম। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে! প্রচণ্ড জোরে একটা ধাক্কা খেলাম! আমি এক ঝটকায় রাস্তা থেকে সাইড ওয়াকে পড়লাম! বিকট একটা শব্দ হল...! কি যেন একটা দলা পাকিয়ে আমার বুকের উপর এসে পড়েছে। সেদিকে আমার একটুও খেয়াল নেই। আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি স্ট্রলারটা বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। মেয়েটার মাথা এবং শরীর ভারী টায়ারের ভারে থেঁতলে গেছে। মগজ আর রক্তে সারা রাস্তা ভরে গেছে। আমার মুখে চোখে গরম রক্ত ছিটকে এসে পড়েছে।

"আহহহহঃ...বাচ্চাটাকেও আমি বাঁচাতে পারলাম না!" কথাটা মনে হতেই আমি চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠি। এমন সময় শুনতে পাই একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ! আমার বুকটা ভীষণ ভারী মনে হয়। কী যেন নড়াচড়া করছে! দুহাতে আলতো করে ধরে আমি উঠে বসি। প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করি। দেখি ব্লাঙ্কেটে মোড়া বাচ্চাটা আমার কোলের উপর উপুড় হয়ে কেঁদে যাচ্ছে! এটা কখন,কীভাবে হল!? এটা কীভাবে সম্ভব হল!? আমার মুখ থেকে কোন কথা বের হচ্ছে না। আমার সবটুকু শক্তি দিয়ে বাচ্চাটাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে কেঁদে যাই। শিশুটি যেন মাকে হারানোর বেদনায়,এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে যাবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কেবলই কেঁদে যায়।