হিম শীতল একটা ঘরে বসে আছে মঈন উদ্দিন। এই রুমটাতে আরো কয়েক জন লোক বসে আছে। যদিও তাদেরও মঈন উদ্দিনের মত একই কাজ কিনা বুঝতে পারছে না। তবে ঠান্ডাটা যে মঈন উদ্দিনেরই বেশি লাগছে তা বুঝতে পারছে। একটু পর একজন লোক এসে মঈন উদ্দিনকে ডেকে ভেতরের একটা রুমে নিয়ে গেল। এই রুমটা আকরাম সাহেবের। আকরাম সাহেবের রিয়েল এষ্টেটের ব্যবসা। রুমে ঢুকতেই আকরাম সাহেব মঈন উদ্দিনকে বসতে বলে কিছু দলিল এগিয়ে দিয়ে বললেন, পড়ে এগুলো সাইন করে দিন। মঈন উদ্দিন দলিলগুলো হাতে নিয়ে কিছুই পড়লেন না একের পর্ এক পাতা সাইন করা শুরু করলেন। সাইন করেই আবার আকরাম সাহেবের দিকে এগিয়ে দিলেন দলিলগুলো। আকরাম সাহেব গম্ভীর মূখে দলিল গুলে দেখে ড্রয়ার থেকে একটা চেক বের করে দিয়ে বললেন, পুরোটা পেমেন্ট করে দিলাম। মঈন উদ্দিন চেকটা হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালেন। ঠান্ডায় তার শরীরটা কাপঁন ধরেছে। যদিও এখন বাইরে প্রচুর গরম পড়ছে।

রাস্তায় বেরিয়েই মঈন উদ্দিন হাটঁতে শুরু করলো। বুকের ভেতরটা কেন জানি খুব চিন চিন করছে। কিছু হারানোর হাহাকারে বুকের ভেতর যেন তোলপাড় করে চলছে। মঈন উদ্দিন নিজেকে স্বাভাবিক রেখে চেকটা নিয়ে ব্যাংকের দিকে হাটা শুরু করলো।

মঈন উদ্দিন গত ২০ বছর যাবত খুব ছোট একটা ফার্মে হিসাবরক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ইদানিং কোম্পানীটা আর তেমন ব্যবসা করতে পারছে না। পুরাতন কর্মচারী বলেই মালিক পক্ষ মঈন উদ্দিনকে রেখে দিয়েছে। সামান্য ইন্টারমিডিয়েট পাশ মঈন উদ্দিন অন্য একটা ভালো চাকরী পাবে সেই ভরসাও পায় না। চাকরীর চার বছর পরই বিয়ে করে মঈন উদ্দিন। মঈন উদ্দিনের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে নিপা এবার এইচএসসি দিবে। ছোটটা রুবা ক্লাস থ্রিতে পড়ে। মেয়েগুলো জম্ম থেকে অভাব অনটনের মাঝে বড় হয়ে আসছে। তারপরও দুইজনই পড়ালেখায় খুব ভালো করছে। মঈন উদ্দিনের বড় মেয়েটা খুব চাপা আর শান্ত স্বভাবের। কিন্তু এই মেয়েটার আত্নসম্মানবোধটা একটু বেশিই। এত অভাব অনটনের মাঝে মঈন উদ্দিন কখনো এই মেয়েটার কাছ থেকে অভাব অভিযোগ বা আবদার শুনেনি। মঈন উদ্দিনকে ভীষন ভালোবাসে এই বড় মেয়েটা। মেট্রিকে এত ভালো রেজাল্ট করলো মেয়েটা অথচ মঈন উদ্দিন জানে এই মেয়েটার জন্য ভালো একটা টিচার দিতে পারেনি সে।

একটা ঘটনা মনে পড়লে এখনো মঈন উদ্দিনের চোখে পানি চলে আসে। তখন এসএসসি পরীক্ষার আর কিছুদিন বাকি আছে। মঈন উদ্দিন অফিস থেকে ফিরে এসে জানতে পারে নিপা আজ স্কুলে যায়নি। এমনিতেই মঈন উদ্দিন মেয়েদের পড়ালেখা নিয়ে তেমন কিছু বলেননা। কিন্তু ঐদিন হয়তো মেজাজটা একটু খারাপই ছিলো তাই স্কুলে না যাওয়া নিয়ে ভীষন বকলেন মেয়েটাকে। রাতেই আসল ঘটনা শুনলেন তার স্ত্রীর কাছে। নিপার একটাই জামা স্কুলের যাবার আর ওটা ভেজা ছিলো বলে যেতে পারেনি। মঈন উদ্দিনের এত বকাবকিতে মেয়েটা একটা বারও তার এই জামা ভেজা থাকার কথা বলেনি বা অভিযোগ করেনি বাবা কষ্ট পাবে বলে। ঘটনাটা শোনার পর মঈন উদ্দিন ঠিক বাচ্চাদের মত হাউমাউ করে কেদেঁছেন।

অথচ ছোট মেয়ে রুবা ঠিক তার উল্টো। কোন কিছু কম পড়লেই চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দেয়। মঈন উদ্দিন জানে তার এই মেয়েটা খাবারের প্রতি একটু দূর্বল। খাবার দাবারে এদিক ওদিক না হলেই তার কোন আওয়াজ শোনা যাবে না্। কিন্তু মঈন উদ্দিন যে তাও ঠিক মত দিতে পারেন না তা মাঝে মাঝে কঠিনভাবে উপলব্ধি করতে পারে। রুবার মিষ্টি ভীষন প্রিয়। বড় মেয়ে নিপার এসএসসি রেজাল্ট হওয়ার পর অনেক টানাটানির মাঝেও মঈন উদ্দিন খুব খুশি হয়ে এক কেজি মিষ্টি কিনে নিয়ে গিয়েছিলো। বাসায় মিষ্টির প্যাকেটটা নিয়ে যেতেই ছোট মেয়ে রুবা ওটার দখলে নিয়ে যায়। যদিও রুবা নিজের হাতে সবাইকে একটা করে মিষ্টি দিয়েছিলো আর বাকিগুলো ও তিনদিন ধরে যত্ন করে রেখে খেয়েছ্।ে ছোট বোনটাকে ভীষন ভালোবাসে নিপা। মঈন উদ্দিন বুঝতে পারে নিপার রেজল্টে না ও যত খুশি হয়েছে তার চাইতে তার এই বোনটার জন্য মিষ্টি নেয়াতে বেশি খুশি হয়েছে।

মঈন উদ্দিন চেকটা ব্যাংকে জমা দিয়ে বের হয়ে কি নীরব একটা দীর্ঘস্বাস ফেলে বাসায় যাওয়ার জন্য বাসে উঠে বসলেন। মঈন উদ্দিন চাকরীর শুরতে গ্রামের বাড়ির তার ভাগের জমিজমা বিক্রি করে টঙ্গীতে এক ঘন্ড জমি কিনেন। বিয়ের পর ধার দেনা করে ঐ জমিতে টিনশেট একটা বাড়ি করে থাকা শুরু করে মঈন উদ্দিন। জমির চাহিদার কারনে এত বছর পর এসে মঈন উদ্দিনের এই জমিটার দাম অনেক গুন বেড়ে গেছে। আর জমির অবস্থানটা ভালো হওয়াতে মঈন উদ্দিনের জমিটার প্রতি এলাকার কিছু বড় লোকের নজরে আসে । মঈন উদ্দিনের পাশের জমিটা কিনেছে আকরাম সাহেব। বেশ কিছুদিন যাবত মঈন উদ্দিনের জমিটা কিনতে চাইছে কিন্তু মঈন উদ্দিন স্বপ্নের এই জমিটুকু ছাড়তে নারাজ ছিলো। জমি বিক্রি করছে না বলে আকরাম সাহেবের বেশকিছু সাঙ্গ পাঙ্গ মঈন উদ্দিনকে শাসিয়ে গেছে। শুনেছে নিপাকে রাস্তায় দেখলেও নাকি বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিচ্ছে। একদিকে সংসারের এমন টানাটানি অন্যদিকে আকরাম সাহেবের হুমকি ধামকি নিজেকে খুব অসহায় মনে হল মঈন উদ্দিনের। তাই অনেক ভাবনা চিন্তা করে মঈন উদ্দিন সিদ্ধান্ত নেয় জমিটুকু বিক্রি করার। যদিও আকরাম সাহেব ভালো দাম দিবেন তাই আকরাম সাহেবের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন কারন এতে মেয়েদের নিরাপত্তাটুকু রক্ষা হবে এই ভেবে। জমি বিক্রির টাকা ব্যাংকে ফিকা্রড ডিপোজিট রেখে মাসিক যদি কিছু আয় হয় তবে মেয়েদের এত অভাব অনটনের আর দেখতে হবেনা।

বাস টঙ্গীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জানালার পাশেই বসেছে মঈন উদ্দিন। বুবের ভেতর চিন চিন ব্যাথা এখনো আছে। বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে মঈন উদ্দিন। এয়ারপোর্ট রোডে রাস্তার পাশেই চাপা ফুলের একটা গাছ দেখলো। চাপা ফুলের গাছটা দেখেই মঈন উদ্দিনের তার স্ত্রী হাসিনা বেগমের কথা মনে পড়লো। মঈন উদ্দিনের এখনো মনে আছে। টিনশেটের বাড়িটাতে উঠার পর হাসিনা খুব যত্ন করে বাড়ির সামনে একটা চাপা ফুলের গাছ লাগিয়েছিলো। গাছটা এখনো বেচেঁ আছে। পূর্ণিমার সময় মঈন উদ্দিন স্ত্রীকে নিয়ে এই গাছটার নিচে এসে বসে থাকেন। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মঈন উদ্দিনের চোখে পানি এসে গেল। নিজেকে খুব অসহায় আর দূর্বল মনে হল। হাসিনা বেগম এত বছর তার সাথে সংসার করছে অথচ আজ পর্যন্ত এমন কিছু আবদার করেনি যা নিয়ে মঈন উদ্দিনকে ভাবতে হয়েছে। মাঝে মাঝে স্ত্রী আর মেয়েদের প্রতি তার খুব রাগ হয় কেন তারা এমন করে সব কিছু মেনে নেয়্। কেন তারা এত ভালোবাসা দিয়ে তাকে অসহায় করে ফেললো। মঈন উদ্দিনের খুব কান্না পাচ্ছে খুব। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মঈন উদ্দিন বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ছে। মেয়েটার জন্য আজ এক প্যাকেট বিরানী নিয়ে যেতে হবে। না আজ সবার জন্য বিরানী নিয়ে যাবে মঈন উদ্দিন ।

বাস খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে টঙ্গীর দিকে। এয়াপোর্টের কাছাকাছি যেতে বিকট একটা শব্দ শুনলো মঈন উদ্দিন। এর পর আর কিছূ মনে নেই। হাসপাতালের বেডে যখন জ্ঞান ফিরলো তখন তার সারা শরীরের ব্যান্ডেজ। চোখটা মেলেই তার বড় মেয়ে নিপাকে দেখলো। তার দুচোখে পানি। ছোট মেয়ে রুবা আর তার স্ত্রী হাসিনা বেগম একটু দুরেই দাড়িয়ে ছিলো। মঈন উদ্দিনকে চোখ খুলতে দেখে তারাও কাছে এগিয়ে আসলো। মঈন উদ্দিন বুঝতে পারে তার শীররের অবস্থা ভালো না। কিছু একটা বলতে চাইলো মঈন উদ্দিন কিন্তু মূখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না। ইশারাই মেয়ে দুটাকে কাছে ডেকে বসতে বললো। মঈন উদ্দিন নিজেকে জাগিয়ে তোলার আপ্রান চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু তার শরীরটা এত বেশি আহত যে সে চেষ্টা বার বার ভেস্তে যাচ্ছে। মঈন উদ্দিন ভাবে, তাকে জেগে উঠতেই হবে। কারন ভূমি ক্ষুধর্াত কিছু দসু্যর কাছে সে তার স্বপ্নের জমি হারিয়েছে। প্রতিনিয়ত মানুষের জীবন দিয়ে ক্ষুধা নিবারণকারী ক্ষুধার্ত কিছু যানবাহনের কাছে আজ তার জীবন বিপন্ন। এলাকার ক্ষুধার্ত কিছু বকাটে আর সন্ত্রাসীদের কাছে তার সন্তানেরা আছে জিম্মি। মঈন উদ্দিন ভাবে তার স্ত্রী সন্তানেরা হয়তো জমি বিক্রির এই টাকা দিয়ে সংসারের আর পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারবে ঠিকই কিন্তু ভুমি দসু্য, যানবাহন আর সমাজে বিরাজমান লোলুপ দৃষ্টির সন্ত্রাসীদের ক্ষুধার কাছ থেকে কিভাবে নিজেদের রক্ষা করবে?

মঈন উদ্দিন জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। এখনো বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। আজকের বৃষ্টিটা অনেক স্বচ্ছ মনে হলো। মঈন উদ্দিন জানে না তার স্ত্রী আর সন্তানেরা কতটা স্বচ্ছতা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। মঈন উদ্দিনের দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তার স্বপ্নের এমন নির্মম সমাধি দেখে নিজেকে খুব অসহায় লাগে মঈন উদ্দিনের।