উপজেলা পরিষদের পুকুরে জাল ফেলা হয়েছে । মাছ ধরা তদারক করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্বয়ং । উপজেলা নির্বাহী অফিসের তত্ত্বাবধানে এই পুকুরে মাছ চাষ করা হয় । শখানেক লোক ভিড় করে মাছ ধরা দেখছে । আমার বাবা ইউএনও সাহেবের পিছে পিছে ঘুরছেন । ইউএনও অফিসের পিয়ন বলে বাবাকে সারাক্ষণ ইউএনও সাহেবের হুকুম তামিল করতে ছুটতে হয় । আমি যেহেতু এরকম কোন ঝামেলায় নেই, তাই আমি নিশ্চিন্ত মনে মাছ ধরা দেখতে পারছি । বাজারের ক্যানভাসারদের মজমার মত এখানেও ছোটরা সামনে, বড়রা পিছনে । জেলেরা জাল টেনে বিশাল বিশাল মাছ তুলছে । বড় বড় মাছ দেখতেও একধরনের আনন্দ আছে । ইউএনও সাহেব উপজেলার সব অফিসারদের বাসায় বাসায় মাছ পাঠাচ্ছেন । একটি বিশাল সাইজের কাতল মাছ বাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ইউএনও সাহেব বললেন, ‘যাও, এটা মৎস্য অফিসারের বাসায় দিয়ে আসো ।’ বাবা মাছ নিয়ে দৌড়াচ্ছেন । আমিও মাছ ধরা উৎসব বাদ দিয়ে বাবার পিছনে পিছনে দৌড় লাগালাম । এতবড় মাছ আমাদের বাড়িতে কখনো কেউ আনে নি । আমি মাছের পাশে পাশে থাকছি । যতক্ষন থাকতে পারা যায়, ততক্ষনই আনন্দ । বড় মাছের পাশে পাশে থাকতেও অনেক সুখ । লোকজন হাঁ করে মাছ দেখছে । এত্ত বড় মাছটা আমার বাবা নিয়ে যাচ্ছে বলে বাবার জন্য আমার একধরনের গর্ব হল ।
মৎস্য অফিসারের কোয়ার্টারে এসে দেখা গেল সদর দরজায় তালা মারা । পাশ থেকে একজন জানালেন, মৎস্য অফিসার ছুটিতে আছেন । বাবা কী করবে বুঝতে পারছে না । আমি মাছ দেখা বাদ দিয়ে পাশের কোয়ার্টারের জানালায় তাকিয়ে থাকি । আমারই বয়সী একটি মেয়ে হাঁ করে বিশাল মাছটা দেখছে । কোনো অফিসারের মেয়ে হবে । আমার খানিকটা অস্বস্তি লাগতে থাকে । মেয়েটা যদি এখন আমাকে দেখে তাহলে ভীষণ লজ্জায় পড়ে যাবো । ও কী সুন্দর একটা জামা পরে আছে । আর আমি পরেছি অনেক পুরনো প্যান্ট-শার্ট । প্যান্টের পিছনে একটা তালিও আছে । অবশ্য এটার জন্য আমি বাবার উপর রেগে থাকি সবসময় । বাবাই তো বছরে একবারের বেশী প্যান্ট-শার্ট কিনে দিতে পারে না ।
মেয়েটা আমার দিকে তাকানোর কোন লক্ষণ দেখায় না । সে একমনে মাছ দেখতে থাকে । আমার দিকে তাকানোর কোন কারণও নেই । আমি খেয়াল করেছি, যারা ময়লা, পুরনো জামা-কাপড় পরে মানুষ তাদের দিকে তাকায়, কিন্তু দেখে না । দেখলেও খুব করুণার চোখে দেখে ।
বাবা মাছটা নিয়ে আবার ছুটলেন । আমিও বাবার পিছনে পিছনে ছুট লাগাই । বাবা ইউএনও সাহেবকে গিয়ে বললেন মৎস্য অফিসার ছুটিতে গেছেন । ইউএনও সাহেব একমুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে বললেন, ‘ঠিক আছে, এটা তুমি নিয়ে যাও ।’
বাবা বোধহয় প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেন নি । কিছুক্ষন বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলেন । অবশ্য আমার বাবা এমনিতেই খুব সহজ-সরল মানুষ । সম্বিৎ ফিরতেই বাবা দৌড় লাগালেন । আমিও বাবার পিছনে পিছনে দৌড় লাগালাম । আমারও বিশ্বাস হচ্ছে না ইউএনও সাহেব মাছটা বাবাকে একেবারে দিয়ে দিয়েছেন। যদিও এরকম মাছ আরও অনেক ধরা পড়েছে । আমি বাবাকে বললাম, ‘বাবা, ইউএনও সাহেব মাছটা সত্যি সত্যি দিয়েছেন ? পরে আবার নিয়ে নেবে নাতো ?’
বাবা হেসে ফেললেন, ‘ধুর বোকা, মাছ কি মিথ্যা মিথ্যা দেয়া যায় নাকি ! এটা এখন আমাদের । আজকে রাতে আমরা এটা দিয়ে ভাত খাবো ।’ শুনে আমি খুশীতে লাফাতে থাকি ।
মাছ দেখে আমার মা আর ছোট ভাইও খুশীতে লাফায় । আমাদের বাড়িতে এত বড় মাছ আগে কখনো আসে নি । শুধু বাবা যেদিন বেতন পায় সেদিন মাঝারি সাইজের কোন মুরগী বা মাছ নিয়ে আসে । তারপর সারা মাস আমরা শাক, ডাল, আলুভর্তা দিয়েই ভাত খাই ।
মা বেশ আয়োজন করে মাছ কুটতে বসে । বাবাও আজকে বাইরে না গিয়ে মায়ের পাশে বসে গুটুর গুটুর করে গল্প করতে থাকে । ঘরের মধ্যে অনেক আনন্দের পরিবেশ । অন্যান্য দিন মা শুধু নিজেদের দরিদ্রতার কথা ভেবে ভেবে সারাদিন গজ গজ করতে থাকে আর বাবাকে গালমন্দ করে । আমরা দুভাই মনখারাপ করে বসে থাকি । একটি বিশাল আকারের কাতল মাছ আমাদের চিরচেনা সেই পরিবেশটা কাটিয়ে দিয়েছে ।
বিকেল বেলাটায় ঘরে আমার একদম মন টিকে না । আমি মাঠে খেলতে যাই প্রতিদিন । কিন্তু আজকে আর খেলতে যাবো না । আমি বই নিয়ে পড়তে বসে পড়ি। রান্না হলে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা মাছের তরকারী দিয়ে ভাত খেতে হবে । পেটপুরে গরম ভাত খাওয়ার মজাই আলাদা । তখন পৃথিবীটাকে অনেক সুন্দর মনে হয় । অনেকদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে ।
আমার দেখাদেখি আমার ছোট ভাইও পড়তে বসে যায় । আমাকে কখনো পড়তে বসতে বলতে হয় না । আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, সামনে বৃত্তি পরীক্ষা । ক্লাসে আমার রোল এক । স্যারেরা আশা করছেন আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাবো ।
রান্না শেষ হলে মা আমাদের ভাত খাওয়ার জন্য ডাক দিলেন । আমরা সবাই মাটিতে গোল হয়ে খেতে বসি । রান্নাঘরের চালের ফুটো দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে । আজকের আকাশে কী সুন্দর জোছনা ! আজকের সবকিছুই সুন্দর । আমার অদ্ভুত ভালো লাগতে থাকে । আজকে আমরা অনেকক্ষণ সময় ধরে ভাত খাই । অন্যান্যদিন তরকারী থাকে না বলে তাড়াতাড়ি আমাদের ভাত খাওয়া শেষ হয়ে যায় । আজকে তরকারী শেষ হয় না । আমরা সবাই ইচ্ছেমত খেতে থাকি । গলা পর্যন্ত খেয়ে আমরা উঠে পড়ি ।
মা সবকিছু গোছগাছ করে শোয়ার আয়োজন করে । অনেকক্ষণ হারিকেন জ্বালিয়ে রাখলে কেরোসিন বেশী খরচ হয় বলে আমরা খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি প্রতিদিন ।
শোয়ার সাথে সাথেই বাবা আর মা নাক ডাকাতে থাকে । দুইজনই সারাদিন অনেক পরিশ্রম করে । আমার ঘুম আসে না । যতক্ষণ এই আনন্দের ক্ষণগুলোকে ধরে রাখতে পারা যায় ততই লাভ । কাল থেকেই হয়তোবা আবার আগের মত দিনগুলো সব শুরু হয়ে যাবে ।
রাত কতক্ষণ হয়েছে আমি জানি না । হঠাৎ করে ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় । আমি তীব্র ব্যাথায় চিৎকার করে জেগে উঠি । মা ধড়ফড় করে ওঠেন, ‘কী হয়েছে তোর ?’
আমি পেট চেপে ধরে বলি, ‘পেটে খুব ব্যথা করছে মা ।’ মা-বাবা কী করবে বুঝতে পারছে না । আমার পেটের ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে রকেটের গতিতে । আমি মাকে বলি, ‘কাতল মাছটা পেট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে মা ।’
মা একটু হতভম্ব হয়ে যান, ‘ এসব কী বলছিস !’
‘হ্যাঁ মা, আমি স্বপ্নে দেখেছি মাছটা আমাকে বলছে, তোরা আমাকে খাওয়ার যোগ্য না । তোর বাবা তো আমার মত একটা মাছকে কখনো কিনে আনতে পারবে না । আজকে যা খেয়েছিস সেটা তো আরেকজনের দান । আরেকজন তোদেরকে করুণা করেছে ।’
মা আমাকে সান্ত্বনা দেয়, ‘ওসব দুঃস্বপ্ন বাবা, মনে রাখিস না । তোর কিছু হবে না ।’
আমি মাকে বলি, ‘আচ্ছা, আমরা এতো গরিব কেন মা ?’ মা কোন উত্তর দিতে পারেন না । ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকেন আমার মুখের দিকে । তারপর লজ্জায় মাথাটা নিচু করে ফেলেন ।
আমি দেখেছি দরিদ্র মানুষের কোন আত্মসম্মানবোধ থাকে না । দরিদ্রতা মানুষকে শুধু লজ্জিত হতেই শেখায় ।