আধো বুজা চোখে তাকিয়ে সূর্যটা দেখলাম। ওর মত আমার আলোর বন্যা নেই। তবুও অন্তরের দীপ্তিটা নিষপ্রাণ প্রদীপের মত নিভে যায়নি এখনো। জানি পেছনে ফেরবার জো নেই। তারপরেও স্মৃতির ঝাপিটা খুললে মন্দ কি। লুডুর ছকের মত সাজান আমার জীবনটা। বার কয়েক চাল চেলে গোটা তেইশ ঘর পাড়ি দিয়েছি। সাপের মুখটা আজ চেয়ে আছে অতীব হিংস্রতায়, যেন আমার জীবনটাকে গোগ্রাসে গিলে খেতে চাইছে।

তখন আমার বয়স তের কি চৌদ্দ। খেলতে খেলতে একদিন একটা ফুলদানী ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। নিমেষেই ওর ভেতরে থাকা রজনীগন্ধাগুলো ছিটকে গেল। ভাঙ্গা টুকরোগুলোর আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রইলো কতকগুলো বন্ধনছিন্ন ফুটন্ত অর্ধফুটন্ত ফুলকলি। হঠাৎ চোখ গেল কিছুটা দূরে পড়ে থাকা একটা কলির দিকে। ফুলটা ফুটবে বলেই জন্মেছিল। কিন্তু কলি থাকতে থাকতেই ছিড়ে গেল গোড়া থেকে। ধীরে ধীরে শুকিয়ে হলদেটে হয়ে গেছে ওটার সাদা জমিন। নাড়ির বন্ধন না থাকলে আহার জোটে না, এটাই নিয়ম। আর নাড়িচ্ছেদের করুণ পরিনতি মৃতু্য। কলিটার ভাগ্যেও তাই জুটেছে। অনেকটা জীবন প্রসারের আগেই তা হারাবার মত। নিষ্পাপ রজনীকলির মৃতু্যটা আমায় আজো ভাবায়। আমার জীবনটাও তো সেই রকমই। সম্ভবনাময়ী সেই রজনীকলির মত আমিও তো একটু একটু করে মৃতু্যর দিকে এগোচ্ছি।

আমি মোসাদ্দেক। হ্যা, এটাই আমার নাম। নিজের নামটাও আজকাল ঠিকমত মনে থাকে না। আর বাবা-মার কথা তো ভুলেই গেছি। যে বেডটায় শুয়ে আছি, তার ঠিক বাম পাশেই একটা বোর্ডে নামটা লেখা আছে। আমি রোগী কিনা জানিনা, তবে রোগীর বিছানাতেই শুয়ে আছি। অবশ্য শোয়া ছাড়া আর কিই'বা করতে পারি। সেদিন বাজার থেকে ফেরার পথে বাসটা মেরে দিল আমায়। অমনি লোকমেলা, তারপর এই হাসপাতাল। ভাগ্য ভাল বেঁচে আছি। প্রথমে দিন। তারপর সপ্তাহ। এখন মাস গিয়ে মাস আসে। প্রায় পাঁচ মাস হল এখানে আছি। মাথা আর ডান হাতটা ছাড়া বাকী দেহটা নিস্তেজ। শুদ্ধ ভাষায় যাকে বলে প্যারালাইজড। তবু ভাগ্য ভাল মাথাটা ঠিক আছে। তাই ভাবতে পারি। কখনো কখনো ভাবনার জগতে মেতে উঠি আপন উল্লাসে।

প্রথম প্রথম বাবা দেখতে আসত। বোন দুটোও আসত মাঝে মাঝে। আমার পরিবার বলতে ওরাই। মা\'তো আমায় ছোট রেখেই আকাশে পাড়ি জমিয়েছেন। কদাচিৎ মাঝ রাতে তার দেখা পাই। আবার রাত ফুরোলেই হারিয়ে যায়। বাবাও ইদানীং কেমন যেন পর হয়ে গেছে। এখন আর আগের মত দেখতে আসে না। তেমনি বোন দুটোও ভুলে যাবার দলে নাম লিখিয়েছে। সবই সময়ের খেলা। অসহায়ত্বের বোঝা দমিয়ে দেয় মনুষত্ব্যকে। তবুও ভাগ্যকে ধন্যবাদ। সরকারী হাসপাতালের এই জীবনে আমি মোটেও খারাপ নেই। তিন বেলা খাবারের চিন্তা নেই কোন। দিনে একবার নার্সের দেখা পাই। নিয়মিত বাসিন্দা হয়ে যাওয়ায় ডাক্তার'রাও বেশ খোঁজ-খবর রাখে। আর মন্ত্রী-মিনিস্টার এলে তো ঈদ লেগে যায়। এইতো বেশ আছি।

আমার বেডটা জানালার পাশে। আকাশ বাতাস প্রকৃতি সবকিছুরই দেখা মেলে এই ছোট্ট জানালায়। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, হাসপাতালের জানালাগুলো আর একটু বড় হয়না কেন। তাহলে প্রকৃতির কোলে নিজেকে আরো এলিয়ে দেওয়া যেত। কেননা এও তো সত্যি, নেহায়েৎ প্রকৃতি ছাড়া আর কেই'বা আছে আমার। একাকীত্বের নির্মম দংশনে মন পুড়ে গেছে। তাই এই আকাশ বাতাস প্রকৃতি- এরাই আমার সব।

আমাদের বাসার ধারে মস্ত একটা কড়ই গাছ ছিল। বেশ তাগড়া ছিল ওটা। কৃষ্ণ রঙটায় মানিয়েছিলও বেশ। গরমের দিন। গায়ে হাওয়া লাগাতে ওটায় চড়ে বসেছি। যেইনা প্রথম ডালটায় চড়েছি, অমনি ওটা বুড়ো হাড়ের মত মচকে গেল। আর আমি দড়াম করে নিচে হড়কে পড়লাম। নাহ্ তেমন লাগেনি। এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। সবে বাসার পথ ধরেছি, অমনি পাশ থেকে ছোট বোনদের সন্মিলিত কন্ঠের অট্টহাসি শুনতে পেলাম। আমায় দেখে ওদের মাঝে যেন হাসির বন্যা লেগে গেল। হাসছে তো হাসছেই, যেন ঠোঁটের দু'পাশ থেকে দুটো হস্তি টেনে চলেছে অবিরাম। পরে ব্যপারটা ধরতে পেরে আমি নিজেও লজ্জা পেলাম। আসলে আমার পেছন সাইডটা গোবরে মাখামাখি হয়ে গেছে। গাছের নিচে যে গোবর ছিল তা আমি খেয়ালই করিনি। যে বোনগুলো আমায় নিয়ে সাড়াক্ষণ এমন খুনসুটিতে মেতে থাকতো, আজ তারাই আমায় দিব্যি ভুলে আছে। আসলে কালের প্রবাহে সবাই পর হয়ে যায়। অসহায়ত্ব মানুষকে পুড়ে খায় জানতাম, কিন্তু এর জ্বলুনী যে অগ্নীদহনের চেয়েও এতটা তীব্র জানা ছিল না।

মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে। দোষটা কি আমার, না কি আমার ভাগ্যটাই এমন। নিয়তির বিধানকর্তার পাষান হৃদয়টা কি শুধূ আমাকেই দেখল। আমি তো বেশ ভালই ছিলাম, হঠাৎ এমন কেন হলো ? জানি অভিযোগ করে কোন লাভ নেই, তারপরেও কালের এই অলঙ্ঘনীয় নিয়তি আমায় বেশ কাঁদায়।

সেদিন ডাক্তার বলছিল, আমি দিনকে দিন আরো খারাপের দিকে এগুচ্ছি। ক্রমশঃ সচল নার্ভগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। শরীরটাতো আগেই গেছে। এখন মাথাটাও যাবার পথে। যে হাতটা দিয়ে লিখছি, সেটিও অচল হবার পথে। বুকের উপর খাতা রেখে লিখছি। একটা গল্প লিখতে চেষ্টা করছিলাম। কখন যে সেটা নিজেরী গল্প হয়ে গেছে টেরই পাইনি।

আজকাল আর এই জীবনটা ভাল লাগেনা। আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত। ক্ষুধার্ত মানুষ খেতে চায়। আর আমি চাই চলে যেতে। এপাড় থেকে ওপাড় জীবনে হারিয়ে যেতে। যে কলমটা দিয়ে লিখছি, সেটির কালিও একদিন ফুরোবে। যতদিন কালি আছে ততদিনই এর দাম। শিশু থেকে ধরে আবালবৃদ্ধবণিতা সবার কাছেই এর কতই না কদর। অথচ কালি ফুরোলেই এই দামী কলমটাকেই নিক্ষিপ্ত হতে হয় ডাস্টবিনে। তেমনি আমিও আজ মূল্যহীন। যুবক বয়সেও আজ বুড়োর মত অথর্ব পঙ্গু আমি। পরিবার-পরিজনদের জন্য চরম বোঝা। এরকম অবস্থায় বন্ধুরাও এক এক করে দূরে সরে গেছে। আজ আমি শুধূই একা। তাইতো মেতে থাকি শুধুই আমার আমির সাথে। আমার আমি হলো আমার ভেতরের মানুষটা। আমার মনে ছোট্ট পিদিম জ্বেলে সে অবিরাম কথা বলে চলে। কখনো গান গায়, আবার কখনো বা কবিতা শুনায়। দু'কলম লেখার শক্তিটা আসলে ওই যোগাচ্ছে। কিন্তু আমার ভেতরের মানুষটাও ইদানীং নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে টের পাচ্ছি। আসলের প্লাবনের জলস্রোত যখন পাহাড় ছুঁয়ে যায়, তখন ঘরের চাল কি আর বাকী থাকে।

জানালাটা কে যেন ভিড়িয়ে দিয়ে গেছে। তারপরেও কাঁচের জানালা বলে বাহিরের সবই দেখতে পাচ্ছি। সূর্যটা এখন আর আগের জায়গায় নেই। এরইমধ্যে ডুবার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই কাল আবার স্বরূপে ফিরে আসবে ও পৃথিবীতে। কিন্তু আমার কি আর ফেরা হবে ? মৃতু্যর পর কি আর কেউ ফেরে ? হয়ত ওপারটা ভাল লেগে যায় বলে আর ফেরে না। কিংবা এমনো তো হতে পারে ওপার থেকে হয়ত দরজাটা খোলার কোন ব্যবস্থা নেই। আমি সত্যিই জানিনা। তবে এপাড়ের জীবনে আমি তৃপ্ত। এখন পূর্ণ পরিতৃপ্তির জন্যই আমায় ওপারে যেতে হবে। ওপাড়ে গিয়ে আমি এপাড়ে একটা চিঠি লিখব। কিন্তু ওপাড়ে কি কোন পোষ্ট অফিস আছে !

খুব ক্লান্ত লাগছে। ঘুমও পাচ্ছে খুব। মনে হয় ওপারের ট্রেনটা ষ্টেশনে চলে এসেছে। ওটা ছেড়ে যাবার আগেই আমায় উঠে পড়তে হবে।