এই কিছুদিন আগেও আমার রাত গুলো অনেক দীর্ঘ হত। কাটতে চাইতোনা। কত রকম জানা কষ্টের ভিড়ে অজানা ব্যথা গুলো আমায় নিজেকে স্টেশনের কোলাহলে নিশ্চুপ ভবঘুরের মত ভাবাত। আমি ঘুমাতে চাইতামনা। রাত শেষে ভোর হত অসীম ক্লান্তি নিয়ে। ছাদে যেয়ে বসে থাকতাম। অনেক গুলো ফুলের টব কিনেছি, গাছ লাগানো হয়নি বলে অনাহারে থাকেনি বরং বন্ধুদের আড্ডার প্রিয় জাগা হয়েছে টবগুলো। তার একটায় বসে চেয়ে থাকতাম খুব দূরে কোথায় যেন !

আমার মন জুড়ে থাকত ভোরের ক্ষণস্থায়ী ভালোলাগা আর চোখে থাকতো সামনের সাততলা বাড়িটার মসৃণ কাঁচের জানালায় আমার ইট রঙা বাড়িটার মুখচ্ছবি ! আমাদের এই বাড়িটা আর পুরানো বাড়ির মাঝখানে একটা বড় পুকুরের দূরত্ব। যে পুকুরটায় আমার ছোটবেলার অনেকখানি কেটেছে। আমি সাতার শিখেছি খুব অদ্ভুত ভাবে; দুটি নারকেলের মাঝখানটা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকতো ! দড়ির মাঝখানটায় দু’হাত দিয়ে ভেসে থেকে সাঁতরাতাম। কখনোবা ফুটবল খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে সব বন্ধুরা মিলে পুকুরে ঝাঁপ দিতাম। মজার একটা খেলা ছিল আমাদের। একজন চোর থাকতো মাঝখানে আর আমরা সবাই বল ছুঁড়ে ফেলতাম এর ওর কাছে। প্রায় সময় চোর থাকতো মনির বলে একটা ছেলে। ও বেশি সাতার জানতোনা বলে বল ওর হাতে কোনমতেই পৌছতে চাইতোনা ! পুকুরটা দেখলেই ওর কথা মনে পড়ে।

পুরানো বাড়িতে আমি কালেভদ্রে যাই বড় কোন সমস্যায় পড়লে। বাড়ীতে কাজের লোকের খুব অভাব হলে অথবা বোকা ম্যানেজার সেলিম মামা ঘাড়তেড়া ভাড়াটেদের উৎপাতে কাত হয়ে গেলে। আমাকে যে ভাড়াটেরা খুব কাজের লোক ভেবে সমীহ করে তা না বরং বছরে দু’তিন বার যাই বলে তাদের সবটুকু ভদ্রতা উচ্ছলে পড়ে আমায় দেখলে। কখনোই আমার যেতে ইচ্ছে করেনা আমাদের পুরানো বাড়িতে, দেখতেও ইচ্ছে করেনা। অথচ ও বাড়িটায় আমার প্রাণ ছিল। আমার দাদু, নানা, নানু আর বাবাটাও ছিল।

আর ছিল প্রচুর গাছ; বাগান বাড়িমত। চার-পাঁচটা আম গাছ, চারটা পেয়ারা গাছ, এক সারিতে অনেক গুলো সুপারি গাছ, ডালিম, চালতা, জামরুল, আমার সবচেয়ে অপ্রিয় কাঁঠাল, মেহগনি, বরুই গাছ, কলা, মেহেদী, চারপাশে নারকেল সহ আরো ভুলে যাওয়া কত গাছ ! বারান্দার সামনে ছোট একচিলতে জাগায় ছিল বড় আপুর আদরের গোলাপ ফুলের বাগান। তার আশেপাশে ছিল জবা, বেলী, হাসনাহেনা, পাতাবাহার আর নানা রকমের ক্যাকটাস।

বাড়িটার চারপাশে ওয়াল। দেয়াল টপকে সকাল-বিকালে খেলতে যেতাম মা আর আপুর চোখ ফাঁকি দিয়ে। বাবা অফিস থেকে ফিরতেন চারটা-পাঁচটার দিকে তার আগেই আবার দেয়াল টপকে ফিরে আসতাম। বাড়িটার শেষ প্রান্তে গাছগাছালির ফাঁকে লম্বা মত আড়াআড়ি একটা জাগা ছিল, আমরা দুই ভাই সকাল বিকেল সেখানটায় ক্রিকেট খেলতাম। কখনোবা বিকেলে টিনের ছাদে ঘুড়ি উড়াতাম। বেশিরভাগ সময়ই আমার ঘুড়ি সবচেয়ে আগে বাকাট্টা হত ! বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় আমাদের সুতা মাঞ্জা দিতে হত। আমি খুব একটা মাঞ্জা দিতে পারতাম না। কত রকম আঠা, কাঁচ ভাঙা গুড়ো একসাথে মিশিয়ে মণ্ড মত বানিয়ে তা সুতায় লাগানো হত ধার বাড়াবার জন্যে। মাঞ্জা দেবার পর প্রথম বিকেলে যখন ঘুড়ি উড়াতাম ঘুড়িটা নাটাইয়ের সুতোর শেষ পর্যন্ত ছাড়তে হত। সবার ঘুড়ি বাড়ি ফিরলেও আমারটা ফিরতোনা; আমার ঘুড়িটা হয়তো দূর আকাশে হারিয়ে যেত নয়তোবা কোন বাড়ির তারে আটকে রয়ে যেত।

তখন বর্ষা এলেই আমাদের এলাকাটা পানিতে ডুবে যেত। বাড়ির উঠোনে কোমর সমান পানি থাকতো। তখনো বন্যায় মানুষের দুর্দশা বুঝবার মত বয়স আমাদের হয়নি। অনেক সময় নৌকা করে আমরা হাজির বিল পর্যন্ত যেতাম। পুরো এলাকা ঘুরে বেড়াতাম।

বার বছর হল এই বাড়িতে আমরা। কিন্তু এখনো স্বপ্নে আমি পুরানো বাড়িটা দেখি। যখন তখন আম গাছে উঠা, নিজেদের গাছের চালতা পেড়ে আচার বানিয়ে খাওয়া, বরুই গাছে সবুজ রঙের বিছার কামড়ে ভয় পাবার চেয়ে ঘৃণার ভাবটুকু বেশি মনে পড়া, একুশে ফেব্রুয়ারি’র আগের রাতে আপুর বাগান পাহারা দেয়া ! কিছুই ভুলতে পারিনা। দাদুর রুমে একটা সিমেন্টের খাট ছিল, পুরো সিমেন্ট দিয়ে বানানো। আপু আর দাদু ঘুমাতো। খেলা শেষে ক্লান্ত হয়ে ওই খাটটায় ঘুমিয়ে যেতাম। এখনো ঘুমের মাঝে সিমেন্টের খাট থেকে আমি লাফ দিয়ে উঠি। উঠে দেখি আমার ওয়াল ভরা নানা রকম ছবি আর কবিতায় ঠাসা নিজের ছোট রুমটা আর সবুজ গাছ বিহীন ইট রঙা বাড়িটা !