লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ মার্চ ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৪০টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৫৮

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা (মে ২০১১)

বুড়ি মা ও তার চার ছেলে
মা

সংখ্যা

মোট ভোট ৫৮

হোসেন মোশাররফ

comment ২৪  favorite ১  import_contacts ২,০৬৭
বহুদিন আগের কথা। যখন এই পৃথিবীতে মানুষ আর ঘর বসতি ছিল খুব সামান্যই। তখনও মানুষ হিংস্র বন্য প্রাণীর হাত থেকে কীভাবে নিজেদের রৰা করতে হয় তাও শেখেনি। মানুষ থাকতো তখন পাহাড়ের গুহায়, বড় আর মোটা গাছের কোটরে কিংবা উঁচু উঁচু গাছের মগডালে বাসা বেঁধে। তারপরও শান্তি আর নিরাপত্তা কোনটাই ছিল না তাদের। কেননা এমন এমন অনেক হিংস্র প্রাণী আছে যারা গাছের উপরে অনায়াসে উঠতে পারে। আবার পাহাড়ের গুহায় যারা বাস করতো তাদেরও ছিল নানা ভয়। কখন কোন দিক থেকে যে কে আক্রমণ করবে তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। সুতরাং তখন মানুষ ছিল এক রকম জীব জন্তু আর প্রাণীকুলের হাতে বন্দি। কিন্তু তারপরও সততা আর মায়া মমতা এখন যেমন আছে তখনও তেমনি ছিল। বরং তখন একটু বেশিই ছিল। কেননা যেখানে যত বিপদ সেখানে ভালবাসাও ততই গাঢ় হয়। তবুও মানুষ তো সবাই আর সমান হয় না। আর সমান হয় না বলেই হয়তো সৃষ্টিকর্তার এই সৃষ্টি রহস্য নিয়ে রচিত হয়েছে যুগে যুগে নানা গল্প কাহিনী আর উপাখ্যান। তেমনি এক গল্প বলতে বসেছি এখন।
পৃথিবীটা ছিল তখন বন বাদাড় আর রহস্যে ভরা এক আজব গ্রহ। তেমনি এক সময়ে এক বনের ধারে কিছু মানুষ বসতি গেড়েছিল। তারা থাকতো সবাই গাছের উপরে ঘর তৈরি করে। শিকার করে আর মাছ ধরেই তাদের দিন কাটতো। আর এই নূতন গড়ে ওঠা মনুষ্য বসতির এক প্রান্তে ছিল গভীর বন; অন্য প্রান্তে ছিল খরস্রোতা এক নদী। দিনে মাছ ধরে আর পশু শিকার করে তাদের কেটে যেত সময়। রাত নামলেই গা ছম্ ছম্ করা অন্ধকারে তারা লুকিয়ে পড়তো গাছের কোটরে কিংবা মগডালে তাদের তৈরি করা সুরৰিত ঘরে।
এইভাবে কতদিন তাদের কেটেছিল জানা নেই তবে অনেকদিন তারা ছিল সেখানে। আর এই পল্লীর শেষ প্রান্তে ছিল একটা ছোট খাট গাছের উপর একঘর মানুষের বাস। তারা ছিল খুবই অসহায় আর দরিদ্র। তাদের দরিদ্র হওয়ার প্রধান কারণ ছিল সেই পরিবারের যে কর্তা ব্যক্তিটি ছিল সে ছিল ভীষণ রোগা আর অলস; তা ছাড়া তার বয়সও হয়েছিল। তারপরও সে সারাদিন বনে বাদাড়ে ঘুরে যা একটু খাদ্য পানীয় যোগাড় করে আনত তা দিয়ে তাদের দিনগুলো কোন রকমে চলে যেত। তার ছিল চার ছেলে। তারা কেউই কোন কাজ করতো না। গাছের মাথায় তাদের তৈরি করা মাচান ঘরে তারা সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমত আর ঘুমত। এই রোগা লোকটি একদিন একটা উঁচু গাছে উঠে ফল পাড়তে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে মারা গেল। ফলে তাদের পুরো পরিবারটা এবার অন্ধকারে ডুবে গেল। বাবা মারা গেলেও ছেলেদের কিন্তু এতটুকুও শুভ বুদ্ধির উদয় হলো না। আগের মতোই তারা পড়ে পড়ে দিন রাত ঘুমাতে লাগল।
তবে এই পরিবারের চার ছেলের মা ছিল কিন্তু খুবই পরিশ্রমী মেয়ে। যদিও তার বয়স হয়েছিল কিন্তু তবুও সে বসে থাকতো না কখনো। এই না হলে সংসার তো আর এমনি এমনি চলেনি এতদিন।
মা যতৰণ পর্যন্ত নিচে থেকে খাদ্য আর পানি সংগ্রহ করে না আনত ততৰণ তার ছেলেরা না খেয়ে অভুক্ত থাকত। মায়ের প্রাণ, সেকি আর পারে নিজে খেয়ে ছেলেদের না খাইয়ে রাখতে। তাই একটু কষ্ট হলেও সে মুখ বুজে সংসারের সব ধকল একাই সামলে নিত।
সেই গ্রামে একদিন এক বুড়ো লোকের আবির্ভাব হল। সে দেখতে যেমন ছিল অদ্ভুত তার পোশাক পরিচ্ছদও ছিল ঠিক তেমনি কিম্ভুতকিমাকার। অল্পদিনের মধ্যেই সে গ্রামের লোকের মন জয় করে ফেলল। কেননা সে যাদু বিদ্যায়ও বেশ পারদর্শী ছিল। আবার এদিকে তার মাথায় বেজায় বুদ্ধিও ছিল। ফলে অনেকের অনেক কঠিন সমস্যার সমাধানও তার কাছে যেয়ে অনায়াসে হয়ে যেত। কাজেই তাকে গ্রামের সবাই সম্মানের চোখে দেখতে লাগল।
এদিকে বুড়ির দুর্গতি দেখে দেখে গ্রামের সেই বুড়ো লোকটি তাকে একদিন ডেকে বলল, ' তুমি বাপু বুড়ি মানুষ, বাড়িতে তোমার বড় বড় ছেলেরা আছে। তারাও তো তোমাকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে।'
তার কথা শুনে বুড়ি তখন বলল, 'সে কথা আর বলো না,বাবা; বড় জ্বালায় আছি। ক'দিন পরে আমি মরে গেলে ওরা করে-কর্মে কেমন করে খাবে তাই ভেবে পাচ্ছি না আমি।'
বুড়ো তখন বলল, 'বেশতো, বুদ্ধিও আছে দেখছি তোমার মাথায়। কিন্তু বুদ্ধি শুধু মাথায় রেখে দিলেই তো হবে না; তা মাঝে মধ্যে খাটাতেও তো হবে।'
বুড়ি বলল, 'তাহলে তুমিই বলে দাও কেমন করে বুদ্ধি খাটালে ছেলে গুলো মানুষ হয়?'
বুড়ো চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে তারপর বুড়িকে বলল, 'তোমার এ সমস্যার ভাল একটা সমাধান আমার কাছে আছে। তবে তুমি যদি তা নিতে চাও তাহলে তোমাকে কথা দিতে হবে তুমি এ কথা কারো কাছে বলতে পারবে না। আর তা ছাড়া একবার শুরু করলে কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে আমার কথামত চলতে হবে; একটুও নড়চড় করতে পারবে না, না হলে কিন্তু ভীষণ বিপদ হয়ে যাবে। '
উপায় না দেখে অগত্যা বুড়ি তাতেই রাজি হয়ে গেল। বুড়ো তখন বুড়ির কানে কানে কিছু পরামর্শ দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
পরদিন সকালে বুড়ি নদীতে পানি আনতে যেয়ে আর ফিরে এলো না। বেলা গড়িয়ে দুপুর হলো, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল; কিন্তু বুড়ির আর দেখা নেই। এদিকে গাছের মাথায় ঘুমিয়ে থাকা তার চার ছেলের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনেক আগেই। পেটে যখন ক্ষুধায় চোঁ চোঁ ধরল তখন একে একে চারজনই নিচে নেমে তাদের মাকে খুঁজতে শুরু করল। আর বুড়োটাও গ্রামময় আগেই রটিয়ে দিয়েছিল বুড়িকে বাঘে ধরে নিয়ে গেছে। নিচে নেমে সেই খবর শুনে চার ছেলে যত দুঃখ পেল তারচে' বেশি দুঃখ পেল কাজের কথা ভেবে। তাদের কাজ গুলো এখন কে করে দেবে এই ভেবে তারা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল। তখন সেই বুড়ো তাদের কাছে এগিয়ে এসে বলল, 'তোমরা এত চিন্তা করছ কেন, তোমার মা তো ছিল একা মানুষ; তাও বুড়ি। আর তোমরা শক্ত সমর্থ চার চারজন ছেলে। তোমার মায়ের কাজগুলো চারজন মিলে ভাগ করে করলেই তো হয়ে গেল।'
কথাটা মনে ধরল বুড়ির ছেলেদের। তারা তখন কাজ ভাগ করতে লেগে গেল। কাজ ভাগ শেষে দেখা গেল সবচে' কঠিন আর কষ্টের কাজগুলো পড়েছে ছোট ছেলের ভাগে।
আর বুড়ির বড় তিন ছেলে খুব ভালই জানতো ছোট ছেলেকে যা কাজ দেয়া যাবে তাই সে করতে বাধ্য হবে। কারণ সে ছিল খুবই বাধ্যগত ছেলে। তা ছাড়া সে ছিল খুব নরম আর মায়ের ভক্ত। সুতরাং মা হারিয়ে সে নিশ্চয় মায়ের কাজগুলো করতে আপত্তি করবে না। সাধারণত ছোটরা যা হয়ে থাকে সে ঠিক তাই ছিল।
ফলে ছোট ছেলের ভাগে প্রতিদিন কাজ জুটল নদী থেকে পানি টেনে এনে গাছের মাথায় তোলা। আর সকাল বিকেল সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। বেশ কঠিন কাজ। ছোট ছেলে তাতেই রাজি হয়ে গেল। বুড়ির বাকি আর ছেলেদের যা কাজ পড়ল তা নিতান্তই তুচ্ছ। যেমন বড়টির কাজ পড়ল ঘর গুছিয়ে রাখা, মেজটির ঘর ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা আর সেজটির কাজ পড়ল বাইরে থেকে আনা খাদ্য দ্রব্যগুলি গুছিয়ে রাখা। ভাগ্যিস! তাদের কোন বোন ছিল না; বোন থাকলে হয়তো বড় তিন ভাইয়ের কাজ সে একাই করে দিত অনায়াসে।
এতে করে একমাত্র ছোট ছেলে ছাড়া বাকি আর কারো জীবনে তেমন কোন ছন্দপতন ঘটল না। সবাই আগের মতোই সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায় আর ঘুমায়। ছোট ছেলে অবশ্য মায়ের কাজগুলো করতে যেয়ে বেশ পরিশ্রমী আর চটপটে হয়ে উঠল অল্পদিনেই।
এদিকে সেই বুড়োর পরামর্শ মতো বুড়ি কিন্তু লুকিয়ে ছিল কাছেই একটা পাহাড়ের গুহার মধ্যে। সেখানে বুড়ো তাকে দিয়েছিল একটা জাদুর থালা আর একটা জলপাত্র। যখনই তার কিছু খেতে মন চাইবে তখনই জাদুর থালাটা হাতে নিয়ে তাকে শুধু বলতে হবে:

"খেতে আমার মন চায় যা,
হাজির কর এখনই তা __"

অমনি সাথে সাথেই সেই জাদুর থালা আর জলপাত্রে তার পছন্দ মতো খাদ্য আর পানীয় এসে হাজির হয়ে যাবে। কিন্তু ছেলেদের অভুক্ত রেখে কোন মা কী পারে নিজে ভালমন্দ খেতে। তাই বুড়ি জাদুর থালার কাছে চাইল দু'টো শুকনো বাসি রুটি আর একটু পানি। জাদুর থালা তাকে তাই এনে দিল। আর এভাবেই বুড়ির দিনগুলো একে একে কাটতে লাগল।

বুড়ি সেখানেই বসে সেই বুড়োর কাছ থেকে ছেলেদের খবরা খবর জেনে নিত। ছোট ছেলের কষ্টের কথা শুনে বুড়ির চোখে আর পানি ধরে না। কথায় আছে নদীর স্রোত আর মায়ের স্নেহ নিম্ন দিকে বহমান। ছোট ছেলের জন্য মায়ের স্নেহ সব সময় একটু বেশিই থাকে। তাই সে একদিন বুড়োকে বলল, 'ছেলেরা মানুষ হোক আর নাই হোক, আমি ফিরে যাই আবার তাদের কাছে। ছোটটার কষ্টের কথা শুনে শুনে আর সহ্য করতে পারছি না।'
বুড়ো তখন তাকে বলল.'একটু ধৈর্য ধরে দেখই না। বাড়ি থেকে যখন একবার বের হয়েছ নিশ্চয় এভাবে ফিরে যাওয়াটা মোটেও উচিত হবে না।'
বুড়োর কথা মত বুড়ি ধৈর্য ধরলেও বুড়ো কিন্তু থেমে রইল না মোটেও। সে নূতন আর একটা ফন্দি বের করল মাথা দিয়ে।
বুড়ির ছোট ছেলে একদিন নদীতে পানি আনতে যাচ্ছিল। তখন সেই বুড়োটা তাকে দেখে পথের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ' আহা রে-, বেচারা! মা কে বাঘে খেয়ে কী বিপদেই না পড়ল।'
বুড়োর কথা শুনে ছোট ছেলে বলল, 'আমার মতো অলস আর বে-ওকুফ ছেলেদের এমন বিপদেই পড়া উচিত।'
বুড়ো অবাক হয়ে বলল, 'কেন কেন, এমন কথা বলছ কেন তুমি?'
ছোট ছেলে তখন বলল বুড়োকে, 'মা বেঁচে থাকতে আমরা কখনো তাকে কোন কাজে সাহায্যও করিনি; নিজেরাও কোন কাজ করিনি। এখন তো এমনটা হতেই পারে। আর এতে আমার কোন দুঃখ নেই।'
তার কথা শুনে বুড়ো মনে মনে ভাবল ছেলেটার মনে কোন হিংসা নেই। কেননা তাকে দিয়ে অন্য ভাইয়েরা সবচে' কঠিন কাজগুলো করালেও তাতে সে মোটেও দুঃখিত নয়। বরং মায়ের প্রতি করা অবহেলার জন্যই সে বেশি বেশি অনুতপ্ত হয়ে আছে।
তাই বুড়োও তখন থলের বেড়াল বের করে দিয়ে বলল, 'তুমি যদি তোমার মায়ের সাথে দেখা করতে চাও তাহলে আমি তোমাকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিতে পারি। সেই মন্ত্রটা পড়লেই তুমি তোমার মায়ের দেখা পাবে। কিন্তু সাবধান এই কথাটা কাওকে তুমি বলতে পারবে না।'
ছোট ছেলে তো বুড়োর কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল, 'কী সেই তোমার মন্ত্র একবার বলো না গো, এখুনি আমি তা পড়ে মায়ের সাথে একবার দেখা করে আসি।'
'কিন্তু সেখানে গেলে একটা বিপদও আছে, তুমি কিন্তু আর মোটেও তোমার ঘরে ফিরতে পারবে না। ভাইদের সাথে আর তোমার দেখাও হবে না।' বলল বুড়ো।
বুড়োর কথা শুনে মোটেও ঘাবড়ে গেল না ছোট ছেলে; বরং সে বলল, 'বেশতো, না হলে নাই হলো দেখা কারো সাথে; কিন্তু মায়ের সাথে যে আবার দেখা হবে এটাই বা কম কী?'
বুড়ো মনে মনে বুঝল ছোট ছেলে যে মায়ের ভীষণ ভক্ত তা তার কথাতেই প্রমাণ পাওয়া গেল। তখন সে একটা রুমাল দিয়ে ছোট ছেলের চোখ দুটো বেঁধে দিয়ে বলল,' আমার সাথে চলো আর মনে মনে এই মন্ত্রটা পড়ো ঃ

"যে কাজে দেবে ফাঁকি,
তার হবে জীবনটাই মাটি।"

চোখ বাঁধা ছোট ছেলে বিড় বিড় করে বুড়োর শেখানো মন্ত্রটা পড়ে আর রাস্তা দিয়ে হাঁটে। বুড়োই তাকে পথ চিনিয়ে সেই পাহাড়ের উপরে নিয়ে এলো। তারপর গুহার ভিতরে নিয়ে যেয়ে তার চোখ খুলে দিল।
চোখ খোলা পেয়ে ছোট ছেলে মাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল, 'একী, আমি সত্যি দেখছি; না স্বপ্ন দেখছি।'
মা ও তখন ছেলে কে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল, 'না বাছা এ মিথ্যেও না আবার স্বপ্নও না, একেবারেই দিনের মতোই সত্যি।'
তারপর মা তাকে সব কথা খুলে বলতেই তার মনের সব ভয় দুর হলো। সেই সাথে ছোট ছেলেও বুঝল মায়ের সাথে এবার সেও কিছুদিনের জন্য বন্দি হয়ে পড়ল এই গুহায়।
এদিকে সেই বুড়ো গ্রামে ফিরেই গ্রামময় রাষ্ট্র করে দিল বুড়ির ছোট ছেলেকে এবার কুমিরে খেয়েছে। নিচে চেঁচামেচি শুনে বুড়ির বাকি তিন ছেলের ঘুম ভেঙে গেল। তারপর তারা একে একে নিচে নেমে এসে শুনল তাদের ছোট ভাইটিকে কুমির ধরে নিয়ে গেছে। যখন সে নদীতে পানি আনতে গিয়েছিল তখনই তাকে এক কুমির এসে গভীর পানিতে টেনে নিয়ে গেছে।
তখন তারা আর কী করে বুক চাপড়ে হা-হুতাশ করে উঠে বলতে লাগল, 'হায় হায় এখন আমাদের কী হবে গো-, আমরা কোথায় যাব গো; কে বা আমাদের খাওয়া আর পানি এনে দেবে? মা ছিল; সে গেল বাঘের পেটে। ছোট ভাই গেল কুমিরের পেটে। হায় হায় এখন আমাদের কী হবে?'
তাদের কান্না আর বিলাপ শুনে গ্রামের লোক সবাই জড়ো হয়ে গেল সেখানে। কিন্তু কেউ এর কোন সমাধান দিতে পারল না। বরং সবাই গোপনে নাক সিটকে চলে যেতে যেতে বলল, 'কুঁড়ে লোকদের এমনই দশা হয়। কর এখন কুঁড়েমি, দেখ কেমন দশা হয়।'
শেষে সবাই তাদের ফেলে রেখে একে একে চলে গেল সেখান থেকে। বুড়ো লোকটা তখন এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। তারপর সে তার গলা অত্যান্ত মোলায়েম করে এনে বলল, 'তোমরা এভাবে কাঁদছ কেন? কী হয়েছে তোমাদের?'
বুড়ির বড় ছেলে কান্না থামিয়ে তাকে বলল, 'আমাদের মা আর ছোট ভাই আমাদের সব কাজ করে দিত। কিন্তু তাদের দু'জন কে বাঘে আর কুমিরে খেয়েছে এখন আমরা কোথায় যাব, আর কে বা আমাদের কাজগুলো করে দেবে।'
বুড়ো তখন মিট মিট করে হেসে বলল, 'বোকা দেখেছি জীবনে অনেক কিন্তু তোমাদের মত নিরেট গো-মূর্খ বোকা আর দেখিনি এর আগে।'
তারপর বুড়ো তাদের কিছু পরামর্শ দিয়ে সেদিনকার মতো সেখান থেকে চলে গেল। পরদিন থেকে দেখা গেল বুড়োর পরামর্শ বেশ কাজে লেগেছে তাদের। তারা তিনজন এবার তাদের কাজগুলো ভাগ করে নিয়ে করতে লাগল। কেউ বয়ে আনল নদী থেকে পানি। আবার কারো ভাগে পড়ল খাদ্য খুঁজে আনার দায়িত্ব। ফলে অল্পদিনেই তারা তিনজনই বেশ পরিশ্রমী হয়ে উঠল। এই না দেখে বুড়ো আবার একদিন এসে হাজির হলো সেখানটায়। তাকে দেখেই তিনভাই ছুটে এসে বলল, 'আমরা তিনজন এখন খুব ভাল আছি। তুমি যদি আমাদের মা বেঁচে থাকতে থাকতেই পরামর্শটা দিতে তাহলে আমরা অকালে মা হারাতাম না। আর ছোট ভাইটিকেও কুমিরে টেনে নিয়ে যেতে পারতো না।'
বুড়ো তখন মিটি মিটি হেসে বলল, 'অতীতে যা ঘটে গেছে তা নিয়ে আফসোস করা নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এখন যদি তোমরা তোমাদের মাকে ফিরে পাও তাহলে কী আবার আগের মতোই অলসতা শুরু করবে?'
বুড়ির বড় ছেলে তখন বলল, 'মাকে আমরা আর কোনদিন ফিরে পাব না; কিন্তু তাকে যদি আমরা ফিরে পেতাম তাহলে নিশ্চয় অমনটা আর কখনোই করতাম না।' বাকি দুই ছেলেও বড়টির কথায় সায় দিল।
তখন বুড়ো তাদের উদ্দেশ্য করে বলল, 'আমি একটা যাদু জানি। তোমরা যদি তোমাদের দেয়া কথা ঠিক রাখতে পার তাহলে নিশ্চয় জাদুবলে তোমাদের মাকে আবার তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারি। কিন্তু শর্ত একটাই আমার যাদুর কথা তোমরা কারো কাছে কখনো প্রকাশ করতে পারবে না।'
বুড়োর কথা শুনে তারা তিনজনই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। বুড়ো বলল, 'তাহলে আমার কথামতো তোমরা আমার শেখানো মন্ত্র পড়তে শুরু করো; আমি তোমাদের চোখ বেঁধে দিই।'

বুড়ো তখন একে একে তাদের তিনজনেরই চোখ বেঁধে দিয়ে মন্ত্রটা এবার শিখিয়ে দিল।
"ফাঁকি দিলে ফাঁকে পড়ে
এই কথাটি সবাই যেনো,
কাজের মাঝেই শান্তি আছে
সবাই তারে বাসেও ভালো।"

বুড়োর কথামতো তারা তিনজনই শুর করে মন্ত্রটা বার বার পড়তে লাগল। এদিকে বুড়ো করল কী, সোজা দৌড়ে যেয়ে মা আর ভাইকে ডেকে এনে তাদের মাঝে দাঁড় করিয়ে দিয়ে একে একে সবার চোখ খুলে দিল।
অনেকদিন পর শুধু মাকেই না তাদের ছোট ভাইকেও আবার ফেরত পেয়ে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। তারপর সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে প্রতিজ্ঞা করল আর কখনো তারা কাজে ফাঁকিও দেবে না কিংবা মাকেও অবহেলা করবে না।
এরপর থেকে চার ছেলে আর তাদের মা সুখে শান্তিতে সেখানে বাস করতে লাগল। কিন্তু শুনলে তোমরা অবাক হবে, সেই অদ্ভুত বুড়োকে সেই গ্রাম কিংবা আশেপাশে কোথাও; কেউ কোনদিন আর দেখেনি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • সূর্য
    সূর্য আপনার লেখাগুলো বরাবরই এমন হয়। আজকাল সবাই আমরা চটুল কোন ঘটনা লিখে থাকি। আপনি গল্পকবিতার আসরে একটা ভিন্নতা নিয়ে আছেন। এই ধারাটা সবাই ভাল পারেনা। আপনার জন্য শুভকামনা থাকলো। আমি নিজ চিন্তায় লেখাগুলোর প্রাপ্য ভোট সব সময়ই দেই। আর একটা কথা ঠিক বয়সটা দিলে সম...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১৩ মে, ২০১১
  • ফাতেমা প্রমি
    ফাতেমা প্রমি আমার ভালো লেগেছে-কারণ রূপকথা খুব ভালোবাসি-আর খুব খারাপ লাগলো কারণ বাসায় বুয়া না থাকলে আম্মুকে তেমন একটা সাহায্য করতাম না,উল্টো আমার মুখে খাবার তুলে দিতে হত তার...আপনার উপদেশমূলক গল্পটা সেই আমার মত কুঁড়ে গুলোকে একটু হলেও ভাবিয়ে তুলবে..চমত্কার গল্প.
    প্রত্যুত্তর . ১৬ মে, ২০১১
  • হোসেন মোশাররফ
    হোসেন মোশাররফ আপনার মন্তব্য টি দেখে আমি এখন মনে মনে ভয় পাচ্ছি / কেননা অদ্ভুদ বুড়টা যদি এই মন্তব্য টি দেখে আপনার মা কে জাদুর থালা দিয়ে গুহায় রেখে আসে তাহলে তো আপনি খুব বিপদে পরে যাবেন / যাক মনে মনে কামনা করি আপনার অনুরূপ বিপদ যেন না হয় / ধন্যবাদ আপনাকে .....
    প্রত্যুত্তর . ১৬ মে, ২০১১
  • ফাতেমা প্রমি
    ফাতেমা প্রমি না,অসুবিধা নেই..অদ্ভুত বুড়ো তো এমনিতেই লাপাত্তা...আর ওটা তো আগের আমি..আম্মুকে ছেড়ে থাকতে হলো যখন থেকে তারপর বাসায় যখনি ফিরি ছুটিতে,তখন হেল্প করার চেষ্টা করি যথাসম্ভব..তাই আপনার অদ্ভুত বুড়ো আমার আম্মুকে লুকাতে পারবেই না..
    প্রত্যুত্তর . ১৬ মে, ২০১১
  • খন্দকার নাহিদ হোসেন
    খন্দকার নাহিদ হোসেন খুব সুন্দর এক রূপকথা। আপনাকে ৫ না দিয়ে কি আর উপায় আছে? সামনে আরও লেখা চাই কিন্তু।
    প্রত্যুত্তর . ১৯ মে, ২০১১
  • বিষণ্ণ সুমন
    বিষণ্ণ সুমন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রোজ্জল ধারা হলো রুপকথা. আপনি নিঃসন্দেহে এর এক অপ্রতিদ্বন্দী স্রষ্টা হিসেবে নিজেকে ইতোমধ্যে পাঠক প্রিয় করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন. আপনার লিখার কমেন্ট করার কিছু নেই, যেহেতু আমি নিজেই আপনার ভক্ত. এগিয়ে যান, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২১ মে, ২০১১
  • ওবাইদুল হক
    ওবাইদুল হক অনেক অনেক সুন্দর দাদা । তবে এত লম্বার কারনে সময় নিতে হল বেশি । তবুও পড়ে ভাল লাগল । ধন্যবাদ ।
    প্রত্যুত্তর . ৩১ মে, ২০১১
  • এফ, আই , জুয়েল
  • আহমেদ সাবের
    আহমেদ সাবের আপনাকে কথা দিয়েছিলাম, বন্ধু সংখ্যার সব লেখা পড়বার পর আপনার গল্প গুলো পড়বো। হ্যাঁ, কথা রাখতে এলাম, পড়লাম এবং ভাল লাগা জানিয়ে গেলাম। গল্প আর উপদেশ, দুটোই ভাল লাগলো।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জুলাই, ২০১১
  • হোসেন মোশাররফ
    হোসেন মোশাররফ আপনি আমার সবগুলো গল্প একসাথে পড়ে এবং মন্তব্য লিখে আমাকে অনেক উত্সাহ দিলেন সেইজন্য আপনাকে জানাচ্ছি অনেক শুভেচ্ছা এবং কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ ....... @আহমেদ সাবের
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জুলাই, ২০১১

advertisement