লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ২৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাংলা ভাষা (ফেব্রুয়ারী ২০১৩)

সার্টিফিকেট
বাংলা ভাষা

সংখ্যা

সালেহ মাহমুদ

comment ১৪  favorite ২  import_contacts ১,১২০
[ বেশ পুরনো একটি গল্প। কাগুজে শেয়ার মার্কেট আমলের গল্প। গ.ক.র পাঠকদের জন্য এখানে আবার সেটা তুলে ধরলাম। পুরনো বলেই ভোটিং-ও বন্ধ করে দিলাম। ]


এক.

শেষ পর্যন্ত আমাকে খালি হাতেই ফিরতে হলো। আজও কিছুই জোগাড় করতে পারলাম না।
রাত দশটায় যখন বাড়ী ফিরতে হলো তখন দেখি বউটা উবু হয়ে কি যেন করছে। ভাবলাম হয়তো পড়াশুনা করছে। তার কোলের ওপর বই। পা ছড়ানো সামনের দিকে। চিবুকে হাত রেখে ঝুঁকে আছে বইয়ের ওপর।

আমি বরাবরের মত গলা খাকারি দিয়ে আমার আগমন বার্তা জানিয়ে দিলাম। কিন্তু কি অবাক কাণ্ড বউ মাথা তুলে তাকালোও না। অথচ আমি যখনই বাইরে থেকে ফিরি তখনই সে ব্যস্ত হয়ে যায় আমাকে নিয়ে। শার্ট খুলে দেয়া, মোজা খুলে দেয়া, ঘাম মুছে দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।
অথচ আজ সে একবারে আত্মমগ্ন হয়ে আছে। আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। কাপড় পাল্টানোর কথা ভুলে গেলাম বেমালুম। হাত থেকে কভারড ফাইলটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দরজা লাগিয়ে দিরাম। তার পাশে বসে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে মনি?

কোন কথা বললো না সে। চুপ করে বসে রইলো
আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। আমার বউটা আসলেই খুব ভালো। এত নরম যে ভাবাই যায়। কাউকে একটা বকা পর্যন্ত দিতে জানে না। কেউ যদি কিছু বলে তো চুপ করে শোনা ছাড়া কিছুই করতে জানে না সে।

আমি ওর মাথার হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার মন খারাপ কেন?

ও কোন কথা বলল না। ওর চোখ থেকে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়েত লাগলো। আমি ভীষন বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। মনি তো এত সহজে কাঁদে না। ও অনেক সহ্য করতে পারে। আমি ওকে আমার বুকে টেনে নিলাম। মনি আমাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ওর মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দিলাম আমি। বললাম, কাঁদে না মনি। কাঁদে না। আমাকে বল কি হয়েছে? আম্মা বকেছে?
ও কান্না ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল, না
তাহলে কি হয়েছে?
কিছু হয়নি।
তবে কাঁদছ কেন?
এমনি, হঠাৎ কান্না পেলো।
আমি বুঝতে পারলাম, সে কিছু একটা লুকাতে চাচ্ছে। হয়তো আম্মা ওকে কিছু বলেছে। কিংবা বাড়ীর জন্যও মন খারাপ হতে পারে। কিংবা অন্য কিছু।

সে সাই হোক। খামোখা কিছুই ধারণা করতে চাই না আমি। কারণ, সে তার কান্নার কথা একটু পরেই আমাকে বলবে। যতই সে ভাবুক বলবে না, তারপরও তাকে বলতেই হবে। আমি তাকে বললাম, ছি বাচ্চা মানুষের মত কাঁদে না।
বলে ওর চোখ মুছে দিলাম। আদর করে দিলাম। ওর কান্না থেকে গেল। কোলের ওপর থেকে বইটা নামিয়ে রেখে নিয়োজিত হল আমার সেবায়। আমি তাকে পূর্ণ সুযোগ দিলাম। সে আস্তে আস্তে আমার জামার বোতাম খুলতে খুলতে বলল, আজ কিছু হলো তোমার?

তার কণ্ঠ শিশিরসিক্ত। আমি বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা। সে আমাদের ভবিস্যত নিয়ে চিন্তা করতে করতে আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিল।

আমি কি উত্তর দেব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। তবু ফাইলটা দেখিয়ে দুস্টুমি করে বললাম- ওর ভেতরে আছে সাত রাজার ধন। সাত পুরুষ ধরে বসে বসে খেলেও ফুরাবে না।

এবার হেসে ফেললো আমার বউ। বুঝলো দুষ্টামি করছি। বলল কোন শেয়ার বিক্রি করতে পারো নি?

এবার দমে গেলাম আমি। বললাম নাহ।

আমার মনটা একদম খারাপ হয়ে গেলো। কি যে করি ভেবেই পাচ্ছি না। আমার ফাইলের ভিতর দু’লাখ টাকার শেয়ার পড়ে আছে। অথচ হাতে একটা টাকা নেই। দু’সপ্তাহ আগে সেল অর্ডার দিয়েছিলাম। কিন্তু আজও বিক্রি হয় নি। তাই এক রকম রাগ করেই শেয়ারগুলো তুলে এনেছি। কি আর করব। চড়া দামে কেনা শেয়ার অর্ধেক দামেও বিক্রি করতে পারছি না। এরচে’ বড় দুর্ভাগ্য আর কাকে বলে?
বিক্রি হবে না?
জানি না।
তাহলে তুমি তোমার ঋণ শোধ করবে কি করে?

ওর কথা শুনে আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আসলেও তো তাই। আমি ঋণ শোধ করব কি করে? দু’লাখ টাকার মতো শেয়ার পুরোটাই ঋণ করে কেনা। এখন যদি টাকাগুলো সময়মত দিতে না পারি, তবে আমার মান-সম্মান রাখা সম্ভব হবে না। কিন্তু কিভাবে দেব এতগুলো টাকা? ভাবতে আমার মাথা ধরে এলা। এরই মধ্যে অনেক হিসাব করেছি। এখনও যদি শেয়ারগুলো বিক্রি করতে পারতাম কিছুটা পার পাওয়া যেত। অনেক কম লোকসান হতো। তা-ও কম না প্রায় লাখ টাকার মতো। কিন্তু কয়দিন পর হয়তো পঞ্চাশ হাজারও পাওয়া যাবে না। তখন তো পুরোটাই লোকসান।
ভাবতে ভাবতে যে কখন আত্মমগ্ন হয়ে গেছি তা নিজেও জানি না। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার অজান্তে। মনিকে স্পর্শ করে গেলো সে দীর্ঘিশ্বাস। সেও চুপ মেরে গেলো। আনমনা হয়ে বললো- শোন এখনও সময় আছে তোমার সবগুলো শেয়ার বিক্রি করে দাও। এই শেয়ারই তোমার কাল হয়ে দাঁড়াবে দেখো।

বলতে বলতে সে আমার শার্ট আলনায় ঝুলিয়ে রাখে। আমি খাটে বসে জিরিয়ে নেই। আর ভাবতে থাকি কি করবো। মাথায় ভিতর জট পাকিয়ে যায় সবকিছু। স্ত্রী এসে বসে আমার পাশে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে- যাও হাতমুখ ধুয়ে এসো। সারাদিনের না খাওয়া তুমি। আমিও খাইনি।

রাতে আমার আর ঘুম হয় না। পাশে জেগে থাকে স্ত্রী-ও। আমি তাকে আদর করে ডাকি মনি। ছোটখাট মিষ্টি মেয়েটি আমার বউ, ভাবতেই আমার মন ভরে যায়।

আমাদের বিয়ে হলো মাত্র দু’বছর। কোন চেনাজানা ছিল না। আমি মাত্র এম.এ পাশ করেছি। আমার মা আমাকে চেপে ধরলেন বিয়ের জন্য। আমি বিয়ে করব না বলে দিলাম সাফ সাফ। অন্ততঃপক্ষে পাঁচ বছরের আগে যেন বিয়ের কথা বলা না হয় এ কথাও বলে দিলাম সবাইকে। কিন্তু আমার মা একেবারে পাগল হয়ে গেলেন বিয়ে করানোর জন্য। হয়তো তিনি ভাবছেন আমি বখে যাব। কিংবা প্রেম-ট্রেম করে ঘটিয়ে ফেলব কোন অঘটন। কিংবা আরো অনেক কিছুই ভাবতে পারেন। কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ভালো রোজগারের ব্যবস্থা না করে বিয়ে করবো না।

একদিন মা আমাকে ধরলেন, তোকে আজ বলতেই হবে তুই কেন বিয়ে করতে চাস না? তোর কি কোন পছন্দ আছে? থাকলে বল তোর পছন্দেই বিয়ে হবে।

আমি পড়লাম মহা বিপদে। মাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম- ওসব কিছু না। আমি স্বাবলম্বী না হয়ে বিয়ে করবো না।
মা আমার কথা মানতেই চান না। তিনি বলেন যদি তোর কোন পছন্দ না থাকে তবে তোকে বিয়ে করতেই হবে।
আমি আরো ভালো করে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না। বিয়ে করলেই হলো। আমি খরচ সামাল দেব কি করে। ভাবতেই আমার মাথায় যেন বাজ পড়লো। আববাকে বললাম- এটা আপনাদের কোন ধরনের জেদ? আমাকে বিপদে ফেলার জন্য এত ব্যস্ত কেন আপনারা?
মা পাশে থেকে হাসিমুখে বললেন- ঠিক আছে তুই যতদিন রোজগার করতে না পারছিস ততদিন তোদের দু’জনের সমস্ত দায়-দায়িত্ব আমার ঘাড়ে। তোকে এক পয়সার জন্য চিন্তা করতে হবে না। কি রাজী?
মা’র কথা শুনে আমার কান্না পেলো কেন যেন। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুই বলেতে পারছিলাম না। মা’র আগ্রহের সামনে আমি একেবারে অসহায় হয়ে পড়লাম। আমার জনক-জননী যেভাবে উন্মুখ হয়ে আছেন আমাকে বিয়ে করানোর জন্য তাতে আমি নিতান্ত নাবালক হয়ে পড়লাম। আমি যেন আমার ভালোমন্দ কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমার মা ঠিক তখনই ছুঁড়লেন তার মোক্ষম অস্ত্রটি। বললেন- তুই আমার মাথা খাস, যদি বিয়ে না করিস।
আববা আমার মুখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইলেন। মা’র কথা শুনে আমার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এলা। তপ্ত জল গড়িয়ে পড়লো আমার কপোল বেয়ে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলে ফেললাম- আপনারা যেমন বোঝেন তেমনটিই হবে।


এ ঘটনার ঠিক পনের দিনের মাথায় ছোট বোন আমাকে একটা খাম ধরিয়ে দিলো আমি তখন সবে বাসায় ফিরেছি দুনিয়া চষে। খামটা খুলে দিখি একট বাচ্চা মেয়ের ছবি। দেখে মনে হয় স্কুলে পড়ছে এখনো। কিন্তু তার বায়োডাটা দেখে আমার একেবারে অবাক হবার পালা। এই পুঁচকে মেয়ে কিনা অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। সামনে পরীক্ষা। আমার খুব কৌতুহল হলো মেয়েটাকে দেখার। ছোট বোনকে বলেই বসলাম মেয়েকে সরাসরি না দেখে কথা না বলে কিছুই ঠিক করা যাবে না। এই মেয়ের সাথে আমি বাইরে কোথাও দেখা করতে চাই।

যেই বলা সেই কাজ। দু’দিনের মাথায় খবর এলো পরদিন বড় আপার বাসায় যেতে হবে খুব সকালে। সেখানে পাত্রীর সাথে কথা বলা যাবে। ঘটক আর বড় আপা থাকবে শুধু।

খবরটা শুনে আমি মনে মনে বেশি পুলকিত হলাম। সারাটা রাত আমার কাটলো স্বপ্নে স্বপ্নে। সকালে একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠলাম। খুব আয়েশী ভঙ্গিতে শেভ-গোসল সারলাম। তারপর খুব সাধারণ জামা কাপড় পড়ে গেলাম আপার বাসায়।

সে-ই প্রথম দেখা। আপার বাসায় দেখলাম ছোট্ট একটা মেয়েকে। কথা বললাম তার সাথে। মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠলো। সে কি হাসি, প্রাণ মাতানো হাসি। আর সে হাসিতেই আমি মজলাম।

এ সব সদ্য পুরানো কথা ভাবতে ভাবতে আমি হেসে উঠলাম মনে মনে। পাশ ফিরে দেখলাম মনি ঘুমিয়েছে কিনা। আমার পাশ ফেরা দেখে মনিও পাশ ফিরলো। মুখে সেই পরিচিত হাসি ছড়িয়ে বললো- কি ব্যাপার ঘুমাচ্ছো না কেন?

আমি কোন জবাব দিলাম না। তাকিয়ে রইলাম তার মুখের দিকে। সেই পুরনো মুখ, প্রথম দেখার সেই লাজুক মুখ। অভাবের তাড়নায় পিষ্ট সেই মুখের হাসি আজো তেমনি আছে। শুধু যখন মন খারাপ হয়, তখনই তার চেহারায় মালিন্য ফুটে ওঠে। আমি তখন ছটফট করে উঠি। আদরের পুতুলটিকে অনাদরে ফেলে রেখেছি ভেবে তীব্র অনুশোচনায় কঁকিয়ে ওঠে আমার সমস্ত অন্তরাত্মা। আমি বেশ সহানুভূতির সাথে বললাম, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না?

মনি কৌতুকের হাসি হাসলো। মুখ ভেংচিয়ে বললো- খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না? বলেই দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। আমি হাত বাড়িয়ে বেড সুইট অফ করে দিলাম।

দুই.
নাস্তার টেবিলে মা বললেন তোর খালাম্মা টাকা চেয়ে পাঠিয়েছেন। তার খুব দরকার। কি বলবো তাকে বল তো?
শুনে আমার মনটা একটু দমে গেল। কিছুই বললাম না। মাথা নীচু করে নাস্তা সেরে উঠে গেলাম। আমি কখনো এমন বিপদে পড়িনি। আমার একটা ব্যাপার ছিল গর্ব করার মতো। আমি কখনো কারো সাথে কথা মিস করিনি। কারো কাছ থেকে ঋণ নিলে সেই টাকা নিয়ে তার ভাবতে হতো না। সময়মত দিতে না পারলে তার কাছে সময় চেয়ে নিতে ভুল হতো না আমার।
কিন্তু এবার আমি আমার অভ্যাসের সম্পূর্ন উল্টো পথে চলতে বাধ্য হলাম। বাইরে যাওয়ার সময় মাকে বললাম- খালাম্মাকে বলবেন খুব শিগগিরই আমি সব টাকা শোধ করে দেব। আর ক’টা দিন অপেক্ষা করতে বলুন।
আমার কথা শুনে মা ক্ষেপে গেলেন। বলে উঠলেন- টাকা নেওয়ার সময় তো তুই খুব ভালো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেই টাকা নিয়েছিলি। এখন এমন দোনোমোনো করছিস কেন? মানুষের কাছে আমার মুখ দেখানোর পথ বন্ধ করার ব্যবস্থা করছিস তুই। আর কখনো কোনো ঠেকায় পড়লে কি তারা আমাকে আর টাকা ধার দেবে? তোর যদি কোন কা-জ্ঞান থাকতো।
মা’র কথাগুলো শুনতে আমার ভীষন খারাপ লাগছিল। আমি কখনো ভাবিনি এমন অবস্থায় পড়তে হবে আমাকে। আমি টাকার জন্য কারো কাছে কোন কথা শুনব এ ছিল আমার কল্পনার অতীত। মা’র কথা শেষ হলে আমি বললাম- আমার অবস্থা কি আপনার জানা নেই মা? তারপরও আমার সাথে এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি কি শখ করে কারো টাকা আটকে রেখেছি?
একটু রূঢ় ভাবেই বলে ফেললাম কথাগুলো। মা ভীষন রেগে গেলেন আমার কথা শুনে। চিৎকার করে বলে উঠলেন, বেয়াদবের মতো কথা বলছিস কেন? যার টাকা সে বোঝে টাকার মায়া। তুই যদি টাকা ফেরৎ না-ই দিতে পারবি তবে নিয়েছিলি কেন? নেওয়ার সময় তো আমাকে বলেছিলি এক মাসের মধ্যেই লাভ সহ টাকা ফেরৎ দিবি। সেই এক মাসের জায়গায় আজ ছয় মাস হতে চললো তারপরও আসল টাকা দেয়ারই কোন নামগন্ধ নাই, লাভ তো দূরের কথা। তুই শেয়ার ব্যবসায় লাভ করেছিস না লোকসান করেছিস সেটা আমি বুঝি না। এক সপ্তাহের মধ্যেই সব টাকা শোধ করবি, যেখান থেকেই পারিস। এটাই আমার শেষ কথা।
কথা কয়টি বলেই মা ঘরের ভেতর চলে গেলেন। আমি ভীষণ অপমান বোধ করলাম। কি করবো আমি? আমি তো একটা চক্রে আবদ্ধ আজ। যদি অর্থের লোভ না করতাম, তবে হয়তো এত তাড়াতাড়ি এ চক্রে চড়িয়ে পড়তাম না আমি।
বিয়ের দেড় বছরের মাথায়ও যখন আমার রোজগারের কিছুই হচ্ছিল না তখন শেয়ার ব্যবসার চাঙ্গা ভাব দেখে মার কাছে টাকা চাইলাম। মা-ও দেখলেন ক্ষতি নেই, অল্প ক’দিনেই দ্বিগুন লাভ। সুতরাং তিনি আমার জন্য ধার করলেন কয়েকজনের কাছ থেকে। আমিও আগুপিছু কিছু না ভেবে দুম করে জড়িয়ে পড়লাম শেয়ার ব্যবসায়। আর তখন থেকেই কমতে শুরু করল শেয়ারের দাম। দাম বাড়ার আশায় অপেক্ষা করতে করতে আজ আমি নিঃস্ব প্রায়। এখন আমার সম্বল মাত্র কয়েকটি সার্টিফিকেট। কয়েকটি জীর্ণ সার্টিফিকেট।
ভাবতে ভাবতে আমি রাস্তায় নেমে পড়লাম। হাতে সেই শেয়ারের বস্তা। উদ্দেশ্য ঢাকা ষ্টক এক্সচেঞ্জ, এক ঝাঁক তারুন্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যত যাত্রার প্লাটফর্ম।
মা’র বকুনি খেয়ে আমার ভেতর এক ধরনের জেদ চেপে গিয়েছিল। আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে বসলাম, যে ভাবেই হোক সাত দিনের ভেতরই শোধ করে দেব সমস্ত টাকা। প্রয়োজনে যা খুশী তাই করবো। অথচ আমি এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কিভাবে ম্যানেজ করব এতগুলো টাকা। হাইজ্যাক করতে পারি। কিংবা এমন কিছুও করতে পারি যা কখনো ভাবিনি আমি। অবশ্য আমি তা করতে চাইলেও পারব না। যতই চেষ্টা করি পারব না আমার চরিত্রকে বিলীন করে দিতে। কিন্তু তারপরও আমার ভেতর একটা জেদ চেপে বসলো। যে করেই হোক টাকাটা আমাকে ফেরৎ দিতেই হবে।
মার বেঁধে দেয়া সাত দিনের তৃতীয় দিন আজ। বেশ ক’জন বন্ধুর কাছে গিয়ে নিরাশ হলাম। কারো হাতেই টাকা নেই। কিংবা শেয়ার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছি বলেই হয়তো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তারা। কেবল একজন আমাকে আশার আলো দেখালো। আমাকে সে পুরো দু’লাখ টাকাই দিতে প্রস্ত্তত। তবে তার চাই মাত্র চারটি সার্টিফিকেট। তার কথা শুনে হাসব না কাঁদব কিছুই বুঝতে পারছি না। মাত্র চারটে সার্টিফিকেটের স্বত্ব ত্যাগের বিনিময়ে আমি পেয়ে যাব দু’লাখ টাকা। কি সৌভাগ্য আমার কি সৌভাগ্য, এমন বন্ধু না হলে কি হয়! তারপরও ভাবার জন্য ক’দিন সময় চেয়ে নিলাম আমি।
মার বেঁধে দেয়া সাত দিনের ষষ্ঠ দিন আজ। এ তিনদিন আমি অনেক ভাবলাম। চারটি সার্টিফিকেট বিক্রি করা ছাড়া ঋণ শোধবার আর কোন পথ আছে কিনা তা-ও ভেবে দেখলাম। নেই, আর কোন পথ নেই। আর কোথাও থেকে টাকা আসার সম্ভাবনাও নেই।

শেষ পর্যন্ত রাজী হয়ে গেলাম আমি।

আমার হাতে এখন দু’লাখ টাকা। আমি এখন কত ধনী। দেখো তোমরা দেখো, আমি এখন কত ধনী। আজই আমি শোধ করে দেব আমার সমস্ত ঋণ। বিনিময় মাত্র চারটি সাটিফিকেট, আমার শিক্ষা জীবনের সমস্ত সঞ্চয়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement