লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ২৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.২৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.২২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমুক্তিযোদ্ধা (ডিসেম্বর ২০১২)

আবুল মাস্টার
মুক্তিযোদ্ধা

সংখ্যা

মোট ভোট ৭২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.২৮

সালেহ মাহমুদ

comment ৩৬  favorite ২  import_contacts ১,০২২
বহুদিন পর কারো সাহায্য ছাড়াই বিছানা থেকে নেমে আসেন আবুল মাস্টার। স্ত্রী আসমা বেগম ধরতে চাইলেও মানা করলেন ইশারায়। তারপর খুব সাবধানে প্রথমে বাম পা মেঝেতে রাখলেন, তারপর আরো সাবধানে এবং অতি যত্নের সাথে ডান পা নামিয়ে আনলেন খাট থেকে। আসমা বেগম নতুন কেনা লাঠিটা ব্যবহার হতে শুরু হবে ভেবেই কিনা কে জানে শাড়ির আঁচল দিয়ে যত্ন করে মুছে দিলেন বার কয়েক। আবুল মাস্টার ততক্ষণে বিজয়ীর হাসি হেসে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। স্ত্রী অত্যন্ত নির্ভরতার হাসিতে অভয় দান করে লাঠিটা সযতনে বাড়িয়ে দেন আবুল মাস্টারের দিকে। আবুল মাস্টার লাঠিতে ভর করে ধীরে ধীরে দাঁড়াতে শুরু করলে আসমা বেগম দুই হাত বাড়িয়ে আগলে রাখেন তাকে। ভারসাম্য হারালেও যেন পড়ে না যান তিনি।

বড় ছেলে হামিদ আলীর স্ত্রী ইসরাত চায়ের ট্রে হাতে রুমে ঢুকতে গিয়ে হা করে তাকিয়ে দেখতে থাকে শশুরের কা-। মুহূর্তমাত্র দেখে নিয়ে প্রায় চিৎকার করে ওঠে- এই তোমরা সবাই দেখে যাও, আববা নিজে নিজেই দাঁড়িয়েছে। তাড়াতাড়ি আস, তাড়াতাড়ি।

ইসরাতের ডাকচিৎকারে সবাই হুড়মুড় করে এসে ভিড় করে আবুল মাস্টারের শোবার ঘরে। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু আবুল মাস্টার ততক্ষণে লাঠিতে ভর দিয়ে পুরোপুরি দাঁড়িয়ে গেছেন। স্ত্রী-সমত্মানদের দিকে আস্থা এবং স্বসিত্মর হাসি নিয়ে তাকালেন একবার। তারপর খুব সাবধানে ডান পা সামনে বাড়ালেন। হামিদ আলী দৌড়ে এসে ধরতে চাইলে ইশারায় থামিয়ে দেন তিনি। এবার বাম পায়ে আর এক কদম হাঁটেন। আবুল মাস্টারের বড় নাতি রুবেলও চোখ কচলাতে কচলাতে এসে দাঁড়িয়েছিল সবার সাথে। সে তার দাদার এ রকম হাঁটার প্রয়াস দেখে হাত তালি দিয়ে বলে ওঠে, দাদায় বাবু হইয়া গেছে, কি মজা কি মজা।

রুবেলের কথায় হাসির রোল পড়ে যায় ঘরময়। আবুল মাস্টারও হেসে ফেলেন। হাসতে হাসতেই বলেন- আয় তর লগেই অহন বিস্কুট দৌড় দিমু, আয়।

রুবেল দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে দাদাকে। রাহেলা বেগম পেছন থেকে পায়ে ঠেস দিয়ে ভর না দিলে হয়তো পড়েই যেতেন তিনি। রুবেল দাদার হাঁটু-উরুতে মুখ ষঘতে ঘষতে বলে- তোমার সাথে ঘুরতে যামু দাদা, চল না ও দাদা চল না। তুমি তো অহন হাটতে পার, চল বাইরে যাব, চল। কতদিন তোমার সাথে ঘুরি না।

হামিদ আলী এসে রুবেলকে কোলে তুলে নেয়। বলে, তোমার দাদা তো এখনো বাইরে যেতে পারবে না। আর কয়দিন পর তুমি দাদার সাথে বাইরে যাবে ঠিক আছে?

রুবেল ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানায়। হামিদ আলী তাকে আদর করে বলে, তুমি তো এখনো দাঁত মাজ নি। যাও, দাঁত মেজে আস, আমি তোমাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাব।

আবুল মাস্টার কারো সাহায্য ছাড়াই ঘরের এমাথা ওমাথা হাঁটেন দু’বার। তারপর বিছানায় বসতে গিয়ে হাত বাড়ান হামিদ আলী দিকে। হামিদ আলী বাবাকে আলগোছে ধরে সযতনে বিছানায় বসিয়ে দেয়।

আবুল মাস্টার বিছানায় বসেই সবাইকে লক্ষ করেন একবার। সবাই যার যার মতো চেয়ার-মোড়া টেনে এনে বসে তাকে ঘিরে। তার মনটা ভরে যায়। এমন সাত সকালে পুরো পরিবারকে একসাথে কামনা করেন প্রতিদিনই। সবার খোঁজখবর নেওয়া হয়ে যায় তখন। ইচ্ছে করে একটুখানি কোরআন-হাদীস পড়ে তা ব্যাখ্যা করে সবাইকে শোনাতে, যেমনটি অসুস্থ হওয়ার আগে প্রায়ই করতেন। অসুস্থ হয়েছেন আজ প্রায় এক বছর পার হতে চললো। আজই তিনি প্রথম বুঝতে পারলেন তিনি সত্যি সত্যি সুস্থ হতে চলেছেন। এজন্য মনটা খুব ভালো লাগছে। সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে অনেকটা স্বাতোক্তির মতোই জিজ্ঞেস করেন, রায়হান কই? ঘুম ভাঙ্গে নাই, নাকি নামাজ পইড়া আবার ঘুমাইছে?

আপনে তো জানেনইনা। আপনে ঘুমানের পড়ে মেঝো বউর শরীরটা একটু বেশী খারাপ অইয়া যায়। রাতেই হাসপাতালে নিয়া গেছে। এখনো ফোন করে নাই।

আবুল মাস্টার একটু চিমিত্মত হয়ে পড়েন। তার কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। জিজ্ঞেস করেন- বউয়ের ডেলিভারীর ডেট তো এখনো মাস খানেক বাকী নাকি?

হ, মাস খানেক বাকী ঠিক আছে। কিন্তু বউর শরীরটা ভালো মনে হইল না আমার। আমার এতগুলা পোলাপান অইল কোন সময় বউর মতন অবস্থা অয় নাই আমার। বললেন আসমা বেগম।

অষুধ-টষুধ ঠিক মতো খায় নাই আগে? কোন্ ডাক্তার দেহাইছিল, সুরাইয়া নাকি খাদিজারে? চিমিত্মত আবুল মাস্টার জিজ্ঞেস করেন।

বড় বউ সিরামিকের বড় চায়ের পটে চা আর অনেকগুলো কাপ ট্রেতে করে এনে ঘরে ঢোকে। শ্বশুরের কথা শুনে নিজে থেকেই উত্তর দেয়- ডাক্তার সুরাইয়ারে দেখাইতাছিল আববা। তবে আরো দুই তিন মাস আগে থেকেই ও আমারে বলতেছিল ওর শরীরটা ভালো না। কোথাও কোন সমস্যা আছে। কিন্তু সমস্যাটা কি সেটা সে বুঝতে পারে না। ডাক্তারকে বলার পর ডাক্তার অনেক টেস্টফেস্ট করেছে। কিন্তু ধরতে পারে নাই।

তাইলে রাইতে কি এমন খারাপ অইল যে হাসপাতালে নেওন লাগল? চিমিত্মত আবুল মাস্টার আসমাকে জিজ্ঞেস করেন।
আমি বুঝতাছিনা কিছু। রাইতে আমারে কইতাছিল-আম্মা আমি মনে হয় বাঁচমু না। কেমন জানি লাগতাছে। খালি নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া আসে। বাচ্চাটাও নড়াচড়া করে খুব বেশী। আমারে মাফ কইরা দিয়েন আম্মা। বউর কথা শুইনা রায়হানরে তাড়াতাড়ি কইরা হাসপাতালে নিতে কইলাম।

আসমা বেগমের কথা শেষ হতে না হতেই ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে ওঠে টেলিফোন। আসমা বেগম ফোনের লাইড স্পিকারের দিকে হতে বাড়াতে বাড়াতে বলেন, মনে হয় রায়হানের ফোন। ঠিক তাই। রায়হানই ফোন করেছে। সবাই উৎসুক হয়ে শুনছে মা আসমা বেগমের কথা।

- বাবা, বউয়ের অবস্থা কি?

- দুঃশ্চিমত্মার কোন কারণ নাই আম্মা। অক্সিজেন দেওয়া আছে। স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেছে। ডাক্তার বললো সব ঠিক আছে। এটা শুধুমাত্র রুগীর মানসিক সমস্যা।

-নারে বাজান না। কোন সমস্যা আছেই। ডাক্তাররে বল, মেডিকেল বোর্ড বসাইয়া ট্রিটমেন্ট করতে। আজকার মধ্যেই যেন বোর্ড বসায়। তর আববার বন্ধু প্রফেসর শমসের আছে না, উনারে ফোন দে। আচ্ছা বাদ দে, আমিই ফোন করতাছি্ হাসপাতালের ঠিকানা ও দিয়া দিমু। তুই কোন চিমত্মা করিস না। আর এক কাজ কর বিয়াইরে ফোন কইরা খবরটা জানাইয়া দে।

এতগুলো কথা একনাগাড়ে বলে থামেন আসমা বেগম। ওপার থেকে রায়হান আশ্বাসের সুরে বলে- আপনে খামাখা দুঃশ্চিমত্মা করতাছেন আম্মা। বোর্ড বসানের দরকার নাই, আপনের বউ এমনিতেই সুস্থ হইয়া যাইব। দোয়া করেন সবাই।

ছেলের এ রকম বোকাটে কথা শুনে ধমকে ওঠেন আসমা বেগম- ধুর বেক্কল, বেশি বুঝিস না। তর হউর বাড়ি খবর দে, আর আমি শমসের ভাইরে হাসপাতালে পাডানের ব্যবস্থা করতাছি। আর শোন নাস্তা দিয়া পাঠামু কেউ রে?


-না আম্মা নাস্তা পাঠানোর দরকার নাই। চন্দ্রমল্লিকা আছে আমাদের সাথে। যাই লাগুক আমরা দুইজনে ম্যানেজ করে নেব, ঠিক আছে?

চন্দ্রমল্লিকা নামটা শুনে সবাই একটু বিব্রত বোধ করে। আসমা বেগমও অপ্রস্ত্তত হয়ে যান। টেলিফোনে আর কথা এগোয় না তাদের। কোথায় যেন তাল-লয় খেই হারিয়ে ফেলে।

এ রকম একটা অপ্রস্ত্তত সময়ে আবুল মাস্টার কথা বলে ওঠেন- চন্দ্রমল্লিকাটা যেন কে? আমার ছাত্র নিখিলের ভাইঝি তো, না কি?

- হ ঠিকই কইছেন। ঐ যে মাস কয়েক আগে একদিন আপনের লগে দেহা কইরা গেল, মনে আছে?

হ্যাঁ, চিনতে পেরেছেন আবুল মাস্টার। সেই নিখিলের ভাতিজী। স্বপ্নালু হয়ে ওঠেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করার পর খুব ভালো ভালো চাকুরীর হাতছানিতে আকৃষ্ট না হয়ে তিনি চলে যান গ্রামে। নিজের এলাকার মানুষদের মাঝে জ্ঞানের আলো বিতরণকে নিজের জীবনের ব্রত মনে করে স্কুল শিক্ষকের পেশা বেছে নেন। সেই থেকে শুরু শিক্ষকতা, এই পেশা আর ছাড়তে পারেন নি তিনি। কিন্তু নিজ এলাকায়ও থাকতে পারেন নি সংকীর্ণ গ্রাম্য রাজনীতির কারণে।

যুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময় তিনি গ্রামেই অবস্থান করেন। স্থানীয় অধিকাংশ যুবক তখন যুদ্ধে চলে গেছে। আবুল মাস্টার এবং তার মতো একটু বয়ষ্করা কেউ যায় নি এবং যাওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না। তবে তারা এলাকায় থেকে প্রকারান্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষেই কাজ করেন ব্যাপকভাবে। স্থানীয় চেয়ারম্যান এলাকায় রয়ে যাওয়া যুবকসহ সবাইকে নিয়ে পিস কমিটি, রাজাকার ইত্যাদি বাহিনীতে যোগ দেয়। অবশ্য অধিকাংশই যোগ দিয়েছিল নাম কা ওয়াস্তে। যেমনটি ছিলেন আবুল মাস্টার। এ ছাড়া এলাকায় থেকে যাওয়া লোকদের করারও কিছু ছিল না। এদের মধ্যে কয়েকজন যে সত্যি সত্যিই পাক বাহিনীর সহযোগী হয়ে যান নি এমন নয়। কিন্তু আবুল মাস্টার তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হন, যুদ্ধের পরিণতি যা-ই হোক না কেন, নিজেদের এলাকাকে ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। বিশেষ করে এলাকার একমাত্র হিন্দুপাড়ায় নিখিলের মতো মেধাবী ছাত্র থাকার কারণে আবুল মাস্টার নিজে উদ্যোগী হয়ে এই এলাকাকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেন। তার পদক্ষেপ সবাই মেনে নেয়। কেবলমাত্র উত্তর পাড়ার শরাফত ফরাজী আর পলানপাড়ার বাতেন মোল্লা একমত হতে পারে না তাদের সাথে। তারা হিন্দু এলাকাকে উচ্ছেদের জন্য গোপনে সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে। অবস্থা বেগতিক দেখে আবুল মাস্টার আরো কয়েকজনকে সাথে নিয়ে শরাফত ফরাজী আর বাতেন পালোয়ানকে নজরবন্দী করে ফেলেন।

কাছেই ঘোড়াশাল রেল স্টেশন থেকে আর্মিরা মুক্তিবাহিনী দমনে এইদিকে মার্চ করতে চাইলেও তিনি প্রবল আপত্তি জানান। তিনি নিজেই জামিনদার হয়ে এই তল্লাটে আর্মির আগমন থামিয়ে দেন। তার স্কুল এবং আশেপাশের এলাকা বেঁচে যায় আর্মির অত্যাচার থেকে। আর মুক্তিযোদ্ধারা এসে ঘাঁটি গাড়ে এই পুরো এলাকায়। আবুল মাস্টার সংগোপনে সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক এবং নৈতিক প্রশিক্ষণ দেন। তারা বুঝতে পারে- একটি এলাকা অন্তত অভয়ারণ্যের মতো থাকা দরকার। এই এলাকায় কোন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছে এটা যেন কেউ বুঝতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তাতে অন্তত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মগোপনের একটি সুযোগ তৈরী হবে। তার ফলেই এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ চারণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

যুদ্ধের শেষের দিকে অবশ্য আর্মিরা একবার মার্চ করে জামালপুর বাজার পর্যন্ত এসেছিলো। আবুল মাস্টার অত্যন্ত কৌশলে তার ব্যক্তিত্বের জোরে তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এই এলাকায় কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই। আর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আগমন ঠেকাতে স্থানীয় পিস কমিটিই যথেষ্ট। পাকিস্তানী আর্মীরা তার ব্যক্তিত্বের সম্মানেই হোক কিংবা এলাকাটিকে শত্রুমুক্ত মনে করেই হোক, একদিনের বেশী অবস্থান করে নি। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তারা এই এলাকায় কোন ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা নারী নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটায় নি, কিংবা ঘটানোর মতো সাহস বা ইন্ধন খুঁজে পায় নি।

যুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝির ঘটনা। আবুল মাস্টার একদিন খবর পান, শরাফত ফরাজী একটা গ্রম্নপ নিয়ে সদলবলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। খবরটি খুশি হওয়ার মতোই, কিন্তু তিনি খুশি হতে পারেন না। তিনি বুঝতে পারেন ধূর্ত শরাফত ফরাজী কোন দুরভিসন্ধি এঁটেছে। এর দু’দিন পরই শরাফত হামলা করে বসে তার গ্রামের বাড়ীতে। তার বাবা কোন রকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসেন। বাবার কাছেই জানতে পারেন, শরাফত তাদের বাড়ীর সবগুলো ঘরের চাল খুলে নিয়ে গেছে। আর বলে গেছে, কোন রাজাকারকে এই এলাকায় থাকতে দিবে না। প্রমাদ গনেন আবুল মাস্টার। তিনি নিখিলকে খবর দিয়ে তাদেরকে আত্মগোপন করার কথা বলে বাবাকে সহ সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন আত্মরক্ষার্থে। সেই যে এলেন তারপর স্থায়ী হয়ে গেলেন ঢাকায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গ্রামে গিয়েছিলেন, কিন্তু শরাফত ফরাজী আর বাতেন মোল্লা তার বিরুদ্ধে আড়ালে-আবডালে কুৎসা রটনা করছে দেখে আর সেখানে থাকাটা নিরাপদ মনে করেন নি তিনি। কখনো সপ্তাহান্তে কখনো মাসান্তে গ্রামে গিয়ে ঘুরে আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেন নিজেকে। ঢাকায় শশুর বাড়ী সংলগ্ন পতিত ভূমিতে স্কুল তৈরী করলেন, আবার শুরু করলেন শিক্ষক জীবন।

এতসব কিছু ভাবতে ভাবতে আবুল মাস্টারের হৃদয় আর্দ্র হয়ে ওঠে। তিনি বলতে শুরু করেন, তরা তো জানছ না। এই চন্দ্রমল্লিকার এক কাকায় সপরিবারে মুসলমান হইছে। আরো কয়েক ঘর মুসলমান হইছে শুধুমাত্র আমার জন্য। একাত্তুরে ওগো হিন্দু পাড়া আমি যেভাবে সেভ করেছি, সেই কথা মনে কইরাই হয়তো তারা আমাকে পীর মনে করে। আর্মিরা যদি একবার টের পাইত আমার কর্মকাণ্ড তাইলে আমারে সোজা গুলি কইরা মাইরা ফালাইত। অথচ দেখ, শরাফত আর বাতেন মোল্লার লোকজন এখনো আমাকে রাজাকার বইলা গালি দেয়। আর যেই শরাফত হিন্দুগ সাফ কইরা ফালাইতে চাইছিল, হেই শরাফতে যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে ভোল পাল্টাইয়া মুক্তিযোদ্ধা হইয়া গেল। কি তামাশা, হা হা হা, কি তামাশা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement