সূর্যটা ডুবছি ডুবছি বলে হাত নেড়ে যাচ্ছে। ক্রমেই কমে যাচ্ছে পৃথিবীর স্বচ্ছতা। অন্ধকার ক্রমে ছেয়ে ফেলতে যাচ্ছে পৃথিবীর অর্ধাংশকে। সারাদিনের কর্ম ক্লান্ত সুখী আর আধা সুখী মানুষগুলো ঘরমুখী হতে যাচ্ছে কর্মকে পিছনে ফেলে। আর সব অন্ধকারকে কবজা করে ওটাকেই মূলধন ধরে কাজে নামতে যাচ্ছি আমি। আমার সকাল সবে শুরু। আমার সকাল কৃষ্ণ সকাল। কারণ আমি যে নিশিচারিণী।
যেখানে পৃথিবীর অন্ধকার দিকটা আরো অন্ধকারময়। ল্যাম্পপোস্টের আলো যেখানে পেঁৗছায় না আর অন্ধকারের নরমাংস লোভী মানুষগুলো যেখানে লকলকে লাল জিভ বের করে পিলপিল করে ঘুরে বেড়ায় সেখানেই আমার শত কর্মব্যস্ততা। সেটাই আমার কর্মস্থল। কারণ সেখানেই যে আমার ক্ষুধা মেটার রসদ যোগাড় হয়। ক্ষুধা নামক যে দাঁতালো দানবটার কাছে পুরো পৃথিবী নতশীর সে দানবটাকে তুষ্ট করতে সেখানেই আমার নিয়ত আনাগোনা অন্ধকারে।
যখন সন্ধ্যা নামে, অন্ধকার ছেয়ে ফেলে চারদিক আর কৃত্রিম আলোগুলো নিষ্ফল চেষ্টায় রত হয় অন্ধকার দূর করার তখন আমি কাজে নামি। আবছা আলো, আবছা আঁধারে গিয়ে দাঁড়াই। কখনো জিয়া উদ্যানে, কখনো কাওরান বাজার বা ফার্মগেটের আশেপাশে। দু'-একটা কাষ্টমারের আশায়। যারা নরমাংস ভাড়া করে।
চোখে চোখে কথা হয় কাষ্টমারের সাথে। চিনে নিতে কষ্ট হয় না। যারা আমাদের খোঁজে তারা যেমন আমাদেরকে দেখেই বুঝতে পারে তেমনি আমরাও যাদের খুঁজি তাদেরকে দেখেই চিনতে পারি।
আমাদের কাষ্টমার পছন্দের কোন অপশন নেই। কাষ্টমাররাই পছন্দ করে। আমাকে যার পছন্দ হয় সে সোজা কাছে চলে আসে। দরদাম হয়, চুক্তি হয়। চুক্তি হয় দুই ধরনের। এক ঝলক অথবা রাত চুক্তি। রাত চুক্তির কাষ্টমাররা নিজেরাই জায়গা ঠিক করে রাখে। শুধু আমাদেরকে দরদাম করে নিয়ে যায়। তাতে কামাই ভাল। ঝলক চুক্তিতে কামাই কম। কিন্তু ঝলক চুক্তির কাষ্টমারই বেশি আসে। তাদের কোন নির্দিষ্ট জায়গা নেই। তাই পাশের কোন গলি-ঘুপচিতেই কাজ সারতে হয়।
এই আমার জীবন। এই আমার প্রতি রাতের রুটিন। আমি যে পতিতা। ভদ্দরলোকেরা মেকি সম্মান করে ডাকে ঘাসফুল।
অথচ আমার রুটিন কিন্তু এমন ছিল না। পতিতা হয়ে কেউ জন্মায় না। কখনো মানুষ কখনোবা প্রকৃতি তাকে পতিতা বানায়।
আমারও একটা দৈনিক জীবন ছিল। আর দশটা সাধারন মেয়ের মত। আমারও এক সময় সব কাজগুলো আবর্তিত হত দিনকে ঘিরে। ছিলাম না এমন নিশিচারিনী।

কতক সময় অল্প কিছু সময়ই বদলে দেয় মানুষের জীবন। অল্প কিছু সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার প্রতিক্রিয়াই চলতে থাকে সারাটি জীবন।
আমার বেলায়ও তা-ই হয়েছে। বাবা-হারা সংসারে ছিলাম আমরা তিন বোন আর মা। অভাব সময় লেগেই থাকত। আমি ছিলাম সবার বড়। সেলাইয়ের কাজ করতাম বড়িতেই। মা এর ওর বাড়িতে ঠিকা ঝিয়ের কাজ করত। দু'জনার হাত দিয়ে যা আসত তাই দিয়েই কোন রকমে দিন পার হত।

আমাদের দিনটা যে কোন রকমে পার হত একারনেই আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এল মার এক দূর সম্পর্কের ভাই। আমরা তাকে মামা ডাকতাম। মাঝে মাঝেই আমাদের বাড়িতে আসত। একদিন কথায় কথায় মাকে বলল
"তোমার এত কষ্ট দেইখ্যা আমার খুব খারাপ লাগে বইন।"
"হ রে ভাই। কি আর করমু ক? আল্লারে ডাকি, একদিন হয়তো ঠিকই ফির্যা চাইব আমাদের দিকে।"
"অইগুলা কইয়্যা কাম অইব না বইন। নিজের ব্যবস্তা নিজেরই করন লাগব।"
"নিজের ব্যবস্তা নিজেই কি করমু ভাই?"
"ক্যান তোমার বড় মাইয়্যাডারে ঢাকায় গার্মেন্টসে পাঠাও না ক্যান। গার্মেন্টসে কাম করব। মাস গেলে আট হাজার টাকা পাইব। তোমরা খাইয়্যা পইর্যা বাঁইচ্যা যাইব।"
"হাঁচা কইতাচস?" মা আগ্রহী হয়ে ওঠে।
আমিও মনে মনে হিসাব করি। দু' হাজার টাকা যদি আমার খরচ হয়ে যায় থাকা-খাওয়ায় আর চার হাজার টাকা যদি বাড়িতে দিই তাহলেও আমার মাসে দু' হাজার টাকা করে জমবে। খুশি হয়ে উঠি।

এর ঠিক দু' দিন পরই মামার হাত ধরে পাড়ি জমাই ঢাকার উদ্দেশ্যে। গার্মেন্টসে কাজ করতে। অনেক দিন পর হঠাৎ বাসে বমি করে ফেললাম। বাস থেকে নেমে মামা আমাকে একটা বাড়িতে নিয়ে গেল খাওয়ানোর জন্য। আমাকে শরবত খেতে দিল।
এর পর, এর পর আর কিছু মনে নেই আমার।
যখন জেগে উঠলাম দেখি এক টিনের ঘরে শুয়ে আছি। মাঝ বয়সী এক মহিলা আমার উপর ঝুঁকে আছে। আমাকে জেগে উঠতে দেখে কাকে যেন ফোন করল।
"স্যার আসেন, নতুন মেয়ে আইচে।"
--------------
"নতুন মানে এক্কেরে টাটকা স্যার, ফ্রিজের না স্যার এক্কেরে ক্ষ্যাত থেইকে তোলা।"
--------------
"হ স্যার কম বয়স স্যার এক্কেরে কচি মাইয়্যা স্যার।"
ততক্ষণে যা বোঝার আমি বুঝে গেছি। কিছু আর ভেঙ্গে বলতে হয় নি।
রাতে বাবার বয়সী একটা লোক এল। ইচ্ছা মত খেলল আমার দেহটাকে নিয়ে।
তখন আমার বয়স সবে পনেরতে পড়েছে। প্রথম সহবাসের সূচিছিদ্র ব্যথার মত পরিণত হইনি তখনো। ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম সতীচ্ছদ হারানোর প্রচন্ড ব্যথায়। কিন্তু সেই পাষন্ড লোকটা আমার কান্নাকে থোড়াই পাত্তা দিচ্ছিল। সে তার নিজের মত কাজ করে চলে গেল।
ব্যস, শুরু হল আমার দ্বিতীয় জীবন। তিনটা দিনের ব্যবধানে আমার জীবন ঘোড়া দৌড়াতে শুরু করল অন্য দিকে।

প্রথম প্রথম কাজটা খুব মজা লাগত আমার কাছে। হয়ত বয়স কম ছিল, ওসব বিষয়ে আগ্রহও বেশি ছিল, কামনাটাও বেশি ছিল সে কারণে। তখন কাজটা আমার কাছে একসাথে রথ দেখা কলা বেচার মতই মনে হত। কিন্তু কথায় আছে পোলাও বিরিয়ানি কি আর প্রতি বেলা গোটা বছর ভাল লাগে! তেমনি কাজটা যখন পুরনো হয়ে এল তখন কাজটার মধ্যে আর কোন মজা বলতে কিছু রইল না। কাজটা এক সময় স্বাদহীন বেরিয়াম খাওয়ার মতই হয়ে এল আমার কাছে। এখন আর ও কাজে মজা নামক কোন কিছু বোধ হয় না। শুধু মাথায় ঘোরে বিলটা ঠিকমত পাব তো। শেষটায় এসে এমন হল যে, মানুষের জৈবিক চাহিদাগুলোর যেটা পূরণে মানুষ সবচে' বেশি আকর্ষণ আর ফুর্তি বোধ করে সেটাই আমার কাছে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। এখন ব্যাপারটা এমন হয়েছে যে আস, খাও, পে কর, চলে যাও। ওসব মজা নিয়ে ভাবার সময় আর এখন নেই।
যাহোক বছর খানেক পরে পালিয়ে এলাম লাইলি বুড়ির ওখান থেকে। সারাদিন বুড়ির হম্বিতম্বি ভাল লাগত না। আবার কমিশন দিত খুব কম। একটা আবাসিকে যোগ দিলাম। এখানে কমিশন আগের চেয়ে ডাবল। কিন্তু থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়। তারপরও আগের চেয়ে ইনকাম ভাল আসে।
আগে নিয়মিত বাড়িতে চিঠি লিখতাম। বাড়ি থেকেও চিঠি লিখত। পাশের ফোন-ফ্যাঙ্রে দোকান থেকে মাঝে মাঝে কথাও বলতাম। আবাসিকে আসার পর বাড়ির সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ততদিনে বাড়ির সবাই জেনে গেছে আসল ঘটনা। তারা আর কোন যোগাযোগ রাখতে চায় না আমার মত বেশ্যার সাথে।
তখন থেকেই শুরু হয় আমার একলা, কঠিন, সামাজিকতাহীন, অন্ধকার জীবন।

মাঝে মাঝে কোন কোন কাষ্টমার আবাসিক থেকে আমাদেরকে নিয়ে যেত তাদের খালি বাসায়। ইচ্ছা মাফিক ভোগ করার জন্য। একবার এক পঞ্চাশোর্ধ লোক আমাদের তিনজনকে একসাথে নিয়ে গেল তার বাসায়। একসাথে তিনজনকে ভোগ করবে বলে।
কী বিচিত্র মানুষের শখ! অথচ কী আশ্চর্য্য! একজনের সাথে দেড় মিনিটেই তার কেল্লা ফতে।
অগত্যা কাজ না করেই তিনজনকে বিল দিয়ে বিদায় করেছিল সে বুড়ো। ঘটনাটা মনে পড়লে আজো আমার হাসি বেরোয়।

একবার বছর বিশেক বয়সের এক যুবক এসেছিল। আমাকে এক ফোঁটা ছুঁল না পর্যন্ত! সে আমার কষ্টের কথা শুনতে এসেছিল। কেন আমি এ পথে এসেছি, আমার জীবন চলে কিভাবে ইত্যাদি জানতে চেয়েছিল। কী জানি এক সিনেমার চিত্রনাট্য বানাবে বলে।
আমিও প্রাণ খুলে বলেছিলাম সব কথা। যখন বললাম আমার পরিবার আমাকে পরিত্যাগ করেছে তখন ছেলেটা কেন জানি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। তাকে ভিতরের সব কথা বলতে পেরে আমারও কেমন জানি বুকটা হালকা হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা আমার ফোন নাম্বার নিয়েছিল। পরে অবশ্য আর কোন যোগাযোগ করে নি।

সে আবাসিকও ছেড়ে দিয়েছি আজ প্রায় বছর তিনেক হল। এখন আমি একা্ই কাজ করি। এতে কামাইটা আবাসিকের চেয়েও ভাল।

একটা প্রশ্ন সবাই করে। আমি এ পথ ছেড়ে দিই না কেন? কেন আমি এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যাই না?

কিছু কিছু কথা আছে যেগুলো মুখ থেকে বের হলে আর ফেরত নেয়া যায় না, কিছু কিছু ঘটনা আছে যাদেরকে আর পিছনে ঘোরানো যায় না, কিছু কিছু পথ আছে যে পথে পা বাড়ালে আর পিছনে ফেরা যায় না।
বিশতলা বিল্ডিং এর ছাড় থেকে লাফ দিলে মাঝপথ থেকে যেমন ছাদে ফেরত যাওয়া যায় না; নিচে পড়ে, থেঁতলে গিয়েই শান্ত হতে হয়। তেমনি আমার এ পেশায় একবার ঢুকলে আর বেরুনোর পথ থাকে না কোন। সময় শেষের মৃতু্য দিয়েই এর ক্ষান্তি হয় আমারও হয়তো তা-ই হবে।
সময় হয়ে এসেছে। আবার সূর্য ডুবেছে। আবার সন্ধ্যা নেমেছে। আবার অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। আবার আমার বেরুনোর সময় হয়েছে। পেশার টানে। দু' একটা কাস্টমারের আশায়। রোজকার মত। আবার সেই পথ চলা, উৎকট মেক-আপ আর কাস্টমারের খোঁজে আবছা আলো আর আবছা অন্ধকারে অপেক্ষা।