লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জানুয়ারী ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ১৬টি

সমন্বিত স্কোর

১.৭৪

বিচারক স্কোরঃ ০ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

স্মৃতিচারণ : ননুদাদু
গ্রাম-বাংলা

সংখ্যা

মোট ভোট ৬১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ১.৭৪

অবিবেচক দেবনাথ

comment ৬৪  favorite ২  import_contacts ১,০১৪
(১)
বসন্ত কাল, শীতের তীব্রতা শেষে গরমের ভাফসা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সারাদিন মাঠে কাজ শেষে তাই সকলের শরীর চুইয়ে ঘাম ঝরছে। মাঠের ক্লান্তি শেষে সবাই ফিরছে ঘরে একে-একে। রমনীরা ধুপ জ্বেলে, উলুধ্বনি করে, কাসি বাজিয়ে, শঙ্খের ধ্বনি তুলে সন্ধ্যা আরতি সম্পন্ন করছে পরমপ্রভুর শ্রীচরণতলে। মসজিদে আযানের ধ্বনি বাজছে, আর জানান দিচ্ছে- এস শান্তির জন্য, নত চিত্তে এই শান্তির আশ্রয়স্থলে।
শুক্লপক্ষ। তাই চাঁদের আলোতে আলোর চাদরে ঢেঁকেছে রাতের আঁধারও। কোথাও কোথাও ফুটেছে গাছের ছায়ায় ঘিরে থাকা আলো-আঁধারির খেলা। প্রান জুড়ানো শীতল হাওয়া বইছে, বাতাসে দুলছে গাছপালা, ঝিঁ-ঝিঁ পোকারা কোন সে গাছের আড়াল হতে ঝি-ঝি শব্দে মাতায়ে যাচ্ছে চারিদিক। কখনো-সখনো জোনাকিপোকারা মিটিমিটি জ্বলে উড়ে বেড়াচ্ছে ঘরের চাল হতে বাগানের দিকে, কিংবা গাছের এ’ডালের ফাঁক হতে ও’ডালের ফাঁকে। শুকনো মাঠ-ঘাট, তাই শুকনো মাঠ হতে হুক্কা-হুয়া শব্দে আওয়াজ তুলছে শিয়াল মামারা। আমরা শিয়াল মামার সাথে-সাথে হুক্কা-হুয়া ধ্বনি তুলছি। ঠাকুর’মা ডাক দিচ্ছে আমাদের, যেন আমরা শিয়াল মামার ডাকে বেংচি না করি। কেননা, শিয়াল মামাদের ধ্বনির বেংচি করলে নাকি তেনারা রাগ করেন আর সে রাগের প্রতিশোধ হল গভীর রাতে এসে যারা বেংচি করে তাদের ঘরের দরজায় মল ত্যাগ করা। শুনেছি শিয়াল মামার মলে নাকি প্রচন্ড দুর্গন্ধ, তাই ঠাকুর’মার ইচ্ছেনা শিয়াল মামাকে খামুখা ক্ষেপিয়ে এমন অনিষ্টতার মুখোমুখি হবার। ডাক দেয়াতে আমাদের উৎসাহ দ্বিগুন হয়, আমরা আরো বেশী বিষয়টির পুনরাবৃত্তি ঘটাই। আসলে বলে লাভ নেই, কারণ প্রকৃতির নিয়মই সেটা-
“যে কাজে পড়বে ডাক, সে কাজ করতে থাক”
তাই কিছু সময় গনগনিয়ে ঠাকুর’মা নিজে নিজেই থেমে যায়, আর তার কিছুক্ষন পর আমরাও শান্ত হই। শিয়াল মামার মল দেখার জন্য প্রচন্ড আশা নিয়ে থাকতাম আমি, সবার আগে ঘুম থেকেও উঠতাম কিন্তু কখনো শিয়াল মামাকে ঘরের দরজায় এসে মল ত্যাগ করে যাবার প্রমান পেতাম না। তবু কেন যানি একটা বিশ্বাস মনের বদ্ধমুলে গেঁথে থাকত সবসময়। ঠাকুর’মা যা বলেছেন তা মিথ্যে হতে পারে না। তাহলে শিয়াল মামা মল ত্যাগ করে না ক্যান? অবুঝ মনে প্রশ্ন জাগে। উত্তরও আবার নিজেই ঘুছিয়ে নেই, হয়ত আমাদের বেংচি মামার কান অবধি পৌঁছেনি।
(২)
সন্ধ্যায় শিয়াল মামার বেংচি শেষ করে, ছরতা (সুপারী কাটার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র) কিংবা নারিকেলের মালা (গ্রাম্য ভাষায় “য়াচ্ছি”) নিয়ে বের হই ঝিঁ-ঝিঁ পোকা ধরব বলে। নানান মুখে শুনেছি দুটো য়াচ্ছিতে পিটিয়ে কিংবা ছরতার হাতল দু‘হাতে ধরে আওয়াজ করলে ঝিঁ-ঝিঁ পোকারা গায়ে এসে বসে। তখন ঝিঁ-ঝিঁ পোকাদের ধরে তাদের পাখা চিকন সুতির সুতোতে বেঁধে বেশ মজা করে খেলা যাবে। তাই য়াচ্ছি আর ছরতা দিয়ে চলে ঝিঁ-ঝিঁ পোকা ধরার প্রচেষ্টা। আমাদের উত্তুর বাড়ির (আমাদের বাড়ি থেকে উত্তরদিকে অবস্থিত বলে নাম উত্তুর বাড়ি) সুমন’দাও কালকে এই পদ্ধতিতে একটাকে ধরে সুতা দিয়ে ওটার পাখনা দুটো বেঁধে দিনভর খেলেছে আমাদের দেখিয়ে-দেখিয়ে। সারাদিন ঐ একটা বিষয় খুব কষ্ট দিয়েছিল আমাদের, আমরা কৌতুহল নিয়ে দাদার পিছে-পিছে ঘুরেছি সারাদিন, আর কি করে ধরেছেন সে প্রশ্ন বারবার করে তাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছি। তার শেখানো নিয়ম অনুসরণ করেই আজ আমাদেরও জোরালো প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু অনেকক্ষন উঠোন, রাস্তা আর গাছের আড়াল-আড়াল হতে চেষ্টা করেও কোন লাভ হয়নি। উল্টো চাড়াতে (গ্রাম্য ভাষায় মাটি পাত্রের ভাঙ্গা টুকরো কে বলে চাড়া) কানুর (সম্পর্কে আমার কাকাত ভাই) পা কেটেছে আর প্রচুর মশার কামড় সহ্য করতে হয়েছে।অনেকক্ষন চেষ্টা করেও যখন ঝিঁ-ঝিঁ পোকাকে গায়ে বসাতে পারলাম না, তখন আশাহত মন নিয়ে সবাই ঘরে ফিরে আসলাম। আনুমানিক সন্ধ্যে সাতটা বাজে। কোন রকমে বই নিয়ে বসে নমঃ ঢমঃ কাশ্যপপূত্রঃ পড়তে বসলাম। কিন্তু মশার কামড় আর গরমে পড়তে ভালো লাগছে না, তাই মায়ের অনুমতি নিয়ে চেয়ার পেতে উঠোনে গিয়ে বসলাম। আমার দেখাদেখি দলের সবাই চলে এল উঠোনে, জমল গল্প-গুজবের আসর। আসর জমল বিদ্যালয়ের শ্রেনীর বিষয় নিয়ে, আশপাশের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কিংবা দাদুর কাছ থেকে শোনা “ঝোলা আর সাত ভুত”, “শিয়াল ও নাপিত”, “নাপিত ও চোর” ইত্যাদি ইত্যাদি গল্প দিয়ে। কিছু-কিছু সময় আবার বড়দের কাছ থেকে রপ্ত করা শোলকও আওরাই আমরা-আচ্ছা, কন চেন- হাতা আছে, মাথা নাই, আস্ত মানুষ গিলে খাই, উত্তর কি? সবাই ভাবনায়- হঠাৎ মেজদিদি উত্তর দেয়- জামা। হ য়ইছে। অথবা সংগীতা দিদির তার মার কাছে শেখা শোলক বলে- পুকুরের অপর পাড় দিয়ে যাচ্ছে একটা লোক, এপাড়ে ঘাটে একটা ছেলেকে স্নান করাচ্ছে একজন মহিলা, তখন লোকটি, মহিলাকে প্রশ্ন করে-“ধোপার ঝ্বি গো ধোপার ঝ্বি, ছেলে ধোও যে তোমার কি? উত্তরে মহিলার জবাব- ছেলের বাবা যার শ্বশুর, তার বাবা মোর শ্বশুর, তার আর আমার মধ্যে সম্পর্ক কি?”- এই শোলকের উত্তর নিয়ে দ্বন্ধ লেগে যায়। কেউ বলে- মা-ছেলে সম্পর্ক, কেউ বলে দেবর-বৌদি সম্পর্ক। দ্বন্ধের জের ধরে গল্প-গুজবের আসর এখানে ইতি হয়।
(৩)
দোকান থেকে ননু দাদু এসে উঠোনে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর ভালো নাম শ্রী হেমন্ত কুমার দেবনাথ। আমার আপন দাদুর সাক্ষাৎ ছোট ভাই। বাড়িতে মাসের মধ্যে চারবার দেখা মেলে তার। আপনারা ভাবতে পারেন তিনি হয়ত অনেক দুরে থাকতেন তাই কম আসেন। আসলে তা কিন্তু নয়, আমাদের বাড়ি থেকে দুই কি তিন কিঃ মিঃ দূরেই সোনাপুর কাপড় দোকান তার। আমাদের জ্ঞাতী-গোষ্ঠী বেশীরভাগই আসলে কাপড়ের ব্যবসার সাথে যুক্ত। যেহেতু গ্রামের বাজারগুলোতে চুরি-ডাকাতির ভয় ছিল, তাই দোকানে একজনকে সবসময় থাকতে হত। বয়স হয়ে যাওয়ায় তিনি ছেলেদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই দোকানে থাকতেন। শুধু সাপ্তাহে একদিন ছেলেরা তাকে জোর করে বাড়িতে পাঠাত। তাঁর বয়স পঞ্চাশ উর্দ্ধ, মধ্যম গড়নের শরীর, মাথায় টাক হালকা পাকা চুলে ঢাঁকা। সব সময় পরতেন সবুজ রঙ্গের এক রংগা লুঙ্গি, গায়ে দিতেন সাদা পাঞ্জাবি। তাকে দেখার মাত্রই আমাদের মনে একধরনের আনন্দের লহর বহে যেত। আমাদের দেখলে তিনিও প্রচন্ড খুশী হতেন। যেদিন আমাদের উঠোনে পেতেন না, সেদিন ঘরে গিয়ে-গিয়ে সকলের খোঁজ নিতেন। কখনো-কখনো ডেকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসতেন খেলার জন্য। ছোটদের প্রতি তার এমনতর বাৎসল্যতার ধরুন আমরা ছোটরা তাকে পেলেই তার পিছ নিতাম। আজ আমাদের সকলকে উঠোনে দেখে উঠোনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি খুলে চেয়ারের হেলানে লম্বায় ঝুলিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন। হালাকা মৃদু মন্দ বাতাস বইছে, চাঁদ মামা আমাদের দক্ষিনের ঘরের পিছনের নারিকেল গাছের উপর এসে দাঁড়িয়েছে। বাতাসের আলতো ছোঁয়া পেয়ে গাছেরা ধুলছে। ঝিঁ-ঝিঁ পোকাদের আওয়াজ আরো প্রখর হচ্ছে। আমের মুকুলের মিষ্টি সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে গরমের রাতের ঐটুকু বাতাসে প্রানে শীতল প্রশান্তি সৃষ্টি করে কোন এক নীরব সুখে বেঁধে চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে কারো-কারো। ননুদাদুর কথার শব্দ শুনে আমার দাদু বেরিয়ে এলেন উঠোনে। আমার দাদু হাফানির রুগি, বোধ-জ্ঞান হবার পর থেকে দেখে আসছি তার এই রোগ। আগে মাঝে-মাঝে দোকানে যেতেন রোগ নিয়ে। কিন্তু রোগের প্রকোপ বাড়াতে এখন আর যান না। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে, ওষুধও খাওয়ানো হয়েছে, কিন্তু প্রলপ্রসূ কিছু হয়নি। ওষুধ খেলে দু’একদিন ভালোতো আবার আগের মতো। বাড়িতে অনেক দিন পর কেউ এলে তিনি দেখতে বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। বয়স হলে সকলের জন্য মায়া বেড়ে যায় বোধ হয়, তাই আপনজনদের শব্দ কানে বাজলেই দাদু আর স্থির হয়ে ঘরে থাকতে পারেন না। দাদু বেরিয়ে এসেই বললেন, মহেন্দ্র নিরে? ননুদাদু জবাব দেয়- অয় অ দা, দাদু ফের প্রশ্ন করে- কতকন্নে আইছত। এইত্ত দা অনগা-উত্তর দেয় ননুদাদু। দাদুর প্রশ্নের উত্তর দিতে-দিতেই, ননুদাদু চেয়ার থেকে এগিয়ে এসে দাদুকে প্রণাম করে, তার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। শ্বাসকষ্টে দাদু হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, তাই আপন দাদার হাত ধরে তাকে এনে চেয়ারে বসালেন। দু’ভাই উঠোনের চেয়ারে এসে বসেই দোকানদারীর বিষয়ে বিভিন্ন খোশ-গল্প করতে লাগল। কোন এক অজানা মমতা আমাদের সব-সময় ননুদাদুর মায়ায় ধরে রাখে সে আগেই বলেছি, তাই তার চারপাশে ঘিরেই আমরা দৌড়াদৌড়ি-ছুটাছুটি করতে লাগলাম। আমার দাদু অবশ্য চিক্কার-চাক্কার পছন্দ করেন না। তাই তিনি আমাদের মাঝে-মাঝে ধমক দিতে লাগলেন, কিন্তু আমরাও যে দমবার পাত্র না। ননুদাদু আমাদের ব্যাপারটি ধরতে পারলেন বোধহয়, তাই তিনি বললেন দা, য়ামনে ঘরে যাই হুতি থান, বারে বেশিক্কন থাকলে য়ামনের শ্বাস বাড়ি যাইব। দাদু আমাদের জ্বালাতন সহ্য করতে না পেরে শেষে ঘরে চলে গেলেন। এবার ননুদাদু আমাদের ডেকে একসাথ করলেন, আর বললেন আমরা এখন চোখলান্তি খেলব। গ্রামের এই খেলাকে শহরের ভাষায় লুকোচুরি খেলা বলে। দাদু চেয়ারে বসেই আমার চোখ দুটো তার হাতের নিচে চাপা দিয়ে ধরলেন আলতোভাবে। সকলে একটু আড়ালে সরলে তিনি হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে আমাকে দেখতে সুযোগ দিয়ে বলতে লাগলেন-

“চোখ ধরি খাড়াই থাক
কলা ঢেঙ্গাত হলাই থাক
কুক দেনইন্নারা কুক দেন গো.......কুক”
-যারা লুকিয়ে গেছে তারা আড়াল সমস্বরে ধ্বনি তুলত, কু....ু.....ক।
সবার লুকানো শেষ হলে তিনি আমাকে বলে দিলেন কে কোথায় লুকিয়েছে, তারপর পকেট থেকে একটা চকলেট ধরিয়ে দিয়ে উঠে ঘরে চলে গেলেন। ননুদাদুর এইটুকুই খেলা আমাদের সাথে, আসলে তিনি আমাদের খেলায় মাতিয়ে দিয়েই লাপাত্তা হয়ে যেতেন।
(৪)
ননুদাদুকে নিয়ে কিছু কথা বললেই নয়, অতীব সাধারণ জীবন-যাপন করতে পছন্দ করতেন তিনি। গ্রামের আর সকলের অনুযায়ী বেশ সম্পদ ছিল তার, কিন্তু সম্পদের মোহ তাকে আর্কষন করতে পারত না কখনোই। তিনি দাঁত মাজতেন মাটি দিয়ে, গোসলও সারতেন মাটির দলা একটু গায়ে মেখে। অথচ পরলোকগত হবার আগ পর্যন্ত তাঁর ঝকঝকে দাঁত একটাও খসে নি বলেই সকলের বিশ্বাস। কখনো শুনিনি তাঁকে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে একটা ট্যাবলেটও কিনে খেতে। ভাত খেতে বসলে তার খেতে বেশী সময় লাগত না, সব তরকারী একসাথে মেখে টপাটপ গিলে খেতেন। তিনি এত তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করতেন যে, মনে হত কোথাও কোন জরুরী কাজে তাকে এখুনি ছুটতে হবে। তাঁর খাবারের ব্যাপারে সবসময় তাকে সবাই বলতেন, য়ামনে বেগ্গিন একসাথে মাখি লইলে তরকারী বেগ্গিনের মজা বুইঝবেন ক্যামনে? এককথায় জবাব দিতেন দাদু, বেগ্গিন ত এক হেডেই যাইব, আলাদা স্বাদের ধক্কার কি! কোন মাছ খেতে চাইতেন না, খেতে দেরী হবে বলে। আলু ভর্তা আর ডালই তার প্রিয় খাবার। সবসময় বলতেন- আলু ভর্তা আর ডাল সরকারি খাবার। তাই এই খাবারের উর্দ্ধে কোন খাবার নেই। চারিত্রির শুদ্ধতার জন্য, নাকি কোন এক অদৃশ্য মায়ার বাহুবলে তিনি সকলকে এমনভাবে বেঁধেছেন যে, কেউ কোনদিন তাকে নিয়ে কোন প্রকার কটুক্তিটি করতে শুনিনি। সবাইকে তিনি উপদেশ দিতেন, ধৈর্য্য ধর, বেগ্গিন একদিন ঠিক য়ই যাইব! বাড়িতে কোন প্রকার ঝামেলা হলে যদি তা তাকে জানানো হত, এবং যে অভিযোগ করত তার যদি কোন দোষ না থাকত, তখন দাদু তাকে এবলে থামাত যে, যে যা করুর তুয়ই কিচ্ছু কইও না, সময়ই মানষের লগে কতা কইব। কখনো কেউ অন্যায়ভাবে তাকে আঘাত দিলে কিংবা ক্ষুদ্ধ স্বরে কিছু বললে তিনি শুধু একটা কথাই বলতেন-
“লেই রাখছি কলা হাত্রে, হুন মারাওগোই হাত্রে-হাত্রে
(শুদ্ধ ভাষায়: লিখে রাখলাম কলা পাতে, কর ইচ্ছে যা ক্ষেতে-ক্ষেতে)”
এত সহজ ভাষায় গভীর মমার্থ পোষন করে আর কাউকে কখনো এমন সুন্দর প্রতিবাদ জানাতে দেখীনি আমি। এভাবেই ননুদাদুর জীবন-যাপনের সাথে সংঘতিযুক্ত আনন্দঘন দিন কাটছিল আমার, আমাদের ও আর সকলের।
(৫)
১৯৯৮ ইং সালের অগাষ্ট মাসের ১১ তারিখ। সকাল ছয়টা বাজে, হঠাৎ খবর ছড়ালো ননুদাদুর কি জানি হয়েছে। উদ্ভান্তের মতো দোকানের দিকে ছুটে চলল ননুদাদুর তিন ছেলে রমেশকাকা, রতনকাকা আর ছোটনকাকা। সারাবাড়িতে হৈ-চৈ কান্নাকাটি ছড়িয়ে পড়ল। সকাল আটটার মধ্যে সংবাদ পেলাম তাকে সরকারী জেনারেল হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে, কিন্তু ডাক্তারা কিছু বুঝতে পারছে না। এখুনি তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। ভাইদের মধ্যে শুধু রমেশ কাকাই বিয়ে করেছিলেন। কাকীকে নেয়া হল শ্বশুরের সেবা জন্য, ঢাকা যাবার পথে, কুমিল্লা পার হতেই তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চিরতরে বিদায় নিলেন। বাড়িতে আনা হল তাকে, আর তখন শোনা গেল তার মৃত্যু রহস্য। শুনতে পেলাম, দাদু রাতভর মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছেন আত্নীয়-বন্ধু-বান্ধব সকলের অগোছরে। রাত দেড়টার দিকে তাকে বাজারের চৌরাস্তার মোড়ের দিকে দৌড়াতে দেখেছেন পাশের এক দোকানদার। তখন তিনি ভেবেছিলেন হয়ত তার বাতরুমের বেগ পেয়েছে, তাই তিনি পাবলিক টয়লেটের দিকে দৌড়াচ্ছেন। আমাদের পাশের এলাকার এক জেঠা সম্পর্কে, যার দোকান ননুদাদুর দোকানের সাথেই। তিনি জানালেন- রাত-ভর য়াই ধুম-ধাম শব্দ হুনছি, কিন্তু য়াই মনে কইরছি, কারো কোন মাল আইছেনি কোন, তাই ধুপ-ধাপ আবাজ। ভোর ৫টার দিকে এক রিকসাওয়ালা দোকানে আসলেন দাদুর কাছ থেকে চাবী নিয়ে রিক্সা বের করবে বলে। এসে দেখেন দোকান খোলা, দোকান খোলা দেখে তিনি ভয় পেলেন, এত সকালে দোকান খুলেছেন কেন? রাতে কোন বিপদ-আপদ ঘটেনি তো? রিকসাওয়ালা যে, বিপদের কথা ভেবেছেন, ঐরকম বিপদ না হলেও দেখেন দাদু দোকানের গদি হতে মেঝেতে পড়ে আছেন। মুখ দিয়ে ফেনা ছেড়ে দিয়েছেন, শরীর নিশ্চল-আড়ষ্ট হয়ে আছে। এদৃশ্য দেখেই তিনি বেরিয়ে এসে সবাইকে ডেকে তুললেন এবং বাড়িতে খবর পাঠালেন।
দাদুর মৃত্যুর পর জানা যায় তাঁর কিছু কর্মপ্রনালী। দোকানের আশপাশের এলাকার অনেক গরীবজনের বিশ্বাসী ব্যাক্তি তিনি, সকলের আয়-ব্যয়-জমা সব হিসেব রাখতেন তিনি। তাঁর মৃত্যূর পর সকলে যখন একে-একে আসতে থাকে দোকানে তাদের আনামত বুঝিয়ে নিতে, তখন কাকারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সিন্দুকে তালা খুলে তারা ভয় থেকে মুক্তি পায়। তারা ভেবে-ভেবে আশ্চার্য হয়ে যায় কবে, কখন তাদের বাবা সবার অজান্তে এমন একটা গুরুদায়িত্ব নিয়ে বসেছিল। যা হোক, দাদু সকলের সব হিসেব তিনি সিন্দুকে ঘুছিয়ে রেখে গেছেন সুচারুরূপে আর কাকারাও লোকজনের দেনা-পাওনা হিসেব সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিতে পেরে বাবাকে দিতে পেরেছিল দায়ভার থেকে মুক্তি আর নিজেরাও নিতে পেরেছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস।
(৬)
সমাজের বিবর্তনে, জীবনের তাগিদে আজ সব পরিবর্তন হয়ে গেছে। অভিসন্ধির মানচিত্র হাতায়ে দেখী আজ আর ছোটবেলার সে মায়া নেই, হাসি নেই, সুখ নেই। যান্ত্রিক জীবনে যন্ত্রের আবহে আজ সকলের জীবন। কোথাও এতটুকু স্থিরতা নেই, মমতার সময় নেই, প্রমোদ কিংবা আহ্লাদ নেই। সময়ের তরী পাড়ি দিয়ে আমরা কাকাত-জেঠাত ভাইরাও যুবক হয়েছি। বিয়ে হয়ে গেছে দিদিসহ কাকাত-জেঠাত বোনসহ আর সকলের। বাঁশের বেড়া আর পাটকাঠির রান্নাঘরের অস্তিত্ব আজ চিহ্ন-বিচিহ্ন। চৌ-চালা টিনের ঘর আর দালানে-দালানে বিভক্ত হয়েছে আজ বাড়ি-ঘর। যৌথপরিবার ভেঙ্গে টুকরো-টুকরো হয়ে হয়েছে বাবা-কাকাদের আলাদা-আলাদা একক পরিবার। আগের মতো স্নেহ-মমতা কিংবা বোধ-আগ্রহ তারাও হারিয়েছে। জীবনের পদচারণে আমিও প্রায় নির্জন একাকি জীবন-যাপন করছি ঢাকার যান্ত্রিক চাকায়। কিন্তু; যখন স্মৃতির দুয়ারে আচড় কাটি তখন মনে পড়ে জীবনের সেই স্মৃতি জমানো ভান্ডারের স্মৃতি কথা। ননুদাদুর কথা, যে পরম মমতায় আমাদের গালে খোঁচা-খোঁচা দাঁড়িযুক্ত মুখ দিয়ে ননু(আমাদের নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় চুমুকে ননু করা বলতাম) করতেন আর নিজে আমাদের কাছ থেকে ননু আদায় করে নিতেন সাগ্রহে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement