আজ বহুদিন পর ফাল্গুনে আমার মন উচাটন । যখন ন্যাড়া শিমুলের শাখা জুড়ে লজ্জা প্রেম এক হয়ে ফুটে উঠেছে জীবনের আহবানে, মাতাল হাওয়ার কানে কানে বলে যাওয়া কথা শুনে কৃষ্ণচূড়ারা রক্ত হয়ে থোকায় থোকায় ঝরে পড়ছে আমার ভুবনে । আমার মন আকুল হয় যেমন আকুল হতো তোমার সাথে দেখা হবার আগে অকারণেই যখন পৃথিবীটা ভাল লাগতে শুরু করেছিল ।


শৈশবে একদিন মাকে বেশি জ্বালাতন করছিলাম বলে দোয়েল পাখির ছবিওয়ালা দুই টাকার নোটটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। সরকারি কলেজে গিয়ে দেখ সবাই ফুল দিয়ে এতক্ষণে ঢেকে ফেলেছে শহীদ মিনার। আমি আর আমার ছোট ভাই তখনই একুশে ফেব্রুয়ারী শেষ হয়ে যাবার আশংকায় দৌড়াতে দৌড়াতে হাজির হলাম কলেজের মাঠে। কোথায় কি ! ছুটির দিন জনমানব শূন্য মাঠ খাঁ খাঁ করছে। মায়ের উপর অভিমান হয়েছিল খুব। আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে তখনই অবশ্য বাড়ি ফিরিনি । হাতে থাকা মূলবান টাকা দুটির সদ্গতি তো করতে হবে ! শৈশবের সেই মিথ্যে মিথ্যে একুশ সেইদিন বুকের ভেতর সত্যিকারের একুশের প্রতি ভালবাসার জন্ম দিয়েছিল অতি সন্তর্পণে। তখন থেকেই একুশের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতাম। অসম্ভব কত পরিকল্পনা করতাম না দেখা একুশের জন্য। আমার কাছে একুশ শুধু একটি সংখ্যা ছিলনা ছিল উন্মাতাল দেশপ্রেমের নাম।

তারপর অদ্ভুত শুভ্র সকালটি এসেছিল অনেক প্রতীক্ষার পর। নিজেদের ফুলের অভাবে আগের দিনের স্কুল থেকে চুরি করে আনা গাঁদা, বাগানবিলাস আর ডালিয়া নিয়ে আমার বড় বোন ও তার জনা দুই তিনজন বান্ধবী মিলে প্রভাত ফেরি করেছিল। আমাকেও সাথে নিয়েছিল । আলতাফ মাহমুদের “ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি...............” পুরো গান না পারায় কয়েকটি লাইনই আমরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইছিলাম । চৌয বৃত্তি দ্বারা উপার্জিত ফুল, অসম্পূর্ণ গান ... আয়োজনে হাজার ত্রুটি থাকলেও ঈশ্বর জানেন নিজ ভাষার জন্য জীবন দান করা শহীদদের প্রতি আমাদের ভালবাসায় কোন খাদ ছিলনা ।
সরকারী কলেজের মাঠে শহীদ মিনারের সামনে তখন অনেকেই দাঁড়িয়ে ছিল ফুলের লোভে। ভাবতে অবাক লাগে ফুলের নিরাপত্তা দিতে পাহারা দিচ্ছিল কলেজের কিছু ছাত্ররা। একটা সময় অস্থির জনগণ আর পাহারার বাঁধ মানল না। ক্ষুধার্ত প্রানীর খাবারের মত ফুল ছিনিয়ে নিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সাজানো চত্বর কে । কয়েক মিনিটের মাঝে পুরো শহীদ মিনার ফুলহীন খালি হয়ে করুণ নয়নে তাকিয়ে ছিল হয়ে ফুল্প্রদানকারীদের প্রতি । একবার দুইবার নয় আমার শৈশবে বহুবার আমি শহীদ মিনারের লুট হয়ে যাওয়া ফুলের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনমনে ঘরে ফিরেছি । এই জাতির অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা তখন থেকেই আমাকে বিচলিত করেছিল। । ফুলের লিপ্সা যারা ত্যাগ করতে পারেনা তাদেরই পূর্ব পুরুষ কেউ কেউ জীবন দান করার নেশায় মেতে উঠেছিল বায়ান্নর ফাল্গুনে । প্রজন্মে প্রজন্মে এত বৈপরত্য বুঝি সারা পৃথিবীর কোন জাতিতে নেই।

আমাদের মফসলের বিশ্ববিদ্যালয়েরর শহীদ মিনারটি ছিল প্রশাসনের বড় অবজ্ঞায়।শুধুমাত্র তিনটি সরল সিমেন্টের পিলার দাঁড় করানো। দেশের প্রচলিত শহীদ মিনারের শীর্ষদেশ বাঁকানো আকৃতি ছিলনা তাতে। কয়েকজন ছাত্র একুশে ফেব্রুয়ারীর আগেরদিন ছোট্র একটি সত্যিকার আকৃতির মিনার বানিয়ে পথের পাশে রেখেছিল প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। সবাই যখন গোলাপ, রজনীগন্ধা আরো অভিজাত সব ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল বেদীতে আমি হলের সামনের গাছ থেকে ঝরে পড়া কমলা রঙের পলাশ ফুল মুঠো ভরে অঞ্জলি দিয়েছিলেম শহীদের স্মৃতির পানে সত্যিকার আকৃতির প্রতীকী শহীদ মিনারে । ভোরের সেই ঊষালগ্নে তোমার নির্ঘুম চোখ দুটিতে আলো জ্বলে উঠেছিল সেদিন ।

কৈশোর পেরিয়ে তারন্যের যাত্রাপথে একেক সময় আনমনে ভাবতাম কোন এক অদেখা সঙ্গীর কথা। এরকম সবাই হয়তো ভাবে। খুব বেশি মুখচোরা আর লাজুক আমি সেই বসন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সামনে শ্বেত জবা গাছ গুলির দিকে তাকিয়ে এক কঠিন পণ করে বসলাম। যতদিন তোমার দেখা না পাই ততদিন আমি কবিতা লিখবনা। কবিতার মত প্রিয় বিষয়কে আমি বিসরজন দিয়েছিলাম তোমাকে পাবার জন্য। আমার সেই অস্থির শিশুসুলভ প্রতিজ্ঞায় নিয়তি অলক্ষ্যে সেদিন নিশ্চয় হেসেছিল । আর তাইতো তোমাকে পাবার জন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলনা । মাত্র একটি বছর তপস্যা করে পরের বসন্তেই তোমার মনের দুয়ারে পৌঁছলাম। তুমিও অপেক্ষায় ছিলে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে পারা মনের জোর আছে এমন কারো জন্যই ।
কবিতা পড়ার প্রহরে একেকদিন জীবনানন্দের লাল পেড়ে শাড়ি আর সাদা তালশ্বাস হাতে লয়ে পলাশের পানে চেয়ে থাকা মেয়ের কার সাথে ভাল বাসা হয় জানতে পূনরজন্ম ভিক্ষা করতাম । আজ আমি জানি সময়ের সাথে মানুষ বদলে গেলেও ভালবাসা চিরন্তন। সে শুধু এক মন থেকে আরেক মনে এক ফাল্গুন থেকে আরেক বসন্তে রাংগিয়ে দিয়ে যায় আমাদের।
আমার জলপায়রার নীড় গড়ার স্বপ্নে বাইরের তুমি সমরথন দিলেও তোমার অন্তরগত মনের সায় ছিলনা। তোমার জানালায় লাগানো কটকটে হলুদ রঙের ছোঁয়া আমার দৃষ্টি ঝলসে দিত কখনোবা। চৈত্রের অপূরব সন্ধ্যাগুলিতে আমার মনের অর্ধেক যখন প্রকৃতি ভাগ করে নিত তোমার অমূলক ঈরষা আমাকে ব্যথিত করে তুলত। আজ আমি স্বীকার করছি বাইরে থেকে যতটা আদর্শ মনে হতো তোমাকে আমি কখনোই তোমার সেই অতি অসাধারণত্বকে মেনে নিতে পারিনি। সোনালী প্রান্তরে নয় সবুজ চত্তরে শুয়ে শুয়ে নিরনিমিষ আকাশ দেখার অদ্ভুত এক কামনা আমি বুকের অত্যন্ত গভীরে ঘুম পারিয়ে রেখেছিলাম তার খোঁজ তুমি কখনোই রাখনি । কেন যেন তখন এক আগ্রাসী মনোভাব তোমাকে নিজের অনুভূতি গুলিকে আমার ইচ্ছের উপর কঠিনভাবে চাপিয়ে দিতে বাধ্য করছিল। তুমি চাইতে তোমার মত আমি কথা বলি, শুধুমাত্র তোমার দেখানো পথে পথ চলি। কিন্তু ভালবাসা মানে তো সেই মানুষটাকেই ভালবাসা যার সকল সীমাবদ্ধতাকেও মেনে নিতে পারি । তোমার স্নিগ্ধতাহীন আধিপত্যমূলক মনোভাব আমাকে ক্রমেই তোমার প্রতি বিমুখ করছিল। যেমন হয়েছিল আমাদের ভাষা নিয়ে উনিশশো বায়ান্ন সালে । যখন বাংলা ভাষাকে কন্ঠরুদ্ধ করে দিতে চেয়েছিল কিছু ভিন্ন ভাষার মানুষ। কারো চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত মানেনি আমার পূর্ব পুরুষেরা আমিও তো তাদেরই সন্তান। যে আলো ছুঁয়ে গিয়েছিল তাদের সে রশ্মি আমাকেও ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গভীরে তাই লোনা জল থেকে উঠে এসে অমৃতের সন্তানেরা প্রদ্যোত হাতে যখন চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙ্গে আধ শতক দূরের আমাকে তাদেরই চেতনায় নিজের জীবন সম্পূর্ণ নিজের পছন্দে যাপন করার দূরন্ত সাহস যোগায়।

রাত বারটায় আমার শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়া নিয়ে আশালীন যে তীক্ষন বাণে আমাকে জর্জরিত করেছিলে ভাঙ্গনের সে পথ ধরে আমি চলে গিয়েছিলাম । যে যেভাবেই দেখুক সে পথ প্রস্থানের ছিল না । আমি তীব্রভাবেই চাইতাম তুমি ফিরে আসো। যে আলো জ্বলেছিল এক ফাল্গুনে শহীদ মিনারের সামনে তোমার দুচোখে আর একটিবার সেই আলো দেখার জন্য আমি বার বার জন্ম নিতে চাইতাম।
প্রাত্যহিক জীবনের ধুলোই কাঁটায় আমার অনুভূতিগুলোকে আমি মরে যেতে দেইনি। আমি ভুলিনি ভাষা সুনিকদের অর্জনের গঊরব গাঁথা । জানি আমি ধমনীতে বাঙালি রক্ত বহমান সবাই এক না একদিন উপলব্ধি করবে সেই সত্য এবং ইতিহাস ।
তাইতো তোমাকে আরেক ফাল্গুনে দেখলাম শহীদ মিনারের বেদীতে দাঁড়ানো কৃষ্ণচূড়া অঞ্জলি নিয়ে। সেই থেকে আমার আমি পুনর্জন্ম লাভ করল। আর ফাগুন হাওয়া সজনে ফুলের শাখা নাড়িয়ে ফুল ঝরিয়ে দিয়ে গেল কত শত।