লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ আগস্ট ১৯৮৩
গল্প/কবিতা: ২৫টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৫১

বিচারক স্কোরঃ ৩.৩৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৭ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftক্ষুধা (সেপ্টেম্বর ২০১১)

লু হাওয়া
ক্ষুধা

সংখ্যা

মোট ভোট ৮৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৫১

রওশন জাহান

comment ১১২  favorite ৬  import_contacts ১,৫১৮
চৈত্রদিনের দ্বিতীয় প্রহর । দারুন উত্তাপ । ট্রেন থেকে নেমে হাটঁতে হাটঁতে একেবারে বাস রাস্তার কাছে এসে দাড়িঁয়েছে তারা । বুকের ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে আফিয়ার । ভীষন অবসন্ন বোধ করছে সে । ধুলি উড়িয়ে হঠাৎ একটা দুটা বাস চলে যাচ্ছে । কখনো গাছের ছায়ার আড়ালে দাড়িঁয়ে পড়ছে আফিয়া আর তার মেয়ে ময়না। এতে করে পা দুটি বিশ্রাম পেলেও মন সেই অশান্তই থেকে যাচ্ছে । বার বার ফুলে উঠা হাতের কালশিটে দাগের দিকে তাকাচ্ছে সে ।

কাল রাতে যখন রান্না করা ভাত কম হয়ে যাওয়ায় শাশুড়ীর অভিযোগের পর রানা শশুরবাড়ীর ঘর ভরা মানুষের সামনে তার মুখে প্লেট ছুড়ে মারল, তারপর জোড়া পায়ে লাথির পর লাথি দিচ্ছিল । আফিয়া তখন ঘটনার আকস্মিকতায় পাথর হয়ে গিয়েছিল । হাত দিয়ে বারান্দার রেলিং আকড়ে ধরতে গেলে রানা হাতে এক হ্যাচকা টান মেরে আরো কয়েকটি লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিল তাকে । সে তখন এত তুচ্ছ ঘটনার এত বড় পরিনতিতে কাদঁতেও ভুলে গিয়েছিল । যদিও কিছুদিন পর পর মারধর এবং নতুন নতুন বিয়ে করা রানার স্বভাব তবুও সে সব কিছু মেনে নিয়েই তার সাথে থাকে ।

আফিয়া স্থির করে ফেলেছে আর সে রানার সাথে থাকবেনা । অনেক কষ্ট হবে তার তিন বছরের মেয়েটিকে নিয়ে । তার কোন অভিভাবকও নেই । এই সমাজ এখনো একা একটি মেয়েকে চলতে দিতে নারাজ । প্রতি পদক্ষেপে বিপদ, বিধিনিষেধ আর অবহেলার বেড়ি দিয়ে তাদের জীবনকে আর জীবন হয়ে উঠতে দেবেনা । তবু সে চেষ্টা করবে । মায়ের বা রানার কারো সংসারেই সন্মান নিয়ে সে বেচেঁ ছিলনা ।

আফিয়ার বাবা আর একটি বিয়ে করে সিলেটে থাকে । ছোট একবোন আর ভাইকে নিয়ে গ্রামে থাকে মা । ভাইটা কিশোর বয়সেই গঞ্জে রিকসা চালায় পরিবারের গ্রাসাচ্ছেদনের জন্য । মায়ের খুব ইচ্ছে ছিল ছেলে লেখাপড়া করবে । অভাবের সংসারে সেটি আর সম্ভব হয়নি । তার বোন আকলিমা অনেকদিন তার সাথেই থেকেছে বিয়ের পর কিন্তু অত্যন্ত সুদর্শনা হওয়াই তাকে নিয়ে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেওয়ায় আপাতত গ্রামেই থাকছে সে । আফিয়াদের পূর্বপুরুষ অবশ্য অবস্থাপন্ন ছিল এবং তারা সবাই দেখতেও যথেষ্ট আকর্ষনীয় এ কারনে তার বোন বা মা বাড়ির বাইরে কাজ করতে সংকোচ বোধ করে, কাজও সহজে মেলেনা । রানা পুলিশের চর । সন্ত্রাসীদের সাথে থেকে তাদের তথ্য পুলিশকে গোপনে জানায় । সে নিজেও এক সময় সন্ত্রাসী ছিল । এখনও ছোট খাটো অবৈধ ব্যবসায় জড়িত ।

ভীষন ক্ষুধা আর ক্লান্তি শরীরে । খাবার ইচ্ছে বা টাকা কোনটাই তার নেই এখন । হাতে যে কয়টি টাকা ছিল তা দিয়ে ময়নাকে রুটি আর কলা খাওয়ানো হয়েছে আগেই । বিনা টিকেটে ট্রেনে উঠে শহর থেকে পৌছেঁছে আজ সকালে, ভাগ্য প্রসন্ন ছিল বলে টিকেট চেকার চেক করতে আসেনি তাদের বগি । কিন্তু এখন শরীর আর মনের যুদ্ধে সে পৃথিবীর রং বদলে যেতে দেখে । পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে , প্রচন্ড ক্ষুধায় মনে হচ্ছে এক্ষুনি বুঝি বমি শুরু হবে । মাথা ঘুরে পড়ে যাবার আগ মুহূর্তে তাকে ধরে ফেলে এক পথচারী । তারপর রিকশায় তুলে দেয় । বাড়ি ফিরে আসে সে ।

নতুন এক জীবন যুদ্ধ শুরু হয় । তার মা হঠাৎ পরিবারে দুজন সদস্য বৃদ্ধির বিষয়টি ভালভাবে নেয়না । প্রথম কয়েকদিন যত্ন করলেও ক্রমেই তার ব্যবহার রুক্ষ হচ্ছে । ভাল মাছ, তরকারী ছেলে শফিকের জন্য রেখে দেয় । সে যে এই সংসারের বোঝা তা বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়ে দেয় ।
নিজের জন্য আফিয়ার এতটা ভাবনা হয়না যতটা হয় মেয়েটির জন্যে । মেয়েটি বয়স অনুযায়ী খাবার পায়না। শুকিয়ে দিন দিন দেখতে ছোট হয়ে যাচ্ছে। রানার সংসারে কষ্ট থাকলেও এতটা ভাতের কষ্ট ছিলনা তাদের । দিনে দিনে তার আশংকা দুঃচিন্তায় পরিনত হল যখন ভাই শফিক টাইফয়েডে পড়ল । সে আর রিকশা নিয়ে বেরোতে পারেনা । সারাদিন জ্বর নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে । এদিকে ঘরে ভাত থাকেনা একমুঠো । ঘুম থেকে উঠেই মেয়েটি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । ক্ষুধার্ত শুকনো মুখ দেখে মায়ের অন্তরটা হু হু করে ।

আফিয়ার মা অন্যের বাড়ি কাজ করতে বের হয় সব সংকোচ ফেলে । গ্রামে কাজের লোক কেউ খুব একটা রাখতে চায় না । সবাই নিজের কাজটুকু করা শুরু করে ভোর হতেই । দুটি পয়সা বাচাঁতে চায় সবাই । তবু সে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরে কাজের আশায়, খাবারের আশায় । জ্বরাকান্ত কিশোর ছেলেটির মুখে কিছু একটু তুলে দেবার আকুলতায় ।


বাড়ির পাশে সরকারী পুকুরের ঘাটে অনেক সময় বসে থাকে আফিয়া তার মেয়ে আর বোন আকলিমাকে নিয়ে । বাহিরে চৈত্রের লু হাওয়া বইতে থাকে, তাতে অতৃপ্ত দেহমন আরো তৃষ্ণার্ত হয় । চিনি , বরফ আর লাল নীল রঙ দিয়ে তৈরি কম দামী আইসক্রীম নিয়ে ফেরিওয়ালারা চলে যায় দৃষ্টির সামনে দিয়ে । তারা নিজেদের অক্ষমতা নিয়ে বুভুক্ষের মত চেয়ে থাকে ।

দীর্ঘ দিনগুলি আর যেন কাটতে চায়না । রাত এলেই আধ পেটা মানুষগুলি ঘুমের অতলে ডুবে যেতে থাকে । মাঝে মাঝে শফিক জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকে । মেয়েটা এক এক সময় ঘুমের মধ্যে “বাবা, আমার জন্য কি আনছো ? “ প্রশ্ন করে । যদিও এর উত্তর দেবার মতো কেউ নেই । শুধু ঘরের পাশের গাব গাছটিতে এক নিশাচর খ্যাপা পাখি হা-হুতোশ করে যায় কখনো সখনো ।


আফিয়াদের পাশের বাড়িতে থাকে এক শিক্ষিকা । স্হানীয় প্রাইমারী স্কুলে সে পড়ায় । ময়নার সমান তার এক নাতনী আছে । ময়না এখন দিনের বেশিরভাগ সময় সে বাড়িতেই কাটায় । প্রায় সময় তার ক্ষুধার্ত মুখ দেখে দয়ালু সে নারী তাকে কিছু খেতে দেয় । মুড়ি ,আলু সিদ্ধ, কলা এমনি দু একটা খাবার হাতে তুলে দেয় । অনেক সময় তার নাতনী যখন কিছু খেতে চায়না তখন ময়নাকে খেতে দিলে তার নাতনী হিংসায় হলেও খেতে চায় । ওরা মেয়েটিকে খাওয়াবার জন্য ময়নাকে দিয়ে সে কৌশল কাজে লাগায় । কিন্তু সেটা প্রতিদিন নয় । উদোম গায়ে ক্ষুধার্ত শিশু তবু ঘুম থেকে উঠেই পাশের বাড়ির দিকেই পা বাড়ায় । আজকাল নিরতিশয় গঞ্জনাও তাকে সহ্য করতে হয় শহরের হোস্টেল থেকে আসা ওদের ছোট মেয়েটির কাছে । কেন জানি উচ্চশিক্ষিত মেয়েটি ময়নাকে একেবারেই সহ্য করতে পারেনা । নিজের ভাগ্নীটিকে কোলে রেখে সে ময়নাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় ।

অন্তহীন সময়ও এক সময় শেষ হয় । নদী ও নারীর মতই ঋতুরাও অনির্বাযতারর পথে বয়ে চলে দিন থেকে দিনান্তে, এক রাজ্য থেকে আরেক রাজত্বে । কার্তিকের কুয়াশার আগমনী দিনগুলির শুরুতে শফিক অনেকটা সুস্থ্য হয় । কিশোরী আকলিমার বিয়ের প্রস্তাব আসে দু-একটি । কিন্তু এত হতদরিদ্র ঘরে কেউ বিয়ে করতে রাজী হয়না । তবে আকলিমার সৌন্দয্যের কাছে হার মানে অনেকেই । সত্যিকার অর্থেই কুটিরে জন্মানো রাজকন্যা সে । আর তাইতো ইদানীং রাতের বেলায় কারা যেন শীষ দেয় ঘরের পেছনে দাড়িঁয়ে ।

আফিয়ার মা আফিয়াকে রানার কাছে ফেরত যাবার জন্য চাপ দিতে থাকে । মা মেয়ের ঝগড়া, মনোমালিন্যে, ক্ষুধায়, অসুস্থতায় দিনগুলি দুর্বিষহ হয়ে উঠে সবার । আফিয়া রানার কাছে ফিরে যাবার কথা চিন্তা করে । খবর পাঠায় তার কাছে ।

তারপর একদিন রানা এলো । ময়না আনন্দে বাবার কোলে বসে থাকলো সারাটা সকাল । আফিয়াও এক ধরনের নিরাপত্তা অনুভব করল । চোখে আনন্দের অশ্রু । শফিক রিকশা নিয়ে বের হল । আকলিমা দুলাভাইয়ের সাথে অনেক হাসি তামাশায় মেতে উঠল। সবাই ব্যস্ত রইল কয়েকটা দিন ।
পরদিন রানা আফিয়া আর ময়নাকে নিয়ে চলে যাবে নিজের বাড়িতে । আফিয়ার মা পিঠা বানাচ্ছে জামাইয়ের জন্য । শফিক ময়নাকে রিকশায় নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছে । আকলিমাকে সারা বাড়ি খুজেঁ না পেয়ে আফিয়া পুকুর ঘাটে এসে দেখে রানা আর সে গভীর গল্পে মগ্ন । তাকে সামনে দেখে দুজনেই অপ্রস্তুতভাবে চুপ করে গেল । কাল চলে যাবে তাই আজ আর সে আকলিমাকে কাজ না করে গল্প করার জন্য কিছু বললনা ।
সারারাত আফিয়া এক নিষ্চিন্ত সুখস্বপ্নের মধ্য দিয়ে ঘুমিয়ে থাকল বহুদিন পর । গাব গাছের খ্যাপা পাখিটা হা-হুতোশ করে গেলেও আজ আর সে অন্যদিনের মত দীর্ঘশ্বাস ফেলল না । বরং পাখিটার জন্য কেমন যেন মায়া হতে লাগলো তার ।
সকালে উঠে সে আর তার মা যাত্রার আয়োজন করতে লাগল । ময়না অন্যদিনের মত আর শুকনো মুখে পাশের বাড়ি গেলনা । বাবার পেছন পেছন পুকুরঘাটে গেল । আর সেদিনই রানা আকলিমাকে নিয়ে পালিয়ে গেল ।

একটা সময়ের পর আফিয়া রানার সংসারে ফিরে গিয়েছিল জীবনযুদ্ধে পরাজিত সেনানীর বেশে। দুই বোনের দুই সন্তান জন্মের পর রানা তাদের দুজনকেই তাড়িয়ে দিয়ে বিয়ে করে আনে নতুন একজনকে। এরই মাঝে আফিয়ার মা মারা যায় এবং ছোট ভাইটিও বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে ।

আবার একদিন ।
আফিয়ার মেয়ে ময়না এবং আকলিমার শিশুসন্তান পাশের বাড়ির সেই শিক্ষিকার দরজায় এসে দাড়াঁলো । বারান্দায় খেলছে শিক্ষিকা নারীর দুই নাতনী । ছোট নাতনীটিকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে । মেঝেতে পড়ে আছে অর্ধেক খেয়ে ফেলে দেয়া কিছু খাদ্য । আগন্তুক শিশুদের শুকনো ক্ষুধার্ত মুখের দিকে চেয়ে একটি রুটি দুইভাগ করে বাড়িয়ে দেন দয়াবতী রমনী।তারা হাত বাড়ায়।

সেই শিক্ষিকার মত এমনই আরো অনেকের দানে ও দয়ায় তারা মরে না গিয়ে ধুকে ধুকে বেচেঁ থাকে। মা থেকে মেয়ে, বর্তমান থেকে ভবিষ্যত প্রজন্ম, একই চক্রে ঘুরে তাদের জীবন। খাবারের সন্ধান শেষে ধীরপায়ে হেটেঁ যায় অমৃতের সন্তানেরা যেখানে পাশাপাশি বসে আছে তাদের বিতাড়িত মা আর খালা কোলে অপুষ্ট শিশু নিয়ে । যুগ যুগের অন্তহীন ক্ষুধা বুকে ধরে। এদিকে পুকুরের লীলুয়া বাতাস তীব্র লু হাওয়া হয়ে তাদের উপর দিয়ে বয়ে যায় চৈত্রদিনের বিজন দুপুরে ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement