রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে গেটের দিকে এগোতে গিয়ে বাম পায়ে একটা টান অনুভব করলো শিলা। এক জোড়া করুণ চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কই আগে তো কখনো একে দেখেনি।
আজ দু’বছর হলো ইডেনে পড়ছে ও। এখানে যারা ভিক্ষে করে তাদের মোটামুটি সবাইকে চেনে ও। দাত্রী হিসেবে ওর সুনামও আছে। একে আগে দেখলে অবশ্যই চিনতে পারতো। ছেলেটার বয়স ওর কাছাকাছিই হবে। চোখগুলো আশ্চর্য মায়াময়। হটাৎ করে দেখলে মনে হবে, হাঁটু গেড়ে বসে আছে ও। ভাল করে খেয়াল করলে বুঝা যাবে, হাঁটুর ওপর থেকে ওর দুটো পা’ই কাটা। থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট এর মাথা দুটো মুড়ে পায়ের কাটা অংশটাকে ঢেকে রেখেছে।
“এই পা ছাড়ো, আমি টাকা দিচ্ছি।” পার্স থেকে দশ টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে দিল ও। “আর কখনো এভাবে পা ধরবে না, ঠিক আছে।”একটু হেসে যোগ করলো।
ছেলেটা মাথা নাড়লো। টাকাটা শার্টের বুক পকেটে রেখে দিল । আফনে খুউব বালা, আফা। তার চোখ খুশীতে চকচক করছে।
“নাম কি তোমার? জানতে চাইলো শিলা। ছেলেটা ওকে আগ্রহী করে তুলেছে।
“বশীর, আফা। তয় সবাই আমায় বশীর্যাি কয়া ডাহে।”
“যদি কিছু মনে না করো, তোমার পা ......! বলতে গিয়েও থেমে গেল। ছেলেটার চোখ ছলছল হয়ে গেছে। শিলার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ওকে, বশীর। মনে থাকে যেন, আর কখনো কারো পা ধরবে না।”বলেই গেটের দিকে হাঁটা ধরলো, যেন ওর সামনে থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে।
“আগে আমি এমন ছিলাম না আপা।" বশীরের শেষ কথাটা কানে যেতেই আবার দাঁড়িয়ে গেল। ঘার ফিরিয়ে তাকাতেই দেখলো, দু’হাতের উপর ভর করে শরীরটাকে পেন্ডুলামের মত দুলিয়ে আগ-পিছু করতে করতে দেয়ালের দিকে সরে যাচ্ছে বশীর। কি মনে করে শিলাও ওদিকে সরে গিয়ে বশীরের সামনে দাঁড়ালো।
“সরি, তুমি কি যেন বলছিলে, ঠিক শুনতে পাইনি।”
“আপনি এখন আমায় যেমন দেখছেন, আগে আমি এমন ছিলাম না। বছরখানেক আগেও আমি আপনার মত হেঁটে বেড়িয়েছি। কিন্তু, আপনার মতই একটা সুন্দর মেয়ের জন্য আজ আমার এই দশা।”অনেকটা সপ্রতিভ কন্ঠে বেশ শুদ্ধ উচ্চারণে বললো বশীর।
ওর বাচনভঙ্গির পরিবর্তনটা কানে বাজলো শিলার। মনে হলো খুব সুন্দর করে কথা বলা একটা ছেলে হঠাৎ করেই রাস্তার পঙ্গু ভিক্ষুকের বেশে চলে এসেছে। বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলো শিলা। ঘটনাটা জানবার জন্য ওর মন আঁকুপাঁকু করে উঠলো। পার্স থেকে মোবাইল বের করে টাইম দেখলো, ক্লাস শুরু হতে আরো আধ ঘন্টা বাকী। তোমার যদি আপত্তি না থাকে, ঘটনাটা আমায় বলবে? দেয়ালের দিকে সরে গেল ও।
সহসাই কেমন আনমনা হয়ে গেল বশীর। দৃষ্টি ছড়িয়ে দিল শিলার মাথার উপর দিয়ে অনেক দূরে। যেন বিস্মৃতির অতল গহব্বর থেকে টেনে আনছে কথাগুলো, এমন করে বলতে লাগলো, “আজ থেকে বছর চারেক আগে আমি গ্রামের স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে ঢাকা এসেছিলাম, ভালো একটা কলেজে ভর্তি হতে । উঠেছিলাম গ্রামেরী এক বড় ভাইয়ের বাসায়। সে গুলিস্থান ফুটপাতে দোকানদারী করত। আমি তার সাথে মেসে থেকে কবি নজরুল কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু, পড়াশোনার যা খরচ, আমার গরীব বাবা কিছুতেই দিতে পারছিলেন না। তাই বাধ্য হয়ে পুরনো ঢাকার এক বাসায় ক্লাস ফাইভের এক মেয়েকে পড়ানোর টিউশনি নিলাম। আমার সেই ছাত্রীর এক ফুপি ছিল, যে তার ভাইয়ের বাসায় থেকে আমদের কলেজে পড়তো। কিভাবে যেন আমার সাথে তার ভাব হয়ে যায়। সেই আমায় টিউশনীটা ম্যানেজ করে দেয়।” এ পর্যায়ে এসে একটু থামলো বশীর। নেতানো শার্টের ভেতর থেকে একটা প্লাস্টিকের বোতল বের করে দুই’ঢোক পানি খেল।
আবারো টাইম দেখলো শিলা। না ক্লাস শুরু হতে এখনো মিনিট বিশেক বাকী।
“আপা আপনার দেরী হয়ে যাচ্ছে। আপনি ক্লাসে যান।” শীলাকে বারবার সময় দেখতে দেখে বললো বশীর।
“আরে না, সমস্যা নেই, তুমি বল।” উত্তরে বললো শিলা। বশীরের কথার খেই ধরিয়ে দিতে গিয়ে যোগ করলো, তোমার সাথে কি মেয়েটার প্রেম ছিল?
“এটা প্রেম ছিল কিনা জানিনা। কিন্তু ওর ভাতিঝিকে পড়ানো শুরু করার পর কিভাবে কি যেন হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।”
“হুমম্ তারপর কি হলো।”
“তার সাথে আমার সম্পর্কটা অনেক গভীর ছিল। কিন্তু, তখন বুঝতে পরিনি, ও আসলে অন্য রকম টাইপের মেয়ে ছিল।”বলেই চোখ নামিয়ে নিল বশীর।
শীলাও বুঝতে না পেরে কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইলো, অন্যরকম মানে ?
“থাক ম্যাডাম, আপনি ক্লাসে যান। এই গরীবের কষ্টের কাহিনী শোনে আপনার কোন লাভ হবেনা।” শরীরটা ঘুরিয়ে সরে যেতে উদ্যতো হলো ও।
“এই না না, তুমি বলো।” দেয়ালে হেলান দিয়ে গায়ের ভর চাপিয়ে দাঁড়ালো শিলা। আমি সবটা না শোনে নড়ছি না।”
“ঠিক আছে, শোনেন তা হলে।” আবার বলতে শুরু করলো বশীর। আমি তার ভাতিঝিরে পড়াতে গেলেই নানা ছুতোয় আমাকে তার রুমে ডাক দিত। গেলেই ও আমায় জোরা-জুরি করতো ওর সাথে ...........।” এ পর্যন্ত বলেই আবার চোখ নামিয়ে নিল বশীর।
বুঝতে পারলো শিলা। তাই সেও এই বিব্রতকর বিষয়টাকে পাশ কাটাবার জন্য বললো, ওকে বাদ দাও, বাট্ তোমার এই একসিডেন্ট’টা হলো কি করে? এখনো বুঝতে পারছে না শিলা, ওই মেয়ে যতই চরিত্রহীন হোক না কেন, তার সাথে এর পা কাটার কি সম্পর্ক থাকতে পারে।
“একদিন ওর সাথে রিকশায় কলেজ থেকে ফিরছি। পরিচিত কেউ দেখে ফেলবার ভয়ে ও সবসময় রিকশার হুঁড ফেলে রাখতো। সেদিনও ও রিকশায় আমায় জোর করে চেপে ধরতেই নিজের প্রতি আমার কেমন জানি ঘেন্না লাগলো। একসময় আমার কি যে হলো, মনে হলো এর কাছ থেকে আমার পালিয়ে যাওয়া উচিৎ। তাই চলন্ত রিকশা থেকে হঠাৎ লাফিয়ে নেমে গেলাম। আর তখনি পেছন থেকে একটা গাড়ী এসে.......।” আর বলতে পারলো না বশীর। হুঁ-হুঁ করে কেঁদে ফেললো। ঘটনার আকস্মিকতায় শিলাও হতবাক। এমন কিছু শোনার জন্য সেও প্রস্তুত ছিলনা। তার চোখেও পানি চলে এলো। তারপর কি হয়েছিল আমি কিছুই জানিনা। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি হসপিটালে। আমার দুই পা কাটা, ব্যান্ডেজ করা। মনে হলো এই জীবন রেখে আর কি হবে। আমি তো আর কখনোই কারো কোন কাজে আসবো না। মাস ক্ষাণেক পর সুস্থ হলেও বাড়ী ফিরে যেতে ইচ্ছে হলোনা। সেই মেসেও আর ফিরতে মন চাইলো না। এমনি সময় এক লোক এসে প্রস্তাব দিল, সে আমার দায়িত্ব নেবে, যদি আমি তার কথামত ভিক্ষে করি। সেই থেকে ওর সাথেই আছি।”
শিলার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। একটা ছেলে তার সততা রক্ষা করতে যেয়ে আজ কতবড় ক্ষতি স্বীকার করে নিল। তার মনে ওর জন্য অদ্ভুত একটা শ্রদ্ধা মেশানো ভালবাসার উদয় হলো। সহসা সে বশীরের প্রতি তার ভালবাসা প্রকাশের একটা উপায় খুঁজে পেল।
“শোন আমি এখন কলেজের ভেতরে যাচ্ছি। একটু পরেই আবার আসছি। তুমি এখানটাতেই থেকো।” বলেই সে অনেকটা দৌড়ে কলেজের ভেতরে ঢুকে গেল। কোনদিক না তাকিয়ে হেঁটে গেলে বাগানের দিকে। এক কোণায় ফুঁটে থাকা গোলাপের ঝাড়টা দেখেই মনটা খুঁশিতে ভরে উঠলো ওর। ওখান থেকে সবচেয়ে বড় গোলাপটা ছিড়ে নিল। তারপর ঘুরেই আবার গেটের দিকে হাঁটা দিল। গেঁটের বাহিরে সবে পা গলিয়েছে, এমনি সময় একটা কর্কশ শব্দে তার চোখ চলে গেল সামনে। একটা গাড়ী দ্রুত স্কীড করে পালিয়ে যাচ্ছে দেখতে পেল। সমস্বরের চিৎকারের সাথে একটা মানুষের বুক ফাঁটা আর্তনাদ শুনতে পেল ও। প্রায় ছিটকে রাস্তায় বেরিয়ে এলো ও। রাস্তায় আনেক মানুষের জটলা। ঠেলেঠুলে সেও চলে এলো সামনে। ফাঁটা কুমড়োর মত মাথা নিয়ে অদ্ভুত ভাবে শরীর বাঁকিয়ে রাস্তায় পড়ে আছে রক্তাক্ত বশীর। তার খোলা চোখ দেখে ঠিকই বুঝতে পারলো শিলা, এবার সে সত্যিই পালাতে পেরেছে।