মুক্তিযোদ্ধা জালাল

স্বাধীনতা (মার্চ ২০২৬)

বিষণ্ন সুমন
  • 0
  • ৫৪
ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার মুশুলি ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রাম কামালপুর। এই গ্রামেরই একটা বিশাল পাড়া, যার পুরোটা জুড়ে একটাই বাড়ি, নাম সরকার বাড়ি।

সরকার বাড়িটা যেন দূর থেকে তাকালেই আলাদা করে চেনা যায়। সাত ঈশা জোড়ে সাতটা টিনের ঘর, সবগুলো পাশাপাশি। সামনে একটা বিশাল উঠোন যেটা সবগুলো ঘরকে একসাথে জুড়ে রেখেছে। উঠোনের কাঁচা মাটিতে দিনের বেশিরভাগ সময় রোদ পড়ে থাকে। আর সন্ধ্যা হলেই সেই মাটির গন্ধে কেমন একটা শান্ত শীতল অনুভূতি জাগে। উঠোনের ঠিক পূর্বদিকে বিস্তীর্ণ একটা বিশাল পুকুর, যেটার জল বর্ষায় কলাপাতা রঙা হয়ে যায়। আর শীতকালে রূপালি ধুলোর মতো কুয়াশা ভাসে তার ওপর। পুকুরটাকে কেন্দ্র করেই আসলে এই বাড়ির মানুষজনের জীবন। সকালবেলা গোসল, সন্ধ্যায় কলস ডুবিয়ে জল তোলা, আর শীতের রাতে জলের ওপর চাঁদের আলোর খেলা দেখা… সবই এই পুকুরকে ঘিরে।

বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটা সরু মেঠো পথ। সেই পথটা পূর্ব দিকের মুশুলি বাজার থেকে এসে সরকারবাড়ির ঠিক দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে চলে গেছে পশ্চিমে আরও ভেতরের গ্রামগুলোর দিকে। পথটা বরাবরই নিরিবিলি। সারা দিন দু-এক’জন বাজারমুখো মানুষ হাঁটে। বিকেলে গ্রাম্য ছেলেপুলেরা বাশের কঞ্চি হাতে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করে। কেউ কেউ বাড়ির পিছনের জংগলে বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে মুরুব্বীদের চোখ বাঁচিয়ে বিড়ি ফুঁকে।

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়। ২৬ এ মার্চের পর থেকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগুন জ্বলে ওঠে। পাকিস্তানি সেনারা তাদের গাড়ির বহর নিয়ে মুশুলি বাজারের পাশ ঘেঁষে নান্দাইল হয়ে ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক ধরে যাতায়াত করে। এই সড়কই তাদের প্রধান যোগাযোগ পথ। মুশুলি বাজারের পাশের অংশ তারেরঘাট বাজারের পাশে নরসুন্দা নদীর তীরে তারা ঘাঁটি করে। ময়মনসিংহ কিংবা কিশোরগঞ্জ গামি বাস থামিয়ে তারা তল্লাশি চালায়।

কামালপুর গ্রামের পাশের সরু মেঠোপথে তারা কখনোই ঢুকত না; জায়গাটা তাদের কাছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংগামী রাস্তাটা সরকারবাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় সরকার বাড়ি, তথা কামালপুর গ্রামের কারও সাথে পাক সেনাদের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার কোনো ঘটনা তখন পর্যন্ত ঘটেনি। কিন্তু, সেই অবচেতনতার মধ্যেই এই বাড়ির মানুষরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারত না। দূর থেকে পাক বাহিনীর গাড়ির শব্দ শোনা গেলেই সবাই ভয়ে চুপসে যেত। রাতে পুরুষেরা না ঘুমিয়ে বাড়ি পাহারা দিত।

এই সরকারবাড়িরই ছেলে জালাল। একদম খাঁটি গ্রামবাংলার মানুষ বলতে যা বুঝায়, সে তাই। শৈশব থেকেই সে দুরন্ত। দুঃসাহসিক। চোখে আগুনের মতো দৃঢ়তা। গ্রামে মাছ ধরতে গেলে সবার আগে পানিতে নামত সে। জন্মগত ভাবেই সাঁতার জানা তার। নদী-খাল কিংবা জংগলের রাতের অন্ধকার তাকে বরাবরই টানতো। সেও তাদের বুঝতে পারতো। তার বাবা স্কুল মাস্টার। মা সংসারের কাজ সামলে পরিবারটাকে ধরে রেখেছিলেন। তাদের ভাই-বোনদের সবাইকে সামলিয়ে তিনি কখনোই তার বাবার হুঁক্কা সাজাতে ভুল করেননি। রাতে পুকুরের ঘাটে বড় আমগাছটার নিচে বসে বাঁশের বাঁশি বাজাতো জালাল। এপাড়া-ওপাড়ার তরুনীদের সেই বাঁশির সুরে মন আন-চান করতো। গ্রামবাসীর কাছে সে ছিল এক অমার্জনীয় দুরন্তপনার নাম।

গ্রামে যুদ্ধের সময়টায় দিন-রাত্রির পার্থক্য বোঝা যেত না। সন্ধ্যা হলেই গ্রামটা নিঃশব্দ হয়ে যেত। খেজুর গাছের মাথা দুলে উঠলেও মানুষ ভাবত, এই বুঝি পাক-সেনারা এলো। সেই ভয়ের মধ্যে সরকারবাড়ির পেছনে ঘন জংগল পেরিয়ে হুহুন্দি বিলের ধারে বসতো মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আড্ডা। বাড়ির সবাই কম-বেশী কিছু না কিছু খাবার যেমন, লাল চিনি, গুড়, খৈ, ভাত, শুকনো চিড়া এসব তাদের কাছে পৌঁছে দিত। দুঃসাহসী হওয়ায় এই কাজটা জালাল আগ বাড়িয়ে করতো। অল্প ক’দিনেই সে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ আস্থাভাজন হয়ে উঠে।

এক রাতে জালাল কাউকে না বলেই পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। তার সাথে চাচাতো ভাই কাসেম, নদীর পাড়ের হাসেমও বেরিয়ে যায়। ধীরে ধীরে তার দুঃসাহস আর নেতৃত্বের জোরে হয়ে উঠে একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। পাক-সেনারা একসময় তার নাম শুনলেই ভয়ে সিঁটিয়ে যেত। তার বয়স খুব একটা বেশি ছিল না। মাত্র বাইশ-তেইশ। ফরসা একহারা দীঘল চেহারা। মাথা ভরতি কুকড়া চুল। তার চোখে মুখে সবসময় একটা দৃঢ় সংকল্প এঁটে থাকত, যা দেখে দলের বড়রাও মাথা নত করে ফেলতো।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়। রাতগুলোতে শীত পড়ে, কুয়াশায় চারদিক সাদা হয়ে যায়। ধানক্ষেতগুলো তখন শরতের আলোয় সোনালি। কামালপুর থেকে মুশুলি বাজার পর্যন্ত হেঁটে গেলে দেখা যায়, মাঠের মাঝখানে ঘুমিয়ে থাকা ধানগাছ মাঝে মাঝে বাতাসে দুলে ওঠে। নদীর কাছাকাছি গেলে শব্দটা আরও স্পষ্ট, একটা দীর্ঘ, গভীর, গম্ভীর শব্দ, যেন নরসুন্দা শ্বাস নিচ্ছে। নদীর ওপার থেকে কখনো কখনো আওয়াজ ভেসে আসে, পাক বাহিনীর গুলির শব্দ। হিন্দু বাড়িগুলো থেকে আর্তচিৎকার শুনা যায়। কখনো তাদের ঘর-বাড়ি পোড়ানোর গন্ধ এসে নাক ভারি করে দেয়।

মুশুলি বাজারের পরেই তারেরঘাট বাজার। বাজারটা খুব বড় ছিল না, তবুও আশ-পাশ সব এলাকার মানুষরই এখানে যাতায়াত ছিল। পাশেই নৌকো ঘাট থাকায় মহাজনি নৌকোর ভীড় লেগেই থাকতো। পেঁয়াজ, ধান, গরু, ছাগল সব ধরনের ব্যবসা হতো এখানে। কিন্তু, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সারা বাজারে ভুতুরে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। দোকানগুলো আগের মতো খোলা থাকত না। আর বাজারের পাশ দিয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদীতে পাকিস্তানি সেনারা সবসময় চোখ রাখতো। তাদের চোখে-মুখে ভয়ংকর এক নিষ্ঠুরতা। নদীর ওপর যে সেতুটি ছিল, সেটা তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের গাড়ির বহর মূলত এই সেতুর উপর দিয়েই ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ সড়ক ধরে যাতায়ত করতো। তারা কখনোই কোনো গ্রামে ঢোকার প্রয়োজন অনুভব করত না। সে কারণেই এই সেতু তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে, এর উপর সর্বক্ষণ টহল বলবৎ রাখতো।

এই সেতুটাই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মাথাব্যথা। জালাল শুনেছিল পাক সেনারা সেখানে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেয়। লরি থামে, সেনারা নেমে আসে, আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটায়। তারা ভালো করেই জানে এই সেতু ধ্বংস করা গেলে আশপাশ অঞ্চলে পাক বাহিনীর সম্পূর্ণ যোগাযোগ রক্ষা করা কঠিন হবে। তাই জালাল কমান্ডার তথা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সেতুটি ছিল এক বিশাল বাধা।

এক সন্ধ্যায় সরকারবাড়ির পুকুর পাড়ে জালাল দাঁড়িয়ে দেখছিল চারদিক। পানিতে তখন অস্তগামী সূর্য লাল আভা ছড়াচ্ছে। হাওয়ায় পাতার মৃদু আওয়াজ। সে বুঝতে পারছিল, সময় এসেছে। কয়েকদিন ধরে খবর আসছে, পাক সেনারা সেতুর ওপর পাহারা আরও জোরদার করেছে। জালালের চোখ সরু হয়ে এলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ। যে কোন মূল্যে এই কড়া পাহারাকে ভাঙ্গতেই হবে।

রাত গভীর হলে মুক্তিযোদ্ধারা একে একে সরকারবাড়িতে জড়ো হলো। টিনের বারান্দার নিচে লণ্ঠন জ্বালানো। আলো টিনের উপর প্রতিফলিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতর জালালের মা চুপচাপ খিচুড়ি রান্না করলেন, যদিও জানতেন ছেলেরা হয়তো কিছুই মুখে তুলবে না। তিনি মাটির হাঁড়িতে খিচুড়ি ঢেকে রেখে বারান্দার পাশে রাখলেন।

জালাল একটি ছোট মানচিত্র বের করে মাটির ওপর পেতে রাখল। সবাই তার চারপাশে বসে পড়ল। বাতাস ভারী। রাতের যেকোনো শব্দেই মনে হচ্ছিল বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

“ব্রহ্মপুত্রের সেতুটা আমাদের ভাঙতেই হবে,” জালাল শান্ত গলায় বলল, “আজ রাতেই।” তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই। চোখে দৃঢ়তা।

কাসেম, যে বয়সে জালালের সমান, বলল, “কমান্ডার, সাঁতার তো আমাদের সবার জানা। কিন্তু, পাহারাটা খুব কড়া।”

জালাল মাথা নাড়ল। “জানি। কিন্তু রাতের অন্ধকার আমাদের পক্ষে। আমরা গেলে তারা টেরই পাবে না। টাইম বোমাটা ফিট করতে পারলে কাজ শেষ।”

হাশেম, একটু বেঁটে চওড়া গড়নের মানুষ। হাতের তালুতে একটা টোকা মেরে বলল, “টাইমার কয় মিনিট?”

“বিশ মিনিট।” জালাল মৃদু হাসল, “তার আগেই আমাদের পাড়ে ফিরে আসতে হবে।”

কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু বাতাসের মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ, আর দূরে কোথাও কুকুরের ডাক। এমন নীরবতা যে মনে হয় চারপাশও যেন শ্বাস বন্ধ করে আছে।

মধ্যরাতের পর, যখন আকাশজোড়া তারা ছড়িয়ে আছে কিন্তু চাঁদ নেই, তারা নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। সরকারবাড়ির দক্ষিণ দিকের সরু রাস্তা ধরে তারা এগোতে লাগল। মশার শব্দ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর নিজের পায়ের শব্দ। সব মিলিয়ে অদ্ভুত উত্তেজনা। গ্রামে কুকুরগুলো মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে, আবার থেমে যায়।

ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে হালকা কুয়াশা ভাসছে। তাদের পা মাটিতে পড়ার সাথে সাথে সেই কুয়াশা নড়ে ওঠে। জালাল লক্ষ্য করছিল, তাদের প্রতিটা শব্দ যেন আরো জোরে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তবুও থেমে থাকা যাবে না।

তারের ঘাট বাজারের ঠিক পশ্চিমে সেতু থেকে বেশ কিছু পৌঁছাতেই ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগল। বুঝতে পারলো তারা নদীর ধারে চলে এসেছে। নদী এখানে চওড়া, গভীর। কুলুকুলু শব্দে বোঝা যায় স্রোত জোরে বইছে। দূরে দেখতে পেল সেতুর ওপর ঝাপসা আলো। পাক সেনারা টহল দিচ্ছে। কেউ হেঁটে যাচ্ছে, কেউ বসে আছে, কেউ সিগারেট ধরাচ্ছে।

“সবাই প্রস্তুত?” জালাল ফিসফিস করে জানতে চাইলো।

উত্তরে মাথা নাড়ল সবাই। উত্তেজনায় জোড়সে শ্বাস নিচ্ছে। বাতাসের শব্দ ছাপিয়ে তাদের শ্বাসের আওয়াজ ক্রশশঃ জোরালো হয়ে উঠছে।

তারা পানিতে নামল। শীতের পানিটা এত ঠান্ডা যেন শরীর ছুঁতেই হাড়ে গিয়ে বিঁধল। কিন্তু, সবাই এতে অভ্যস্ত। তারা সাঁতরে এগোলো। জালাল সামনে, বাকিরা পেছনে। তাদের প্রতিটি হাতের নড়াচড়া নিঃশব্দ। প্রতিটি শ্বাস মেপে রাখা।

সেতুর পিলারের কাছে পৌঁছাতেই উপরে সশব্দে বুটের শব্দ শোনা গেল। টহল দল হাঁটছে। সেতুর নিচের অন্ধকারে ভাসতে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিঃশ্বাস বন্ধ করে সাঁতরে গেল।

হঠাৎ ওপর থেকে একটা সিগারেটের টুকরো পানিতে পড়ল। হালকা ধপ শব্দে পানি ছলকে উঠল। তারা নিঃশব্দে পানির নিচে ডুব দিল। তাদের মাথার ওপর দিয়ে আলো হালকা ঝলকে উঠল, তারপর নিস্তব্ধ।

জালাল গভীর শ্বাস নিল। টাইম বোমাটা কোমর থেকে খুলল। হাত ঠান্ডায় কাঁপছে, তবুও তার ভেতরের আগুন তাকে থামতে দিচ্ছে না। সে বোমাটা পিলারের গায়ে লাগাল। বাকিদেরও মাথা নাড়িয়ে ঈশারা করলো। সবাই তাদের হাতের বোম নির্দেশিত পিলারে ফিট করলো। তখনো চারদিকে নীরবতা।

উপরে একজন পাক-সেনা চেঁচিয়ে কিছু বলল। অন্যরা সাড়া দিল। মনে হলো তারা নড়েচড়ে উঠেছে। মুহূর্তে পরিবেশের ভয় যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল।

জালাল দ্রুত টাইমার সেট করল। ২০ মিনিট। অন্যরাও তাই করলো।

“চল,” সে ইশারা করল সবাইকে। ধীরে ধীরে পাড়ের দিকে সাঁতরে গেল। বাকীরাও অনুসরণ করলো তাকে।

সাঁতরে ফেরার সময় স্রোতটা একটু বাড়ল। কাসেমকে ঠেলে দূরে নিয়ে গেল। জালাল ফিরে গিয়ে তাকে ধরে টেনে আনলো। সেই সময়ই ওপর থেকে ভেসে এল শিসের শব্দ। টহল দলের একে অন্যকে সতর্ক করার সংকেত এটা।

তারা প্রাণপণে সাঁতরে তীরে পৌঁছাল। ভেজা শরীর নিয়ে ওঠার পর পাশেই আখের বাগানে দৌড় দিল। আশেপাশে কুয়াশা, মাটির ওপর আর্দ্রতার গন্ধ। তাদের নিঃশ্বাস যেন বুক ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে।

একটু দূরেই সেই নীরবতার মাঝখানে হঠাৎই একটা গগন বিদারী শব্দ। বুম্। যেন গোটা পৃথিবীটাই ফেঁটে গেল।

সেতুর মাঝখানটা আগুনের লেলিহান শিখাটা জ্বলজ্বলে আলোয় আকাশ ছুঁয়ে উঠল। লোহার পাত, কাঠ, ইট উড়ে গেল নদীর দিকে। পাক সেনাদের চিৎকার নদীর এপার থেকেও স্পষ্ট শোনা গেল। তারপর আরেকটা বিস্ফোরণ। নদী এতটাই কেঁপে উঠল যে ঢেউ উঠে এসে দুই তীরে আছড়ে পড়ল।

আখের বাগান থেকে জালাল আর তার দল সেই আগুনের আলো দেখতে দেখতে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের চোখে সেই অদ্ভুত আলো, যেখানে গর্ব, স্বস্তি আর স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি একাকার হয়ে গেছে।

পরের সকাল। পুরো কামালপুর গ্রাম লোকজনে ভরা। কেউ আসছে, কেউ দৌড়ে খবর নিচ্ছে। “সেতু ভেঙে গেছে! পাক আর্মির দল ডেরা গুটিয়ে পালিয়ে গেছে!” বাজারেও গুঞ্জন। মুশুলি বাজার থেকে লোকেরা কামালপুর পর্যন্ত এসে বলছে, গত রাতের সেই বিস্ফোরণের পর পাক বাহিনী ভয়ে দিশেহারা।

সরকারবাড়ির সামনে বড় পুকুরের ধারে জালালের মা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখে জল, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা। গ্রামের সবাই এসে বলছে, “আপনার ছেলেরে নিয়া আমরা গর্ব করি বৌমা। এই এলাকার স্বাধীনতা আজ থাইক্যা শুরু হইলো।”

জালাল দূরে দাঁড়িয়ে সবই শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, দেশটা যেন আজ সত্যিই স্বাধীনতার কাছে চলে এসেছে। এই সেতু ধ্বংস, এটা শুধু একটি সামরিক অপারেশন নয়, এটা ছিল আপামর মানুষের সাহসের জয়।

পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে পাক বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে নান্দাইলে। মুক্তিযোদ্ধারা আরও শক্তি পায়। তাদের আস্থা বাড়ে, গেরিলা হামলা বাড়ে।

এবং অবশেষে…১৬ই ডিসেম্বর বিজয় আসে। ৯ মাস যুদ্ধের পর সত্যিই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

সেদিন কামালপুরের আকাশে আর কোন যুদ্ধের ভয় নেই, নেই বুটের শব্দ, নেই মৃতদেহের গন্ধ। আছে কেবল বিজয়ের হাসি। বাচ্চারা পুকুরপাড়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। নারী-পুরুষ সবাই চিৎকার করছে, “জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!”

মুশুলি বাজারে মানুষ আনন্দে কেঁদে ফেলেছিল। তারেরঘাট বাজারে দোকানিরা ফ্রি চা বিলাচ্ছিল। গ্রামের যুবকেরা মিষ্টি বিতরন করছিল। আর সবাই একটাই কথা বলছিল “জালাল কমান্ডারের দল না থাকলে এই অঞ্চল মুক্ত হইত না?”

জালাল তখন তাকিয়ে ছিল দক্ষিণ দিকে। তার চোখে শান্তি। সেই নদী, যে নদীর পিলারের নিচে এক অন্ধকার রাতে সে এবং তার দল মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে স্বাধীনতার আলো জ্বালিয়েছিল।

আজও কামালপুরের সরকারবাড়ির সামনে দাঁড়ালে পুকুরের জলে প্রতিফলিত হয় সেই ইতিহাস। টিনের বাড়িগুলোয় লুকিয়ে থাকে সেই রাতের গোপন কানাকানি। নরসুন্দা নদ থেকে ভেসে আসা বাতাস ফিসফিসিয়ে আজও বলে, “এই দেশ স্বাধীন করতে যারা যুদ্ধ করছে, তারাই ছিল সত্যিকারের দেশপ্রেমিক।”
সমাপ্ত

(মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জালাল এবং কাসেম ছিলেন আমার কাকা। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জালাল কাকা ঢাকা চলে আসেন। তিনি দীর্ঘদিন পুরনো ঢাকার আরমানিটোলা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অবসরের পর কাকা নিজ বাড়ি কামালপুরে চলে যান।
সেখানেই তিনি ২০২১ সালের ২১এ ডিসেম্বর মৃত্যুবরন করেন। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।)
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী অসাধারণ উপস্থাপন
মেহেদী মারুফ বেশ সুন্দরভাবে গুছিয়ে কাহিনি বর্ণনা করেছেন। যোদ্ধারা যখন টাইমবোম ফিট করে ফিরে আসছিলো, আমি মনে মনে ভাবছিলাম, তারা যেন দ্রুত ভালোভাবে পাড়ে ফিরে আসে। কোন অঘটন না ঘটে। আমরা সিনেমা দেখার সময় যেমন ফিল করি, অনেকটা সেরকম। শুভ কামনা রইলো সুমন ভাই।
অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইলো ভাইজান।
বিষণ্ন সুমন অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইলো ভাইজান।
মাহাবুব হাসান বহুদিন বাদে সামনে আপনার লেখা পেয়ে সাগ্রহে পড়তে শুরু করলাম। ঘটনার ঘনঘটা আছে, কিন্তু মন খুঁজছিল শক্তপোক্ত একটা মোচড় (ট্যুইস্ট)। "সমাপ্ত" লেখাটা পর্যন্ত সেটা না পেয়ে কিছুটা আশাহতই হয়েছিলাম। কিন্তু একদম শেষে ব্র্যাকেটের মধ্যে যখন পড়লাম এটা সত্যি ঘটনা, তাও আবার নিজের চাচার, তখন বুঝলাম এই গল্পের আসল ট্যুইস্ট এটাই!

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

মুক্তিযোদ্ধারা বুকের রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।

২৪ জানুয়ারী - ২০১১ গল্প/কবিতা: ৭৬ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "রহস্য”
কবিতার বিষয় "রহস্য”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মার্চ,২০২৬