লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৩৯

বিচারক স্কোরঃ ২.৫৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_left২১শে ফেব্রুয়ারী (ফেব্রুয়ারী ২০১২)

রক্তে রাঙ্গা লাল পলাশ
২১শে ফেব্রুয়ারী

সংখ্যা

মোট ভোট ৪২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৩৯

মিলন বনিক

comment ৩০  favorite ৩  import_contacts ১,৬৮৩
সি্নগ্ধ সকাল।
স্থান পরিবর্তনে ভালো ঘুম হয়নি অলকেশের। ব্যাচেলর সীট। সিংগেল খাট। গাদাগাদি করে দুজনকে শুতে হয়েছে। আজ নেপালের অথিতি অলকেশ। নরম বালিশটা জুটেছে অলকেশের ভাগ্যে। নেপালের মাথার নীচে এক গাঁদা বই। দু'জনে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করেছে।
নিপা। নেপালের ছোট বোন। এবার বায়না ধরেছে। একুশে ফেব্রুয়ারীতে শহীদ মিনারে নিয়ে যেতে হবে। সে একেবারে নাছোড়বান্দা।
অলকেশ জিজ্ঞাসা করল - কোথায় নিয়ে যাবি।
- তাইতো ভাবছি। তার আবদার-সে খালি পায়ে ঠিক বারোটা এক মিনিটে শহীদ মিনারে যাবে।
- ওরে বাবা, একেবারে সময়ও বেঁধে দিয়েছে দেখছি।
- ওর জেদ তো দেখিসনি। না নিয়ে গেলে কথা বলবে না। তুই তো জানিস নিপা ছাড়া আমার আর আপন বলতে আর কেউ নেই।
- ও যখন চাইছে নিয়ে যা।
- ভাবছি, কোন্ শহীদ মিনারে নিয়ে যাবো।
- তা শহরে নিয়ে আয়। শহরটাও ঘুরে গেল, শহীদ মিনারও দেখা হবে।
- তাই ভাবছি। ভাবছি আগের দিন নিয়ে আসব। রাতটা আমার সাথে রেখে একুশে ফেব্রুয়ারীর দিন দু'জনে মিলে বেড়াবো।
- তাই কর। নিপারও ভালো লাগবে।
চারপাশে কেমন একটা আঁশটে গন্ধ। ছোট ঘর। একটা খাট। শার্ট প্যান্টগুলো এলোমেলো ভাবে চারদিকে ছড়িয়ে আছে। বোটকা গন্ধটা সম্ভবতঃ মৌজার। অনেকদিন ধোয়া হয়নি।
গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছে খেয়াল নেয়।
এই মাত্র ঘুম ভেঙ্গেছে।
বাইরে এসে তিন তলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছে অলকেশ। শীতের ঝিরঝিরে হিমেল হাওয়া। পূব আকাশে সুর্যটা রক্ত আবীর ছড়িয়ে উকি ঝুকি মারছে। দুর্বা ঘাস গুলো শিশির সিক্ত। আকাশে হালকা সাদা কালো মেঘ। দূরে সবুজ বন বনানী। কুয়াশার চাঁদরে আবৃত। মেঘের আড়ালে সূর্যটার লুকোচুরি। মেঘগুলো ছুটছে। পথহারার মত এদিক ওদিক। ভালোই লাগছে।
অলকেশ ভাবল- লুকোচুরি খেলায় এ পৃথিবীটা মশগুল। মেঘগুলো খেলছে। তার আড়ালে চলছে সূর্যটার লুকোচুরি। এরি মধ্যে সূর্য তার আপন স্বকীয়তা প্রকাশ করে যাচ্ছে। মেঘের আচ্ছাদনে যেন সূর্যের অনন্ত উল্লাস।
কচি ঘাসের উপর মিষ্টি রোদের ঝিলিক। অলকেশ দেখল সূর্যটা অনেকখানি উপরে উঠে গেছে। বাসার সামনে খোলা মাঠ। চারপাশে ইউক্যলিপটাস গাছগুলো দুলছে হালকা হাওয়ায়। ঝড়ে পরছে শিশির। নীচে কচি ঘাসগুলো নড়ে উঠে। যেন নিশুতি রাতে প্রিয়ার নীরব অভিষেক হচ্ছে। ঘনিয়ে এসেছে বিদায়ের ক্ষণ। বিদায় নিতে হবে সব ক'ফোটা শিশিরকে। দিনের আলো তাদের সহ্য হয় না। পথিকের পায়ের তলায় ওরা হারিয়ে যায়।
সকালের মনোরম দৃশ্য। খুব শীত লাগছে। চাদরটা দরকার। দু'পা পিছনে গিয়ে আনতেও ইচ্ছা হচ্ছে না। সামনে ঐ রেললাইনটা চোখে পরে। সোজা দক্ষিণে চলে গেছে অনেকদূর। রেল লাইনের ধারে একটি ন্যাড়া পলাশ গাছ। পাতা বলতে কিছুই নেই। ন্যাড়া ডালগুলো ঠাঁই দাড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে। দুর থেকে শ্রীহীন এক কংকালের মতোই মনে হচ্ছে। হালকা বাতাসে ডালগুলো নড়াতে পারছে না।
চিকন ডালগুলোর ডগায় মৌচাকের মত জড়ো হয়ে আছে কালো কালো পলাশ কলি। কিঞ্চিৎ লালচে হয়ে আধফোটা ফুটে আছে কয়েকটা পলাশ। অলকেশ তন্ময় হয়ে ভাবছে বাইরের রাজ্যে এর অস্তিত্ব বুঝি মূল্যহীন। পাশের রুম থেকে বের হলেন অমর বাবু। দাঁত ব্রাশ করতে করতে বললেন-
- কি ব্যাপার? একা দাঁড়িয়ে আছেন যে। মুখ ধোবেন না ?
- ও হ্যাঁ, ধোব। একটু পরে। ঠান্ডাটা খুব বেশী তাই না ?
- শীতের শেষ তো। শেষবারের মত পরে যাচ্ছে। কিন্তু আপনার চাদর কই। খালি গেঞ্জি পরে দাড়িয়ে আছেন।
- আর দরকার হবে না। রোদ উঠে গেছে।
- কিছু ভাবছেন মনে হচ্ছে। মাজন এনে দিচ্ছি। মুখ ধুয়ে নেন।
অমর বাবু রুমে গিয়ে কালো মাজনটা এনে দিলেন। অলকেশ কিছুটা মাজন বাঁ হাতের তালুতে নিয়ে শিশিটা অমর বাবুর ঘরে রেখে আসলেন। অমর বাবু তখনও সমানে ব্রাশ করে যাচ্ছে। অলকেশ জিজ্ঞাসা করল-
- আচ্ছা দাদা, সামনের মাসটাইতো ফাল্গুন মাস। তাই না ?
অমর বাবু মুখ থেকে একগাল ধবধবে সাদা ফেনা ছুড়ে ফেলে বললেন-
- হঁ্যা। কিন্তু হঠাৎ ফাগুন মাসের কি হলো। বিয়ে সাদি নামাবেন না কি ?
- সেই সুয়োগ আর কই ?
- তাহলে।
- না এমনি বলছিলাম। আজকের সকালটা খুব ভালো লাগলো।
- কি জানি ভাই। আপনারা কবি মানুষ। কখন যে কি ভালো লাগে বুঝি না।
- আসলে তা নয়। পৃথিবীর সব সুন্দরই সবার দেখার মত। সুন্দরের কোন আবরণ থাকে না। আপনারাতো কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাই সবকিছু দেখা হয়ে উঠে না। আমরা বেকার মানুষ। সব সুন্দরের মাঝে নিজেকে হারাতে পারলে সময়টা কেটে যায়।
অমর বাবু সংসারী মানুষ। চাকরি করে। ব্যাচেলর বাসা নিয়ে থাকেন। নিজের হাতে রান্না বান্না করেন। আশে পাশে ব্যাচেলরদের সাথে থাকতে থাকতে বেকারদের কষ্টগুলো উপলব্দি করতে পারেন। মাঝে মাঝে পরামর্শ দেন। আপদে বিপদে সাধ্যমত বিশ পঞ্চাশ টাকা ধারও দেন।
অলকেশ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল-আজকের সকালটা একটু স্বতন্ত্র।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টি অমর বাবুর- কেন বলুন তো ?
- ঐ যে পলাশ গাছটা দেখছেন, কত ন্যাড়া। শ্রী হীন এক নর কংকাল যেন। অথচ কত কিছুরই জানান দিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখেও না দেখার মত এড়িয়ে যায়। এর চেয়ে লজ্জার আর কি আছে।
অলকেশ দীর্ঘশ্বাস চাপল। এত শীতেও যেন এক ধরনের উষ্ণ অনুভূতি সর্বাঙ্গে শিহরণ জাগিয়ে তুলল। বলল-
- আসলে বাংলা মাসটা আমার খেয়ালই ছিলনা। ঐ গাছটা দেখে মনে পড়লো বাংলা মাসের কথা।
ক'টা পলাশ ফুটে আছে আধফোটা হয়ে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে এক একটা শাপলা কলি। পলাশের গর্ভমুন্ডগুলো যেন এক একটা মিনার। ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভ্রোমর কালো কলি গুলো শোকে মূহ্যমান, কালো কফিনের আস্তরন ভেদ করে শোর্য বীর্য নিয়ে বেরিয়ে আসছে রক্ত লাল সূর্যের মত। কত বিচিত্র, কত ত্যাগ, কত কষ্টের এ স্মৃতির মিনারগুলো।
নেপাল অনেকদূর জগিং শেষে অনেকগুলো শিশিরের অপমৃত্য ঘটিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল-
- এখনও মুখ ধোয়া হয়নি।
- না।
পাশের রেল ষ্টেশনে ফাষ্ট ট্রেনের আগমনী হুইসেল শোনা গেল। বিকট আওয়াজ। মফস্বলের ট্রেন। যাত্রীও কম। পলাশ গাছটা আড়াল করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ট্রেনটা। ট্রেনের গতি পেছনের খড় খুটো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাতাসের ধাক্কা লাগলো পলাশ গাছটায়। গোড়া থেকে ঝরে পড়লো ক'টা আধা শুকনো পাতা। বাতাসের ছন্দে ট্রেনের পিছু ছুটতে গিয়ে দারুন ব্যর্থতায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লো, যেন মরীচিকার পেছনে ছুটতে নারাজ।
অমর বাবু কি যেন ভাবছিলেন, আবার মনে করিয়ে দিলেন মুখ ধোয়ার কথা। নীচে ক'জন খোকা খুকুর পদধ্বনি শোনা গেল। তারা ফুল কুড়াতে ব্যস্ত। নানা রঙ্গের ফুল।
অলকেশ ভাবল সকালের রূপটা যদি একবার ওদের দেখানো যেত। দ্রুত নীচে নেমে এল অলকেশ। সোনামণিদের একজন রূপা।
- রূপা শোন। অলকেশ রূপাকে কাছে ডাকল।
- রূপা কাছে আসে। অলকেশ রূপার কাঁধে হাত রেখে বলল-
- ঐ দ্যাখো ন্যাড়া পলাশ গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। দ্যাখেছো ?
- হ্যাঁ। কিন্তু কি হয়েছে ? রূপার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি। অন্যরাও রূপার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
- ঐ ন্যাড়া পলাশ গাছটা কেন ওভাবে আজো দাঁড়িয়ে আছে জানো ?
- না।
- ঐ ন্যাড়া পলাশ গাছটা কি বলছে জানো ?
- না।
- কিসের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে জানো ?
- না।
একজন একটু মুখ টিপে হাসল। ওরা কিছুই জানে না। রূপার কৌতুহল হয়। প্লিজ আংকেল বলুন না কি হয়েছে ঐ পলাশ গাছটার।
অলকেশ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- আমিও জানি না রূপা। তবে আমার মনে হচ্ছে এটা ফাগুন মাস। আর ফাগুন মাস আসলেই থোকা থোকা রক্ত রাঙ্গা লাল পলাশ ফোটে। আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভাষা শহীদদের। আমার কাছে মনে হচ্ছে প্রতিটা রক্ত পলাশের গর্ভমুন্ডগুলো অসীম উজ্জলতায় মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা এক একটা স্মৃতিসৌধ। এ মাসে আমরা তাদের স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়।

দুই,

নিপা এসেছে। বাসায় একটা উৎসবের আমেজ। কিন্তু বাসার পরিবেশটা নিপার মোটেও ভালো লাগছে না। নেপালের দিকে কেমন খটমট করে তাকাচ্ছে। চারপাশে জুতা মৌজার বোটকা গন্ধ। জিনিস পত্র সব এলোমেলো। এক কোণায় রান্নার হিটার বসানো। চারপাশে ডাল, লবন, মরিচের গুড়া, হলুদের গুড়া। এরকম অগোছালো সংসার নিপা কখনও দেখেনি।
চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে নিপা। এ নিয়ে দ্বীতিয় বার শহরে আসা। বিস্মিত হয়ে একবার দাদাকে জিজ্ঞাসা করেছে এভাবে তুমি কি করে থাকো দাদা।

নেপাল মাথা নেড়ে বলল- থাকতে হয় রে। এছাড়া কোন উপায় নেই। তাছাড়া এতকিছু ঘুছিয়ে রাখার সময় কই? এর মধ্যে অলকেশ এসে পরেছে। নেপাল বলে রেখেছিল অলকেশ আসলেই বিকালে শিশু পার্কে নিয়ে যাবে। সেই আনন্দে নিপা বড় খুশি। অলকেশ ত্ড়াহুড়ো করে জিজ্ঞাসা করল-
- কিরে তোরা সব তৈরী তো। নিপাকে কাছে ডেকে বলল- তুই কেমন আছিস বোন?
- ভালো দাদা, তুমি কেমন ?
- আমিও ভালো রে। তা আজ রাতে শহীদ মিনারে যাচ্ছিস তো ?
- সে কি দাদা! শহীদ মিনারে যাওয়ার জন্যেই তো এসেছি।
- সে তো জানি। তা না হলে তো দাদার সাথে কথাই বলতিস না। কই নেপাল তোর হলো।
- নেপাল বাথরূম থেকে বের হয়ে বলল-আর বলিস না, নিপুটা এমন সব বায়না ধরে না--- নেপালের কথা শেষ না হতেই নিপা ফোঁস করে উঠে বলল-
- দাদা, আমাকে রাগাবে না বলে দিচ্ছি, আমি ছাড়া তোমার কাছে আর কে বায়না ধরবে শুনি, বৌদি আনলে তো তাও পারব না।
- সে কিরে ? তুই তো দেখছি পাকা বুড়ি হয়েছিস। বৌদি আসলে তুই বুঝি পর হয়ে যাবি ?
- না ঠিক তা বলছি না, তবে একটু দুরত্বতো বাড়বেই।
- তার মানে ততদিন তুই বড় হয়ে যাবি আর তোর জন্য পাত্র খুঁজতে হবে, এইতো তোর মতলব তাই না ?
এবার ঠিকই লজ্জা পেয়েছে নিপা। অলকেশ বুঝতে পেরে বলল হয়েছে হয়েছে। পাত্র পাত্রী খোঁজার দায়িত্ব আমার। এবার তাড়াতাড়ি বের হ, তা না হলে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
এর আগে নিপা কখনও শিশু পার্কে আসেনি। চারপাশে অনেক লোকজন। ছেলেমেয়েদের হৈ চৈ, লাফালাফি, দৌড়াদৌড়ি। নিপা অবাক হয়ে দেখছে। খেলনা গুলোও চমৎকার। ঝুলন্ত দোলনা গুলোতে উঠলে গোটা শহরটা দেখা যাবে। নেপাল উঠতে বলছিল। নিপা উঠেনি। ভয় করছে। তিনজনে মিলে স্পীড বোটে চড়েছে। তাতে নিপা খুব খুশি। বর্ষাকালে গ্রামের বাড়ীতে নৌকা চড়া হয়েছে। তাই ভয়টাও কম।
ফিরে আসার সময় এদিক ওদিক বার বার তাকাচ্ছিল নিপা। কোথাও কোন ফুলের দোকান চোখে পড়ে কিনা। দেখলে দাদাকে বলত কিছু ফুল কিনে দেওয়ার জন্য। না চোখে পরছে না। বিষন্ন মনে বাসায় ফিরেছে নিপা। ভাবছে বুঝি শহীদ মিনারে আর ফুল দেওয়া হবেনা। তাছাড়া বাড়ী থেকে আসার সময় মন্দিরের পুকুর পাড়ের পলাশ গাছ থেকে ক'টা পলাশ কুড়িয়ে এনেছে। শুধু কয়েকটা ছিন্ন পলাশ শহীদ মিনারে দিতে কেমন কষ্ট হচ্ছে। সাথে আর কিছু ফুল হলে ভালো হতো। পলাশ ফুলের কথাটা নিপা মনের মধ্যে চেপে রেখেছে। দাদাকেও জানায়নি। ভাবছে নিতান্ত অন্য ফুল পাওয়া না গেলে পলাশ ফুলটা দিয়েই শ্রদ্ধা জানিয়ে আসবে। এই সান্তনা।
নিপার তর সইছে না। কাল ২১শে ফেব্রয়ারী। আজ রাত ঠিক বারটা এক মিনিটে শহীদ মিনারে যাবে নিপা। আবার ভয়ও করছে। এত রাতে শহরে কখনও বেড়াতে বের হয়নি। আজ খালি পায়ে শহীদ মিনারে যাবে নিপা। অলকেশ আগেই বলে রেখেছে ঠিক এগারোটায় বের হতে হবে। দেরী হবে দেখে বার বার তাগাদা দিচ্ছে নিপা। তাড়া তাড়ি করো দাদা, নয়তো ঠিক সময়ে পেঁৗছানো যাবে না। নিপার ইচ্ছা আরও আগে বের হলে যদি ফুলের দোকানটা পাওয়া যায়।
দাদা আলু দিয়ে ডিম রান্না করছে। আলু আর ডিমের খোসা ছাড়িয়ে দিয়েছে নিপা। বলেছে বেশী কিছু রান্নার দরকার নেই। মনে মনে নেপাল ভাবছে এর চেয়ে বেশী কিছু ব্যাচেলররা জানেনারে। এক বারের রান্না করা ডাল আর প্রতি বেলায় একটা ডিম দিয়ে কমপক্ষে এক সপ্তাহ চালিয়ে দেওয়া যায়। শুধু প্রতি বেলায় একটু পানি দিয়ে ডাল গরম করে ডিমটা ভেঙ্গে দিলেই হলো।
খেতে বসে নেপাল জিজ্ঞাসা করেছে- রান্না কেমন হয়েছে রে নিপু।
ভালো হয়েছে। নিপার বেশী কথা বলার সময় নেই। রাত দশটা বাজে।
খাওয়ার পর্ব শেষ। সবাই বেরুচ্ছে, এমন সময় নিপা বলল-তোমরা জুতা পরেছ কেন? আমি কিন্তু জুতা পরব না।
- কিন্তু খালি পায়ে এতদূর যাবি কিভাবে ? শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার সময় জুতাটা বাইরে খুলে রাখিস। এখন জুতা পরে নে। বলল নেপাল।
- কিচ্ছু হবেনা দাদা, আমি খালি পায়ে হাটঁতে পারব।
- বলছি তো পারবি না। এটা শহর গ্রামে হলে বলতাম না।
- নিপার একটাই জেদ। জুতা পরবে না, খালি পায়ে শহীদ মিনারে যাবে। বলল-আমি খালি পায়ে যাবো।
- বেশ তো, ও যখন চাইছে খালি পায়ে যাক। অলকেশ নিপার হাত ধরে বলল-চল।
বাসা থেকে শহীদ মিনার। দুরত্বও কম নয়। একটা রিঙ্ায় তিনজন চেপে বসেছে। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে মাইকের শব্দ। গান বাজছে "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী"।
রিঙ্া চলছে। চারপাশে তাকিয়ে দেখছে নিপা। কাউকে কিছু বলছে না। ডিসি হিলের কাছাকাছি যেতে ফুলের দোকান চোখে পড়ল। সাথে সাথে দাদাকে বলল রিঙ্া থামাতে। নেপাল জিজ্ঞাসা করল-
- কেন কি হয়েছে ?
- ঐ তো ফুলের দোকান। আমার কাছে জমানো পাঁচ টাকা আছে। আমাকে কিছু ফুল কিনে দাও।
- সে কি রে, তোর পাঁচ টাকা আছে মানে। আমি কি তোর জন্য ফুল কিনবনা ভেবেছিস ?
- পাঁচ টাকায় তো হবে না। বাকীটা তোমার পকেট থেকে দাও।
- ধার চাইছিস বুঝি।
- হ্যাঁ, পরে শোধ করে দেবো। এখন চল তো ফুল নিয়ে আসি।
- ঠিক আছে বাবা তাই যাচ্ছি, তুই অলকেশের সাথে বস, আমি ফুল নিয়ে আসছি।
- না দাদা, আমিও তোমার সাথে যাবো।
নিপা কোমর থেকে পলাশ ফুলগুলো বের করে বলল এ দেখ আমি বাড়ী থেকে এ কয়টা পলাশ কুড়িয়ে এনেছি। অলকেশ আবেগে একবার নিপাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু দিল, আর মনে মনে আশীবর্্বাদ করল তুই অনেক বড় হ বোন, অনেক বড় হ। নেপাল ছোট বোনের আবদারগুলো যথাসাধ্য পূরণ করার চেষ্টা করে। তারপরও একবার বলল-খালি পায়ে তোর না গেলে নয়, আমি নিয়ে আাসি।
- না, আমিও যাবো। নিপার সেই এক কথা।
- অলকেশ বলল- ঠিক আছে তোরা ফুল নিয়ে আয়। আমি বসছি।
নিপা খুশী মনে নেপালের হাত ধরে ফুল কিনতে যায়।
চার দিক থেকে খন্ড খন্ড মিছিল শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শ্লোগান দিচ্ছে শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা। আরও নানা শ্লোগান। অলকেশের শুনতে ভালোই লাগছে। পাশাপাশি একটা ভয়ও তাড়া করছে। ইদানীং মিছিল মিটিং-এ রাজনৈতিক সহিংসতা বেশী করে ঘটছে। এক দল অন্য দলের বিরুদ্ধে পাল্টা পাল্টি শ্লোগান দেয়। মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার পর শুরু হয় মারামারি। তারপর লাঠি, পুলিশ, টিয়ার গ্যাস। অতঃপর কিছু নিরীহ মানুষের মৃত্য। ভাবতেও কেমন যেন গা শিউড়ে উঠছে। শহরের যানজট, ব্যস্ত সড়ক। একটু ফাঁকা রাস্তা পেলেই গাড়ীগুলো বেপরোয়া গতিতে চলতে শুরু করে। অলকেশ রিঙ্াটা একটু সামনে নিয়ে রাস্তার একপাশে দাড় করায়।
দোকানে ঢুকেই নিপা অবাক হয়ে দেখছে। কত রকমের ফুল। অনেক লোক ফুল কিনছে। তোড়া বানিয়ে নিচ্ছে শহীদ মিনারে পুষপস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। একদল লোক অনেক বড় একটা তোড়া বানিয়ে নিচ্ছে। অনেক টাকা। নিপার ইচ্ছে এরকম একটা তোড়া বানাতে পারলে ভালো হতো।
নেপাল তাড়া দিচ্ছে। নিপু এবার তোর কি ফুল লাগবে নিয়ে নে।
নিপা দুটো গোলাপ আর দুটো রজনীগন্ধা কিনেছে। টেপ দিয়ে তোড়া বেঁধে নিপার হাতে দিয়েছে দোকানদার। নিপা খুব খুশী। পলাশ ফুলগুলো তোড়ার সাথে হাতে নিয়ে দাদাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল-দাদা আমার খুব ভালো লাগছে। তাড়াতাড়ি চলো। অলকেশ দা অপেক্ষা করছে।
হ্যাঁ চল্। দু'হাতে ফুলগুলো যত্ন করে ধরে রেখেছে, যাতে কুচকে না যায়। রক্ত লাল পলাশের পাপড়িগুলো কালচে হয়ে গেছে। আগে পা বাড়িয়েছে নেপাল। এখন রাস্তাটা অনেক ফাঁকা। পিছু পিছু খালি পায়ে হাঁটছে নিপা।
ফুটপাত থেকে পা ফেলতেই একটা কলার খোসায় পা ফসকে গেল নিপার। উপুর হয়ে পড়ে গেল রাস্তার উপর। দাদা বলে চিৎকার করে উঠতে-ই দ্রুতগামী একটা প্রাইভেট কার নিপার দেহটাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিল।
রক্তে রাঙা লাল পলাশের পাপড়িগুলো রাস্তায় ছিটকে পড়ল। নেপাল নির্বাক তাকিয়ে আছে। হৈ চৈ উঠতেই অলকেশ এসে নেপালের কাঁধে হাত রাখল। লম্বা একটা মিছিল এসে থমকে দাড়াল। অনেক লোক জড়ো হয়েছে। নিপার নিথর দেহটা কোলে নিয়ে বসে আছে নেপাল। ফুলের বিচ্ছিন্ন কয়েকটা পাঁপড়ি কুড়িয়ে নিল অলকেশ। পাপড়িগুলো নিপার দেহের উপরে ছিটিয়ে দিল।
নেপাল আর্তস্বরে সবাইকে অনুরোধ করল-আমাদের একটু শহীদ মিনারে নিয়ে যাবে ?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement