পার্থিব জীবনের চাওয়া পাওয়া নীতি-নৈতিকতা নিয়ে মানুষেরই জীবনের এই গল্প “জীবনবিলাস”
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - পার্থিব (আগস্ট ২০১৮)

জীবনবিলাস
পার্থিব

সংখ্যা

মোট ভোট ১৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৩

মিলন বনিক

comment ১৫  favorite ১  import_contacts ৩৬৭
নার্গিসকে আজ অন্যরকম লাগছে।
সাজঘরে চন্দনকাঠের বিশাল ফ্রেমের আয়না। তাতে বার বার নিজের চেহারা দেখছে। ঘুরে ফিরে। ডানে বামে। সামনে পেছনে। নিজেকে দেখছে নার্গিস। ধীরে ধীরে যৌবন হারাচ্ছে। তাও বুঝতে পারছে। নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। চোখের নিচে কালি পড়েছে। সুন্দর মুখের আদলটা দিন দিন ফ্যাকাসে হচ্ছে। শরীরের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে। বয়স যাই হোক। আরও কত কাজ বাকি। ইচ্ছে আর চাওয়া পাওয়ার তো শেষ নেই। আর মাত্র একটা সিড়ি। যৌবনটাকে ধরে রাখতে পারলে জীবন বিলাসের স্বপ্নটা পূর্ণতা পেতো।

প্রসাধনি যতই ব্যবহার করুক, নিজের শরীরের ভেতরের রহস্য তো আর নিজে অস্বীকার করতে পারে না। সুরম্য সাজঘর। হাজারো রকমের দেশী বিদেশী প্রসাধনী। রুপচর্চার জন্য একজন অভিজ্ঞ বিউটিশিয়ান সারাক্ষণ নিয়োজিত আছে। ইমরান সাহেব বলেছেন, প্লটটা হয়ে গেলে দু’জন করে দেবেন। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির সাথে মনের পরিপূর্ণতা না থাকলে স্বাস্থ্যহানি হতেই পারে। বার্ধক্য উঁকি দিতেই পারে। মনের সাথে যুদ্ধ করে কি যৌবন ধরে রাখা যায়?

নার্গিসের ভাগ্যটাও ভালো। নার্গিসকে দিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরাচ্ছেন ইমরান। নার্গিসের ওপর নির্ভর করে ইমরান সাহেব একের পর এক সিড়ি টপকাচ্ছেন। এটা বোকামি নয়, বরং দূরদর্শী চিন্তার ফসল। স্বপ্ন চূড়ায় পৌঁছানোর সিঁড়ি। নার্গিস ইমরান সাহেবের বউ হয়ে ঢাকায় এলো। তারপর থেকে কপালটাও খুলতে শুরু করলো ধীরে ধীরে।

এতসব একদিনে হয়নি। ইমরান সাহেবকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। তিল তিল করে তৈরি করে নিতে হয়েছে নার্গিসকে। আজকের নার্গিসকে এভাবে তৈরি করা যেতো না, যদি না উপরওয়ালা নার্গিসকে এত সুন্দর করে সৃষ্টি না করতেন। সৃষ্টিকর্তা নার্গিসের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজ হাতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গড়েছেন। পৃথিবীর সমস্ত রুপ-গুণ, কথা বলার ভঙ্গি, চাল চলন সবকিছু একবারে উজাড় করে দিয়েছেন। বিধাতা নিজের হাতে কিছুই রাখেন নি। এমন রূপ নিয়ে জন্মালে পায়ে পায়ে বিপদ। পদে পদে নিজেকে সামলে রাখতে হয়। ছোটবেলা থেকে কতরকমের অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে। কত প্রতিকুল অবস্থার মধ্য দিয়ে উঠে আসতে হয়েছে। কত কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। অনেক সময় সব বুঝেও, না বোঝার মতো মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে।

ঢাকায় এসে নার্গিস বুঝতে পারছে, এসব কিছুই সহ্য করতে হয়েছে একমাত্র তার রূপের কারণে। এখনও মুক্তি মেলেনি। তার রূপের কদর এখনও ফুরিয়ে যায়নি। সভ্য সমাজে নার্গিসের চাহিদা এখনও আছে। তার চোখের ইশারায় ফাইলগুলো ছুটে চলে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে। জীবনের বোঝাটা ভারি হলে একটা মুক্ত জীবনের স্বপ্ন দেখে নার্গিস। মুক্তির স্বপ্ন পোষণ করা মানে মুক্তি নয়। যে বাজারে জীবনটা হচ্ছে দোকান আর যৌবনটা হচ্ছে পুঁজি। পুঁজি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই বাজার থেকে বেরিয়ে আসাও সম্ভব নয়। নিয়মিত সওদা চলে। নার্গিসের কদর আছে বলেই ইমরান সাহেব দিনের পর দিন ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হচ্ছেন। একের পর এক সিড়ি টপকাচ্ছেন।

নার্গিসের বাবা নবী মুন্সি চাষাভূষা মানুষ। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। এমন রূপবতী মেয়েকে সারাক্ষন চোখে চোখে রাখতে হয়। দশ বারো বছরে পা দিতে না দিতেই মুদি দোকারদার, চা দোকানদার থেকে শুরু করে অনেকেই এসেছে। শেষবার যে এলো, সে স্থানীয় মসজিদের ইমাম। বয়সটাও বেশি। কোন যৌতুক লাগবে না। তার কারণ, কয়দিন আগে এক সেবা সংস্থার কার্যক্রমের সাথে এলাকায় যৌতুকবিরোধী সমাবেশ করেছিল। তাতে এলাকার মা বোনদের সাথে নার্গিসও ছিল। সেই সমাবেশে প্রধান আলোচক ছিলেন ইমাম সাহেব। যৌতুকের কারনে প্রথম স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা হয়েছেন। সেটাকে জায়েজ করার জন্য ইমাম সাহেব নিজেকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। দরিদ্র পরিবারের নার্গিসকে যৌতুক বিহীন শাদী করার প্রস্তাব পাঠালেন। তাতে নবী মুন্সি কিছুটা সম্মতি দিলেও নার্গিসের মা একেবারে বেঁকে বসলেন।
তার কিছুদিন পর গ্রামে এসে শেষ দানটা মারলেন ইমরান। নানারকম ঘটনা রটনার মধ্য থেকে নার্গিসকে উদ্ধার করলেন। রতনে রতন চিনে, স্যাঁকরা চিনে সোনা। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে জীবন বিলাসী ইমরান নার্গিসকে চিনতে এতটুকু ভূল করেননি। সাহেব খেতাবটা জুটেছে নার্গিসকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার অনেক পর।

নার্গিসকে পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা ছিল ইমরান ঢাকায় চাকরি করে। তাও যেন তেন চাকরি নয়, সরকারি চাকরি। নবী মুন্সির পক্ষে এমন সুযোগ হাতছাড়া করার কোনো মানে হয় না। ছেলেকে অপছন্দ করার একটাই যুক্তি, ছেলের বয়সটা একটু বেশি। তাতে কী? ছেলে মানুষের আবার বয়স! ঢাকা শহরে সরকারি চাকরি! এ কি সহজ কথা! ইমরান বলেছে, বউ নিয়ে ঢাকায় থাকবে।

ইমরান গর্বের সাথে বলে, জীবনে বিয়েটা মুখ্য নয়। সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারাটায় বড় কথা। ইমরানের বয়ান থেকে সেটাই স্পষ্ট। আই, এ পাশ করেছি। খেয়ে না খেয়ে ঢাকা শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি। কুলিগিরি করেছি। চা দোকানে চাকরি করেছি। শেষে এক আবাসিক হোটেলে বেয়ারার কাজ নিলাম। সেখানে আলম সাহেবের সাথে পরিচয়। হোটেলের নিয়মিত আসতেন। হাতও বেশ লম্বা। সরকারি অফিসের কর্তাব্যাক্তিদের সাথে সারাক্ষণ উঠাবসা। বন্ধু-বান্ধবী আসতো। আবার চলে যেতো। ফাইফরমায়েস খাটতাম। তোষামোদ করতাম, ভালো কিছু পাবার আশায়। একদিন এই আলম সাহেবই উপরে উঠার সিড়ি বাতলে দিয়ে বললেন,
- বুঝলি, উপরে উঠতে গেলে অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহোদয়ের তৈল সমাচারটা যথাযতভাবে কাজে লাগাতে হয়।
- স্যার কীভাবে?
- লেগে থাকতে হবে। নিয়মে-অনিয়মে অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হয়।
- স্যার গেরাম থেইকা আইছি। কষ্ট করছি। কূল কিনারা পাইতেছি না। আপনে একটা ব্যবস্থা কইরা দেন স্যার।
- মানিয়ে নিতে পারলে উপরে ওঠা কঠিন কিছু নয়।
- স্যার, কসম কইরা কইতাছি, আপনে যা কইবেন তাই করুম। শুধু একটা পিয়নের চাকরি হইলেও ব্যবস্থা কইরা দেন।
ইমরান, আলম সাহেবের পা জড়িয়ে ধরলো। আলম সাহেব মুচকি হেসে বললেন-
- দেখি কি করা যায়।
- স্যার, আপনে শুধু একটা কাজ দেন, দেহেন আমি আপনের জন্য কি করতে পারি।
আলম সাহেবের বন্ধু-বান্ধবীদের দিকে বিনয়ের ভঙ্গিতে তাকায় ইমরান। যেন সবাই দয়া করেন। তারপর ব্যাগগুলো হাতে কাঁধে করে গাড়িতে তুলে দিত ইমরান। কিছু উপরি পাওনা জুটতো। ইমরান জিজ্ঞাসা করতে চাইতো, এরা কারা? কখনও সাহস হয়নি। সাহেব যদি কিছু মনে করেন।

আলম সাহেব হোটেলে আসলে, ইমরানের হাতে দু’চারশ টাকা বকশিস দিতেন। ইমরান খুশি হতো। সবকিছু বুঝেও, ইমরান মানিয়ে নিতো। চাকরিটা ভালোই চলছিল। বাড়তি আয় রোজগারও ছিলো। সাহেব কখন আসবেন সেই অপেক্ষায় থাকতো ইমরান। একদিন ইমরানের হাতে পাঁচশ টাকা দিয়ে বললো, দু’প্যাকেট ডটেড সেনসেশন নিয়ে আয়। ইমরান প্যাকেটসহ বাকি টাকা ফেরত দিতেই বললো, রেখে দে।

অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে হোটেলটাকে সিলগালা করে দিলো পুলিশ। ভাগ্যিস আলম সাহেব ছিলেন না। কতগুলো লোককে ধরে নিয়ে গেল। সাথে ম্যানেজার। ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল মালিক রফিকউদ্দিন। হোটেলের চাকরিটাও গেলো। তাতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। হাতে বেশকিছু টাকা পয়সা ছিল। আলম সাহেবের সাথে দেখা করলো ইমরান।

আলম সাহেব করিৎকর্মা লোক। সাহেবকে অনেক তোষামোদ করলো। ক’মাস বাসায় থেকে ফায়ফরমায়েশ খাটলো। ঘর মোছা থেকে কাপড় ধোয়া সব। তাতে লজ্জ¦ার কিছু নেই। উপরে উঠতে গেলে সবকিছু মানিয়ে চলতে হবে। এটাই ইমরানের জীবনে বড় শিক্ষা। লেগে থাকার কারণে, সরকারি অফিসে পিয়নের চাকরিটাও হয়ে গেলো। তার জন্য কম কষ্ট করতে হয়নি। অফিসের বড়কর্তা সেলিম সাহেবকে বলে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। হাজার পঞ্চাশেক টাকা দিয়ে সেলিম সাহেবের স্ত্রীর জন্য উপহার কিনে দিতে হয়েছে।

আলম সাহেব ষ্পষ্ট বলে দিয়েছেন, এসবে কিছু খরচ লাগে। আমি তা দেয়নি। শুধু হাজার পঞ্চাশেক দিয়ে সেলিম সাহেবের বউকে কিছু কিনে দিয়েছি। তাতেই কাজটা হয়ে গেলো। অন্য কেউ হলে দু’লাখের উপরে ছাড়া কথাও বলতো না।

ইমরান যেদিন নার্গিসকে দেখেছে, সেদিনই মনে মনে ছক তৈরি করে রেখেছে। সুদুরপ্রসারি লক্ষ্য ছিলো ইমরানের। ইমরান ধরে নিয়েছিলো, নার্গিসই হবে তার ভাগ্যলক্ষ্মী। নার্গিসের হাত ধরেই তাকে উপরে উঠতে হবে। নার্গিসের মধ্যে ইমরান সেই আলো দেখতে পেয়েছে। ইমরান তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছে। অজপাড়াগাঁয়ে বেড়ে উঠা স্বল্পশিক্ষিত ইমরান জীবনে সুখের চাবি-কাঠির সন্ধান পেয়েছে। খেয়ে না খেয়ে বাবা আরজ আলীর সাথে ক্ষেত-খামারে কাজ করে মেট্রিক পাশ করেছে। থার্ড ডিভিশন। তাতে কী? পাশ তো হলো। আরজ আলীর কোনো আক্ষেপ নেই। গরিবের আবার লেখাপড়া।

সুখ নিলয়-এর পাঁচতলা ভবনের ব্যালখনিতে দাড়িয়ে আছেন ইমরান সাহেব। ভাবছেন পাশের প্লটটা খালি পড়ে আছে। শরীফ সাহেবকে কোনভাবে বশ করতে পারলে কাজটা হয়ে যাবে। সরকারি প্লট। তার হাতে সবকিছু। শরীফ সাহেবের সুপারিশটা পেলে স্বপ্নটা পূরণ হবে। স্বপ্ন দেখেন নিজের একটা পাঁচতলা বিল্ডিং। এখনই নিজের গাড়ি আছে। গাড়িটা সেকেলে। গাড়িটা বদলানো দরকার। আছে দুটো ফ্ল্যাট। নামে বেনামে ঢাকা শহরে কিছু জায়গা জমিও আছে। গ্রামের বাড়িতে বেশ কিছু ধানি জমিও কেনা হয়েছে।

নার্গিস গ্রামের বাড়ি ছেড়ে কখনও নিজ জেলা শহরেও যায়নি। যেদিন ইমরানের সাথে প্রথম ঢাকা শহরে এলো সেদিন নার্গিসের কাছে শহরটাকে পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ বলেই মনে হয়েছিলো। চারিদিকে এতো আলোর ঝলক, বড় বড় দালানকোঠা, সবকিছুই বড় অচেনা। এত চাকচিক্য জীবনে কোনোদিন দেখেনি। শহুরে রাস্তায় অনব্যস্ত নার্গিসকে দেখে কয়েকজন পথচারি আড়চোখে দেখছিলো। কী দেখছিলো তা তারাই জানে। অনব্যস্ত নার্গিসের, পথচলা না কি তার সৌন্দর্য? তারা কী মনে করেছিলো, শহরের চাকচিক্যের চাইতে তার রূপের দ্যেতনা অনেক বেশি? নার্গিসের রূপের কাছে তাদের শহুরে সৌন্দর্য ম্লান মনে হচ্ছিলো কি?


এই প্রথম নার্গিস ঢাকা এলো। একটা চিপা গলির ভিতর তিনতলা বিল্ডিং-এর এককোণায় দু’কামড়ার একটা ঘরে উঠলো। ঘরটা বেশ গুছানো। মাঝে মধ্যে আলম সাহেব আসেন। কখনও রাত কাটিয়ে সকালে চলে যান। সাথে স্ত্রী হিসেবে কেউ একজন থাকেন। ইমরান সেটাও বেশ মানিয়ে নিয়েছে। আলম সাহেবের এই শিক্ষাটা ইমরান কখনও ভুলবে না। নার্গিস ঢাকা শহরের কোনো বাসায় এই প্রথম পা রাখলো। পুলকিত হয়ে ওঠে তার মন। গ্রামের সহজ সরল নারী। ভাবে, এটাই তার বেহেশত। স্বামীর ঘর। এ ঘরেই তার সব স্বপ্ন। এই ঢাকা শহরেই তাকে সবকিছু মেনে নিয়ে চলতে হবে। ভয় শুধু একটাই, গ্রামে বেড়ে উঠা গরিব ঘরের নার্গিস এই ঢাকা শহরের সবকিছু মানিয়ে নিতে পারবে তো? এর চেয়ে খুব বেশি কিছু সে জীবনে আশাও করেনি।

কাপড় পাল্টানোর আগেই দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো। এই হেঁসেলটাই যেন সংসার ধরে রাখার অন্যতম মাধ্যম। হাড়ি-পাতিল সবই ঠিক আছে। ইমরানের প্রতি একধরনের প্রচ্ছন্ন গভীর ভালোবাসা অনুভব করলো। ইমরানের দায়িত্ববোধ দেখে মুগ্ধ হলো নার্গিস। বাসায় বৌ আনার আগে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে। নার্গিসকে বাড়তি কিছু নিয়ে কখনও চিন্তা করতে হয়নি। নার্গিসের একটাই ভাবনা, এই ঢাকা শহরে ইমরানের মতো করে নিজেকে গড়ে নিতে হবে। স্বামী হিসেবে ইমরানকে সে যতটুকু ভেবেছিলো তারচেয়েও বেশিকিছু।

রাতে নার্গিসের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ইমরান। চুলে আলতো হাতে বিলি কাটছে নার্গিস। বিয়ের একমাসের মাথায় ঢাকায় এসে তার সবকিছু নতুন মনে হচ্ছে। ইমরান তার জীবনের গল্প শোনাতে চায় নার্গিসকে। শোনাতে চায় তার বেড়ে উঠার গল্প। শোনাতে চায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। ঢাকা শহরে নিজের একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখে ইমরান। ইমরান এই বয়সে যেটুকু এগিয়েছে তাও নার্গিসের কাছে স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছে। নার্গিস পরিপূর্ণ সান্ত¦না দিয়ে বলেছে,
- আর বেশি কী চাই? এটুকুই যথেষ্ট। এখন একটা ছেলে মেয়ে হলে আমাদের দিনটা সুখেই কেটে যাবে। কোনো দুঃখ থাকবে না।
- এখন ছেলে মেয়ের কথা ভাবতে হবে না। ইমরানের দৃঢ় জবাব।
- সে কী? প্রত্যেক মেয়েরাই আশা করে একটা সুন্দর ফুটফুটে সন্তান। তুমি তো সারাদিন অফিসে থাকবে। আমার সময়টা কাটবে কী করে?
- সে কেটে যাবে। ক’টা দিন দেখো। নিজেদের একটা বাড়ি না হলে ছেলেমেয়েদের কী দিয়ে যাবো। তাদের জন্য একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তো দরকার। একমাত্র তুমিই পারো, আমাদের এই স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে।
- কী করে বুঝলে?
- বুঝেছি, বুঝেছি। জহুরী যেমন জহর চেনে, তেমনি আমিও তোমাকে চিনেছি। আমার হিসাবে ভূল হয় না।
- এতটা নিশ্চিত হলে কী করে? আমি গ্রামের মানুষ, গাঁয়ের ধুলো কাদা মেখে বড় হয়েছি। এই ঢাকা শহর আমার কাছে কেমন আজব লাগছে।
- কোনো ভয় নেই। আমি তো আছি। আমিই তোমাকে তৈরি করে নেবো। আস্তে আস্তে সব মানিয়ে নিতে পারবে।

পরবর্তীতে নার্গিস অনেককিছুই মানিয়ে নিতে পেরেছে। সময়ের সাথে নিজের প্রয়োজনটাকে যথার্থ সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে। তবে কোনোকিছুই মনে নিতে পারেনি। হোক না সবকিছু ইমরানের ইচ্ছায়। এছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিলো না। এই ঢাকা শহরে নার্গিসের আপন বলতে আর কেউ ছিলো না। এমনকি ইমরানের প্রতি প্রচ- ঘৃণা স্বত্তেও কখনও ইমরানকে ছেড়ে যাবার কথাও ভাবতে পারেনি। কেননা ইমরানের কারণেই আজ সে ঢাকা শহরের নার্গিস বেগম হতে পেরেছে। যে ধরণের বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত নার্গিস, এভাবে হয়তো জীবনকে পাল্টাতে চায়নি। চেয়েছিলো স্বামী ইমরানকে ভালোবেসে একটা সুন্দর জীবন। সে জীবনে জীবনের প্রয়োজনে যেটুকু অর্থ-বিত্ত দরকার সেটুকু হয়তো থাকবে। থাকবে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, হাসি-আনন্দ, আশা-ভালোবাসা, মান-অভিমান। সব মিলিয়ে একটি পরিপূর্ণ জীবন।

যখন নার্গিসের এজীবন থেকে পালানোর সুযোগ হলো, তখন সে নিজেই আর পালাতে চাইছে না। যে গলিতে, যে সমাজে নার্গিস পা রেখেছে সেখান থেকে ইচ্ছে করলেও বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ এখন নার্গিস ইচ্ছে করলেই লাল পাসপোর্ট নিয়ে যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো দেশে ঘুরে বেড়াতে পারে। ইমরানের ইচ্ছা অনিচ্ছা কিছুই যায় আসে না। নার্গিসের জীবনে ইমরান এখন একটি সাইনবোর্ড। উচ্চাবিলাসি ইমরানের ইচ্ছা পূরণ করাটাই নার্গিসের কাজ। শুধু ইমরানের ইচ্ছাই নয়, আরো অনেকের অনেক রকমের ইচ্ছা, আবদার নার্গিসকে পূরণ করতে হয়।

ইমরানের লক্ষ্য সুখ নিলয়ের পাশের পাঁচ কাঠার প্লট। সরকারি প্লট বলে কথা। ইমরান স্বপ্ন দেখে বাংলো টাইপের একখানা বাড়ি। সামনে বিশাল পার্কিং। অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকবে ফুলের বাগান। বাগানে থাকবে নানান জাতের ফুল। নিজস্ব একটা প্লট। মনের মত একটা বাড়ি। বাড়িটার নাম রাখবে জীবন বিলাস। সেই স্বপ্নটার কথা ইমরানও অনেকদিন ধওে বলে আসছে নার্গিসকে। তারা দু’জনেই জানে সেই জীবন বিলাসের সিড়িটা কিভাবে ডিঙাতে হবে।

একটা কালো মার্সিডিস এসে থামে গেইটের সামনে। গাড়িতে অপেক্ষা করছেন সেলিম সাহেব। নার্গিস পাঁচতলা থেকে হাত ব্যাগটা নিয়ে নেমে পড়লেন। পেছনে লাগেজগুলো নামিয়ে দিচ্ছে কেয়ারটেকার মজিদ। সাথে ইমরান। সাড়ে বারোটার ফ্লাইট। সপ্তাখানেকের জন্য ব্যাংকক যেতে হচ্ছে নার্গিসকে। সাথে সেলিম সাহেব। সেলিম সাহেবকে দিয়ে জীবন বিলাসের দ্বিতীয় সিড়িটা টপকাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

তিনদিন ধরে নার্গিস বাসায় নেই। এখন পাতায়া আছে। ইমরান বড় একা হয়ে আছে। ইমরানের দু’চোখ জুড়ে জীবন বিলাসের স্বপ্ন। এই সময়টাতে খুব বেশি মিস করছে নার্গিসকে। নিজের ভিতর এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করছে। এই পর্যন্ত নার্গিসকে শুধু তার স্বার্থের জন্য ব্যবহার করে এসেছে। কখনও নার্গিসের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে তেমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নার্গিসকে আরো বেশি সুন্দর, লাবণ্যময়ী, আকর্ষণীয়া করে তোলার জন্য যা যা দরকার, তার সবটাই করেছে। কোনোকিছুতেই কার্পণ্য করেননি। নার্গিস মুখ বুজে সব মেনে নিয়েছে। ঠিক কাদা মাটির পুতুলের মতো যেমনটি ইমরান চেয়েছে, সেভাবেই গড়ে নিয়েছে।

নার্গিস নেই। বিছানায় ইমরান একা। না থাকার কারণেই বুঝি নার্গিসকে খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে। কিছু সময়ের জন্য ইমরান সমস্ত জাগতিক ভোগ বিলাসের উর্ধ্বে ওঠে এসেছে। ইমরানের শুধু জোৎস্না দেখতে ইচ্ছে করছে। অথচ আকাশে একটুও জোৎস্না নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঢাকা শহরে রাতের আঁধারে কোথাও চাঁদ দেখতে পেলো না ইমরান। জীবনে কখনও এমনটি মনে হয়নি। আজ কেন যে এভাবে চাঁদ দেখার সাধ হলো, তা ইমরান কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না।
গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করলেন। নিজেই ড্রাইভ করছেন। রাত দুটো বাজে। ঢাকা শহরে গভীর রাতে পথ চলার অভ্যাস ইমরানের আছে। প্রথম প্রথম আলম সাহেব যখন বাসায় আসতেন, ইমরান গাড়ি নিয়ে কাজের দোহায় দিয়ে হাতিরঝিলে বসে সময় কাটাতেন। আজও সোজা চলে গেলেন হাতিরঝিলে। সেখানেও হরেক রকম বাহারি আলোর ঝলকানি। এসব আলো একটুও ভালো লাগছে না। ইমরান সাহেব অনেক্ষণ একা দাড়িয়ে থাকলেন। কোথাও চাঁদ দেখতে পেলেন না। ইমরান সাহেব ফিরে এলেন ভোর রাতের দিকে। শরীরটা খুবই ক্লান্ত লাগছে।

আজ বৃহস্পতিবার। নার্গিসের ফেরার কথা সাড়ে দশটার ফ্লাইটে। কিন্তু ফিরবেন না। ইমরান সে খবর আগেই জেনে গেছে। এবার তার স্বপ্ন সার্থক হতে চলেছে। এবার ব্যাংকক থেকে ফিরেই ফাইলে সই করে দেবেন। তার কিছুক্ষণ পরেই সেলিম সাহেব ফোনে জানিয়ে দিলেন, আজ নার্গিসের ফেরা হচ্ছে না। আগামী রবিবারে ফিরবে। কারণ হিসেবে জানালেন, শরীফ সাহেব আসছেন ব্যাংককে। এই দু’দিন তিনি ব্যাংককেই থাকবেন। নার্গিসের সাথে সময় কাটাবেন। ওভাবেই প্লানটা সেট করা হয়েছে।

এর আগেও অনেকবার শরীফ সাহেবের সাথে নার্গিসের দেথা হয়েছে। কখনও হোটেলে, কখনও অফিসে, কখনও শরীফ সাহেবের ফ্লাটে, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, ব্যাংকক মালয়েশিয়া কিংবা সিংগাপুরে। বরাবরই শরীফ সাহেব আশ্বস্ত করে এসেছেন, তোমার জন্য দরকার হলে জীবনটাও দিয়ে দিতে পারি। এটাতো সামান্য। কিছু অফিসিয়াল জটিলতা আছে। তোমার কাজটা হয়ে যাবে। কিছু সময় তো ধৈর্য ধরতেই হবে।

এবার সবকিছু ফাইনাল। শরীফ সাহেব ব্যাংকক থেকে ঢাকায় ফিরে ফাইলটা ছেড়ে দেবেন বলেছেন। এর আগে এতটা ভালো লাগেনি। এবার পাতায়া সমুদ্র সৈকতটাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। জীবনের অনেক প্রাপ্তি, চাওয়া পাওয়ার হিসেবটা হয়তো এবার মিলে যাবে। ষাটোর্ধ শরীফ সাহেব পতি পলে পলে জীবনকে উপভোগ করছেন।

ঢাকা ফেরার পালা। শরীফ সাহেবের ফ্লাইট সাড়ে বারোটায়। আলাদা ফøাইটে যাবেন। পাঁচতারকা হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করছেন সেলিম সাহেব। নার্গিসকে নিয়ে শরীফ সাথে স্যুট থেকে লবিতে আসলেন। কফি অর্ডার করা ছিলো। কফির কাপে চুমুক দিয়ে কাপটা রাখলেন। নার্গিসের কাঁধে হাত রেখে উঠে দাড়ালেন শরীফ সাহেব। বললেন, আমিও তৈরী হচ্ছি। ঢাকায় গেলে দেখা হবে। বাই।

আজ অনেক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে সাঁজিয়েছেন নার্গিস। সময় ঠিক করা আছে। বারোটায় শরীফ সাহেবের দপ্তরে যেতে হবে। ফাইলে সই করবেন শরীফ সাহেব। ইমরান সাহেব ভীষণ উৎকন্ঠায় আছেন। গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ভোর হলেই জীবন বিলাসের স্বপ্নটা সার্থক হবে। কী এক অমিয় আনন্দে মনটা বার বার দুলে দুলে ওঠছে! নার্গিসের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। নার্গিস না হলে জীবনে কখনও জীবন বিলাসের স্বপ্ন পূরণ হতো না। নার্গিস সত্যিই ইমরানের জীবনের ভাগ্যলক্ষী।

খুব ধীর পায়ে পাঁচতলায় শরীফ সাহেবের দপ্তরের দিকে এগিয়ে গেলো নার্গিস। পিয়ন জানে। নার্গিসকে আটকানোর সাধ্য তার নেই। রুমের দরজা খুলতেই দেখলেন, শরীফ সাহেবের ঘা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কম্পিউটারে চোখ বুলাচ্ছেন একজন অষ্টাদশী তন্বী তরুণী। নার্গিস জানে সে এই অফিসের কেউ নয়। নার্গিসকে দেখে বিব্রত শরীফ সাহেব বলে উঠলেন, তুমি পরে এসো। আমি জরুরী মিটিং-এ আছি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement