লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.২৫

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উপলব্ধি (এপ্রিল ২০১৬)

সেলিব্রেটি
উপলব্ধি

সংখ্যা

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.২৫

মিলন বনিক

comment ১১  favorite ১  import_contacts ৭৯০
আজকের টক অফ দ্যা টাউন।
চট্টগ্রামে ডক্টর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার আসছেন। শিশু কিশোরদের মধ্যে খবরটা ছড়াতে বেশি সময় লাগেনি। দেশের শিশু কিশোরদের খুব কাছের একজন মানুষ। পরম বন্ধু। মানুষটি সহজে ছেলে বুড়ো সকলের মন জয় করতে পেরেছে। তাঁর কর্ম, জ্ঞান, দেশাত্ববোধ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সরলতায় সাধারণ মানুষের অন্তরে ঠাঁই করে নিয়েছেন। তার সৃষ্টি ও সৃজনশীলতার কারণে সবার কাছে একজন প্রিয় মানুষ। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে। ভালোবাসে। তাঁর লেখা বই সকল শ্রেণির পাঠকের কাছে সমাদৃত। এমন একজন মানুষকে চট্টগ্রামের লোকেরা সামনা সামনি দেখবে, এটা কি চাট্টিখানি কথা? কম সৌভাগ্যের কথা!

আজ তিনি চট্টগ্রামের সৃজনশীল বই বিপণি বাতিঘরে এসেছেন। ভক্ত পাঠকের মুখোমুখি হয়েছেন। পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। ভক্তদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। এমন প্রিয় মানুষটার মুখদর্শনেও পূণ্য আছে। হাজার হাজার মানুষ মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনছেন। একেবারে সাদামাটা একজন মানুষ। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। মোটা সাদা গোঁফের আড়ালে সবসময় লুকিয়ে আছে মিষ্টি হাসি। মাথায় ঘন সাদা চুল। আহামরি কোন আভিজাত্য নেই। সদা নিরহংকারী একজন সাদা মনের সৃজনশীল মানুষ।

কার না ইচ্ছা জাগে এমন মানুষটির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাবার। তাঁর মুখোমুখি বসে তাঁর কথা শোনার। এটি অনেক বড় পাওয়া। সেলিব্রেটিরা এমনই। এত লোক। এত বড় লাইব্রেরির ভিতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। চট্টগ্রামের লোকজনের কাছে এ এক স্মরণীয় মুহূর্ত। এই মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখতে একটা প্রশ্ন, একটা উত্তর, একটু হাসি, এও কম কী! যদি ভীড় সামলে একটা অটোগ্রাফ নেওয়া যায়, তাহলে তো কথায় নেই। একটা ছবি তুলতে পারলে তো জীবন ধন্য। কে না চায় পাশে দাড়িয়ে একটা ছবি তুলতে। তাতেও প্রতিযোগিতা। উনার বড় ভাইও এসেছিলেন। তাও একই অবস্থা হয়েছিল। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। তিনি হুমায়ুন আহমেদ। আজ তিনি নেই।

সন্ধ্যা সাতটায় তিনি আসবেন। তার আগে থেকে সীট দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ভীড় করেছে অনেক আগে থেকে। তাঁর বক্তব্য প্রেস ক্লাবের বাইরে প্রজেক্টরে লাইভ দেখনো হচ্ছে। সেখানেও ভীড়। তবুও এক নজর সামনা সামনি দেখার মতো তৃপ্তি নেই। অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছেন। বসার কোনো সুযোগ নেই। যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে কেউ নড়ছে না। রাস্তায় জ্যাম লেগে আছে । লোকের ভীড়। রাস্তার ওপারেও অনেক মানুষ। তারা কাউকে দেখছে না। শুধু মানুষ দেখছে।

একজন গ্রাম্য কিশোর। নাম রাশেদ। ঠিক রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে ল্যাম্পপোষ্টের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। সেও মানুষ দেখছে। কোনভাবে ভিতরে যেতে পারছে না। রাশেদের খুব ইচ্ছা, জীবনে একবার হলেও জাফর ইকবাল স্যারের সাথে দেখা করবে। স্যারকে একটা সালাম করবে। তারপর কিছু প্রশ্ন করবে। স্যার নিশ্চয় তার কাঁধে হাত রেখে বলবেন, বেশি বেশি পড়ালেখা করবে। নাকি বলবেন, বেশি বেশি খেলাধুলা করবে, ডাংগুলি খেলবে, ফুটবল খেলবে। আর গল্প বই, সায়েন্স ফিকশন এসব পড়বে।

রাশেদের আশে পাশে কেউ নেই। সে একা। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। ল্যাম্পপোষ্টের নীচে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর ভাবছে, আচ্ছা স্যার কি আমার সাথে কথা বলবেন? রাশেদের হাতে আজকের একটি দৈনিক পত্রিকা। ছোট কাকুই পত্রিকার খবরটা দিয়েছে। এই প্রথম পত্রিকায় রাশেদের একটি কবিতা ছাপা হয়েছে। প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা স্যারের ও তো কোন লেখা প্রথম পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তখন স্যারের কেমন আনন্দ হয়েছিল? আমার যেমন আনন্দ হচ্ছে, স্যারেরও কি তাই হয়েছিল? খুব জানতে ইচ্ছে করছে। রাশেদেরও খুব আনন্দ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে পত্রিকাটা একবার স্যারকে দেখাতে। আর বলতে ইচ্ছা করছে, স্যার আমিও আপনার মত অনেক বড় লেখক হবো। আপনার মতো সেলিব্রেটি হবো। আবার নিজেই লজ্জিত হলো। দুর এসব কী বলা যায় নাকি? তিনি কী ভাববেন? রাশেদ তো স্যারের বইয়ের পোকা। পড়া শুরু করলে শেষ না করে উঠে না। এমন কি খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত বন্ধ। একবার হিসু এসেছিল। প্যান্ট ভিজিয়ে চুপচাপ বসেছিল। পরে অবশ্য বাথরুমে গিয়ে প্যান্ট পাল্টে এসেছে। তাও বইটা শেষ করার পর। আচ্ছা স্যার কী জানে, আমি তাঁর কত বড় ভক্ত?


ছোট কাকুর সাথে আমার বন্ধু রাশেদ ছবিটা দেখেছিল চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনষ্টিউটে। রাশেদ কেঁদে ফেলেছিল। আর স্যারকে এক চোট গালি দিয়ে জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিল, আপনি আমাকে এভাবে মেরে ফেললেন কেন? আমিতো স্বাধীনতা দেখতে চেয়েছিলাম। আজ দেখা হলে নিশ্চয় সে প্রশ্নটি করবে রাশেদ। কিন্তু তা কিছুতেই সম্ভব নয়। পুলিশ ভিতরে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। তাছাড়া রাশেদ একা। সামনে জেএসসি পরীক্ষা। কোচিং শেষ করে ছোট কাকুর বাসায় আসবে বলে শহরে এসেছে। ছোট কাকুকে বলেছে আমি একটু বাতিঘরে যাবো। জাফর ইকবাল স্যারকে একপলক দেখবো। ছোট কাকু না করেনি। রিক্সা ভাড়াটা দিয়ে বলল, সাবধানে যাবি। আবার তাড়াতাড়ি ফিরে আসবি। সমস্যা হলে ফোন কল সেন্টারে গিয়ে আমাকে ফোন করে দিবি। আমি নিয়ে আসবো। হুম! রাশেদ কম কিসে? এটুকু পথ রাশেদ যেকোন ভাবে ফিরে আসতে পারবে। রাশেদ দৈনিক পত্রিকাটা বার বার দেখছে। আর কোন এক স্বপ্নের জগতে ডুবে যাচ্ছে। কী যে ভালো লাগছে।

সে বার বার স্যারকে বলছে, স্যার আমিও আপনার মতো সেলিব্রেটি হতে চাই। এই দেখুন আমার লেখা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। স্যার শুনে খুব খুশি হলেন। রাশেদের সাথে স্যারের খুব ভালো বন্ধুত্ব হলো। স্যার রাশেদের কাঁধে হাত রেখে কথা বলেন। পাশাপাশি হাঁটেন। অনেক অনেক মজার মজার কথা বলেন। সারাক্ষণ শুনতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে হয় সারাদিন বসে বসে শুধু স্যারের সাথে গল্প করি। স্যার রাশেদকে হাতে কলমে অনেক কিছু শিখিয়ে দেন। একসময় রাশেদ স্যারের খুব প্রিয় ছাত্র হয়ে গেল। স্যার রাশেদকে অনেক ভালোবাসেন।

একসময় রাশেদকে মেরে ফেলার জন্য দুঃখ করে বললেন, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি গল্পের রাশেদকে মেরে ফেলেছি। তোমাদের মধ্যে কী অপূর্ব মিল! সেও আমাকে বলেছিল, আমাকে মারবেন না। আমি স্বাধীনতা দেখতে চাই। আমি মরতে চাই না। কিন্তু আমার কোন উপায় ছিল না। তাকে না মারলে আমি তোমাকে পেতাম না। আজকের বাংলাদেশে তোমার মতো লক্ষ কোটি রাশেদের জন্ম হতো না। এই বলে স্যার রাশেদকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করলেন। স্যার তো অনেক লম্বা। তাই গোপনে দু’ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল রাশেদের পিঠে।

স্যার খেয়াল করেনি। রাশেদ স্যারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, স্যার আপনি কাঁদছেন? স্যার হেসে বললেন, দূর বোকা। আমি তো হাসছি। হাসতে গেলেও কিন্তু চোখের জল পড়ে। আমি আনন্দে কাঁদছি।
- কেন স্যার?


এই যে তোরা কত বড় হয়েছিস। চারিদিকে তোদের কত নাম ডাক। আমি পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোরা যেখানে যাচ্ছিস, সেখানে হাজার হাজার লোক জড়ো হচ্ছে। তোদেরকে সম্মান করছে। তোদের অটোগ্রাফ নিচ্ছে। তোদের সাথে ছবি তোলার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তোরাতো এখন অনেক বড় সেলিব্রেটি। আগামী দিনের পৃথিবীটা তোদের হাতের মুঠোয়। ইচ্ছে করলে মুহূর্তেই পৃথিবীটাকে জয় করতে পারবি।

রাশেদের মাথায় স্বপ্নের ঘোর লাগে। একসময় রাশেদ হাজার হাজার লোকের ভীড়ে স্যারকে খুঁজছে। কোথাও দেখতে পাচ্ছে না। অনেক অনেক লোক ঘিরে ধরেছে রাশেদকে। কারও হাতে রাশেদের লেখা গল্পের বই। শিশুদের জন্য লেখা বই। কারও হাতে ডায়েরি আবার কারও হাতে ক্রিকেট ব্যাট। সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে একটা অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। রাশেদ কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। তার চোখ দু’টো কেবল স্যারকে খুঁজছে।

রাশেদ বহুদুরে তাকিয়ে দেখে, সাদা চুলের সবার প্রিয় মানুষটা ধীরে ধীরে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। রাশেদ অপলক তাকিয়ে আছে। কিন্তু স্যারকে কাছে না পাওয়ার শূন্যতাটুকু রাশেদ কিছুতেই ভুলতে পারছে না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement