হঠাৎ দেখলে মনে হবে, কোন ম্যাজিক শো হচ্ছে। কিন্তু না। বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে ঘরের বিভিন্ন স্থানে হাড়ি- পাতিল বালতি মগ জগ বাটি বোল বদনা রাখা হয়েছে। ছেলেটার পড়ার টেবিলের দৃশ্য আরো খারাপ। এতো কিছু করেও বৃষ্টি মোকাবেলা করা যাচ্ছে না । মধ্যরাতে এ অবস্থা দেখে ছেলের মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে পিতা। রাত পোহালেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। সন্তানের লেখা পড়ায় যেনো ব্যাঘাত না ঘটে সে জন্য এই ছাতা দিয়েই শেষ চেষ্টা চালাচ্ছে হত দরিদ্র পিতা সুরুজ মিয়া। পলিথিনের চালাটা নষ্ট হয়ে গেছে। ঢেউ টিন দিয়ে চালের ছাউনি করি করি করে আর করা হচ্ছে না। জেল- হাজত আর মামলার হাজিরা দিতে দিতে সর্বশান্ত সুরুজ মিয়া। কোর্টে শুধু তারিখ পড়ে। এ তারিখ কবে যে শেষ হবে ........... জানে না সে। হাজিরা দিতে আর ভাল লাগে না তার। দীর্ঘ বার বছর ধরে চলছে হাজিরা -– তারিখ আর হাজতবাস। জমি সংক্রান্তসহ খুন চুরি ডাকাতি ছিনতাই সাম্প্রতিক যোগ হয়েছে মাদক ব্যবসার অভিযোগ।
সুরুজ মিয়ার জানা মতে, খুনের মধ্যে একটি কুকুর হত্যা ছাড়া সব মিথ্যা। তবে মাদকের ঘটনা সত্য। কিন্ত ব্যবসায়ী নয় ; সে আসক্ত হয়ে পড়েছে। জেলখানায় অবাধে পাওয়া যায় গাঁজা ইয়াবা। সেখান থেকেই দিক্ষা নিয়েছে এই বাবার । ওখানে ইয়াবার সম্মানসূচক নাম ‘বাবা’।
লোহাজুরি গ্রামে তার নাম শুনলে ভয়ে আঁৎকে উঠে সবাই। কুত্তা সুরুজ আইতাছে ... বললেই ভয়ে শিশুরা ঘুমিয়ে যায়। র‌্যার ও পুলিশের খাতায় হিট লিষ্টে তার নাম রয়েছে। আজকের কুত্তা সুরুজ এক সময় পালা গানের দল করতো। নিজেই গান বাধতো। গ্রামের বিভিন্ন আসরে গান গায়তো। কিছু ফসলী জমি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তার এই জমির পাশে পুকুর কাটে এলাকার প্রভাবশালী আসগর আলী মাতবর। বর্ষা আসলেই পুকুরের কারনে জমি গ্রাস হয়ে যাচ্ছে তার। অপরদিকে নদী ভাঙ্গনতো আছে’ই ...। নদী আর পুকুর ভাঙ্গনে দিশেহারা হয়ে পড়ে সে। কতবার মাতবরের কাছে কত আকুতি- মিনতি করেছে সে , একটা কিছু করার জন্য। কিন্ত বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করলেন না তিনি। পুলিশও কোনো অভিযোগ গ্রহন করে না তার।
একদিন ঘুরে দাঁড়ায় সুরুজ মিয়া। পুকুরে তার যে টুকু জমি তলিয়ে গেছে - সেই অংশের মালিকানা তাকে দিতে হবে। একদিন ভোরে পুকুরে জাল ফেলে সে। খবর পেয়ে আসগর আলী তার লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে হামলা করে সুরুজ মিয়ার উপর। সুরুজ মিয়া একাই দা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবাইকে পরাস্থ করে এগিয়ে যায় আসগর আলীর দিকে। আসগর আলী ঘরে দৌড়ে গিয়ে দু’নালা বন্ধুক নিয়ে আসে। এ সময় সুরুজ মিয়া দা দিয়ে মারে ঢিল। দা’এর আঘাতে আসগর আলীর পোষা কুকুরটা যায় মারা। সেই থেকে সুরুজ মিয়ার নাম পাল্টে হয়ে যায় ‘কুত্তাসুরুজ’। এই নাম ধারন করার পর এলাকার প্রভাবশালী আরেকটি মহল তাকে কাছে ডেকে নেয়। রাজনৈতীক ফায়দা আহোরনে ব্যবহার করে তাকে। আর তার প্রতিপক্ষ আসগর মাতবর তো আছেন’ই। গাছে পাতা নড়লে’ই .... হারামজাদা কুত্তাসুরুজের কাম ...।
এভাবেই ভয়ংকর এক মানুষে রুপান্তরিত হয় নিরীহ কৃষক সহজ সরল সুরুজ মিয়া। র‌্যাব -পুলিশের খাতায় ভয়ংকর হলেও তার পরিবারে সে একজন আদর্শ একজন একজন পিতা। এতোগুলি মামলা মাথায় নিয়ে ফেরারী জীবনেও স্ত্রী সন্তানদের খোঁজ খবর রাখে সে। কখনো নিজে আবার দূত মারফত বাড়ীর দেখাশুনা করার চেষ্টা করে। সংসারে স্ত্রীসহ এক ছেলে এক মেয়ে রয়েছে তার।
ছেলেটার পরীক্ষা রাত পোহালে। মেয়েটা গুটি গুটি পায় সারা উঠোন হেঁটে বেরায়। মেয়েটির জন্য মেলা থেকে আনা ইমিটেশনের নূপুরের ঝংকার যখন সুরুজ আলীর কানে বাজে তখন অদ্ভুত এক আনন্দ লাগে তার। মনে হয়, পৃথিবীর সেরা শব্দ। টুকটুক কি সুন্দর করে কথা বলে। ওর কথাও মনে হয় পৃথিবী সেরা।
চৌকির এক কোনে বসে ছেলেটার মাথায় এখনো ছাতা হাতে সুরুজ আলী। বৃষ্টি থামছে না। সুরুজ মিয়ার স্ত্রী রাহেলা বেগম ও মেয়ে কমলা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার মা মেয়ে। তবুও ঘুম ভাঙছে না ওদের। বিষয়টি গভীরভাবে লক্ষ্য করলো সুরুজ মিয়া। তার বেশ আনন্দ লাগলো এই ভেবে যে, বৃষ্টি জয় করেছে তার পরিবার।
ছেলে রহমত মিয়া বইয়ের পাতা বন্ধ করে বাবার দিকে তাকায়। বিষ্ময় ভরা কন্ঠে বললো, বাজান তুমি অহনো ছাতি ধইরা রাখছো !
ঃ হরে বাজান, তুই মনোযোগ দিয়া পড়। কি আর করবাম ... ঘরের ভিতরে ছাতি ধইরা রাখছি। ভালা একটা ঘরও তরারে বাইন্ধা দিতাম পারতাছি না। এবার তার দু’চোখেও ঝরছে বৃষ্টি।
রহমত তার বাবাকে কিভাবে শান্তনা দেবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎ ভালো একটা আইডিয়া এলো তার মাথায়।
ঃ বাজান বৃষ্টি নিয়া একটা গান বান্ধো, অনেকদিন ধইরা তোমার গান হুনি না।
ঃ অরে কুত্তারছ্উা রাইত পোয়াইলে তর পরীক্ষা, আর তুই কইতাছস গান গাইতাম। থাক আর পড়–ন লাগত না, ম্যালা রাইত অইছে। ঘুমাইয়া পড়। আমিও ভাগি ...কোন সময় আবার ল্যাব- পুলিশ আইয়া পড়ে।
ঃ বাজান, পরীক্ষা লইয়া তুমি কোনো চিন্তা কইরো না। দেইখখো আমি অনেক ভালা করবাম। অতো রাইতে এই বৃষ্টির মইধ্যে পুলিশ টুলিশ আইতো না। তুমি একটা গান বানাও বাজান।
সুরুজ আলী কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজের বানানো গান গায়তে শুরু করলো-
বাইরে বৃষ্টি পড়ার আগে
আমার ঘরে পড়ে (২) ঐ
একটুখানি বাতাসেই
ঘরটা নৃত্য করে
বাইরে বৃষ্টি পড়ার আগে
আমার ঘরে পড়ে (২) ঐ
সময় শুরু হয় যখন নদীর ভাঙ্গন
আমার ঘর ভেঙ্গে নদী করে উদ্ভোধন
ডবধি তোমার একি খেলা আমার সনে রে
বাইরে বৃষ্টি পড়ার আগে
আমার ঘরে পড়ে (২) ঐ

গানের আওয়াজে মা মেয়ে জেগে উঠে। মেয়েটা দু’হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে বলতে লাগলো, কুত্তা সুলুজ আইছে কুত্তা সুলুজ আইছে ...
মা রাহেলা বেগম মেয়ের গালে কষে লাগায় এক চর।
মেয়েটা এবার চিৎকার করে বলছে, কুত্তা সুলুজ কুত্তা সুলুজ ...।
রাহেলা বেগম মেয়েকে কড়া ধমক দিয়ে বললো, কিমুন জাউরির ঘরের জাউরি ... বাপের কছ কুত্তা !! ওই মাগী ক বাজান বাজান ক।
ঃ এ্যা এ্যা এ্যা বাজান বাজান ... কুত্তা সু ... এ্যা এ্যা ..
মেয়ের গালে আবারও হাত উঠায় রাহেলা বেগম। সুরুজ মিয়া রাহেলার হাত ধরে বললো, বউগো আমার অবুঝ মা ডারে অন্নাধন্না মারতাছো কেরে ? গেরামের বেবাক মাইনষে আমারে ঘিন্না নিয়া কইলেও মা আমার কিন্তুক ঘিন্না নিয়া কইতাছে না। খেয়াল কইরা দ্যাহো, মাইয়াডার এই ডাকটার মইধ্যে কি দরদ কি মায়া। সুরুজ মিয়া মেয়েকে কোলে টেনে নিয়ে চুমু খেতে লাললো। পকেট থেকে চকলেট বের করে দিলো তাকে। রাহেলা বেগমকে দিলো কিছু টাকা । ছ্যারাডারে ভালামন্দ কিছু খাওয়াইও।
ঃ বউ বিলাইডা কই ..? এই লও পলিতিনের ভিতরে মাছের কাডা আছে।
ঃ বিলাইডারে অনেকক্ষুন ধইরা দেখতাছি না। মনে অয় বৃষ্টির মইধ্যে কোনো খানো আইটকা পড়ছে। দেইন মাছের কাডাডি ছিক্কাত থুইয়া রাহি- আইলে দিয়ামনে। তাইজ্জব মানুষ আপনে !! বিলাইডার কতাও মন রাখছুইন।
ঃ মিঞাও মিঞাও...
ঃ আইয়া পড়ছে আপনের বিলাই। দেইন কাডাডি আপনের হাতে দেইন।
সুরুজ মিয়া বিড়ালটাকে মাছের কাঁটাগুলি খেতে দেয়। বিড়ালটা খাওয়ার আগে সুরুজ মিয়ার পায়ে মুখ ষ্পর্ষ করে জানান দেয়, প্রভুর প্রতি তার ভালোবাসার। সুরুজ মিয়াও বিড়ালটার মাথায় হাত বোলায় পরম মমতায়। ক্ষুধা দারিদ্র অভাবের মাঝেও মানুষ পশু ও প্রকৃতির কি এক অপূর্ব আশ্রম...।
সুরুজ মিয়া ছেলের মাথায় হাত রেখে বললো, তুই ভালা একটা পাশ দিলে যা চায়বে তা অই দিয়াম।
ঃ হাছা তো বাজান ?
ঃ কইলাম তো দিয়াম।
ঃ আমারে একটা ল্যাপটপ কিইন্না দিওন লাগবো।
ঃ এই গরমের মইধ্যে লেপ দিয়া কি করবি ? শীত আইওক বানাইয়া দিয়ামনে।
রহমত হু হু কওে হেসে উঠে বললো, এইডা শইল্লে দিওনের লেপ না, এইডা অইলো ল্যাপটপ। একটা যšত্র। কম্পিউটার দ্যাহ নাই ... টেলিভিশনের মতো দেখতে যে।
ঃ এইডা দিয়া তুই কি করবি ?
ঃ এইডা দিয়া সারা দুনিয়ার খোঁজ খবর নিওন যায়। এইডা আমার জবর দরকার।
ঃ আইচ্ছা দিয়ামনে। যšত্রডার দাম কত রে ?
ঃ হুনছি ত্রিশ চল্লিশ হাজার ট্যাহার মত লাগে।
ঃ আইচ্ছা যা দিয়াম। তুই ভালা পাশ দিলে আমি পুলিশের হাতো ধরা দিয়াম। ধরা দিওনের আগে পিস্তলডা বেইচ্চা তরে যšত্রডা কিইন্না দিয়াম।
ঃ আজগা জবর খুশি অইলাম বাজান। হ, তুমি পুলিশের হাতে ধরা দেও। জেল-ফাঁস যা অই হোক। এই জীবন আর ভালা লাগে না। মাইনষে নানান কথা কয়।
ঃ যা কইলামতো, তুই ভালা একটা পাশ দে। কি গো মা জননী তোমার লাইগগা কি আনতাম ?
মেয়ে কমলা ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে বললো, লাল জামা, লাল জুতা, লাল চুড়ি, লাল লিপষ্টিক, লাল লাল ....
ঃ বুজ্জিগো মা তোমার লইগগা সব লাল জিনিস আনুন লাগবো। বউ, তোমার লাইগগা কি আনতাম ?
ঃ আজগা রাইতটা থাইক্কা যাইন। বিইন্নালা হুটকি ফিডা বানাইয়া আফনেরে খাওয়াইয়াম। কতদিন আফনেরে হুটকি ফিডা খাওয়াই না।
ঃ না গো বউ থাহুন যাইত না। লেব- পুলিশ আমারে কুত্তার মতন খুঁজতাছে।
একটা দীর্ঘ নি:স্বাস ছেড়ে বললো, আইচ্ছা তে যাইন। এই লইন বোরকা। আরেকবার আইলে এক রাইত থাইক্কা যাইবান। আফনেরে হুটকি পিডা বানাইয়া খাওয়াইয়াম বলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো রাহেলা।
ঘন কালো অন্ধকার মাঝ রাতে কালো বোরকা পড়ে বেরিয়ে যায় সুরুজ মিয়া, রাতের মতোই কালো অন্ধকার জগতে...। তবে এবার প্রত্যাশা- নতুন সূর্যোদয়ের।
রহমতের পরীক্ষা শেষ হয়। তার দৃঢ় বিস্বাস, সে খুব ভাল রেজাল্ট করবে। আর ভাল রেজাল্ট করা মানেই ল্যাপটপ পাওয়া। এর চেয়েও বড় পাওয়া- তার বাবা পুলিশের হাতে ধরা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।
মেয়েটা প্রতিদিন লাল জামা লাল জুতা বলে বলে ঘুমায়। আবার সকালে উঠে শুরু করে লাল জামা ....। রাহেলা মনের অজান্তেই তার স্বামী আজ রাতে আসতে পারে, এই ভেবে শুটকি পিঠা বানিয়ে রাখে। কিন্ত তার স্বামী আর আসে না। এভাবেই ¯স্ত্রী সন্তান প্রতিদিন অপেক্ষার প্রহর গুনে, কিন্ত সুরুজ মিয়ার আসার পায়ের আওয়াজ নেই।
পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। রহমত মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে। তার কৃতিত্বের ছবি দেশের সব পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। খুশিতে আত্বহারা রহমত ও তার মা। রহমতের মা জিলাপী কিনে প্রতিবেশীর ঘরে বিতরন করতে যায়। কিন্ত কেউ তা গ্রহন করতে রাজী নয়। কুত্তা সুরুজ বাড়ীর মিষ্টি খাওয়া ঠিক না। আনন্দ ভরা দিনে পাহাড়সম কষ্ট নিয়ে ফিরে আসে মা ছেলে। জিলাপী গুলো বাড়ীর কুকুরকে খেতে দেয় রহমতের মা। পরে জিলাপী খাওয়া উৎসবে যোগ দেয় আরো দশ- বারোটা কুকুর। কুকুরগুলির জিলাপী খাওয়ার দৃশ্য দেখে মা- ছেলে আনন্দিত হয়ে উঠে। আনন্দে মেতে উঠে কমলাও।
একদিন স্কুলের হেড মাষ্টার আবু জাফর ভ’ইয়া বিএড ভোরে সুরুজ মিয়ার বাড়িতে হাজির। রহমতকে জানালেন, একটি সু-সংবাদ অন্যটি দুঃসংবাদ। সু-সংবাদ হচ্ছে, মাননীয় শিক্ষামšত্রী মহোদ্বয় দাওয়াত কার্ড দিয়েছেন রহমতকে। আগামীকাল বিকালে বঙ্গবন্ধু চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবারের এসএসসির কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার আয়োজন করেছে। আর দুঃসংবাদটি হচ্ছে, কিছুক্ষণ আগে তোমার বাবাকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।
এ খবর শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু রহমতের মা। ও ছার ছার গো ..এইডা কি খবর কইলাইন গো ... লেব ধরলে ক্ররছ কইরা মাইরালা গো .. ও আল্লা আল্লা গো ...
মায়ের কান্না দেখে কমলাও কাঁদতে লাগলো। নির্বাক হতভম্ব রহমত।
বঙ্গবন্ধু হলরুমে সারা দেশ থেকে আগত মেধাবী শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিগণ এসে গেছেন। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। মšত্রী ও বুদ্ধিজীবিরা আগামী প্রজন্ম শিক্ষা এবং মানবাধিকার নিয়ে চমৎকার কথা বললেন। রহমত শিক্ষামšত্রীর কাছ থেকে পরুস্কার গ্রহন করলো। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রহমতের প্রতিক্রিয়া জানতে চায়লো।
এই সুযোগে রহমত বড় আবেগ ভরা কন্ঠে বলতে শুরু করলো- আমার কৃতিত্বের পেছনে আমার বাবার অবদান যে কি পরিমান, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। আমি হাজারো ডিগ্রী অর্জন করলেও তাঁর অবদানের কাহিনী লিখে শেষ করতে পারবো না। আমার সেই বাবার নাম শুনলে সবাই চিনবেন এবং আৎকেও উঠবেন। উনার নাম ‘কুত্তা সুরুজ’। র‌্যাব তাকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে। আমি জানি, র‌্যাব আমার বাবাকে নিয়ে শীঘ্রই অ¯ত্র উদ্ধারে যাবে। তারপর পূর্ব থেকে উৎ পেতে থাকা সšত্রাসীরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি করবে অথবা হবে বন্ধুক যুদ্ধ। এসময় ক্রসফায়ারে মারা যাবে কুত্তা সুরুজ। রাষ্ট্রের কাছে আলোয় ভরা এই দিনে আমার আকুল প্রার্থনা- আমার প্রাণপ্রিয় বাবাকে আইনের আওতায় আনুন। আইনে দোষী প্রমাণীত হলে তাকে অবশ্যই ফাঁসি দিন। আমিও দৃপ্ত কন্ঠে আমার বাবার ফাঁসি দাবি করছি। আর সেই সাথে আরো একটি দাবি জানাচ্ছি- নিরীহ কৃষক সুরুজ মিয়াকে যারা কুত্তা সুরুজ বানিয়েছে, তাদের বিচারটাও করুন। ক্রস ফায়ারে কুত্তা সুরুজের মৃতে্যু হলে গড ফাদাররা থেকে যাবে অন্তরালে। আমার মতো মেধাবীরা ঝরা ফুলের মত’ই অকালে ঝরে যাবো। অপরদিকে গড ফাদাররা এমন আরও বহু কুত্তা সুরুজের জন্ম দিবে।
রহমতের কথায় সবার চোখ ভিজে যায় এবং জোড়ালো দাবি উঠে- বিচার বহিভর্’ত এই হত্যাকান্ড বন্ধ করতে হবে ...
শ্রাবনের আকাশ। এই বৃষ্টি এই আবার সূর্যের আলো। রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকায় শিক্ষার্থীরা র‌্যাবের গাড়ি আটকিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা করতে লাগলো। গাড়ীর ড্রাইভার কোনো লাইসেন্স দেখাতে পারছে না। খবর এলো গাড়ীর লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে মšত্রী দুদক বিচারপতিসহ অনেক বড় বড় আমলারা।
র‌্যাবের গাড়িতে বসা কুত্তা সুরুজ অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বললো, ছার পোলাপান গুলি জবর একটা দামী কথা লেখছে- রাষ্ট্রের মেরামত চলছে..।
অফিসার কড়া একটা ধমক দিয়ে বললো, চুপ কর কুত্তার বাচ্চা ! এই হারামজাদার চোখ শক্ত করে বাঁধো।
এতো মায়াময় সুন্দর চেহারার মানুষ এমন নির্দয়ভাবে ধমক দিতে পারে, বিষয়টি খুব অবাক লাগলো কুত্তা সুরুজের কাছে। ভিতরে আরেকটি কথা ঘোরপাক খাচ্ছে ...বলার সাহস পাচ্ছে না সে। তাই সে মনে মনেই বললো, নিজেরার লাইসেন নাই, এরা আবার আরেক জনের লাইসেন দ্যাহে ...
অবশেষে সরি বলে অফিসার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মুক্তি পায় গাড়িটি । গাড়ি ছুটে চলেছে। সুরুজ মিয়ার চোখ এখন শক্ত করে বাঁধা। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিশোর কন্ঠে শুনা যাচ্ছে ব্যতিক্রম শ্লোগান- ওয়ি ওয়ান্ট জাষ্টিস .. ওয়ি ওয়ান্ট জাষ্টিস ... এই ইংরেজির অর্থটা কি ? জানতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে তার। কিন্ত ধমকের ভয়ে প্রশ্ন করার সাহস পাচ্ছে না। এর উত্তরও সে নিজে দিলো- রাষ্ট্রের মেরামত চাই .. ।
গাড়ি ছুটে চলেছে ... বেশ কিছুক্ষণ পর গভীর নীরবতা চলে আসলো। মাঝ রাত । ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর ব্যাঙের ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সুরুজ মিয়ার এখন মনে হলো, তার আয়ু আর বেশিক্ষন নেই । তার চোখে ভেসে আসছে - কমলা রহমত রাহেলা আর বিড়ালটার ছবি...।
হঠাৎ অফিসারের মুঠোফোনে একটা রিং আসলো। কেঁপে উঠে সুরুজ মিয়া। সারা শরীরে শ্রাবনের বৃষ্টির মতো’ই ঘাম ঝরতে লাগলো তার। দোয়া দুরুদ পড়া শুরু করলো সে- লাইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নিকুনতুম মিনাজজোয়ালেমিন...।
অফিসার রক্ত নিয়ে কথা বলছে টেলিভিশন চ্যানেল গুলোতে । তার একমাত্র ছেলেটা গাড়ির নীচে চাপা পড়েছে, জরুরী রক্তের প্রয়োজন। কিন্ত রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না। রক্তের ˉপ বড় দূর্লভ। অফিসারের দু’চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে। মোবাইল ফোনে তার পরিচিত এক চিকিৎসকের কাছে বলছে, ডাক্তার শফিক- যে ভাবেই হোক রক্ত খুঁজে বের কর। আমার ছেলেটাকে বাঁচাও। ওর কিছু হলে আমি বাঁচবো না। তোমার ভাবিও বাঁচবে না। এবার শিশুর মতো অঝরে কাঁদতে লাগলো অফিসার।
সুরুজ মিয়া অত্যন্ত মিহি সুরে বললো,লক্তের গুরুপটা কি ছার ?
অফিসার এবার আরো ভয়াবহ কন্ঠে ধমক দিলেন। একদম চুপ কুত্তার বাচ্চা !! এই হারামজাদার মুখ বাঁধো। মুখ বাঁধার সময় সে বহুবার চেষ্টা করেছে শুধু একটিবার বলতে, আফনে যেই লক্ত খুঁজতাছুইন এইডা আমার শইল্লে আছে। এবি নিগেটিভ । যতক্ষুন লাগে নেইন, ছেড়াডারে বাঁছাইন ছার। না, তা আর বলা গেলো না। শাঁ শাঁ গুলির শব্দে কেঁপে উঠলো নির্জন জায়গাটি। ঘুমন্ত পাখিরা জেগে উঠে ডানা ঝাঁপটানো শুরু করলো।
কুত্তা সুরুজের দেহ থেকে তীরের গতিতে রক্ত বের হচ্ছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় তুমুল ছটফটরত অবস্থায় এক পর্যায়ে তার মুখ ও চোখের বাঁধন খোলে যায়। অফিসারকে উদ্দেশ্য করে ক্ষীন কন্ঠে বললো- ছার, আমার শইল থেইক্কা এইযে বারুইতাছে- এবি নিগেটিভ লক্ত...
পাথরে মূর্তিরুপ ধারনকারী অফিসারের ইচ্ছে হচ্ছে, ধুেলা বালি থেকে কুত্তা সুরুজের এই রক্ত কুড়িয়ে তার প্রিয় সন্তানের কাছে ছুটে চলতে ...
পরের দিন সকল পত্রিকার শিরোণাম- ‘ক্রসফায়ারে দুর্ধর্ষ সšত্রাসী কুত্তা সুরুজ নিহত’।
রহমত গতকাল চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তার পিতার মৃতে্যুর গল্পটি যে ভাবে বলেছিলো- পত্রিকায় হুবহু তা ছাপা হয়েছে। শুধু অতিরিক্ত খবর- কুত্তা সুরুজের লাশের পাশে পড়ে ছিলো, একটি ল্যাপটপ লাল জামা লাল জুতা লাল চুড়ি আর কিছু মাছের কাঁটা...।