পৃথিবীতে তার বসবাস। ষোল বছর বয়সী আরেফিন অদ্ভুত সব কাজের জন্য মানুষের কাছে মানুষ না! তবে কি! পৃথিবীর আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা মানুষ রুপি আরেফিন কি অপার্থিব কোন প্রানী!?
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ নভেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬

বিচারক স্কোরঃ ২.১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - পার্থিব (আগস্ট ২০১৮)

অপার্থিব আরেফিন
পার্থিব

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬

মোহাম্মদ অয়েজুল হক জীবন

comment ৫  favorite ০  import_contacts ৯৮
বছর দশেক আগের কথা। আম গাছ, জাম গাছ ছিল আরেফিনের প্রিয় স্থান। কি সকাল আর সন্ধ্যা বাছবিচার নেই। বাড়ি, পরের বাড়ি, রাস্তাঘাট, বাগান এক কথায় ঘুম ছাড়া অধিকাংশ সময় তাকে দেখা যেত কোন গাছের চূড়ায়। মোটা ডালে হেলান দিয়ে বসা কিংবা শোয়া। আম গাছে থাকলে আম, জাম গাছে থাকলে জাম আপন ভেবে খেতে কখনো দ্বিধা করেনি। গাছ মালিকের সাথে কখনো যে বাকবিতণ্ডা হয়নি এমন নয়। একবার মারুফ সাহেব কি একটা কাজে শহর থেকে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরছেন। ভদ্রলোক হাইস্কুলের মাস্টার। সে সময় গ্রামের মানুষ বাইরে গেলে যদি বুঝতেন ফিরতে রাত হবে, টর্চ লাইট নিতে ভুল করতেননা। তখন গ্রামে কারেন্ট ছিলনা। সন্ধ্যা নামতেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে যেত সারা গ্রাম। তারপরেই পিনপতন নিস্তব্ধতা। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির ভেতর মারফ সাহেব এদিকওদিক আলো ছড়িয়ে দ্রুত বেগে বাড়ির দিকে ছোটেন। বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছেন। মাথার উপর কি একটা এসে পড়তেই কেপে ওঠেন। আলো ফেলে দেখেন আমের আঠি। বাদূড় আম খায় তবে পরিচ্ছন্ন আঠি দেখে নিশ্চিত হন কিছু কিন্তু আছে। ওপরের দিকে লাইট মারতেই দেখা যায় আরেফিন। বেশ আয়েশি ভঙ্গীতে বসে আম খাচ্ছে। জামাকাপড় গুলো ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে একাকার । দেখেই গা জ্বলে ওঠে মারুফ সাহেবের।
- চাচা চোখে লাইট মারেন ক্যান?
- এই নাম। এতো রাতে ঝড়বৃষ্টির ভেতর কোনো শয়তানও গাছে উঠবে না। তুই কোন কোয়ালিটির শয়তান রে!
আরেফিন হাসে। কি যে বলেন। আম দুধ তো বহু খাইছেন আম বৃষ্টি খেয়েছেন? দারুন।
- গাছটা কি তোর বাপ লাগাইছে?
আরেফিন হাসে। বলে কি! সেই ছোটবেলা বাবা চলে গেছেন। মটির নিচে কি অবস্থা কে জানে! থাকলে এ গাছটা বাবাও লাগাতে পারতেন। গাছ থেকে নেমে মারুফ সাহেবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, বাপ তুলতে হয় না চাচা। আপনি না মাস্টার। বোঝেন না?
- না, বুঝি না। তুই কি লেখাপড়া করিস? ভবঘুরে, বদমাশ। আমি মাস্টার হই না যা হই তাতে তোর কি?
- এজন্যই তো মাথায় আঠি পড়ে। যেদিন গাছ পড়বে সেদিন বুঝবেন।
মারুফ সাহেব ঠাস করে একটা থাপ্পড় কষে দেন। যা ভাগ আজ কিছু বললাম না। ফের যদি দেখি, সেদিন বুঝবি কতো মাসে বছর। থাপ্পড়ের গায়ে ওজন আছে। আরেফিনের মাথা ঘুরে ওঠে। আজ কিছু বললেন না! আরেফিন অবাক হয়। সেদিন কি আশ্চর্য স্বাভাবিক ভাবে এমন একটা চড় হজম করেছিল নিতু! বাবা হারা আরেফিনের পড়ালেখায় চেষ্টার ত্রুটি করেনি তার মা। স্কুলে যে যায়নি এমনও নয়। শিক্ষকরাই বলে দেন, এর পড়ালেখা হবেনা। মানুষ না। আরেফিনের মনের ভেতর এই যে মানুষ হবার ইচ্ছা, জাগেনি কোনদিন। যে হারে মানুষ মরছে তাতে মানুষ হবার চেয়ে না হওয়াই ভাল!
মায়ের আক্ষেপ, দীর্ঘশ্বাস উপেক্ষা করেই চলতো রুটিনবাঁধা কাজ। স্কুলের নামকরে গাছের ডালে বসে থাকা। পরীক্ষায় উত্তরের জায়গা আজগুবিকথা কথায় ভরা। অবশ্য বিষয় গুলো আরেফিনের কাছে আজগুবি মনে হতোনা। একবার প্রশ্ন এসেছিল, প্রাকৃতিক দূর্যোগ বন্যা মোকাবেলায় করনীয় কি?
আরেফিন লিখেছিল, বন্যায় চারিদিক নদী হয়। সাতার কাটার বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। নদী দেখতে কারও নদীর পাড়ে যেতে হয় না। গাছ আমাদের বাড়িঘর হয়ে ওঠে....
ক্লাসের সবাই হাসে। একজন হাসে না। মারুফ সাহেবের মেয়ে নিতু। আরেফিন যখন সবার সামনে কান ধরে দাঁড়ায় গোটা ক্লাসে চোখ বুলিয়ে নিতু ছাড়া সবার হাসি মুখ, চোখে খুশির ঝিলিক দেখে।
ছুটির ঘন্টা পড়লে আরেফিন হাফ ছেড়ে বাচে। স্কুল আর কবরস্থান দুটো একরকম। পার্থক্য কবর থেকে ছুটিরঘণ্টা পেয়ে কেউ দৌড়ে বের হয় না। কবর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসেনা। কিছুদূর এগিয়ে জহুর আলীর পুরানো আমলের শিরিষ গাছটা চোখে পড়ে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়া দরকার। বইখাতা নিচে ফেলে গাছে উঠবে এমন সময় পেছন থেকে কেউ ডাকে। আরেফিন ভাই। আরেফিন স্বাভাবিক ভাবে পেছন ফেরে। নিতু। আরে তুমি?
- অবাক হয়েছেন?
- অবাক হবার কি আছে। গাছে উঠবে?
নিতু হাসে। হাসিতে মায়া আছে। ' পারিনা তো। উঠতে মন চায়। আচ্ছা উপর থেকে আমাদের গ্রাম কেমন দেখায়? '
- সবুজের ভেতর কিছু ঘরবাড়ি, কিছু মানুষ ও প্রানীর চলাফেরা। দূরে দেখা যায় নদী। একেবেকে চলে গেছে যেখানে আকাশের সাথে তার মিতালী।
মুগ্ধতা নিয়ে আরেফিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নিতু।
- আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছো কেন!
- বারে আপনার দিকে তাকানো যাবেনা?
- যাবেনা কেন! কারও চোখ তো আমি কিনে রাখিনি।
নিতু খিলখিল করে হেসে ওঠে। হাসি শেষ হয় না। আরেফিনের চোখে পড়ে মারুফ সাহেব সাইকেল চালিয়ে গ্রাম্য আকাবাকা রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছেন।
- নিতু তোমার বাবা আসছে। নিতুর যেন কোন ভয় নেই। ভয়হীন কন্ঠে বলে, আসুক।
মারুফ সাহেব নিজের মেয়েকে আরেফিন নামক ডাইনোসরের সাথে দেখে লাল চোখে তাকান, কিরে এখানে দাঁড়িয়ে কি করিস?
- আরেফিন ভাইয়ের সাথে গল্প করি।
- ওর সাথে গল্প! অমানুষ থেকে দূরে থাকতে হয় জানিস না?
- জানি। এজন্যই তো মানুষের সাথে নিরিবিলি কথা বলছি।
কথা শেষ হবার সাথে সাথে নিতুর গালে প্রচন্ড এক থাপ্পড় আছড়ে পড়ে। মুখটা লাল হয়। বাড়ি চল বেয়াদব। সেদিন থাপ্পড় খেয়ে নিতু নিরবে চলে গিয়েছিল। হেটে যাওয়া দেখেছিল। বুকের ভেতর দেখার ক্ষমতা কই! নিতুর গালে কষে দেয়া মারুফ সাহেবের সে থাপ্পড়ের মুহুর্তটা বৃষ্টি ভেজা রাতের আধারে একেবারে জীবন্ত হয়। চড় থাপ্পড় এক প্রকার ট্যাবলেট, এজন্য সম্ভাবত মানুষ বলে, মাইরের উপর ওষুধ নাই। ভাবতে ভাবতে নিরবে নিঃশব্দে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে। আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে! আকাশ টা কি পৃথিবী! মেঘমালা! এরা পৃথিবী না হলে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে কেন! পৃথিবী কি! তার বাবা তো ছিল। ছোট বেলা দেখা সে মুখ চোখের পাতায় ভাসে। কোথায় গেলেন! রাতভর উদ্ভট সব ভাবনা ষোল বছর বয়সী আরেফিন কে ভাবনার ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যায়। যেখানে সে কোন কূল খুঁজে পায়না। বৃষ্টি উপভোগে, ভাবনায় দ্রুত রাত পেরিয়ে যায়। সকাল হতে না হতেই মা এসে হাজির। পূর্ব দিগন্তে তখন মেঘ সূর্যের লুকোচুরি খেলা চলছে। বাড়ি থেকে নদী দূরে নয়। হাটাপথে মিনিট পাঁচেক লাগে।কান্না জড়ানো কন্ঠে বলেন, আমাকে কি বাচতে দিবি?
- কেন কি হয়েছে?
- কি আর হবে! তুই পাগলামি করে বেড়াবি আর আমি সারাক্ষণ চিন্তায় মরবো। পড়ালেখা তো আর শিখলি না। ভ্যান চালাস। আরেফিন কিছু বলেনা।
কয়েকদিন পরের ঘটনা। বেশ গরম পড়েছে। মাঝেমাঝে বৃষ্টি। আরেফিন রাস্তার পাশে একটা সড়া গাছের উপর বসে আছে। কিছুক্ষণ পর গাছের নিচে এসে উপস্থিত হয়, কালু, নিলু, সাগর আর ওপাড়ার কয়েকজন। সবাই মাস্তান। মানুষজন তাদের দেখলে ভয়ে কে কোথায় পালাবে পথ খোঁজে। ছোটখাটো একটা মিটিং হয়। সারসংক্ষেপ এই, আজ রাতে মারুফ সাহেবের বাড়িতে ডাকাতি হবে। তেমন বাধা আসবে বলে তারা মনে করেনা। আর যদি আসে তো প্রয়োজন মাফিক হত্যা করা হবে। সম্পদের সাথে নিতুকেও আনা হবে। তবে তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবেনা। ঘটেচলা শত ঘটনার মতো নিতুও হবে এক ঘটনা।

সড়া গাছে বসে আরেফিন ভাবে কি করা যায়। আপন মনে একটা ছক আকে। প্রতীক্ষা রাতের। সন্ধ্যা নেমে রাত একটু গভীর হতেই নিতুদের ঘর ছোঁয়া বড় আম গাছে উঠে বসে। একব্যাগ পাথর, পাচ টাকার বাদাম এই তারসম্বল। মৃদুমন্দ বাতাসে রাতের আধারে বাদাম খাওয়ার মজাই আলাদা। আকাশে ঝিলিমিলি তারা। রাত বাড়ার সাথে সাথে অন্ধকার তীব্র হয়। মাঝরাত। আট দশ জনের একটা দল এগিয়ে আসে। কাছাকাছি আসতেই চিকন গলায় খিকখিক করে হেসে ওঠে আরেফিন। আসবি জানতাম। ভড়কে যাওয়া মানুষ গুলো একে অপরের দিকে তাকায়। আরেফিন সুর চড়িয়ে বলে, ভুত সম্রাটের প্রিয়তমা নিতুর বাড়ি লুট, নিতুকে নিয়ে মজার স্বপ্ন। সড়া গাছের নিচে পরিকল্পনা। ঘাড় মটকাতে সম্রাট আসছে। কথা শেষ করেই একটা পাথর গাছ পালার ঝোপে ছুড়ে মারে। পাতায় পাতায় খচমচ শব্দ। গাছপালা ভেংগে সম্রাট আসছে! দ্বিতীয় পাথর ছুড়তে গিয়ে ঘটে যায় বিপত্তি। পাথর ছোড়ার সাথে হাত ফসকে যায়। পড়ে যাওয়া থেকে বাচতে একটা ডাল ধরে সেটা ভেংগে একেবারে সোজা নিতুদের টিনের চালে। মাঝরাতে বিকট আওয়াজ। কে একজন বলে, ওরে বাবা গাছপালা ভেংগেচুরে টিনের চালে সম্রাট নামছে। বাচতে চাইলে পালা। দৌড়ে পালানোর শব্দ আরেফিনের কানে আসে।
চালের উপর কয়েক ডজন ঘুরপাকের পর মাটিতে আছড়ে পড়ে আরেফিন। কিছুক্ষণ মাটিতে পড়ে থাকে। যখন উঠে বসে তখন হুড়মুড় করে দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন মারুফ সাহেব। টর্চ লাইটের আলো ফেলতেই দেখেন, দরজার সামনে কাদামাটি মাখিয়ে বসে আছে আরেফিন।
চিৎকার করে ধেয়ে আসেন, আজ তোর ভণ্ডামি ছোটাবো। এতো রাতে আমার টিনে ইট ফেলছিস!
হাতের টর্চ লাইট দিয়ে একের পর এক আঘাত করেন। আরেফিন বলতে থাকে, আমি ইট ফেলিনি ভুত সম্রাট টিনের চালে আছড়ে পড়েছে। মারুফ সাহেব আরো রেগে যান। হাত, পা, পিঠ, মাথা কিছুই বাদ পড়েনা । অল্প সময়ের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আরেফিন। একটু পরেই ঘর থেকে দৌড়ে বের হয় মারুফ সাহেবের স্ত্রী ও মেয়ে নিতু। দুজনা অনেক জোরাজুরি করে থামান। নিতু কাঁদতে কাঁদতে বলে, ও মরে যাবে বাবা।
রক্ত, মাটি ও বৃষ্টি ভেজা শরীর। নিতু মেয়েটা কাদে কেন! তিনজন মানুষের তিন রকম আচরণ। একজন ক্ষিপ্ত, তার স্ত্রী মার দেখে সহমর্মিত আর মেয়ে ব্যথিত। শেষতক রাতের গভীরতা উপেক্ষা করে আরেফিন কে ধরাধরি করে বাড়ির দিকে নিয়ে চলে তিনজন মানুষ। আরেফিন কে এভাবে দেখে প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান তার মা। তারপর ঢুকরে কেদে উঠে বলেন, আমার ছেলের এ অবস্থা কেন?
- সেটা আপনার ছেলের কাছ থেকেই শুনবেন।
বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই নিতু বলে ওঠে, বাবা ওকে ডাক্তার দেখানো জরুরী। মারুফ সাহেব ধমকের সুরে বলেন, এতো রাতে ডাক্তার পাবে কোথায়? যাদের কাজ তারা করবে। নিতুর হাত ধরে বাড়ির পথ ধরেন। পেছন পেছন হাটেন তার স্ত্রী।
আরেফিন কে খাটে শুইয়ে দিয়ে তার মা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তোর কি হয়েছে বাবা! কি করে এমন হলো?
আরেফিন জবাব দেয়না। গভীর রাতে কান্নাকাটি শুনে প্রতিবেশীরা জড়ো হতে থাকে। ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে রক্তঝরা স্থান গুলোতে কাপড়ের পট্টি বাধা হয়। কেউকেউ হাত পা তেল মালিশ করে। বেশ উপভোগ্য। আরেফিন ভাবে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, পবিত্র, উপভোগ্য দৃশ্য হলো - মানুষের দ্বারা মানুষের উপকার। সেবা।
কানেকানে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের ভীড় বাড়ে। আরেফিন শুয়ে আছে। কালু, নিলুর দলও এসেছে। কেন মারলো, কে মারলো? কিছুটা উত্তেজিত কালু। এরা ধান্দায় থাকে। কিছু একটা ঘটলে সেখানে তাদের উপস্থিতি অনিবার্য।
আরেফিন কালুকে ইশারায় ডাকে। কালু মুখের কাছে কান দেয়। আরেফিন ফিসফাস করে বলে, ভাই আমি ভাবলাম মাস্টার সাবের বাড়ি চুরি করতে যাবো। কিন্তু ভাই!
কালুও ফিসফাস করে বলে, কিন্তু কি!
- কিন্তু যেই না বাড়ির সামনে গেছি...
- হ্যা।
- বিরাট এক আগুনের দলা ধপ করে আমার সামনে এসে পড়লো।
- তারপর! কালু ঘেমে যাচ্ছে।
- তালগাছের মতো একটা দানব। চোখে আগুন। বিকট গর্জন ছেড়ে বলে, আমার নিলুর বাড়ি। নিলু কে আমি ভালোবাসি। তুই এসেছিস এ বাড়ি চুরি করতে। বলেই এক আছাড়.....
কথা শেষ না হতেই কালু উঠে দাঁড়ায়। আচ্ছা যাই।
নিলু, সাগর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যাবে মানে! ছেলেটাকে মারলো বিচার হবেনা?
কালু এক ঝটকায় হাত সরিয়ে পড়িমরি করে বেরোয়। যেতে যেতে বলে, বিচার! আগে তো নিজে বাচি। জোরে জোরে কলেমা পাড়ে। সে শব্দ বেশ দূরে যাওয়ার পরও আরেফিনের কানে আসে। ওভাবে করে কালুকে চলে যেতে দেখে নিলু, সাগর দাঁড়ায় না। তারাও পেছনে ছোটে। মাস্তানদের ভয়ে পালাতে দেখে আগন্তুক এলাকাবাসী বুঝে নেয়, ঘটনা জটিল। ভয়াবহ। তারাও আস্তে আস্তে কেটে পড়ে। আপন মনে হাসে আরেফিন। বিড়বিড় করে বলে, মানুষের দল, প্রিয় প্রতিবেশী।
মা কাছেই ছিলেন।কিছু বুঝে উঠতে পারেননা। তুই চুরি করতে গিয়েছিলি!
- হ্যা, চোর কি মানুষ না?
- ছিঃ, ভাবতে লজ্জা হচ্ছে তুই আমার সন্তান।
রাতেই তার মামার কাছে ফোন করেন। ভাগ্নে চোর হয়েছে। ভুতে আছড়িয়ে কি করেছে দেখে যা, নিয়ে যা।
ভদ্রলোক আশ্বস্ত করেন। অনেক আঁকাবাঁকা কথার পরও মা দূরে যাননি। আরেফিনের পাশে নির্ঘুম রাত কাটে তার।
মারুফ সাহেব ভয়ে ছিলেন। কি জানি কি হয়! সকালবেলা যখন মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া কথাটা কানে আসে আরেফিন কে ভুতে আছাড় মেরেছে। একেবারে খুশিতে আটখানা। মারবেই তো, বদটা সারাদিন গাছেগাছে, আগানে বাগেনে যা করে ওকে ভুতে আছাড় মারবে না তো মারবে কাকে। মুখে অনেক কথা বললেও মারুফ সাহেব হিসাব মেলাতে পারেননা।
চারদিন পর মামা আসেন। ভাগ্নেকে মনে হয় নিজেই একটা ভুত। সাদা ভুল।প্রায় সারা শরীরে ব্যান্ডেজ লাগানো।
মমতা নিয়ে বলেন, এখানে আর থাকতে হবেনা। কালই আমার সাথে ঢাকা যাবি। অনেক বোঝানোর পর রাজি হয় আরেফিন। সেখানে গাছ না থাকলেও বড় বিল্ডিং আছে। অনেক উপরে আকাশের কাছাকাছি যাওয়া যায়! দেখা যায়।
আরেফিন ঢাকা চলে যাচ্ছে। বিদায় বেলা নিতু ছুটে এসেছিল। মুখের দিকে তাকিয়ে একটা মিনতিপূর্ণ আবেদন ছিল, আরেফিন লেখাপড়া শিখে ওদের দেখিয়ে দিন না, আপনি কতোটা পারেন। আরেফিন নিতুর দিকে তাকায় না। মামার সাথে শহরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। সেই যে আসা দশ বছরে আর গ্রামে যাওয়া হয়নি। মাঝেমাঝে মা এসেছে। দশ বছর পরের আরেফিন এখন ডাক্তার।গ্রামে যাবে। নদী, গাছ, মা আর নিতুর কথা মনে পড়ে খুউব।



advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement