ভাই বোনের গল্প

ভাই/বোন সংখ্যা

Gazi Saiful Islam
  • 0
  • ৩৫৮৫
পিয়াস তোহফা ভাই বোন। পিয়াস বড়। বয়স এগারো। আর তোহফা ছোট। বয়স সাত। একদিন সময় মতো পড়তে না বসার জন্য তাদের আম্মু রাগ করে পিয়াসকে মারতে লাগলেন। তোহফা কাছেই ছিল। পুতুল কোলে। ভাইয়াকে মারতে দেখে তার খুব খারাপ লাগছে। ভাইয়ার সঙ্গে সেও কাঁদছে। বলছে, আম্মু ভাইয়াকে আর মেরো না। ভাইয়াকে মাফ করে দাও।
ছোট একটা কঞ্চি দিয়ে তাদের আম্মু পিঠাচ্ছিলেন তার ভাইয়াকে। সে যখন ভাইয়াকে বাঁচাতে গেল একটা বাড়ি তারও হাতে লাগল। এতে দাগ পড়ে গেল।
মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে পিয়াস দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে একটা ঝাকড়া মাথা কাঁঠাল গাছ। সে ওই নিচে দাঁড়িয়ে খুব কাঁদল। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ লাল হয়ে গেছে। চোখের পানি পড়ে বুকের কাছে জামা ভিজে গেছে। ঘেমে কাঁদা হয়ে গেছে তার শরীর। অনেকক্ষণ কান্নার পর সে কাহিল হয়ে পড়ল। তবু কান্না তার থামছে না। রাগের সময় কারো কাছে যেতে নেই। তোহফা এটা না জানলেও এ সময় ভাইয়ার কাছে যেতে সাহস করছে না। যখন তার কান্না ও কষ্ট অনেকটা কমে এসেছে তোহফা গিয়ে তার কাছে দাঁড়াল। সে তার ভাইয়াকে নিজের হাতের বাড়ির দাগটা দেখিয়ে বলল, আম্মু না আমাকেও মেরেছে। এই দেখো বাড়ির দাগ।
পিয়াস কোনো কথা বলল না। তোহফার কথা শুনতে তার ভাল্লাগছে না। তবে তাকে মারার সময় সে যে আম্মুকে আর না মারার জন্য অনুরোধ করেছে এ জন্য সে তার কাছে মনে মনে কৃতজ্ঞ। এ জন্যই অন্যসময়ের মতো ধমক দিচ্ছে না। অন্যসময় হলে বলত, যা ভাগ। আর তাতেই তোহফা ভে করে কেঁদে ফেলত। আর মায়ের কাছে গিয়ে নালিশ করত, ভাইয়া মেরেছে।
আজ সে তার চেহারার মধ্যে একটা উদাসীনভাব ফুটিয়ে তুলল। একবার সে তার কোলের পুতুলটার দিকে তাকাল। সুযোগ পেয়ে তোহফা পুতুলটা তার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে কোমল গলায় বলল, তোমার পিঠ নিশ্চয়ই কেটে গেছে। সে আরও এগিয়ে ভাইয়ার একেবারে কাছে গিয়ে বলে, তোমার পিঠটা দেখি ?
পিয়াস খুব সহজেই ঘুরে দাঁড়াল। তোহফা তার জামাটা উঠিয়ে দেখল তিন চারটি বাড়ি প্রায় কেটে গেছে। ফুলে লাল হয়ে আছে। আরেকটু হলেই রক্ত বেরুত
সে বলল, খুব ব্যথা করছে না ভাইয়া ?
হ্যাঁ, মাথা নাড়ল পিয়াস।
ইতেমধ্যে সমবয়সী আরও কটা ছেলেমেয়ে তাদের কাছে এসে দাঁড়ালে পিয়াস ধমক দিয়ে বলল, যা ভাগ।
ছেলেমেয়েরা চলে গেল।
তোহফা বলল, চলো ভাইয়া আমরা অন্য কোথাও চলে যাই। না হলে আরেকদিন আম্মু তোমাকে মেরেই ফেলবে।
এতক্ষণই পিয়াস কাঁঠাল গাছটার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তোহফার কথায় তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তার এবারকার কথাটা যেন মনে ধরল। কোনোকিছু চিন্তা না করেই বলল, চল্‌।
কিন্তু কোথায় যাব?
শুনেছি ওইদিকে কাছেই একটা নদী আছে। নদীর পাড় ধরে শুধু জঙ্গল। জঙ্গলে আছে সাপ, শকুন, শিয়াল, বাঘ। চল্‌ আমরা ওইদিকেই যাই।
আমার তো শুনেই ভয় করছে। বাঘ যদি আমাদের খেয়ে ফেলে?
ক্ষতি কী? আম্মুর হাতে আর মার খেতে হবে না।
হ্যাঁ, ঠিক। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমরা খাব কী?
ভয় নেই, খাবারের ব্যাপরটা ওখানে গিয়েই দেখা যাবে।
ঠিক আছে চলো। তারা হাঁটছে আর কথা বলছে।
পিয়াস বলল, শোন, ওই নদীতে নাকি প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। বনে আছে লাকড়ি। আমি মাছ ধরে দেব তুই রাঁধবি। পেট ভরে মাছ খেয়ে শুয়ে থাকব। জঙ্গলে পাওয়া যায় অনেক ফল। যেমন কলা-ডেওয়া-ডেহল-বুবি-জাম। আরও কত কি। যত ইচ্ছা খাওয়া যাবে। প্রথম প্রথম আমরা না হয় ওসব ফল খেয়েই দিন কাটিয়ে দেব।


(দুই)

পড়তে না বসার জন্য পিয়াসকে হঠাৎ এভাবে মারায় তার আম্মুর খুব খারাপ লাগছিল। একটু আগেও উঁকি দিয়ে দেখলেন, কাঁঠাল গাছের নিচে ছেলেমেয়ে দুটি দাঁড়িয়ে আছে। একবার মনে হলো গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবেন। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি না। এখন গেলে আরও রেগে যাবে। আবার মারার কথাটা সহজে ভুলে গেলেও চলবে না। তাহলে ভয় দেখিয়ে পড়া আদায় করা যাবে না।
এভাবে ভাবতে ভাবতে আরও কিছুক্ষণ কেটে গেলো। দুজনের জন্য একটা ডিম ভেজে দুভাগ করে রাখলেন। দুধ গরম করলেন। রান্না যত শেষ হচ্ছে ততবেশি খারাপ লাগছে। এতটা নিষ্ঠুর হওয়া ঠিক হয়নি। আহা! আব্বুটাকে আমার এত জোরে বাড়ি না দিলেও চলত। নিজেই তিনি এবার কেঁদে ফেললেন এবং দৌড়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেউরি কাছে গিয়ে দেখলেন কাঁঠাল গাছতলে দুভাইবোন নেই। বুকটা ছাৎ করে উঠল। কোথায় গেছে? ওদিকে একটা ছেলে একটা ছাগল টেনে মাঠের দিকে যাচ্ছে। তিনি ছেলেটার কাছে ছুটে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, পিয়াস তোহফারে দেখছিলেরে ইউনুছ?
“না। তারা তো অনেক আগেই গাছতলতে চইলা গেছে।”
কোনদিকে গেছে?
“ওই দিকে, ঠিক জানি না।” ছেলেটি হাত তুলে অস্পষ্ট ইঙ্গিত করে কোনদিকে বোঝালো সেই জানে।
এবার তিনি পুকুরপাড়ের দিকে ছুটে গেনেন। চারপাশে তাকালেন। আরও কটি ছেলেমেয়েকে দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এই তোরা পিয়াস তোহফাকে দেখেছিলেরে?
একজন বলল। হ, আমি একবার দেখছিলাম। গোপাটের রাস্তা দিয়া দুই ভাইবইন হাঁইটা যাইতাছে। জিগাইলাম, কই যাছরে তরা। কিছুই কইল না। পিয়াস আমার দিকে তাকাইল। কিন্তু তোহফা টাইনা লইয়া গেলো।
বুক ফেঁটে কান্না আসছে তাদের আম্মুর। তিনি কান্না চেপে পাগলের মতো ছুটছেন। কিন্তু কোনদিকে যাবেন? কিছুই তো জানা নেই। যতদূর চোখ গেলো চেয়ে দেখলেন কিন্তু কোথাও দুভাইবোনকে দেখতে পেলেন না। তিনি সেই কাঁঠাল গাছটির নিচে গেলেন। এবার তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। যেখানে হেলান দিয়ে পিয়াস দাঁড়িয়েছিল গাছের সেই জায়গাটায় তিনি হাত বুলিয়ে দিলেন। অশুভ একটা চিন্তা মনে উঁকি দিল।
ওরা কি অভিমানে পুকুরে ডুব দিয়েছে? তিনি পুকুরের পানির দিকে তাকালেন। কিন্তু পানি নিস্তরঙ্গ। এবার গাছের ওপরে ডালের দিকে তাকালেন, ওখানে তিনটি ডালের ফাঁকে তোহফার পুতুলটা রাখা আছে।
এবার তিনি পুতুলটা নামিয়ে বাসার দিকে ছুটলেন।
পিয়াসের আব্বু বাড়িতে নেই। অফিসে। ফিরবেন সেই সন্ধ্যের পর। তাদের আম্মু মোবাইলে ফোন দিয়ে সব কথা বললেন। সব শুনে তাদের আব্বু গেলেন রেগে। বললেন, আমি কিছুই শুনতে চাই না। আমার ছেলেমেয়েকে খুঁজে বের করো। তুমি তাদের মেরেছ, তুমিই ফিরিয়ে আন। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আমার সন্তানদের দেখতে চাই। এবার তিনি আরও অসহায়বোধ করছেন। প্রতিজ্ঞা করছেন আর কোনোদিন ওদের মারবেন না।
যেহেতু ছেলেমেয়েরা না খেয়ে আছে তিনি নিজেও না খেয়ে সারাদিন এখান থেকে ওখানে, কখনো বাড়ির ভেতরে কখনো বাহির বাড়ির ওঠোনে, কখনো কাঁঠালগাছ তলে হেঁটে হেঁটে অসহায়ভাবে কেঁদেছেন। কিন্তু ছেলেমেয়ের কোনো খবর পেলেন না।

(তিন)

হাঁটতে হাঁটতে দুভাইবোন খুব কাহিল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তোহফা।
ভাইয়া আর পারছি না। খুব খিদে পেয়েছে, পানির তিয়াসে বুক ফেঁটে যাচ্ছে।” সে তার ভাইয়ার হাত ধরল। লক্ষ্মি বোন আমার, আরও কিছুটা পথ আমাদের যেতে হবে। মনে হচ্ছে, ওই একটা বাজার। আমার কাছে টাকা আছে। রাতে আব্বু দিয়ে দিয়েছিলেন। ওখানে গিয়ে তোকে কিছু কিনে দেব।
কিন্তু বাজার তো অনেক দূরে। ওখানে আমি যেতে পারব না। দেখো, আমি একটুও হাঁটতে পারছি না ...। আমি বরং এখানেই বসি। তুমি গিয়ে কিছু কিনে নিয়ে এসো।
এখানে না। ওই যে নদীর পাড় দেখা যায়। ওখানে কত গাছ। গাছের ছায়ায় তুই বসবি।
কিন্তু ওটা যদি একটা জঙ্গল হয় আমি তো ভয় পাব।
জঙ্গল আরও দূরে। ওই দেখ কত আম, কাঁঠাল, নারিকেল গাছ। ওদিকে নিশ্চয়ই ঘরবাড়ি আছে, মানুষ আছে।
আচ্ছা, ঠিক আছে চলো।
না, তুই আমার কাঁধে উঠ। নদীপাড় পর্যন্ত আমি তোকে কাঁধে করে নিয়ে যাই। এই বলে সে সামনে বসে পড়ল। তোহফা দুহাতে তার গলা আকঁড়ে ধরে ঝুলে পড়ল।
নদী তীরে সুন্দর একটা জায়গা পেল তারা। বড় একটা কদম গাছ। গাছটার নিচে সবুজ দুর্বার বিছানা।
তুই এখানে বস। আমি এক দৌড়ে যাব আর আসব।
আচ্ছা যাও। দেরি করো না কিন্তু। তাহলে আমি কেঁদে ফেলব। আম্মুর জন্য খারাপ লাগছে।
কী বলছিস? বাড়ি থেকে চলে আসার জন্য তখন তুই-ই না বললি।
হ্যাঁ বলেছিলাম। কিন্তু এখন যে খারাপ লাগছে।
খারাপ লাগলেও বাড়ি ফেরা যাবে না। এবার আম্মু দুজনকে একসাথে পিটাবে। বলবে, বাড়িততে গেছলে কার লগে কইয়া?
আচ্ছা তুমি যাও, বিস্কুট নিয়ে আসো। আমি এখানে বসে ভাবি। দেখি কী করা যায়।
হ্যাঁ, তুই ভাবতে থাক। আমি বাজারে যাই। একটু দূরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল সে। বলল, সত্যি সত্যি বাড়ি ফিরে যেতে চাস?
হ্যাঁ, আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আব্বু এসে যখন আমাদের দেখতে না পাবে আম্মুর সঙ্গে খুব রাগারাগি করবে। আর বলবে আমার মাকে এনে দাও।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আব্বু তো আবার তোকে একটু বেশি ভালোবাসে। পিয়াস ঠাট্রা করছে।
তুমি ঠাট্রা করছ?
নারে পাগলি। শোন এক কাজ করি। খালি হাতে বাড়ি না ফিরে আম্মুর জন্য কিছু নিয়ে যাই। তাহলে আম্মু খুব খুশি হবে।
কী নেবে?
আমি বিস্কুট আর একটি বড়শি ও সুতো কিনে আনি। সুতোয় বড়শি লাগিয়ে বাঁশের কঞ্চির সঙ্গে বেধে নদী থেকে মাছ ধরব। দেখছিস না নদীতে কত মাছ ভাসছে।
তাহলে তো খুব মজা হয়। কিন্তু টোপ পাবে কোথায়?
সড়কের কিনার থেকে ছোট ছোট ব্যাঙ ধরে নেব। বড়শিতে ব্যাঙ গেঁথে পানিতে ফেললেই মাছ লাফিয়ে ধরবে।
ধ্যাৎ! মাছে কি ব্যাঙ খায় ? তোহফা নাক সিটকাল।
হ্যাঁ, ব্যাঙ মাছের খুব প্রিয় খাবার।
তাহলে যাও। এক্ষুণি বড়শি আর বিস্কুট নিয়ে এসো।
পিয়াস চলে গেলে তোহফা নদীর দিকে পা বিছিয়ে বসে দুহাত গালে ঠেকিয়ে ভাবতে লাগল।

(চার)

বিস্কুট, বড়শি ও সুতো নিয়ে কিছুক্ষণ পরে ফিরে এলো পিয়াস। সে তোহফার সামনে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। এক দৌড়ে গেছি এক দৌড়ে এসেছি। খালি ভয় করছিল তোর জন্য..। তুই কি ভয় পাচ্ছিলি?
হুম, একটু একটু...।
আচ্ছা ভাইয়া, আম্মু তো তোমার ভালোর জন্যই তোমাকে মেরেছে।
হ্যাঁ, তাই বলে চোরের মতো মারতে হয়?
আম্মুর যে রাগটা একটু বেশি। রাগ উঠলে নাকি মানুষের মাথা ঠিক থাকে না।
তা অবশ্য থাকে না।
নে ধর বিস্কুট খা।
কিন্তু পানি পাব কোথায়?
তাইতো! আগে মনে থাকলে টিউবওয়েল থেকে পলিথিনে করে নিয়ে আসতাম।
আচ্ছা খা, পানির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। নদীর পানি খেয়ে নেব।
আনবে কিভাবে?
দুহাতের চেউল ভরে উঠিয়ে আনব। আগে আমি খাব পরে তোর জন্য নিয়ে আসব।
যাও, হাতে করে কি পানি আনা যায়?
যাবে না কেন? একটু একটু করে আনব। দুবারে না হয় তিনবারে আনব। তুই যত খেতে পারিস।
দুটো বিস্কুট খেয়েই তোহফা বলল, ভাইয়া পানি।
যাহ! দুটো খেয়েই?
হ্যাঁ, পানি ।
তুইতো দেখছি আমাকে খেতে দিবি না। সে বিস্কুট নামিয়ে রেখে নেমে গেল নদীতে। কিন্তু দুহাত পেতে যতবার পানি ওঠায় ততবার পড়ে যায়। একবার খুব চেষ্টা করে কয়েক ফোঁটা পানি আনল। বলল, চল্‌ পানির কাছে গিয়ে খেয়ে নিবি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে তোহফা পানির কাছে গেল। ঠাণ্ডা নীল পানিতে হাত দিয়ে তার খুব ভালো লাগল। নিজেই নিজের মুখে পানি উঠিয়ে নিল। এবার সে খুশিতে হাসতে লাগল। দুহাতে পানি ছুঁড়ে মারল তার ভাইয়ার শরীরে। কী মজা ভাইয়া তোমাকে ভিজিয়ে দিয়েছি।
তারা এবার আগের জায়গায় ফিরে এলো। কিন্তু পিয়াসের বিস্কুট চলে গেছে কাকের ঠোঁটে। বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে কাক গিয়ে বসল তাদের মাথার ওপর কদম গাছের ডালে। পিয়াস কাকটার দিকে একটা ডিল ছুঁড়ে মারল। বলল, দেখলি তোর লাগিই বিস্কুটগুলো কাকের পেটে গেল। যাক, তুই বস। আমি সুতোয় বড়শি লাগিয়ে নিই। এরপর আনব বাঁশের কঞ্চি।
সে একটি শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে এনে ছিপ বানালো এবং বড়শিসহ সুতোটি বেধে দিলো ছিপের চিকন প্রান্তে। এরপর রাস্তার পাশ থেকে ছোট ছোট ব্যাঙের বাচ্চা ধরে এনে বড়শিতে গেঁথে পানিতে ফেলে নাড়াতে লাগল। কিছুক্ষণ নাড়াতেই বড় একটা এক ষৌল মাছ লাফিয়ে উঠল বড়শিটার কাছে।
তোহফা বলল, ভাইয়া আমার ভয় করছে। মাছ ধরতে হবে না। চলো বাড়ি ফিরে যাই।
বলিস কী? মাছ না ধরেই চলে যাব?
আমার যে ভয় করছে।
ভয় করলে তুই একাই চলে যা।
কিন্তু বাড়ি তো অনেক দূরে।
হোক, আমি তোকে সড়কে উঠিয়ে দিয়ে আসব।
না, তোমাকে ছাড়া আমি কিছুতেই যাব না।
তাহলে বস মাছ ধরে নিই। কথা বলতে বলতেই পিয়াস আবার নদীতে বড়শি ফেলল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা ষৌল মাছ বড়শিটা গিলে নিয়ে দৌড় লাগাল। মাছের টানে পিয়াস একেবারে পাড় থেকে নিচে নেমে গেল।
অবস্থা দেখে তোহফা তো প্রায় কেঁদে ফেলে। পিয়াস বলল, আয় আয় ছিপটা ধর। এরপর দুভাইবোন মিলে ছিপটা টেনে ধরে রাখল। মাছটা অনেকক্ষণ ছুটাছুটির পর যখন কাহিল হয়ে পড়ল দুভাইবোন ওটাকে টেনে তুলল পাড়ে। এরপর দুভাইবোন কী খুশি।
কত বড় একটা ষৌল মাছ-তাই না ভাইয়া! তোহফা খুশিতে লাফাতে লাগল।
পিয়াস বলল, শোন, এই মাছ খেলেই তো আমরা তিনদিন কাটিয়ে দিতে পারব। বাড়ি ফিরে যাওয়ার আর দরকার নেই। কী বলিস?
পিয়াসের কথা শুনেই মুখ ভার করল তোহফা।
আরে পাগলি চিন্তা কি আমি এখনই বাজার থেকে ম্যাচ কিনে আনব। জঙ্গল ভরা লাকড়ি -কুড়িয়ে নিলেই হবে। আগুন জ্বালাতে অসুবিধা হবে না।
কিন্তু ভাইয়া বড় মাছটা আম্মু-আব্বুকে ছাড়া খাবে কী করে? আমার মনে হচ্ছে, আব্বু আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।
হ্যাঁ, আব্বু আমাদের খুঁজছে। এতক্ষণ একবারও তুই আব্বুর কথা বললি না কেন?
আমি বললে তো তুমি বলবে, আব্বু আমাকে বেশি ভালোবাসে।
তা ঠিক।
ভাইয়া! আমার মনে হয়, আব্বুর বকা খেয়ে আম্মুও কাঁদছে।
তাহলে এখনই চল্‌। সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরতে পারব।
হ্যাঁ, তাই চলো। কিন্তু আম্মু যদি...
আর মারবে না। খুব ভয় পেয়ে গেছে আজ।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আমিও এখন থেকে ঠিক মতো পড়াশোনা করব। আম্মুকে কষ্ট দেবো না।
এইতো লক্ষ্মি ভাই আমার!
মাছটা পেলে আম্মু খুব খুশি হবে, নারে?
হ্যাঁ, কিন্তু মাছটা নেবে কিভাবে?
কাঁধে করে।
পিছলে পড়ে যাবে না?
জামা খুলে পেঁচিয়ে বেধে নেবো।
আচ্ছা তাই করো। আর দেরি করা ঠিক হবে না।
তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু সমস্যা একটা, পিয়াস আগে থাকলে তোহফা ভয় পায়। আবার পিয়াস পেছনে থাকলে সে নিজেই ভয় পায়। খালি মনে হয়, কোনো কিছু কাঁধ থেকে মাছটা নিয়ে নেবে।
নদী তীর ছেড়ে অনেকটা পথ বাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়েছে তারা। সামনে আরেকটি জঙ্গল। এখানে কিছুটা পথ তাদের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আগে যে কোনদিক দিয়ে এসেছিল এখন কিছুই মনে করতে পারছে না।
জঙ্গলের পথটায় পা রাখতেই দুটো বেজি সামনে পড়ল তাদের। ছোট ছোট গাছের আড়াল থেকে তাদের দিকে উঁকিচুকি মারছে ওরা। তোহফা ভয় পেয়ে তার ভাইয়ার হাতের নিচে চলে এলো। ভাইয়া বেজি!
কী সুন্দর তাই না? যদি পোষ মানত আমি বেজির বাচ্চা পালন করতাম।
হ্যাঁ, বেজির বাচ্চা পালতাম আর প্রতিদিন আম্মুর হাতে মার খেতাম।
যাহ্‌, তখন তো আমি পড়া শিখতাম।
তাহলে এখন শেখো না কেন?
আম্মু যে আর কিছুই করতে দেয় না। বেড়াতে নিয়ে যায় না, ফুটবল খেলতে দেয় না, পাখির বাচ্চা পালতে দেয় না। আমার কত সখ একটা লাল ঠোঁট টিয়ার বাচ্চা পালন করব।
জঙ্গলের পথ। আঁকা-বাঁকা। উঁচ-নিচু। ছোট-বড় গাছে ছাওয়া। তোহফা হাঁটতেই পারছে না। বারবার পড়ে যাচ্ছে। কেঁদে ফেলে আর কি।
কাছেই কোথাও ব্যাঙে সাপ ধরেছে। ব্যাঙটা কঁ-ঙ কঁ-ঙ শব্দে কাঁদছে।
ভাইয়া কিসের শব্দ?
সাপ ব্যাঙ ধরেছে।
কেন ধরেছে?
সাপ যে ব্যাঙ খায়। তোকে না একটু আগেই বলেছি।
বলেছ তো মাছে ব্যাঙ খায়। মনে হচ্ছে, ব্যাঙটার খুব কষ্ট হচ্ছে।
হ্যাঁ, কান্না শুনে মনে হচ্ছে বেশিরভাগটা গিলে ফেলেছে।
ভাইয়া জঙ্গলের পথে আর ভাল্লাগছে না।
আরেকটু হাঁটলেই শেষ।
এবার দুটি সজারু শরীরের কাঁটায় ঝুনঝুন শব্দ তুলে দৌড়ে পালিয়ে গেলো তাদের সামনে দিয়ে। একটা কাঁটা ছিটকে পড়ল।
পিয়াস গিয়ে লম্বা কাঁটাটা হাতে তুলে নিয়ে বলল, পেয়ে গেছি ডেগার। এখন আর আমি কোনো কিচ্ছুরে ভয় পাই না। সে ওটা তার হাফপ্যান্টের পকেটে রেখে দিলো।
সন্ধ্যের একটু আগে তারা জঙ্গল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। সামনে একটা বড় মাঠ। পিয়াস বলল, ওই যে কালো গ্রামটা দেখা যায় ওটাই আমাদের গ্রাম। ভয় নেই, সন্ধ্যের আগেই আমরা বাড়ি পৌঁছে যাব।
নিজেদের গ্রামটা দেখে তোহফা খুব খুশি। বলল, ভাইয়া আর হাঁটতে পারছি না।
লক্ষ্মি আপু আরেকটু হাঁট। এই যে আমার হাত ধর।

(পাঁচ)

মাঠের প্রান্তে বাড়ি দেখা যায়। ওখানেই একটি লাউয়ের মাঁচার খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের আম্মু। উদাস চোখে তাকিয়ে আছে দূরের মাঠের দিকে।
ভাইয়া ওই যে আম্মু।
তাইতো।
দেখলে ভাইয়া আম্মু আমাদের কত ভালোবাসেন?
হ্যাঁ, কিন্তু আব্বু কোথায়?
আব্বু হয়তো আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছেন।
আহা! আব্বুর আমাদের জন্য পথে পথে ঘুরছেন। সত্যি খুব ভুল হয়ে গেছেরে। এভাবে রাগের মাথায় বাড়ি ছেড়ে চলে আসা ঠিক হয়নি।
এতক্ষণে বুঝলে তাহলে?
চুপ! তুই-ই তো প্রথম বললি, চলো আমরা কোথাও চলে যাই।
হ্যাঁ, কিন্তু তুমি তো বড়, তুমি না করলেই পারতে।
তারা বাড়ির আরও কাছাকাছি চলে গেছে। তাদের আম্মুও তাদের দেখতে পাচ্ছেন। তিনি জোরে জোরে কেঁদে উঠলেন, চিৎকার করে ডাকলেন, পিয়াস! তোহফা!
তোহফা তার ভাইয়াকে রেখেই দিলো দৌড়। সে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার মাযের বুকে। কিন্তু মাছ কাঁধে পিয়াস হাঁটতে পারছে না। সে কোনো রকমে মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল। অভিমানে ঠোঁট ভেঙে আবার কাঁদতেও লাগল। তার আম্মুই তাকে জড়িয়ে ধরল।
আমার বাবা, আমার লক্ষ্মি বাবা! কিন্তু এই মাছ কোথায় পেলি?
নদীতে বড়শি দিয়ে ধরেছি। পিয়াস বলল।
তোদের ভয় করেনি?
একটুও না। যখন মাছটা ধরল তখন অবশ্য একটু ভয় পেয়েছিলাম। তোহফা তো প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল।
ভাইয়া!
সত্যি তো বললাম। আরেকটু হলেই তো তুই ভে.. করতি।
আম্মু ভাইয়া কিন্তু...
বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই আবার দুজন লাগছিস? চল্‌ বাড়ি ভেতরে যাই।
তারা বাড়ি ফিরে গোসল করল। তাদের আম্মু মাছ রান্না করলেন। বেশ রাত করে বাড়ি ফিরলেন তাদের আব্বু। এসেই শুনলেন শুভ সংবাদটা। দুজনকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললেন। বললেন, কতদিন বলেছি আমার সন্তানদের তুমি মারতে পারবে না। কিন্তু আমার কথা শুনলে তো।
আচ্ছা, আম্মুকে মাফ করে দাও আব্বু। তোহফা বলল।
অপরাধ তোমরাও কম হয়নি। কাউকে না বলে বাড়ি ছেড়ে যাওয়াটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।
আমাদেরও মাফ করে দাও আব্বু। আর কোনোদিন এমন হবে না।
ঠিক আছে, সবাইকে মাফ করে দিলাম।
আচ্ছা, মাফ যখন করেছ এবার এদের নিয়ে খেতে বসো। বললেন তাদের আম্মু। দেখো কত বড় একটা ষৌল মাছ ধরে এনেছে ভাইবোন মিলে।
তাই নাকি। তাহলে তো খুব মজা।
এরপর সকলে একসঙ্গে ভাত খেয়ে একটু আগেভাগেই শুয়ে পড়ল। তোহফা-পিয়াস আম্মু-আব্বুকে মাছ ধরার গল্প বলতে বলতে কখন যে ঘুমিয়ে গেল কেউ জানতে পারল না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ওয়াহিদ মামুন লাভলু জীবন ও বাস্তবতার গল্প। খুব ভাল লিখেছেন। শ্রদ্ধা জানবেন।

২৪ মার্চ - ২০১১ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বাংলা - আমার চেতনা”
কবিতার বিষয় "প্রেম”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৮ জানুয়ারী,২০২২