চৈত্রের খর দুপুর।ঘর্মাক্ত বালিশ ভেজা তন্দ্রায়িত চোখ,খটখট শব্দে হঠাৎ চোখ মেলে দেখি, মা আমার সেলাই মেশিনে কাস্তমারদের কাপড় সেলাই করছে।বললাম, মা একটু ঘুমিয়ে নাও না- মা বলে নারে তোরা ঘুমা। স্কুলের পরা আছে না? সংসারে সহযোগিতার হাত ছিল মায়ের অসীম। কাপড় সেলাই,গবাদি পশু পালিন,ছোট বাচ্চাদের পড়ান, এসব কটাই ছিল মায়ের অর্থ আয়ের উৎস।বাবা সেনাবাহিনিতে কর্মরত ছিলেন,বীর মুক্তিযোদ্ধাও বটে। তবে ঐ বেতনে আমাদের জাহাজের মত পরিবার চলতে হিমশিম খেত।দাদু, ঠাম্মা ,পিসিরা ২ জন,আমরা ৩ ভাইবোন, মা সহ মোট ৮ জনের সংসার। তন্মধ্যে মোটামুটি সকলেই পড়াশুনাই রত। দাদু ছিলেন ১১ বছর শয্যাশায়ী-যক্ষা রোগী। একবার দাদু এমন অসুস্থ হোলো সবাই বলল মরেই যাবে,অথচ মায়ের হাতের যাদুকরি সেবার কাছে হার মানল যমদূত। ফিরিয়ে আনল দাদুকে বাড়িতে। হাস্পাতালে থাকতে ডাক্তার –নার্সরা বলতেন,আপ্নার মেয়ে তো নয় যেন লক্ষি প্রতিমা এত স্বাচ্ছন্দ্যে এমন রোগীর সেবা করা সত্যিই অবাক করা। ছাড়পত্র দেবার দিন ডাক্তার হেসে বললেন,যান নিশ্চয়ই এখান থেকে আপনার মেয়ের হাতে অনেক সুস্থ সবল থাকবেন আর আসতে হবেনা।
দাদু তখন ছলছল আঁখিতে হেশে বললেন ও আমার মেয়ে নয় “বৌমা” আর আমার অন্য জন্মের গরভধারিনি “মা “। ঠাম্মা ও আনন্দাস্রু ত্যাগে তাই বলল।
গ্রামের লোকেরা দাদুর প্রতি মায়ের সেবা দেখে প্রায় বলত অরে বাবা এ কি মানুষ না ফেরেশতা! আমরা ভাইবোনেরা মায়ের হাতে খেতে চাইতাম না,গা ঘিন ঘিন লাগত। মায়ের কোলেই দাদুর মৃত্যু হল।
মনে পড়ে আমাদের দুটি গাভী ছিল।একটার নাম সরস্বতী (ওটা আমার),আরেকটা লক্ষি (দাদার)।মাকে দেখতাম তাদের কে ও মাতৃ স্নেহে যত্ন নিত। শীতের দিনে চট সেলাই করে ওদের গায়ে জড়িয়ে দিত যেন ওরা শীতে কষ্ট না পায়। বর্ষাকালে পায়ের খূড় গূলো খূব ভালো করে পরিষ্কার করতো।
আত্মীয় স্বজন যে যখন এসেছে,দেখেছি মাকে হাসিমূখে বরন করতে।ভরদুপুরে হঠাৎ ৪/৫ জন এসে হাজির; মাকে দেখিনি এতোটুকু বিব্রত হতে । এমন ও হয়েছে আমার পিসেমশাই এসেছেন,রাতে –ঠাম্মা বলল কি দিয়ে ভাত দিবে বৌমা? মাংস— নাহলে,ইতস্তত স্বরে -মা আমার ঘুমন্ত প্রিয় মোরগটাকে দিয়ে দিল। কষ্টে আমি খুব কেঁদেছিলাম।কিন্তু মা আমায় বুঝাল দেখ কিই বা করার ছিল এছাড়া -দেখলাম মা ও কাঁদছে।
অন্যের জন্য বিসর্জন দিতে মায়ের একটু ও কষ্টও হত না।মাকে আমরা “দাতা হাতিম “বলে বেশ খেপাতাম। মা লজ্জায় হাসত। বাজারের টাকা হাতে আছে ৭০০, কেউ ধার চাইল হয়ত ১৫০০ ব্যাস হয়ে গেল সব খুজে দিয়ে দিল। এমন ঘটেছে বহুবার।
প্রত্যহ সূর্যোদয়ের পূর্বে মা ঘূম ঠেকে উঠতেন। ফূল তোলা,ঊঠানে গোবর ছটা, বাসন মাজা,স্নান করে পূজার আয়োজন তখন ও বাড়ির কেঊ ঘূম থেকে উঠেনি । আমি পড়তে ঊঠতাম,দাদা আর পল্লব মহা ফাঁকিবাজ নাম মাত্র উঠা গোঁ গোঁ করে একটু পড়ে আবার ঘুম।আমি ওদের গুঁতো দিয়ে সতরক করতাম-এই ই মা আসল বলে।

দেখেছি মাকে পরিবারের অন্যান্যদের কটূ কথা শুনতে,শুনেছি মায়ের অবমুলাি য়ত হৃদয়ের চাপা কান্না,হাজার করেও অপবাদে ভঙ্গুর চিত্তের মূল্যহীন অভিমান , সহ্য হতোনা আমার যখন দেখতাম বিনা দোষে চরম বকা শূনতে হতো এবং যা হতো অতি অশ্লীল। মা ভয়ে ভয়ে ২ একটা বলতো তারপর দরজা বন্ধ করে দিত। আমি মাকে যুক্তি দেখিয়ে দিতাম মা এ কথার উত্তর এটা বল,মা বলতো ওরা বলুক আমি বলব না সৃষ্টিকর্তা শ্রেষ্ঠ বিচারক।
আজ তাঁর কাছে আমার বিদগ্ধ আত্মার হাহাকারত জিজ্ঞাসা কি কি-সুবিচার করলেন তিনি? কেন,কেন? আমার মায়াময়ী, পরোপকারী,শান্তিপ্রিয়।নিরীহ মায়ের মুখে আজ লেপটে দিলে মহাশোকের কাল করদমা!? যে কিনা সন্তানদের মঙ্গল কামনারথে কাউকেও বড় কথা বলেনি।
সেদিন জানুয়ারী ১৮,২০১০ সোমবার অতি প্রত্যুষে উঠে পরেছি সকলেই । শত্য প্রবাহে পুরো দেশ অন্ধকার। কেমন যেন দিনটা ভাল্লাগছেনা।মা সকাল থেকেই বলছিল মারে আজ এমন লাগতেছে কেন?আমি বললাম কুয়াশারত দিন তাই হয়ত এমনটা লাগছে। বাবা গেছেন বাইরে বাসার অদূরেই কিন্তু মুঠোফোন নেই আমি বেড়িয়ে পড়লাম কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে।গেইট থেকে বেরচ্ছি যেন কেউ পেছন থেকে টেনে ধরে রাখল। পাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে –মাথার উপরে কাকের দল হুম্রি খেয়ে পড়ছে মনে হোল ওরা আমায় কিছু বলতে চায়।
আগের দিন সন্ধ্যায় আমি অফিস থেকে ঘরে ঢুকতেই মা জানতে চাইল, ওমা তোর দাদার সাথে কথা হয়েছে আজ? বললাম না তো কেন মা? মা বলল আমায় যেন ওর গলায় মা,মা, ডাক শুনতে পেলাম বেশ কয়েক বার তাও বেল্কুনি থেকে। হেসে বল্লাম,আসলে তুমি দাদাকে প্রচণ্ড ভালোবাসো তাই ও বাড়ীতে থেকেও যেন তোমার কাছেই আছে-এটা হোল মায়ের অকৃত্রিম ভালবাসা আর স্নেহের প্রতিফলন বুঝলে মামনি। মা ১টা দীর্ঘশ্বাস ফেল্ল,কি যেন নিজের সাথে গুন গুনাল। বেলা ১টা ১৭ মিনিট,হঠাৎ আমার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ধরলাম- হেলো, শুনতে পেলাম বড় মামার বিভৎস চিৎকার –-“সঞ্ছি” আমার ভাগনা পলাশের সংবাদ কি? জানিস কিছু-এতটা চিৎকার বড় মামার গলায় প্রথম সুনে আমি হতবাক; কলজায় একটা সজোরে কামড় পড়ল যা কিনা এই মুহুরতে আমার লিখনির মাঝে ঘটে যাচ্ছে।
আমি দৌড়ে বেড়িয়ে এলাম অফিসের সম্মুখপানে। শুধালাম।মামা কি হয়েছে আমার দাদার-আমায় বলেন। মামা বল্লেন,খবর নে খবের নে –আমি জানি না। হেলো, হেলো –না কোন সাড়া পাচ্ছিনা। ফোন কেটে দিল মামা।
এবার দাদার বউ কে ফোন দিলাম-বউদি দাদা কোথায়? বৌদি আমার কণ্ঠ সুনে হাউমাউ করে বলল আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা সঞ্ছিদি। তোমার দাদার কি হইছে আমারে কেউ কিছু বলছেনা ।আমার ভাবনা ছিল হয়ত দাদা ইলেকট্রিকের খাম্বা হতে পরে গেছে- বড়জোর অজ্ঞ্যান হয়ে পরেছে,বেথা পেয়েছে অক্তান ---কিন্তু!! সঠিক খবর পাচ্ছিনা দেখে দাদার বন্ধু অজিত কে ফোন দিলাম।সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম, আমার দাদাভাই কই- বলেন?
সে আমায় যা বলল –সঞ্ছি,পলাশকে আমরা বাড়ীতে নিয়ে যাচ্ছি তোমরা তাড়াতাড়ি আস। অস্থির হৃদয় থেমে গেল মুহুরতের মধ্যে,নিথর সারা দেহের কল্কব্জাগুলি। শুধু একটা চিৎকার দিয়ে কোথায় যেন পড়ে গেলাম। আমার সহকর্মীরা আমার জ্ঞ্যান ফিরাল। বুঝতে পারলাম কেন বারেবারে ফোন কেটে দিচ্ছিল যখন আমি দাদার ফোনে কল করছিলাম –সিস্টার কথাটা দেখে উদ্ধারকারী লোকজন কেটে দিচ্ছিল ।
বুঝলাম,আমার দাদো,আদরের দাইয়া,প্রিয় ভাইটা আমায় ত্যাগ করে চলে গিয়েছে আর নেই । বহুকষ্টে নিজেরে সংবরণ করে ঢুলে ঢুলে রওআনা করলাম বাসার দিকে। ছোট ভাইটিকে নিলাম সাথে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা দু’’ভাইবোন প্রায় বোবা ।মুহুরতেই মনে পড়ল,চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার কথা। ১১.১৮ বা ১১।২০ মিনিট হঠাৎ ই ধপাস করে পড়ে গেলাম- এ দিক ও দিক দেখলাম কেউ দেখল কিনা,ভেবেছিলাম আমার হয়ত বিপি লো হয়ে গেছে,তাই মাথাটা ঘুরছে।আসলে দাদাভাই তখন ট্রাকের ভারি নির্মম চাকাগুলিতে ছেঁচড়ে রাস্তায় পিষ্ট হচ্ছিল।এই ই তো ভালোবাসা; দাইয়া যে কতটা আমার আমি যে ওর ২য় ভগবান ছিলাম। তাই পৃথিবী ছেড়ে যেতে ও জানিয়ে যাচ্ছিল। মাত্র ৩ দিন আগেও সকাল সাড়ে সাত টায় আমায় ফোনে বলে সতর্ক করছিল “দাদো” আজ সূর্য গ্রহণ লাগবে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিও আর আমার ভাগনা –ভাগ্নিদের খাইয়ে দিও। সেই তো শেষ কথা,চিরজিবনের মত শেষ,আমরন আর শুনতে পাবনা সেই আদুরে প্রীতিপূর্ণ ডাক “দাদো”-পাচ্ছি ও না।

যাই হোক, বাসার নীচ পর্যন্ত গিয়ে থামলাম,প্রায় ৩০ মিনিট সবাই কে ফোন সারলাম, খুব চেষ্টা করছিলাম দু’ ভাইবোনে শক্ত হতে কারন অভিনয় --মায়ের সামনে একটু পরে।কি বলব বুঝে পাচ্ছিলাম না।
কঠিনতর স্বাভাবিকত্ব আনার চেষ্টা করলাম অবয়বে।তবুও কিঞ্চিৎ পূর্বে বয়ে যাওয়া টর্নেডো পুর শরীর আর মুখটাকে ঘিরেই রাখল।
কাপন্ত হাতে ঘরে বেল টিপলাম ।পা দু’খানা ঠকঠক করে কাঁপছে। এখুনি-এখুনি-মা-দরজা খুলবে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে,উফ এ কি মুহূর্ত!!আমি কি করে বলব মাকে যে সে তার কলজার টুকরো ,নয়নমনি প্রথম সন্তানকে হারিয়েছে চিরজীবনের তরে । পৃথিবীতে এত অক্সিজেন ,কই আমিত পাচ্ছিনা।দম আটকে যাচ্ছিল বারেবার।
মা দরজা খুল্ল,না পারলাম না তাৎক্ষণিক মায়ের মুখটা দেখে নিতে। অন্তরে অনুভব হচ্ছিল শ্রেষ্ঠ অপরাধপ্রবনতা যে নিষ্ঠুর সত্যি কথাটি আমাকেই শোণাতে হবে মাকে।মা আমার ছেলেমেয়েদের ভাত খাওয়াচ্ছিল ,আমাদের দু’ভাইবোন কে একসাথে দেখে রিতিমত আঁতকে উঠল। শুধাল, কিরে তোরা একসাথে এই সময়ে? কার শরীর খারাপ ,সঞ্ছি তোর নাকি পল্লুর ? কি কি হইছে বলনা? মায়ের উৎসুক,চিন্তিত জিজ্ঞাসা আমাদের আরও ভরকে দিল।
আমি একদম ধীরে কাধের বেগটা রেখে চেয়ারে মায়ের পাশে বসে বললাম,মা আমি কাপড়চোপড় গুলি গুচাচ্ছি,তুমি ওদের হাত মুখ ধুইয়ে তৈরি হয়ে নাও। বাবা যায়গা নিচ্ছেন ওখানে যেতে বলেছে। মা হা করে তাকিয়ে রইল –কি বলিস পাগলের মত! জায়গার ওখানে বাচ্ছারা কেন? ওটা ছিল পল্লবের বুদ্ধি তাই অগুছালো ই হল।
আমি সাহস নিয়ে বললাম, মা তুমি ভেঙ্গে পরনা তো আসলে দাদার ছোট ১টা দুর্ঘটনা হয়েছে হাসপাতালে আছে আমরা ওখানেই যাব। কিসে-কিসের দুর্ঘটনা-হোন্ডা ? বল আমায় বল। মাকে কি ভগবান তার অন্তরে জানিয়ে দিল যে সে পুরটাই সঠিক বলল! মাথা নেরে হ্যাঁ জানালাম। মায়ের হাত থেকে ভাতের থালা পরে গেল-উফ মায়ের সে কি মলিন,বিদ্ধস্ত অবয়ব যেন ভিতরের ভেঙ্গে যাওয়া হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি ,দুম্রান-মুছ্রান স্বকরুন নম্র আরতনাদ। ওরে তোরা আমায় মিথ্যা বলছিস ।“আমার বাবা নেই।“ আমার পলাশ নেইরে নেই। হোন্ডা একচিদেন্ত হলে আমার বাছা নেই-
ও বাবারে! কত্ত নিষেধ করেছিলাম কেন গেলি বাবারে! ও মানিকরে আজ সোমবারে শিবের উপবাস থেকে তমার চলে যাবার সংবাদ শোনা –এ কি ভাগ্য আমার, আমায় মামনি ডাকবে কেরে, জড়ায় ধরে আদর করবে কে বলরে? জন্মধারিনি,পালনকর্ত্রী,১০ মাস ১০ দিন গরভধারিনি মায়ের বিলাপ কি লিখবো? আমার এই ছোট খাতায় ধরবে কি? আজ হাতড়ে বেড়ায় মা তার সন্তানেরে ডাকে খেতে আয় বাবা দুপুর গরিয়ে গেল,উঠে পড় সোনা বেলা অনেক হোল -সন্ধ্যা রাতি অবিরাম অহনিশি। হয়ত খুঁজবে আমরন –আজীবন,গাইবে বিলাপের গান নিজের মনে সঙ্গোপনে । ভুলিনি আজ ও সেই মুখ যে মুখে ছিল পরিপূর্ণ কোলের স্বাদ। আজ কেবল রিক্ত,অসহায়,অপুরন,ক্ষত ,হাহাকারত,পোড়া হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি দেখি আমার মায়ের মুখে। দেখতে হবে আমরন মায়ের চিরকষ্ট মাখা মুখ।