জানালার ফাঁক গলে আসছে বকুল ফুলের মৌ মৌ গন্ধ, চারিদিকে বইছে ফাগুনের বৃষ্টিস্নাত মৃদু ঝড়ো হাওয়া। সবমিলিয়ে একটা রোমান্টিকতাময় পরিবেশ বিরাজ করছে আসুতোষিক প্রকৃতিতে। সকালের এই মিষ্টিমুখর ভালবাসাময় পরিবেশের দারুণ ভক্ত মিথি। ফাগুনের প্রতিটি সকাল এভাবেই উপভোগ করে ও। আনমনে বসে কত আজানা কাব্যের জন্ম দিয়েছে তার কোন হিসাব মিলাতে পারবে না মিথি। সেসব কাব্যের মধ্যে উঠে আসে ওর জীবনে ঘটে যাওয়া মজার কিংবা বেদনাময় ঘটনার নানা স্মৃতি। তবে অধিকাংশই ভালবাসা কেন্দ্রিক। কারণ মিথি বিশ্বাস করে ভালবাসাকে, মানুষ ভালবাসার পূজারী; ভালবাসা ছাড়া একজন সুষ্ঠ চেতনশীল মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। জীবনের পরতে পরতে ভালবাসার জয়গান জপতে মোটেও দ্বিধাবোধ করে না ভালবাসায় বিশ্বাসী মিথি। ভালবাসাকে ধারণ করে বন্ধুমহল ও এলাকার মানুষদের সাথে মজা করতে দারুণ উপভোগ করে ও। অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে বলীয়ান সু-সংস্কৃতিতে ভারী দক্ষ মিথি। কবিতা আবৃত্তি, সংগীত পরিবেশন, নৃত্য ও খেলাধুলায় অনেক পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছে স্কুল জীবনে। যতই পায় ততই যেন পাওয়ার আকাঙ্খাটা ক্রমেই বাড়তে থাকে ওর মধ্যে। পাওয়ার ব্যাকুলতায় তবুও এগিয়ে চলেছে মিথি। ও এখন কলেজে পড়ে, ওর চলাফেরার মধ্যে বিরাজ করে কলেজ কলেজ একটা ভাব। বেড়ে গেছে পাওয়ার সীমানাটাও।
পড়ালেখায়ও অসম্ভব মেধাবী। এক প্রকার সব্যসাচী টাইপের। কলেজে যাওয়ার পথে প্রায়শই মেয়েদের উত্যক্ত করে কিছু বখাটে। কিন্তু মিথি এগুলো দারুণ উপভোগ করে। সে বখাটেদের স্পষ্টভাবে স্বরণ করিয়ে দেয় দেশের আইন সম্পর্কে, মনে করিয়ে দেয় দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রীরাও নারী। অতএব আমাদের উত্যক্ত করলে আমরা নারীরা খুব সহজে ছেড়ে দেবো না। তবুও ওদেরই গ্রামের সান্টু ও আতিক কিছুতেই মিথির পিছু ছাড়ে না। এলাকায় ওরা বখাটেদের নেতা বলে পরিচিত। ওরা দুজনই প্রভাবশালী এক নেতার ঘনিষ্ট আত্মীয়; যাদের দেখে এলাকার সবাই খুব ভয় পায়। তবে ওরা কখনোই মিথিকে নিয়ে বাজে মন্তব্য কিংবা কটুক্তি করে না। কারণ একটাই, আতিক মিথিকে ভালবাসে। সে মুখে না বললেও ইশারা-ইঙ্গিত আর কথাবার্তায় বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। মিথি তার চাল-চলন, মার্জিত কথাবার্তা ও সু-বুদ্ধি প্রয়োগ করে ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে মোটেও ভুল করে না। ওদের প্রতিদিনের রুটিন হলো মিথিদের কলেজের পথের পাশের একটি শতবর্ষী বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকো ওর সাথে কথা বলার আশায়। আজও এর হেরফের হলো না। ওদেরকে দেখে মিথিই আগে ওদের সাথে কথা বললো-
-- ভালো আছেন ?
-- কাকে বললে, আতিক।
-- সবাইকে।
-- ও তাই! আমি ভাবছিলাম আমা ......ক.......এ, ম্রীয়মান কন্ঠে বললো আতিক।
-- আচ্ছা আতিক ভাই, আপনি তো আমার বড় ভাইয়ের মত। তাই বড় হিসেবে ছোট বোনের দু-একটি আবদার থাকতেই পারে। আর দুএকটি আবদার কভার করার মত ক্ষমতাও নিশ্চয়ই আপনার আছে।
-- তাতো আছেই, হেহেহে।
-- জটপট বলে ফেলো তোমার আবদার, বললো সান্টু।
-- মিথি তোমার যেকোনো আবদারই আমি জীবন দিয়ে হলেও পূরণ করতে পারবো।
-- না আতিক ভাই আপনারা যে আমাকে কত ভালবাসেন তা আমি ঠিকই বুঝি। তবে আমার আবদার পূরণ করতে আপনাকে যে জীবন দিতে হবে না, এইটুকুর গ্যারান্টি আমি দিতে পারি। তবে রক্ত-টক্ত একটু ঝড়তে পারে আর কি।
-- আরে বলো কি, রক্ত... র..... গম্ভীর হয়ে বললো সান্টু।
-- এই বাচাল চুপ কর, ধমকের সুরে বললো আতিক সান্টুকে।
-- মিথি তুমি কি যেন বললে ভালবাসার ব্যাপারে। সবাইকে মানে ?
-- হ্যাঁ, সবাইকেই তো।
-- বলো আমাকে।
-- আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে, আমার কথাগুলো আগে শুনুন।
-- বলো-
-- আমরা মেয়েরা কলেজে আসতে পারি না রাস্তার বখাটেদের উৎপাতে। ওরা আমাদেরকে নিয়ে নানা অশালীন কটুক্তি করে। যা মোটেও আপনার মত সভ্য বড় ভাই থাকতে কাম্য নয়। আপনি এই বিষয়টা একটু সু-নজরে দেইখেন।
মিথির সামনে ভদ্র ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করলেও তবুও মাঝে মাঝে কেমন যেন কথা আতিকের জটলা পাকিয়ে যায়। মিথি চলে যাওয়ার পরেই শুরু হয়ে যায় ওর ভিলেন টাইপের ডায়ালগ।
-- আরে তোমাকে তো কারোর বিরক্ত করার কথা না, কে বিরক্ত করে, শুধু এইটুকু বলো।
-- শুধু আমাকে করবে কেন, সব মেয়েদেরকেই তো ওরা বিরক্ত করে বেড়ায়। যাই ওদিকে আবার ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।
-- এই সান্টু আমার মিথিরে কে ডিস্টার্ব করে রে, জানিস তুই ?
-- ক্যা তুই জানিসনে, আনিসরা।
-- আনিসরে তুই ফোন দে। তোর কথা না শুনলে আমারে ধরাইয়া দিস।
-- আচ্ছা।
মিথি ক্লাসের পড়া বরাবরই তৈরী করে আসে। সবার আগে আগে হাত তোলে। কিন্তু আজ আর সবার আগে হাত তোলা হল না ওর। ওকে টপকিয়ে পড়া বলতে সবার আগে হাত তুললো মৃদুল। গড়গড় করে পড়া বলে দিয়ে ক্লাসে একপ্রকার হিরোই হয়ে গেল সে। ক্লাস শেষে মৃদুলকে একটি ধন্যবাদ দিলো মিথি। মিথির এমন আচরণে মৃদুল তো বটেই ওর সাথে থাকা সব বান্ধবীরাই রীতিমত অবাক বনে গেল। কমনরুমে ওর বান্ধবী সুমনা বললো- এই মিথি মৃদুলকে তো তুই সহ্যই করতে পারিস না, আর সে মৃদুলকেই কিনা তুই.....।
-- আরে ওসব তোরা বুঝবি না। ধন্যবাদ দিতে কোন টাকাও লাগে না আবার পয়সাও লাগে না। তাছাড়া ও যে কাজ করেছে তাতে কি আমার ধন্যবাদ দেওয়াটা কি অনুচিত হয়েছে ? যদি অনুচিত হয় তাহলে ফেরত নিয়ে আসি।
-- না না আমি তা বলছি না।
-- দেওয়ার দরকার দিলাম বুঝবে ও মজাটা। আর ওদিকে আতিক ও আনিস গ্রুপের মধ্যে দিছি গিরিঙ্গি বাধিয়ে।
-- কেমন করে রে ?
-- পরে বলবো।
কলেজ শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে দেখলো আজ বটগাছ তলায় সান্টু আর আতিক নেই। মিথির আর বুঝতে বাকি থাকলো না যে তার দেওয়া ডোজে কাজ হয়েছে, এ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে এতক্ষণে ঠিক এ্যান্টিবায়োটিকের মত। দিছি প্যাঁচ লাগাইয়া, বিড়বিড় করে বললো ও। উৎফুল্ল মনে বাড়ি ফিরে প্রতিদিনের মত আজও ওর ফুলের বাগানে পানি দিতে গেল। বাগানটা দেখে ওর খারাপ মনটা ভাল হয়ে গেল আপনাপনিই। কারণ ওর বাগানটা আজ খুব সুন্দরে সেজেছে। ৮ জোড়া ৪ রঙ্গা গোলাপ ফুলগুলোর সৌন্দর্যে বিমোহিত হচ্ছে সবাই। এমনকি মিথিও। বাগান থেকে একচিলতে ভালবাসা পেয়ে ওর বুকটা আনন্দে উতলা হয়ে গেলো। এমন সময় ফোন-
-- হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন ?
-- আমি মৃদুল।
-- কি অবস্থারে, ভাল আছিস ?
-- জানি না।
-- কেন রে আজকে তো তুই আমাকে বোল্ট করে দিলি। তোর তো ভাল থাকার কথা।
-- নারে আমি কাউকে কষ্ট দিয়ে ভাল থাকতে পারি না।
-- ও তাই !
-- আজ রাখি।
-- আচ্ছা।
সান্টু ও আতিক ইতিমধ্যে ওদের এ্যাকশন পুরোপুরি শুরু করে দিয়েছে। ফোনে আতিক আর আনিসের বিতণ্ডা চরমে। দেখে নেওয়ার পাল্টাপাল্টি চ্যালেঞ্জ।
-- এই আমি খুব সোজা লোক, সোজা কথা কয় সবসময়। কেউ আমার সাথে বেসোজা কাম করলে আমি তারেও বেসোজা করে দি। একনাগাড়ে কথাগুলো বললো আতিক।
-- আরে তুই কি করবি আমার। আর তুই-ই কি খুব ভালো ?
-- ভালো খারাপ আমি বুঝি না আমি বুঝি তুই মিথি ও ওর বান্ধবীদের সাথে কোনদিন ইভ টিজিং করবি না।
আনিস আর আতিকের মধ্যে বেঁধে গেল চরম দ্বন্দ্ব। দুই গ্রুপেই মেয়েদের উত্যক্ত করা থেকে বিরত থেকে ওরা এক অপরের দোষ খুঁজতে মরিয়া হয়ে হন্য হয়ে বেড়াচ্ছে। ইভ টিজিং নেই, অরাজকতা নেই তাই চারিদিকে এখন ভালবাসার চরম সম্ভাবনা বিরাজ করছে। মৃদুল এই সম্ভাবনাটাকে প্রকাশ করতে চাইলেও অনেক কষ্টেও তা প্রকাশ করতে পারে না। দিন যত কেটে যায় মৃদুলের মনটাও তত উতলা হয়ে ওঠে। একদিন সব সীমাবদ্ধতা, লাজ-লজ্জা, সংকোচ আর সব বাধা ভুলে মিথির কাছে বলেই ফেললো তার অন্তরের ভালবাসার প্রস্ফুটিত সম্ভাবনাকে। মিথি মৃদুলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তার আকাঙ্ক্ষাকে বেদনার বালুচরে মিশিয়ে দিল। মিথির ভাষ্য তারা ভালো বন্ধু থাকতে চাই। এর বেশি বড় সম্পর্কে না জরানোর অনুরোধ করে মৃদুলকে।
-- মৃদুল, আসলে মানুষের সব চাওয়া-পাওয়ায় পূর্ণ হয় না। সব সময় মনে রাখবি যে যাহারে ভালবাসে সে তাহারে পায় না।
-- ঠিক তাই। আমাদের বন্ধুত্বটা অবশ্যই টিকিয়ে রাখিস।
-- আমিও সেটিই চাই।
মিথি আবার ফোন দেয়। রিসিভ করে না মৃদুল। পৌনঃপুনিক ভাবে ফোন দিয়েই যায় মিথি। একসময় এসএমএস দিল-
সব সময় একটা কথা মনে রাখবি। সহজ কিছু সহজে হয় না। যদি সহজে হয়েও যায় তাহলে তা টেকসই না।
সবকিছুর মধ্যে একটা সংগ্রাম থাকতে হয়।
একসময় এমন হল মৃদুল মিথির আশা ছেড়েই দিল। নিরাশার রাজত্বের গভীর সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে সে। তবুও ও এগিয়ে চলছে আমূল কোন পরিবর্তনের আশায় সব মিথ্যাকে সত্যিতে পরিণত করতে। শেষ পর্যন্ত কি পারবে ও........? আবহমান ধারাবাহিকতায় এভাবেই কেটে গেল আরো কয়েকদিন। নিয়ম মেনেই চলছে সবকিছু। ঠিক আগের মতই। আগের মতই চলছে ওদের কলেজ, চলছে ওদের নৈত্তিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু একটিমাত্র জিনিসই আগের মত চলছে না; ওদের মন। কেমন যেন উদাস হয়ে গেছে ওরা, যা কেউ-ই বুঝতে পারছে না। এখন মৃদুলের দিন কাটে কবিতা লিখে আর মিথির কাটে জানালার পাশে রৌদ্রের কিরণ জপে।
ওদের গ্রামে গড়াই নদীর ত্রি-মোহনা নমের একটি চমৎকার জায়গায় প্রতিদিনই আড্ডা দেয় মৃদুল ও ওর বন্ধুরা। কখনো কখনো মিথিও আসে। মিথি যখন আসে মৃদুলের মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তির ভাব দেখা দেয়, ওকে ও একদমই সহ্য করতে পারে না। কারণ মিথি এমন একজন যার জন্যই ওর আজ এই অবস্থা। তবে এ জায়গাটাই মৃদুলের সব মুশকিলের আসান। এখানে বসে বসে ভাবলেই যেন ওর সব সমস্যার সমাধান একদম মিলে যায়। কিন্তু মৃদুল সম্প্রতি যে সমস্যাটাতে পড়েছে তা কোনদিনই সমাধান হওয়ার না। কারণ ও অনেকবার মিথিকে বুঝিয়েছে; কোন কাজ হয়নি।
ত্রি-মোহনায় বসে এক বিকেলে আনমনেই মৃদুল বলে উঠলো, এই গড়াই তুই বলতে পারিস, মিথির কিসের এত বড়াই? নিরুত্তাপ গড়াই যেন উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। পড়ন্ত বিকেলের ঢেউ যেন বলতে চাইছে মিথির ঢেউ মৃদুলের মোহনায় একদিন এসে মিলবেই। বিশ্বাস হয় না মৃদুলের। পিছন থেকে হঠাৎ ভৌতিক একটা কণ্ঠ এসে বললো- হ্যাঁ মৃদুল, সত্যিই ভিড়বে একদিন। আচমকা শব্দে মৃদুলের সারা শরীর অজানা এক ভয়ে শিহরিত হয়ে উঠলো। কণ্ঠটি অবশ্য মৃদুলের অতি পরিচিত। কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। যার জন্য এত বিরহ ব্যথা, যার জন্য ওর চোখে জল, যাকে কাছে পাওয়ার ব্যাকুলতায় উদগ্রীব হয়ে আছে সেই মিথিই কিনা ওকে বলছে, ভিড়বে। সম্বিত ফিরে স্বাভাবিক হয়ে ও বললো- না মিথি, তুই মিথ্যা বলছিস কোনদিনই মৃদুলের মোহনায় আপাতত মিথি এসে ভিড়বে না। মিথি অকপটে আবারও বলে দিল- সত্যি! সত্যি!! সত্যি!!! তুই সত্যি বলছিস ? হ্যাঁ, তা নয় কি। বললো মিথি। এবার যেন মৃদুলের নিরাশার আঁধারের রাজত্বে একচিলতে রৌদ্রের কিরণ খুঁজে পেলো।