লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ ডিসেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫

বিচারক স্কোরঃ ২.১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপূর্ণতা (আগস্ট ২০১৩)

ভালবাসার অপূর্ণতা
পূর্ণতা

সংখ্যা

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫

শিশির সিক্ত পল্লব

comment ৭  favorite ০  import_contacts ১,৮৭১
এক

সবুজ গাছপালায় বেষ্টিত ছাঁয়াঘেরা আমাদের এই গ্রামটা। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট একটি নদী। শহর থেকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন আমাদের এই গ্রামে নেই কোন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আধুনিক সুবিধা। যেন মনে হয় পৃথিবী থেকে আলাদা এক অসম্ভব সৌন্দর্যে গড়া আমাদের এই গ্রামটা। আমি যে স্কুলটায় পড়াশুনা করি সেটা প্রায় এই গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। যাতায়াতের ব্যাবস্থা বলতে ভ্যান ছাড়া আর কিছুই নাই। তবে আমার আছে ছোট একটি বাইসাইকেল। কোন সমস্যাই মনে হয়না। প্রতিদিন সাইকেল চড়ে যাওয়া আসাটাকে আমার কাছে উপভোগ্যই লাগে।

ক্লাস অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র আমি। স্কুলে এখন বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। আজ ছিল গণিত পরীক্ষা। বরাবরের মত আজও ফুল মার্কসের উত্তর করতে পারেনি। জানি বাড়িতে গেলে কপালে কি জুটবে। ভেবে ভেবে একটু খারাপও লাগছে। বাড়ির দিকে রওনা হতে ভয় ভয় করছে ভীষণ। কিছু সময় স্কুলে থেকে ব্যয় করলাম। তারপর সাইকেলটা নিয়ে রওনা হলাম বাড়ির দিকে। কিছুদুর গিয়েই রাস্তায় পূজার সাথে দেখা।

কি ব্যাপার পূজা, হেটে যাচ্ছিস কেন?
ভ্যান পেলাম না তো।
তোর সাথে আর কেউ নেই, একা একা যাচ্ছিস যে?
কি করব, ব্যাচের স্যারকে প্রশ্ন দেখাতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। আর অন্য সবাইও চলে গিয়েছে।।
তা পরীক্ষায় কত মার্কসের উত্তর করলি?
সবই করেছি।
সবই করেছিস!

শুনে তো মাথায় চিন্তা আরও বেড়ে গেল। ও তো বাড়িতে গিয়ে আমার মায়ের সাথে বলবেই। আর মা আমাকে আর রাখবেনা। মনে মনে ওর উপর তো ভীষণ রাগ হল। প্রতি পরীক্ষায় ও ফুল মার্কসের উত্তর ক্যামনে দেয়। যাহোক আর চিন্তা না করে ওকে সাইকেলের পিছনে উঠতে বললাম। তারপর চললাম ইটের রাস্তা বেয়ে।

উচু নিচু ইটের রাস্তা। ডবলে চালানো আমার খুব একটা অভ্যাস নাই। কিছুদূর চালানোর পর ভীষণ কষ্ট হতে লাগল।তার উপর উচু নিচু রাস্তা হওয়ায় সাইকেলটা মাঝে মাঝে ঝাকি দিচ্ছে।আর পূজা আমার কোমর আটকে ধরছে।
এই পূজা কোমর ধরিস না।
না ধরলে পড়ে যাব তো, সমস্যা কোথায় তোর?
গা শির শির করে তো।
আরে ছেলে মানুষের আবার গা শির শির করে নাকি?
সেটা আমার জানা নেই, তবে আমার করছে।
করলে করুক, আমি কোমর ছাড়তে পারব না।
এটা কোন কথা হল। সাইকেল থমিয়ে নিচে নামলাম। ওকে বললাম তুই সাইকেলের সামনে বস।
কেন, কি হচ্ছে?
আমার সাইকেল চালাতে অসুবিধা হচ্ছে। পাশে খাল বিল। হাত বেশি নড়লে কখন গিয়ে ওই খাল বিলে পড়ব।

আচ্ছা ঠিকআছে বলে পূজা সামনে বসল। আমি পিছনে বসে চালাতে থাকলাম। চারিদিকের সবুজ গাছপালা গুলো এক এক করে পিছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চললাম সামনে। চলতে চলতে পূজা বলল, শুভ সাইকেল চালাতে খুব মজা তাইনা।
হ্যা খুব মজা, চালাতে তো হচ্ছেনা। সামনে বসে কতই মজা।
এমন ভাবে বলছিস যেন এটা খুবই কঠিন কাজ। সাইকেল যদি চালাতে পারতাম তাহলে তোর এত কথা শুনতামই না। দেখতিস তোকে আমিই চালিয়ে নিয়ে যেতাম।
পারিস না চালাতে, তার উপর এত কথা আসে কিসে?
একদিন শিখিয়ে দিলে তো হয়।

ওর কথা শুনে খুবই রাগ হল। সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়লাম আবার। এর মধ্যে যদিও দুই কিলোমিটারের বেশি চলে এসেছি। তবে মনে জীদ চাপল ওকে আজ সাইকেল চালানোটা শিখাবই।
নামলি যে আবার? পূজা বলল।
তোকে আজ সাইকেল চালানো শিখাব।
সত্যি শিখাবি! পূজার চোখে উচ্ছ্বাস।
হ্যা শিখাব। ব্যাঙ্গ করে বললাম আমি।

ওকে সাইকেলের সীটে বসিয়ে প্যাডেল ঘুরাতে বললাম। আর আমি পিছনে ধরে রাখলাম সাইকেলটা। আস্তে আস্তে এগুতে থাকলাম। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই কাত হয়ে পড়ল সাইকেলটা। দূর তোর দ্বারা কিচ্ছু হবেনা বলে সাইকেলটা উঠালাম। কিন্তু ও নাছোড়বান্দা। সাইকেল চালানো শিখতেই হবে। খুবই জেদী টাইপের মেয়েটা। মাঝে মাঝে রাগে মনে হয় পিঠের উপর দুই একটা বসিয়ে দেই। মাঝে মাঝে যে দেইনা তা ঠিক বলা যায়না। কিন্তু এখন যেহেতু মনটা ভাল নেই। তাই আর কিছু বললাম না। তাকালাম ওর দিকে।
কি, আজই শিখতে হবে?
হ্যা হবে।

বেশি আর কথা না বাড়িয়ে ওকে আবার সীটে বসিয়ে দিলাম। আর আমি এবার বসলাম পিছনের ক্যারিয়ারে। আস্তে আস্তে আমি প্যাডেল ঘোরাতে লাগলাম আর ওকে বললাম হ্যান্ডেলটা ভাল করে ধরে রাখতে। অন্তত হাতটা আগে সোজা হোক। কিন্তু না, এবার দেখছি ভালই পারছে। আমিও এবার প্যাডেল ঘোরানোর গতি বাড়িয়ে দিলাম। কিছুদূর যেতে না যেতেই ও চেচিয়ে উঠল -
শুভ, শুভ, কোন দিকে যাচ্ছে রে, সাইকেলটা ধর।
এই, এই, ব্রেক মার, ব্রেক মার।

বলতে বলতেই পাশের উচু রাস্তা থেকে ডিগবাজী খেয়ে গড়াতে গড়াতে সোজা সাইকেলসহ খালে গিয়ে পড়লাম দুজনেই। জল ভরা খালে দু তিনটা ডুব খেয়ে উঠলাম উপরে। উপরে উঠেই আমাকে লাথি ঘূষি মারতে লাগল পূজা। আমার জন্যই নাকি সব কিছু হয়েছে। কাঁদতে লাগল আর আমাকে বকতে লাগল ইচ্ছে মত। আমি তো মহা বোকা হয়ে গেলাম। কি বলে ওকে বোঝাব তাই আমি বুঝতে পারছি না। এদিকে নিজেও আমি ভিজেছি কম নয়। যাহোক অবশেষে ও কাঁদতে কাঁদতে নিজের ভেজা বই খাতা নিয়ে হাটতে হাটতে চলে গেল বাড়ির দিকে। আমি চেয়ে রইলাম কিছুক্ষন ওর দিকে। দারুন ভেজা ভিজেছে মেয়েটা। বাড়িতে গেলে আজ ওর পিঠে মনে হচ্ছে পড়বে কয়েকটা। ভালই হয়েছে মনে মনে ভাবলাম আমি। বড় লোকের আদূরে মেয়ে। তোর একটু শিক্ষার দরকার ছিল। এদিকে আমার সাইকেলটা এখনও জলে। আমাকে আবার নামতে হল জলের ভেতর সাইকেলটা উঠাতে। একা একা সাইকেলটা তুলতে অনেক সময় লাগল আমার।

স্বন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। বাড়িতে এসে ফ্রেশ হয়ে ট্রাওজারটা পরে মাকে ডাকলাম। মা দেখি রান্না ঘরে রান্না করছে। আমি রান্নাঘরে এসে মাকে একগ্লাস জল দিতে বললাম। মা সামনে এসে জল দিল। আমি জল খেয়ে মায়ের কাছে গ্লাসটা ফিরিয়ে দিয়ে আমার পড়ার রুমের দিকে যাব বলে ঘুরলাম। মা আবার পিছন থেকে ডাক দিল। আমি মায়ের দিকে ঘুরতে না ঘুরতেই শপাং শপাং সজিনার ডাটার বাড়ি পড়ল পিঠে। তাকিয়ে দেখি সামনে মা না তো যেন কালি মূর্তি দাড়িয়ে।
পূজাকে জলে ফেলেছিস কেন?
ইচ্ছে করে ফেলেছি নাকি? ও তো নিজের দোষে পড়েছে।
আবার পড়ল বাড়ি। উ: কি যে ব্যাথা। মনে মনে বললাম একটা সজিনার ডাটার বাড়ি নিজে খাওতো কেমন লাগে। এত কিছু রেখে সজিনার ডাটা দিয়ে মারছে।
আর যেন পূজার সাথে মিশবি না।
কেন দোষ কি করলাম?
নিজে তো খারাপ, অন্য ছেলেমেয়েদেরও খারাপ করে করে ছাড়বি।

মা চলে গেল। আমিও চলে এলাম রুমে। মায়ের শেষের কথাগুলো কানে খুব বাজতে লাগলো –‘নিজে তো খারাপ, অন্য ছেলেমেয়েদেরও খারাপ করে ছাড়বি।’ পরে অবশ্য শুনেছি কথাগুলো ছিল পূজার মায়ের। তিনিই মায়ের কাছে এসে নালিশ করে গেছেন। আমার ভীষন খারাপ লেগেছিল। তিন চারদিন ধরে পূজার সাথে কথাই বললাম না।

পরীক্ষা শেষ হল। কিছুদিন পরই রেজাল্ট দিল। বরাবরের মত এবারও পূজা প্রথম। আমার কিন্তু এবার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তিন থেকে সরাসরি তেত্রিশ। মানে একটা সাবজেক্টে ফেল করে বি গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকার করেছি আমি। এমন ভাল রেজাল্ট করায় মা এবং বাবা কিছুই বললনা আমাকে। অন্য কেউও আমার সামনে কিছু বলল না। যেন সবাই অবাক। শুধু পূজা এসে একবার আফসোস করেছিল আমার জন্য।

নবম শ্রেনীর ছাত্র এখন আমি। স্যাররা সাইন্স দিতে চাইলেও বাবা দিতে রাজি নয়। তিনি বললেন, এমন ভাল রেজাল্ট করে আবার সাইন্স চাও কিভাবে? কমার্স বা আর্টস নাও আর ব্যাবসা বানিজ্য করার জন্য প্রস্তুত হও। বাবার কথা শুনে খুবই খারাপ লাগলো। আমার সবসময়ই সাইন্স পড়ার ইচ্ছা। কিন্তু এখন কি যে করি।

গ্রামের স্কুল। সাইন্সের স্টুডেন্ট বেশি হয়না। স্যাররাও চেষ্টা করে ছেলেমেয়েদের সাইন্সে ঢুকাতে। আমি সুযোগটা কাজে লাগাব ভাবলাম। আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের স্যারকে ধরলাম ভাল করে। স্যারকে বললাম বাবাকে একটু বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করাতে। স্যারের কথা হয়তো বাবা ফেলতে পারবেন না।

বুদ্ধিটা কাজে দিল। বাবা রাজি হলেন। আমিও সাইন্সে পড়ার সুযোগ পেলাম। তবে মনে মনে এবার প্রতিজ্ঞা করলাম, এই সুযোগটা আমাকে কাজে লাগাতেই হবে। সুতরাং পড়াশুনা শুরু করে দিলাম প্রথম থেকেই। আমার পড়াশুনার গতি দেখে বাবাতো বেজায় খুশী। যদিও সামনে পাইলে আরও বেশি বেশি পড়তে বলেন। এখন যদিও আমি আর বাবার কাছে পড়িনা। বাবা কর্মাসের ছাত্র ছিলেন। সাইন্সে জ্ঞান নেই তার। আমাকে সাইন্সের চারটি সাবজেক্টের জন্যই আলাদা চারটি ব্যাচে ভর্তি করিয়ে দিলেন। পড়াশুনার গতি এতই বাড়ালাম যে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় শুধু ফার্স্ট হলাম না। পূজার থেকে প্রায় একশো মার্ক বেশি পেলাম। বাবা এবং মা দুজনেই ভীষণ খুশী। তবে আমার এই পজিশনটাকে স্থায়ী করার জন্য পড়ার গতি আমি আর কমালাম না।

আস্তে আস্তে ঘরকুনো হয়ে যেতে লাগলাম। আগের মত আর তেমন বাড়ির বের হইনা। কোন জায়গায় বসে থাকার সময়ও একটা বই হাতে নিয়ে চোখ বুলাই। কেননা মনে শঙ্কা জাগে যদি পূজা আবার উপরে উঠে যায়। সব সময়ই খোঁজ রাখি পূজা কেমন পড়াশুনা করছে। পাশের বাড়ির ছোট ভাইকে পাঠিয়ে দিই দেখে আসতে পূজা এখন বিকাল বেলা কি করছে। ও এসে জানায় যে পূজা এখন ছাদের উপর দাড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছে। একথা শুনে ভাল লাগে। আমি আবার পড়ার গতি বাড়াই। এভাবেই দিন কাটতে থাকে।

দেখতে দেখতে দশম শ্রেনীতে উত্তীর্ন হলাম। এবা্রও পূজা প্রথম। আমি হয়েছি দ্বিতীয়। প্রথম হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল। জীবনে স্কুল লাইফে তাহলে আমি প্রথম হতে পারলাম না কোনদিন। ভেবে মন খারাপ হল খুবই। মনটা আরও খারাপ হল যখন দেখলাম পূজার থেকে মাত্র তিন মার্কস কম পেয়েছি আমি। আর সেটা ঐ গণিতের জন্যই। গনিতে এবারও এ প্লাস পায়নি আমি। রেজাল্ট নিয়ে একসাথে বা্ড়ি ফিরছিলাম আমরা। অনেকদিন পর আবার দুজন হেটে যাচ্ছি একসাথে স্কুল থেকে বাড়ির দিকে। চলতে চলতে পূজা আমাকে জীজ্ঞাসা করল-
কি ব্যাপার শুভ, মন খারাপ?
না, কেন? মন খারাপ হতে যাবে কেন?
এবারও যে প্রথম হতে পারলি না?
তাতে কি?
তাতে কিছু না। আসলে আমি কিন্তু বুঝতে পারছি তোর মনের অবস্থা।
তাই নাকি? খুব তো সাইকোলজিস্ট হয়ে গিয়েছিস। তো বুঝতে যখন পারছিস তবে জীজ্ঞাসা করছিস কেন?
খারাপ লাগছে তো তাই।
তুই তো প্রথম হয়েছিস। তবে তোর আবার খারাপ লাগছে কিসে?
তুই যে প্রথম হতে পারলি না, এ কারনেই।
আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। সত্যিই ওর কাঁন্নাভেজা চোখ। অবাক হলাম। সত্যিই কি আমি প্রথম হয়নি বলে ও কাঁদছে।

বাড়িতে এসে বারান্দায় চেয়ারটা টেনে বসে আছি। মা রেজাল্টটা শুনে মুড অফ করে রাখলেন তো রাখলেন। কমন বিষয়। সবসময় তিনি এমনটাই করেন। ভাল হলে তো খুবই আদর যত্ন। আর খারাপ হলে তো মুড অফ। বাবা যদিও কিছু বললেন না। শুধু ডেকে নিয়ে কয়েকটি সান্তনা বাক্য শোনালেন- চেষ্টা করেছ, ভালই করেছ। একদম বাজে রেজাল্ট তো করনি। আর তাছাড়া খারাপ হয়েছে আগামীতে হয়তো ভাল হবার জন্য। সামনের বছর এস এস সি পরীক্ষা। মন দিয়ে পড়াশুনা শুরু করে দাও। দেখ এ প্লাস টা পেতে পার কিনা। কে ফার্স্ট হল সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল যেন এ প্লাসটা পাও।

বাবার কথা শুনে স্পিড আমার তুঙ্গে। সাথে সাথেই পড়ার রুমে চলে এলাম। পূজাকে এবার নিচে ফেলবই ফেলব। পরক্ষনেই মনে পড়ল ওর কাঁন্নাভেজা চোখের কথা। আমি খারাপ করেছি কিন্তু ও কাঁদতে যাবে কেন? মেয়েটা আসলে অনেক ভাল। খুবই সহজ সরল। কি মিষ্টি ওর চেহারা। ফর্সা মুখের উপর কাজল টানা দুটো চোখ, কত সুন্দর নাক। ওকে আমার অনেক অনেক ভাল লাগে। মনে মনে ইচ্ছে করে যদি ও আমার বউ হত। মুহূর্তেই সম্বিত ফিরে আসে। কি ভাবছি উল্টাপাল্টা। আমাকে পড়তে হবে। অনেক অনেক পড়তে হবে।

শুক্রবার বিকালের দিক। আমি পূজাদের বাড়িতে যাচ্ছি। গত দিনের ব্যাচে যেতে পারেনি। স্যার কি পড়িয়েছে সেটা জানার জন্যই। পূজাদের বাড়িটা আমাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই। আসলে ওটা ওদের বাড়িনা। ওটা আমাদের ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোয়ার্টার। ওর বাবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার হওয়ায় কোয়ার্টারে থাকে ওরা। ওদের আসল বাড়ি মূলত বরিশালে। আমি ওদের বাসার সামনে আসতেই ওর মায়ের সাথে দেখা। এমনিতেই আমি ওর মাকে ভয় পাই। তা্র উপর আবার সামনে এসে পড়ল। আমাকে দেখেই কাকীমা বলে উঠলেন-
কি ব্যাপার শুভ?
ভাল আছেন কাকীমা? পূজার কাছে একটু দরকার ছিল। ও কি বাসায় আছে?
হ্যা ভাল আছি। মনে হয় পূজা দোতলায় ওর রুমে আছে। গিয়ে দেখ।
ঠিক আছে কাকীমা।
আচ্ছা যাও।

আমি দোতলায় উঠে আস্তে আস্তে করে পূজার রুমে এলাম। ভাবলাম ওকে ধমক দিয়ে চমকে দেব। কিন্তু ধমক দিয়ে ওকে কি চমকাব। আমি নিজেই তো চমকে গেলাম। দেখি জামা উচু করে বুকের উপর দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমার চোখতো বড় বড়। কি করব। এক লাফে দরজার বাইরে বেরিয়ে এলাম। তারপর বাইরের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে ওকে ডাকলাম। ডাক শুনে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল পূজা। জামাটা ভাল করে টেনে নিয়ে এক ঝটকায় আলনা থেকে ওরনাটা টেনে বুকের উপর দিল। আমি মিচকি হাসি দিয়ে বললাম-
নে হয়েছে, হয়েছে। যা দেখার তা দেখে ফেলেছি। আর অত ঢাকাঢাকি করে লাভ নাই।
কি দেখেছিস তুই- বাকা চোখে তাকাল পূজা।
সব দেখেছি-হাসলাম আমি।
সত্যি দেখেছিস- ও চোখ বড় বড় করে জীজ্ঞাসা করল।
না দেখে কি মিথ্যা বলছি নাকি। আবার হাসলাম আমি।
তা দেখেছিস যখন খুবই ভাল কাজ করেছিস। এখন বল কি কাজে এসেছিস?
পূজার কাছ থেকে পড়াগুলো ভালকরে দেখেশুনে চলে এলাম বাড়িতে। ভাল লাগছে না কিছুই। বহুদিন পর আজ মাঠের দিকে যেতে ইচ্ছে করল খেলা করতে।

দুই

বসে আছি পড়ার টেবিলে। বসে বসে কি একটা বিষয়ে যেন ভাবছি। কিন্তু সময়। সে তো আমার মত এক জায়গায় থমকে বসে ভাবেনা। সে তো তার মত বয়ে চলে অক্লান্ত ধারায়। কি দ্রুতই না সময় বয়ে চলে যায়। সব কিছুই যেন হয়ে যায় অতীত। স্কুলের সেই পুরানো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে পূজার সাথে খুনসুটী করার মত কত কাহিনী। জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকাই। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে। পূজার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে খুব। কিন্তু কি করব। কলেজেই তো যেতে পারলাম না। গত সাত আটদিন আগে একবার কথা বলেছিলাম। বাইরের দোকানের মোবাইলে বেশি কথা বলা যায়না। অনেক বিল হয়। বাবা আবার নির্দিষ্ট পরিমান টাকা দেন হাত খরচের জন্য। তারপরও টাকা বাচিয়ে পূজার সাথে কথা বলার চেষ্টা করি।

পূজা এখন শহরে একটা নামকরা ভাল কলেজে পড়াশুনা করছে। আর আমি সেই পুরান স্কুলটার পাশে ছোট্ট যে কলেজটা আছে সেখানকারই স্টুডেন্ট। দুজনেই স্কুল থেকে এ+ পেয়েছিলাম। তারপর ও চলে যায় শহরে। আর বাবার অতিরিক্ত আদরের ধন বাইরে যাবার এখনো বয়স হয়নি যে ছেলেটার সেই আমি এই ছোট্ট কলেজেই আছি। পড়াশুনা মোটামুটি ভালই হচ্ছে আমার। তাছাড়া কলেজের এক স্যারের মেয়ে ভর্তি হয়েছে আমাদের সাথে। দেখতে দারুন লাগে। দিনগুলো যে একেবারে খারাপ কাটছে আমার তা কিন্তু মোটেও বলা যায়না।


মাঝে পূজা এসেছিল বাড়িতে। দেখা হয়েছিল ওর সাথে। কথা হয়েছিল অনেক। শুধু তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে। কি স্মার্ট হয়ে গিয়েছে শহরে থেকে। এখন ও জিন্সের প্যান্ট পরে, ছোট ছোট জামা পরে, দেখতে যেন পুতুলের মত লাগে। ওকে দেখে আমিও ভাবি। আর কিছুদিন পরই কোচিং করতে শহরে যাব। আমিও শহরে থেকে স্মার্ট হয়ে যাব।

স্বপ্ন আমার স্বপ্নই রয়ে যায়। আমি একটি বিষয় খেয়াল করেছি। আমি যে স্বপ্নটা দেখি, বাস্তবে তার হয় উল্টা। তাইতো ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে শহরে এলাম যখন কোচিং করতে, পূজা তখন ঢাকায় ওর মামার বাসায় থেকে কোচিং করতে চলে গেল। শুনলাম ও নাকি মেডিকেল কোচিং করছে। শুনে আমার খারাপ লাগলনা। ওর যোগ্যতা আছে, ভাল ব্রেন, ও অবশ্যই চান্স পাবে। কিন্তু আমার দ্বারা ভাল কোন ভার্সিটিতেই চান্স পাওয়া হবে কিনা সেটাই অনিশ্চিত। যেহেতু আমি খুলনা জেলার ছেলে। তাই ইচ্ছা্টা খুলনা ভার্সিটিতেই চান্স পাওয়ার। তবে জানিনা ভাগ্য কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে।

এদিকে রেজাল্ট বের হল ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার। পূজা শুনলাম এ+ পেয়েছে। আমি অল্পের জন্য মিস করেছি। তাতে কিন্তু আমার দু:খ নেই। ওসব লেখাপড়ার রেজাল্ট নিয়ে এখন খুব ভাবতে ভাল লাগেনা। কারন ভাল পড়াশুনা করেও দেখেছি কিন্তু রেজাল্টের খুব বেশি উন্নতি করতে পারিনি কোনদিন। এখন আমার একটাই চিন্তা। আর সেটা হল ভার্সিটিতে চান্স পাবার।

রেজাল্ট বের হবার কিছুদিন পরেই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গেল। অপ্রত্যাশিত একটা খারাপ খবর শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। পূজার সাথে ফোনে কথা বললাম। ও খুব কাঁদছে। ওকে সান্তনা দিলাম। এবার মেডিখেলে চান্স পাসনি তো কি হয়েছে। সামনের বারের জন্য চেষ্টা কর। দেখবি অনেক ভাল একটা মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়ে গেছিস। পূজা আমার কথা শুনে শান্ত হল। আসলে আমার কথা যে ও এখনো শোনে একথা ভেবে আমার খুবই ভাল লাগল। ও আমার কাছ থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশনের জন্য কি কি পড়তে হবে এসবের টিপস নিল। কেননা ও মনস্থির করেছে ও খুলনা ভার্সিটিতেও পরীক্ষা দিবে।

খুলনা ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গেল এবং রেজাল্টও বের হল। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের প্রথম দিকের সিরিয়ালে আছি। কিন্তু সেটা নিয়ে ভাবনা আমার মধ্যে কাজ করছে না। মেরিট লিস্টে ভাল করে খুজছি পূজার রোল। কিন্তু নেই। কোথাও নেই। কষ্টটা আমার বেড়ে যেতে লাগল। এবার দেখতে লাগলাম ওয়েটিং লিস্ট। না, সেখানেও নাই। হঠাৎ চোখে পড়ল লাস্টের দিকে। ওয়েটিং লিস্টের লাস্টের দিকেই পূজার রোল। পূজাকে কল করে জানালাম। ও প্রথমে ভীষন কাদল। তারপর জীজ্ঞাসা করল, এমন সিরিয়াল টানবে কিনা। আমি সঠিকভাবে ওকে জানাতে পারলাম না। তবে ওকে আশ্বাস দিলাম হযতো হবে। কেননা মেয়েটা খুবই ভেঙে পড়েছে। যত জায়গায় পরীক্ষা দিয়েছিল কোথাও চান্স পায়নি।

মনটা আমার বেজায় খুশী। ভার্সিটিতে আজ গিয়ে শুনলাম পূজা যে সিরিয়াল পর্যন্ত আছে সেটা পর্যন্ত টানতে পারে। আমি ভাল করে শুনলাম এই সিরিয়ালে সে কোন সাবজেক্ট পেতে পারে। যে ম্যাডামের কাছে শুনলাম তিনি নিশ্চিত ভাবে জানেন না। তবে বললেন-যেহেতু লাস্টের দিকে, খুব ভাল কোন সাবজেক্ট পাবেনা সে। তারপরও চান্স পেতে পারে কথাটা শুনেই চোখে, মুখে আমার উচ্ছ্বলতা। চাইনা আমি ইলেকট্রোনিক্স অথবা কম্পিউটার সায়েন্স। পূজা যে সাবজেক্ট পাবে সেটাই দেব আমার ফার্স্ট চয়েস। তাহলে পূজার সাথেই পড়তে পারব আবার। কথাটা ভেবে সত্যিই গা আমার শিউরে উঠল। কেননা আবার যে পূজার সাথে পড়ার একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছে।

পূজা আর আমি দুজনেই খুলনা ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আবার সেই ছেলেবেলা ফিরে এল দুজনের মধ্যে। আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুজন দুজনকে ভালবেসে ফেললাম। কিন্তু পোড়া কপালে আমার কি সুখ সইবে বেশি দিন। বড়জোর ছয়মাস একসাথে ভাল ভাবে ক্লাস করলাম, একসাথে ঘুরতে পারলাম আমরা। তারপরই পূজা সেকেন্ড টাইমে ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়ে চলে গেল আমাকে একা ফেলে।

পূজা ঢাকায় চলে যাওয়ার পর আমাদের মধ্যে দেখা না হলেও কথা কিন্তু ঠিকই চলতে থাকে। দিনে ৩-৪ ঘন্টা পূজার সাথে কথা না বলতে পারলে ভালই লাগেনা কিছু। পূজাও আনন্দ পায় আমার সাথে কথা বলে। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে পূজার ক্লাস শুরু হয়। ওর পড়াশুনার অতিরিক্ত চাপের কারনে কমে আসে আমাদের কথা বলার সময়। ও প্রতিদিন রাতে এক ঘন্টা করে কথা বলতে চায়। মনটা আমার মানতে চায়না। কিন্তু কি আর করা। রাজি হতে বাধ্য হই। এভাবেই চলতে থাকে দিন। পূজার পরীক্ষার সময় চলে আসে। পড়াশুনার চাপ ওর এতই বেড়ে যায় যে এক সপ্তাহেই ও দুই-এক দিনের বেশি কথা বলতে পারেনা। ওর পরীক্ষার কথা ভেবে আমি বিষয়টি মেনে নেই।

এদিকে আমার পড়াশুনার চাপ একদম কম সেটা কিন্তু মোটেই নয়। খুলনা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে নিজেকে যেন বড় অসহায় লাগে। এই অনার্স লাইফে কে এত পড়াশুনা করতে চায়। কিন্তু না। সপ্তাহে তিন-চারটি ক্লাস টেস্ট দিতে হবে, এস্যাইনমেন্ট জমা, কত যে ঝামেলা। কিছুই ভাল লাগেনা আমার। সবসময় মনে হয় এখান থেকে অনার্স পাসটা হলেই বাঁচি।

পূজার পরীক্ষা চলার দু-তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ওর সাথে আর কথাই হয়না। প্রায় সময়ই ওর ফোন বন্দ থাকে। আর খোলা থাকলেও কেটে দেয় আমার ফোন। ওর সমস্যাটা আমি বুঝি। জানি মেডেকেলে পড়াশুনার অনেক ঝামেলা। পরীক্ষার সময় ওর খাওয়া ঘুমই থাকেনা। আর প্রেম করার সময় পাবে কোথায়।

পূজার পরীক্ষার ব্যাস্ততার মধ্যে আর কোন ফোন আমি ওকে দেয়নি। কিন্তু অবাক হই যখন দেখি পরীক্ষা শেষ হবার পরও ও আমাকে ফোন দেয়না। আমিও অভিমান করে ফোন দেইনা। পূজাও দেয়না। এভাবে কিছুদিন চলার পর হঠাৎ একদিন রাতে আমি পূজাকে কল করি। ও প্রথমে কেটে দেয়। তারপরও আমি আবার কল করি। এবার ও রিসিভ করে বলে ও নাকি খুব ব্যস্ত আছে, এখন কথা বলতে পারবে না। কথাটা শুনেই রাগে উষ্ণ হয়ে উঠি আমি। আচ্ছা করে বকি ওকে। বকাঝকার এক পর্যায়ে ও ফোনটা কেটে দেয়। আমার টেম্পার এতই বেড়ে যায় যে সাথে সাথেই ওর নম্বরটা ডিলেট করে ফেলি।

পূজার নম্বরটা ডিলেট করার পর থেকে আর ওর সাথে কথা বলা হয়নি আমার। পূজাও আমাকে আর কোনদিন কল করেনি। কিন্তু ওর সাথে কথা না বলতে বলতে আমি প্রচন্ড নি:সঙ্গতায় ভুগতে থাকি। একদিন চলে যাই গ্রামের বাড়ি। ভাবলাম পূজার মায়ের কাছ থেকে ওর নম্বরটা নিয়ে আসব। কিন্তু সে আশার গুড়েও বালি পড়ল আমার। পূজার বাবা নাকি রিটায়ার্ড করে নিজেদের এলাকায় চলে গিয়েছে। পূজার সাথে যোগাযোগ করার সব উপায় গুলোই যেন হারিয়ে ফেললাম আমি।

ইদানীং আমি জীবনটা নিয়ে বড় বেশি ভাবি। আমি কেন এ পৃথিবীতে, আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্যইটা কি এসব নিয়ে খুব ভাবি। বিশেষ করে মায়ের মৃত্যুটাই আমাকে জীবন সম্পর্কে ভাবতে শেখাল। মাকে খুব মনে পড়ে আমার। মা হঠাৎ করেই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। বাবা এখন বাড়িতে একা। কিছুদিন আগে তিনি হাইস্কুল থেকে অবসর নিয়েছেন। একা একা রান্না বান্না করে তিনি কাটিয়ে দিচ্ছেন দিন। আমি প্রতি শুক্রবার সকালে বাড়িতে যাই বাবার কাছে। আবার চলে আসি পরের দিন। বাবাকে দেখে খুবই কষ্ট হয় আমার। বাবাকে নিয়ে শহরে চলে আসতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়। পড়াশুনার পাঠ না চুকিয়ে আর একটা ভাল কোন চাকরি না পেয়ে সেটা সম্ভব কিভাবেই বা হবে। কিন্তু দিন যে ফুরাতে চায়না। আমি অধীর আগ্রহে আছি কবে পাশ করব, কবে মুক্ত হব এইসব ঝামেলা খেকে।

তিন

অবশেষে অনার্সটা শেষ হল আমার। কিন্তু এখনতো আরেক সমস্যায় পড়লাম। চাকরি তো পাব বললেই পাচ্ছিনা। শেষমেষ দূর সম্পর্কের এক দাদার মাধ্যমে বেসরকারী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। এখানে চাকরি করাটাই আমার মূখ্য উদ্দেশ্য নয়। আসলে এখানে আমি চাকরির পাশাপাশি ঢাকা ভার্সিটির ই.এম.বি.এ টাও কমপ্লিট করতে চাইলাম। ই.এম.বি.এ চান্স পাওয়ার জন্য প্রিপারেশনও শুরু করলাম ভাল করে। কিন্তু ঢাকায় আসার পর থেকে সমস্যা আমার দিন দিন বেড়েই চলল। এই অনার্স পাশ করার পর বাবার কাছে টাকা চাইতেও ভীষন লজ্জা করে আমার। এদিকে চাকরির বেতনেও মাসের শেষ দিকে এসে টানাটানি পড়ে যায়। সমস্যাটা আমার ধীরে ধীরে চিন্তার প্রধান কারন হয়ে ওঠে। অবশেষে না পেরে দূর সম্পর্কের সেই দাদার কাছে গিয়ে সব খুলে বলি। দাদা সব কিছু শোনার পর কিছু একটা ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

ঢাকা ভার্সিটির ই.এম.বি.এর এডমিশনটা হয়ে যায় এবং ভাগ্য ভাল আমার চান্সও হয়ে যায়। ওদিকে দাদা আমার জন্য একটা টিউশনির ব্যবস্থা করে দেয়। জীবনে যে জিনিসটা পছন্দ করিনি কখনো সেটাও করতে হবে আমাকে। টিউশনি কাজটা একদমই অপছন্দ আমার কাছে। ভার্সিটি লাইফে আমার কত ফ্রেন্ডদের দেখেছি টিউশনি করাতে। অথচ আমার কখনো ইচ্ছাও জাগেনি। কিন্তু এখন বাস্তবতার মুখোমুখি দাড়িয়ে এটাকে তো চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিতেই হবে।

টিউশনিতে গিয়ে বক বক করাটা আমার কাছে ভীষন অসস্তিকর লাগে। আর আমার স্টুডেন্টাও যেন হাই ভোল্টেজের চার্জার ব্যাটারী চালিত কৃত্রিম তোতা পাখি। যেন আমি যাওয়ার আগে চার্জ নেয় আর গেলেই অবিরল ধারায় বকতে থাকে। আমার যদিও প্রথম প্রথম একটু অসস্তি লাগত। কিন্তু পরবর্তীতে ভালই লাগতে লাগল। মেয়েটা এতই পটু যে আমাকে কয়েক দিনের মধ্যে ওর ফ্রেন্ডের মতই বানিয়ে ফেলল। ওর নাম মিতু। ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। আমাকে ওর ফিজিক্স সাবজেক্টটা দেখিয়ে দিতে হয়।

সেদিন ফিজিক্সে রংধনুর উপর পড়াতে গিয়ে রং এর প্রশ্ন চলে আসে। মিতু আমাকে জীজ্ঞাসা করে-আচ্ছা টিচার, আপনি কোন রং বেশি পছন্দ করেন?
মনে মনে বলি, আমার জীবনের তো কোন রং নাই। সেখানে পছন্দ অপছন্দের রং থাকার প্রশ্ন আছে কি?
আমাকে একটু উদাস ভাব দেখে মিতু আবার বলে, কি টিচার, বললেন না আপনার পছন্দের রং কি?
আমার পছন্দের কোন রং নেই, শান্ত ভাবে বললাম আমি।
সেটা তো সম্ভব নয়। আপনি নিশ্চয় মিথ্যা বলছেন। বলুন না টিচার, প্লিজ।
আমি সত্যিই বলছি আমার পছন্দের কোন রং নেই।
কিন্তু নাছোড়বান্দা মেয়েটা। ওকে বলতেই হবে। অবশেষে কি আর করা। সাত পাচ না ভেবেই ভেবেই বললাম লাল।
মিতু আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর বলল, আমি কিন্তু ঠিকই আমার প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে গেলাম টিচার।
একটু বিরক্ত অনুভব করলাম। কিন্তু বিরক্তির ভাবটা ওকে বুঝতে না দিয়ে আবার ফিরে এলাম পড়ার ভিতরে।

পরবর্তী পড়ার দিন আমি মিতুকে দেখে তো অবাক। লাল একটা ড্রেস পরেছে ও। লাল পোশাকে মেয়েদের একটু অন্য রকমই লাগে। তাছাড়া লালের মধ্য থেকে ওর লাবন্যময় ভরাট মুখটা চমৎকার হয়ে ফুটে উঠেছে। অপরূপ লাগছে ওকে।
আস্তে ধীরে ধীরে চেয়ারে গিয়ে বসলাম আমি। তারপর বললাম, কি ব্যাপার মিতু, এত সাজার কারন কি?
ও মিষ্টি হাসল। তারপর বলল, আজ আমার জন্মদিন টিচার।
তাই নাকি?
হ্যা টিচার। এজন্যই আপনার পছন্দের কালারের জামা পরেছি আজকে। বলেন তো কেমন লাগছে আমাকে।
তোমাকে অনেক অনেক ভাল লাগছে।
সত্যি টিচার!
হান্ড্রেড পাসের্ন্ট।

আমার কথায় হেসে ফেলল মিতু। আমি আর কথা না বাড়িয়ে বইটা বের করতে বললাম। অনেক কথা হয়েছে। এবার একটু পড়া যাক। কিন্তু মিতু আজ পড়বে না। ওর নাকি জন্মদিন। এ কারনে না পড়িয়ে ওর সাথে গল্প করতে হবে। মনে মনে ভাবলাম মেয়েটা একটু বেশি ফ্রি হয়ে যাচ্ছে আমার সাথে। নিজের ওয়েটটাকে ধরে রাখতেই ওকে আচ্ছা করে একটা তাড়া দিলাম। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ও হেসেই উড়িয়ে দিল। কি আর করা। শহরের মেয়ে তো। একটু বেশি পাকা। তাই কিছু সময় ওর সাথে কথা বললাম। তারপর চলে এলাম বাসায়।

স্বন্ধ্যার দিকে ফোন করল মিতু। আমি যেন ওর জন্মদিনের পার্টিতে অবশ্যই হাজির হই। কি যে শুরু করেছে মেয়েটা। আমার সত্যিই ভাল লাগছে না। আমি ওকে সরাসরি জানিয়ে দিলাম আমার কাজ আছে, আজ আর যেতে পারব না। কিন্তু পরক্ষনেই ওর মা আবার ফোন করে আমাকে খুব করে যেতে বলল। অবশেষে বাধ্য হয়েই যেতে হল আমাকে।

মিতুদের বাড়িতে এলাম রাত নয়টার দিকে। এসে দেখি ঘরোয়া পরিবেশে ছোট্ট আয়োজন। বাইরের লোক বা অতিথী তেমন নেই বললেই চলে। সবাই ওদের নিজেদের আত্মীয়স্বজন। পরিচিত হলাম সবার সাথে। খুব সুন্দর ছোট্ট ওদের পরিবারটা। সরকারি চাকুরিজীবী মা-বাবার একটিমাত্র ছেলে এবং একটিমাত্র মেয়ে। ছেলে এম.বি.বি.এস ডাক্তার। ছেলের বউ ডাক্তারি পড়ে। খুবই গোছাল একটি পরিবার।

সবার সাথে পরিচিত হবার পর্বে বার বার আমার চোখ আটকে যাচ্ছিল মিতুর ভাবীর দিকে। নীল রঙা কাপড়ের ভাঁজের ভিতরে যে সাদা মূর্তিটা বসে আছে সে আমার অনেক পরিচিত ছিল। কিন্তু আজ আমাকে চিনল না। কষ্টে বুকটা আমার কেঁপে উঠল। এখানে বেশি সময় আর থাকতে মন চাইল না। চলে আসতে চাইলাম আমি। মিতু তো অবাক। ওর মা-বাবাও তো না খেয়ে কোনরকমে আসতে দিতে চাইল না আমাকে। কিন্তু আমি ওদের ভাল করে বললাম আমার শরীরটা প্রচন্ড খারাপ। এক মুহূর্তের জন্যেও আমি আর ঐখানে দাড়াতে পারছি না। শেষমেষ আমার অতিরিক্ত পীড়াপীড়িতে আমাকে আর উনারা নিষেধ করলেন না। আমি বাইরে চলে এলাম। আসার আগে মিতুর দিকে ভাল করে আরেকবার তাকালাম। কি নিষ্পাপ একটি মেয়ে। আর হয়তো কোনদিন ওর সাথে আমার দেখা হবেনা। কেননা কাল থেকে যে আমি ওকে আর পড়াতে আসব না।

চলে এলাম রাস্তায়। হাটতে আছি সারি সারি নিয়ন বাতি গুলোর নিচ দিয়ে রাস্তা বেয়ে। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার নি:শ্বাস গুলো কেমন যেন ভারী হয়ে আসছে। মনের অজান্তেই কয়েক ফোঁটা অশ্রু এসে পড়ল হাতের উপর। একটা গভীর দীর্ঘ:শ্বাস বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। হৃদয় ভেঙে বেরিয়ে এল সকরুন আফসোস- পূজা, এত নিষ্ঠুর হতে পারলি? অনেক ভাল ফ্যামিলিতে বিয়ে হয়েছে তোর। তুই অনেক সুখী হতে পারবি, অনেক………………।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement