[গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। জীবিত বা মৃত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে এর কোন মিল নেই। যদি মিলে যায়, তবে তা কাকতালীয়।]

(শুন্য)
কি রে রাকেশ! দেশ উদ্ধার কর্মসূচি নাই এবার? নিয়াজের এই কথাটা রাকেশ কোন রকম হজম করল। ক্লাসে হঠাৎ করেই মোস্তফা স্যার বলে বসলেন, কি খবর রাকেশ সাহেব! পরীক্ষার তো বেশী দেরী নাই। তা প্রিপারেশন হচ্ছে.... নাকি দেশ উদ্ধার কর্মসূচিতে ব্যস্ত?
রাকেশ অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদা। রাকেশকে অনেকে মুক্তিযুদ্ধের ব্যপারে মৌলবাদী বলে ডাকে। এই যেমন সেদিন! বসে বসে চা খাচ্ছে। হঠাৎ করেই রুমমেট বশির সবার সামনেই বলে বসল, কি চরমপন্থি মুক্তিযোদ্ধা... ক্লাসটেষ্টে নাকি ৫ পাইছস!.... যাগো লাইগা কাজ করস.... সেই বাবারা এইবার পাস করাইবো না! রাকেশ খুব কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু কাউকেই বলতে পারল না। কারণ সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। দু একজন আছে... যারা পড়ালেখার পাশাপাশি এইসব ব্যপার নিয়ে ভাবে। কিন্তু যেখানে সেনসেটিভ কিছু আছে.... সেখানে সবাই এড়িয়ে যায়। কিন্তু রাকেশ কেমন যেনো সব কিছু ভুলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই আছে। ঐ যে বশির.... সে কিন্তু রাকেশকে ভালবাসে। কিন্তু বরাবরই রেজাল্ট খারাপ করাতে রাকেশের উপর ক্ষ্যাপা।

(এক)
রাকেশ আর দশটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতই সাধারণ একটি পরিবারের ছেলে। তার বয়সের আর দশটা ছেলে-মেয়ের মত তারও রয়েছে অনেক স্বপ্ন.... জীবনকে ঘিরে, জীবিকাকে ঘিরে। গল্প-কবিতায় অনুল্লেখ্যযোগ্য হাত থাকলেও, তার স্বপ্ন একদিন সে বড় নির্মাতা হবে। যদিও তার শিক্ষাগত সনদের সাথে এগুলো কিছুতেই চলনশীল নয়। ফলে সবসময়ই তাকে প্রতিকুলতার সাথে সখ্যতা গড়ে নিতে হয়েছে। প্রেম করছেনা আপাতত, তবে ভালবাসে একজনকে। হু.... অনেকদিন ধরেই এই হৃদয়ের রোগটি বাসা বেঁধেছে। কিন্তু সেটা প্রকাশ পায়নি এখনো। আর পেলেও বাস্তবায়ন যে হবে না, এ ব্যপারে সে পুরোপুরি নিশ্চিত। কারণ বিপরীত স্রোতে তরী বাওয়া মানুষগুলোকে সারাজীবন সংগ্রামই করে যেতে হয় সময়, সমাজ আর জীবনের সাথে। আর সেখানে পাশের সংখ্যা খুবই নগন্য। রাকেশ তার পরিবেশের অনেকের মাঝে একজন হলেও, দেশে অনেকের মাঝে না থাকা একজন। স্বপ্নকে সত্যি করার স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখার (৫%) পাশাপাশি (৯৫%) সে এখন দেশের স্বনামধন্য বেসরকারী টিভি চ্যানেল স্বাধীন বাংলা'র প্রযোজক হুমায়ন রহমানের সহকারী কাম স্ক্রীপ্ট রাইটার হিসেবে কাজ করছে। অবশ্য কাজ করছে না বলে, কাজ শেখার চেষ্টা করছে বলা ভাল। আরেকটি কথা, "মুক্তিযুদ্ধ".... এই কথাটার প্রতি দূর্বলতা হঠাৎ কেন কিভাবে কবে এলো.... এসব প্রশ্নের উত্তর জানা না গেলেও, এটা সবাই জানে যে রাকেশের কাছে সারা পৃথিবী একদিকে আর বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ একদিকে। ও সবসময়ই স্বপ্ন দেখে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন একটা অনুষ্ঠান বানানোর, যা তার তৃষ্ণা মেটাবে, প্রজন্মকে জাগ্রত করবে। তার আশেপাশের ছেলে-মেয়েদের দেখেছে কেমন যেন অবজ্ঞা করে মুক্তিযুদ্ধকে, ... মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বললেই সবাই ফালতু, ফটকা বলে চিহ্নিত করতে চায়। তাই তার স্বপ্ন এমন একটা অনুষ্ঠান করবে, যা তার সমবয়সীদের জানাবে মুক্তিযুদ্ধ কি ছিল, এদেশের স্বাধীনতার জন্য কত কষ্ট করেছে মুক্তিযোদ্ধারা, কত অত্যাচার সয়েছে মা বোনেরা....। স্বাধীনতা বিরোধীরা কত বড় অমানুষ ছিল, ছিল কতটা বর্বর, জানোয়ারেরও অধম। সহপাঠীরা প্রায়ই বলে, কি মিয়া! টিভিতে নাকি কাজ শুরু করছ? কবে দেখাইবা? অনেকে অবজ্ঞার চোখে দেখে, অনেকে হিরো বানাচ্ছে। আসলে ঢাকার বাইরের পরিচিত দৃশ্য যেমন হয় আর কি! আজ নতুন অনুষ্ঠানের প্রস্তাবনা বানাতে বলল হুমায়ন। রাকেশও খুব উৎসাহ নিয়ে কাগজ পত্র দেখা শুরু করল।

ক্রিং ক্রিং ক্রিং........ মোবাইলটা একটানা বেজে চলছে। রাকেশ দৌঁড়ে এসে ধরল। হ্যালো, স্লামালাইকুম হুমায়ন ভাই। কেমন আছেন?
কি মিয়া, একেবারে ভুইলা গেলেন।
না, মানে খুব ব্যস্ত ছিলাম।
আরে রাখেন ব্যস্ততা। ডিসেম্বরের জন্য একটা প্রপোজাল বানান। এইবার একটা অন্যরকম অনুষ্ঠান বানাব। আপনে তো খালি রিক্সাওলা আর ভিক্ষা করা মুক্তিযোদ্ধা খোঁজেন। এইসব অনুষ্ঠান অনেক হইছে। সবাই বানায় এখন। নতুন কিছু করেন এইবার। যেইটা কেউ করে নাই।
ঠিক আছে। কবে লাগবে?
কালকের মধ্যে।
কালকের মধ্যে কিভাবে সম্ভব! পরশু পাবেন।
ঠিক আছে। পরশু ফোন দেব।

ফোন কাটার পর থেকেই রাকেশ ব্যস্ত। সংগ্রহের সব ডাটা, পেপার কাটিং, বই সব দেখছে। কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না। একটার পর একটা সিগারেট টানছে টেনশন আর উত্তেজনায়। কিন্তু কোন সমাধান পাচ্ছে না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল গত বছরের কথা। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে একটা প্রপোজাল দিয়েছিল গত বছর। কিন্তু ফালতু বিষয় হিসেবে, প্রপোজাল বাতিল হয়ে যায়। একটা অভিমান ভর করে রাকেশের মনে। কাগজ পত্র সব ভাজ করে রুমের বাইরে চলে যায়।

(দুই)
কি খবর! কাজ হইছে... হুমায়নের প্রশ্ন।
না ভাই! কেউ করে নি, এমন কিছু পাইনি।
একটা সাধারণ কাজ পারেন না, আবার লম্বা লম্বা ডায়লগ দেন!
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাকেশ আবার বলল, ভাই গতবারের প্রপোজালটা আবার দেখবেন?
কোনটা?
বীরাঙ্গনা....
হু..... দেন। দিয়া দেখি।

প্রপোজাল পাশ হলে কয়েকদিনের মধ্যেই পরিচিত সবাই খেয়াল করল রাকেশের ব্যস্ততা। আবারো নতুন পুরাতন মুক্তিযুদ্ধের বইয়ে টেবিল একাকার। রুমমেট বশির বলে গেল, ভাল! আবার শুরু। নিয়াজ বলল, এইসব ফালতু কাম না করলে হয় না! এইসব কি ভাত দিবো? এখনো সময় আছে আসল কাজে নাম। আর শেষজন রাজু। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, বাইরে চল। চা খাব।
দোকানে বসে চা খেতে খেতে বলল, দেখ রাকেশ! আমি সবসময়ই তোকে উৎসাহ দিয়েছি। কিন্তু সব ভুলে শুধু এসব নিয়ে থাকলে তো আর জীবন চলবে না, তাই না। গতবছর একবার সবাইকে বললি, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে অনুষ্ঠান করছিস। সবাই অপেক্ষায় থাকল। শেষে পুরোটাই ভুয়া! সবাই তোকে নিয়ে হাসাহাসি করল। আবার পরীক্ষার রেজাল্টও বরাবর ডাব্বা। এভাবে কি চলবে?
কি করব! অফিস যে Accept করবে না, কে জানত। আমার প্রডিউসারও তো কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু অফিস তো বলল, এসব ফালতু, ষ্পর্শকাতর ব্যাপার নিয়ে অনুষ্ঠান করা যাবে না।
যদি এটা সত্য হয়ে থাকে, তো ঠিক আছে। কিন্তু তোর প্রডিউসার ঠিক আছে তো? মানে দেশপ্রেমের তাগিদ থেকে অনুষ্ঠানটা করবে তো, নাকি পুরস্কার-টুরস্কার পাবে সেজন্য ছক কেটে বসে আছে? আর তাছাড়া ৭১, বীরাঙ্গনা, মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার এসব ব্যাপারে কাজ করার জন্য তোর চাইতে ভাল গোল্ডেন এ+ ফ্রি কাজের লোক আর কোথায় পাবে? যাই হোক, দুই সপ্তাহ পর পরীক্ষা, মনে আছে তো!
দেখ এই সুযোগটা হারালে, আর পাবোনা। কিন্তু পরীক্ষা....

(তিন)
কি খবর! ইলিয়াস ভাই। কত দিন পর দেখা! ক্যামেরা এ্যাসিসটেন্ট কে যাচ্ছে?
জসিম যাইব। ..... এই রাকেশ ভাই, তিন দিনের সিডিউলে কি করবেন? বিশ মিনিটের অনুষ্ঠানে তিনদিন?
আরে ভাই, কাজ আছে।

সবাই গাড়ীতে উঠলে রাতের আধাঁরে রসুলপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো মাইক্রোটি। পৌছঁতে ভোর হয়ে যাবে। গাড়ীতে হালকা কথা হচ্ছে। এর মাঝে রাকেশ হিসাব করছে। কখনো কল্পনায় স্ক্রীন সাজাচ্ছে। এমন একটা শর্ট, এমন একটা আবহ, বীরাঙ্গনা মাতারা বলে যাচ্ছে একের পর কষ্টের কথা, বীরগাঁথা ঘটনা, কাঁদছেন, আজো প্রত্যাশা বুকে নিয়ে উদাস চোখে দূর পথে চেয়ে আছেন। হঠাৎ ইলিয়াস জিজ্ঞাসা করল- রাকেশ ভাই, অনুষ্ঠানের নাম কি?
বীরমাতা বীরাঙ্গনা।
এইটা আবার কেমন নাম!
আরে কইয়েন না। রাকেশ কৈ ত্তে জানি নাম যোগাড় করছে। বীরমাতা... হে আবার বীরাঙ্গনা! হে..হে..হে..- হুমায়ন জবাব দেয়। রাকেশ চুপ করে থাকে।
ইলিয়াস আবার জিজ্ঞাসা করে, রাকেশ ভাই, বীরাঙ্গনা জিনিসটা কি?
ই য়ে... মানে..
হুমায়ন তড়িৎ জবাব দেয়, আরে ৭১-এ যাগোরে চুদছিলো। ঐ চুদা বেডিগরে কয় বীরাঙ্গনা।
রাকেশ কেমন যেনো ঝিমুচ্ছিলো। হঠাৎ চমকে উঠে। ভাই, এমন একটা মানসিকতা নিয়া আপনে বীরাঙ্গনাদের নিয়া অনুষ্ঠান করতে চাইতাছেন! আপনে কাদের নিয়া কথা বলতাছেন, বুঝতাছেন?
ঐ মিয়া মিছা কথা কইছি নাকি! আপনেই কন, হেগরে কি চু....
ভাই আমি আপনের সাথে ঝগড়া করতে চাইতাছি না।
গাড়ীর সবাই হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে। রাকেশের মাথায় আগুন জ্বলছে। কিন্তু চুপ থাকতে হবে। যে কোন মূল্যে অনুষ্ঠানটা বানাতে হবে। ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহ চলছে। ঢাকার বাইরে প্রচন্ড শীত। গাড়ীর জানালা দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। গাড়ী খুব আসত্দে আসত্দে চলছে। হেড লাইটে বড়জোর দশ হাত বোঝা যাচ্ছে। ..... মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। গাড়ীর ভেতর সবাই ঘুমাচ্ছে। ড্রাইভার আপন মনে ধীরে ধীরে গাড়ী চালাচ্ছে। আর রাকেশ একটার পর একটা সিগারেট টানছে। ড্রাইভার একবার পিছন ফিরে কি জানি দেখলো।
রাকেশ ভাই,একলা সিগারেট খাইলে চলবো?
সরি বস্। নেন ধরান।
না না ধরাইয়া দেন। গাড়ী এক সেকেন্ডের লাইগা ছুটলেও খবর আছে।
ড্রাইভার সিগারেট টানতে টানতে আবার তাকালো। ভাই'র কি মন খারাপ?
না... মন খারাপের কি আছে! অনুষ্ঠানটা তো এদের মত মানুষদের জন্যই বানাচ্ছি।
তবুও... যে বানাইবো সে-ই যদি এমন কথা কয়..... তাইলে তো....
বাদ দেন।
হ, সেইটাই ভাল। তারচেয়ে আপনারে একটা গল্প বলি।
আমারে!... বলেন।
৭১'এ আমার বয়স ৭/৮ বছর হইবো। আমাগো গ্রামের এক হিন্দু বাড়ীতে তিন মুক্তিযুদ্ধা পলাইয়া ছিলো। তো আমাগো ঈমাম সাবে এইডা কেমনে জানি জাইনা ফেলল। এই লোক যে রাজাকার, এইটা আমরা জানতাম না। যাই হোক, পাকিস্তানীরা সেই হিন্দু বাড়ীতে আসল। হায় হায় এখন কি হইব! মুক্তিযুদ্ধারা তো পালানের সুযোগ পাইল না। সেই বাড়ীতে ছিল একটা ২৫/২৬ বছরের হিন্দু মাইয়া। বাকি সবাই তখন কৈ জানি ছিল, মনে নাই। ভাই জবানে কইতাছি, এই ঢাকা শহরে আইজ বিশ বছর। এত সুন্দর মাইয়া আমি আর জীবনেও দেখি নাই। তো হইছে কি.... পাকিস্তানীরা যেই না ঘরে ঢুকবো হঠাৎ কইরা দেখি মাইয়াডা ল্যাংটা হইয়া ক্ষেতের দিকে দৌঁড় দিছে। এইডা দেইখা পাকিস্তনিরা সব তার পিছে পিছে দৌঁড় দিলো। আর মুক্তিযুদ্ধারা বাড়ীর পিছন দিয়া পালাইয়া গেলো। আল্লাই হেগরে বাঁচাইয়া দিলো।
আর মেয়েটা?
ভাই আপনের মাথা তো আসলেই খারাপ হইয়া গেছে দেখি। এই যে আপনেরা কথায় কথায় আড়াই লক্ষ মা বোইনের কথা কন, এগরে নিয়াই তো! একটু গল্প দিয়া কইলেই আপনেরা আর তাগরে চিনেন না। .... দেন, আরেকটা সিগারেট ধরাইয়া দেন।
হঠাৎ হুমায়ন নড়ে উঠল। কি রাকেশ মিয়া, ঘুমান নাই! ও... মন খারাপ। আরে মিয়া ইলিয়াস অশিক্ষিত লোক। তারে তো আর তত্ত্ব কথা দিয়া বুঝাইতে পারবেন না।
এবার দেখি ইলিয়াস নড়ে উঠল। ভাই, কিছু বলতাছেন নাকি?
হ... ইলিয়াস ভাই, এই কামডা দিয়া কইলাম পুরস্কার পামু। নিশ্চিত পুরস্কার। তো রাকেশ, বিদেশে এই অনুষ্ঠানটা পাঠানির ব্যবস্থা করা যায় কি না, দেইখেন তো।
ফাও যদি পুরস্কার টুরস্কার পাওয়া যায়.... কি কন!
আচ্ছা দেখবো।
আসত্দে আসত্দে কখন যেনো ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমরাও রসুলপুরে চলে এসেছি। দূরে একটা খেঁজুর গাছ থেকে রস নামাচ্ছে একজন। দু'চারজন লোক চাদর মুড়ি দিয়ে খড়-কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে উম নিচ্ছে। একটা ছেঁড়া লাল সোয়েটার আর হাফপ্যান্ট পড়ে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। হাত দুটো বুকের কাছে ধরা।

(চার)

রাকেশ.... হুমায়ন ডাক দেয়।
জি বলেন।
উনাদের সাথে কথা বইলা নোট তুলেন।
জি, কথা চালাচ্ছি।
কৈ মিয়া চালাইতাছেন? খালি তো হাইসা হাইসা কথা কইতাছেন। আরে মিয়া, হেগরে কান্দানের ব্যবস্থা করেন। হেরা না কানলে তো হইব না।
ভাই, জীবনের সবচাইতে কষ্টের কথাগুলা বলতে গেলে এমনিতেই কানবো। বইলা কান্দাইতে হইব না।
দূরো... মিয়া! কষ্ট কিয়ের! পাকিসত্দানীগো লগে ফিলিংস তো ঠিকই নিছে। আরাম পায় নাই,মনে করছেন!
ভাই আস্তে বলেন। এইসব অসভ্যতামি করতাছেন কি জন্য?
আইচ্ছা আসত্দে কইতাছি। যান তাগরে ইমোশনাল বানান। আর আমি চারপাশের ফুটেজ নিয়া আসতাছি। ইলিয়াস ভাই, ক্যামেরা নিয়া পিছনে আসেন।
রাকেশ বীরাঙ্গনাদের সাথে কথা বলছে। তাঁদের জীবনের গল্প, আজকের দিন পর্যনত্দ বেঁচে থাকা, তাঁদের প্রাপ্তি, প্রত্যাশা সবই নোট করছে। অতঃপর ক্যামেরা রেডি হলে বলল- আম্মা, এই কথাগুলাই আপনে আরেকবার বলবেন।
এবার হুমায়ন বলে উঠে, চাচীমা শোনেন, আপনের মত কইরা আপনে বইলা যান। ক্যামেরার দিকে তাকাইয়েন না।.... ও কে। রেডি... ফাইভ ফোর থ্রি টু ওয়ান জিরো জিরো জিরো.... এ্যকশন।
বীরাঙ্গনা নাসিমা বানু বলে যাচ্ছেন তাঁর জীবনের গল্প। তাঁর সামনে কিভাবে তাঁর বাবা, ভাইকে হত্যা করা হলো। কিভাবে তার কোলের বাচ্চাকে তার মায়ের কোলে ছুঁড়ে দিলো। কিভাবে তাঁর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়া হলো। ... নাসিমা মুখ ঢেকে কাঁদছেন। কেঁদেই যাচ্ছেন। আমার ভাই..... আমার বাপ.... মুখে কাপড় চাপা দিয়ে কাঁদছেন তিনি। ক্যামেরাম্যান অপলক চেয়ে আছেন সাইড স্ক্রীনে। বুম ধরা ছেলেটার হাত কাঁপছে একটু। রাকেশ দ্রুত নোট তুলছে। হুমায়ন হাসিমুখে রাকেশের কাঁধে চাপ দিলো। হঠাৎ নাসিমা বানু কান্না চোখে ক্যামেরার দিকে তাকালো। হুমায়নের হাসি থেমে গেলো।
কাট্। এইটা কি করলেন! ক্যামেরার দিকে তাকাইছে ক্যান? আর আপনে মুখ ঢাইকা কাঁদলে তো মানুষে সাহায্য দিবো না। ঘোমটাটা একটু সরান। ঐ যে আঁচলের ছেঁড়া... ঐখান দিয়া মুখ বাইর করেন। এই তো... এখন বুঝা যাইতাছে আপনের পড়নেরও শাড়ী নাই। শোনেন চাচী, ঢাকার মাইনষে যখন এই অনুষ্ঠান দেখবো তখন দেইখেন সবাই কেমনে টাকা নিয়া ছুইটা আসে। অনেক সাহায্য পাইবেন। নেন, কাঁনতে কাঁনতে যেই কথাগুলা কইছেন, সেইগুলা আরেকবার কন।
এভাবে এক... দুই...তিন...। এবারে চতুর্থ জন। বীরাঙ্গনা শেফালী বেগম। বরাবরের মতো তিনিও বলতে বলতে কেঁদে ফেলছেন। তাঁর স্বামী তাঁকে আর গ্রহণ করেনি। বর্তমানে মেয়ের শ্বশুরবাড়ীতে আশ্রিতা। ঠিকমত ভাত-কাপড় পান না। কথাগুলো তিনি বলছেন আর নিঃশব্দে কাদঁছেন। চোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে অথচ কোন কান্নার শব্দ নেই। হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ। নিঃশ্বাস টেনে টেনে কেউ কাঁদছে পাশে। ক্যামেরাম্যান, রাকেশ সবাই অবাক হয়ে দেখছে হুমায়নকে। হুমায়ন কাঁদছে। রাকেশের খুব লজ্জা হচ্ছিল। শুধু শুধু মানুষটিকে ভুল বুঝেছিলো। রাকেশ এত আবেগ দেখায়, অথচ তার চোখে কোন জল নেই। আর এদিকে যাকে সে নিকৃষ্ট মানুষ ভেবেছিলো, সেই হুমায়ন কাঁদছে।
রেকর্ডিং আজকের মতো প্যাকআপ। বাকি অংশ আগামীকাল। তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে ফিরছে পুরো ইউনিট। হঠাৎ হুমায়ন ক্ষেপে উঠল।
আচ্ছা রাকেশ, আপনারে আনছি কি জন্য? শেষের এই মহিলা যে সাউন্ড ছাড়া কনতেছিলো, দেখেন নাই? খালি ফাঁকি দেন। ঢাকায় গিয়া কি তার কান্নার সাউন্ড ডাবিং করতেন নাকি? ভাগ্য ভালো যে আমি ধরতে পারছিলাম। দূরেত্তে কান্দার সাউন্ড না দিলে তো শর্টটাই মাটি হইয়া যাইতো।
রাকেশ বোকার মত চেয়ে থাকে। তবে এবার তার কষ্টটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কান্নার সাথে শব্দ নেই বলে ডামি সাউন্ড!

(পাঁচ)
আজ সবাই যাচ্ছে গতদিনের জায়গা থেকে একটু দূরে। আধা ঘন্টার রাসত্দা। সেখানে আছেন বীরাঙ্গনা মঞ্জু দাস। মঞ্জু দাস সম্পর্কে যতটা তথ্য জানা গেছে তার পুরোটাই অমানবিক। দু দফায় তাকে গণ ধর্ষণ করা হয়েছিল। প্রথমবার ধর্ষণ শেষে তাঁর শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয়। তার দিনকয়েক পর দ্বিতীয়বার। তাঁর হাত পা কপাল মুখসহ কয়েক জায়গার মাংস কামড়ে ছিড়ে ফেলে জানোয়ারেরা। এমনকি তাঁর একটা ব্রেস্টও কামড়ে ছিড়ে ফেলা হয়েছিল। তাঁর স্বামী জাও রান্না করে নিজ হাতে তাঁকে খাওয়াতেন। ভাল কীর্তন গাইতেন। কিন্তু বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার ঘটনায় বাংলাদেশে যে দাঙ্গা হয়েছিল,সে সময় তাঁর স্বামী নিখোঁজ হয়। বরিশাল থেকে কীর্তনের বায়না আসে। দল সহ তিনি যাচ্ছিলেন লঞ্চে। হঠাৎ মাঝ নদীতে তাদের উপর আক্রমণ হয়। হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হয় সবাইকে। প্রায় তিনমাস পর মঞ্জু দাস জানতে পারেন তাঁর স্বামী আর আসবে না। দরজায় কুপি জ্বালিয়ে অপেক্ষার দিন শেষ হয়। তারপর ছেলের সংসারে বোঝা হয়ে জীবনযাপন। ছেলের রান্নাঘরে মাটির উপর পলিথিনের বসত্দা বিছিয়ে ঘুমান। মাঝে মাঝে সেখান থেকেও বের করে দেয়া হয় তাকে। সাপ্তাহিক আয় ৭০ টাকা। তা দিয়েই চলে যায় ৭ দিনের আধপেটা সপ্তাহ। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। থাকে শ্বশুরবাড়ী।
এতো অনেক তথ্য! মেইন স্টোরী একে নিয়েই করতে হবে- রাকেশ বলে।
হু..ম... ভাল ডাটা সংগ্রহ করছেন। এক কাজ করেন এলাকার লোকদের কাছ থেইকা তার ব্যপারে খোঁজ নেন। আর আমি শর্ট নিতে থাকি- হুমায়নের জবাব।
মঞ্জু দাসের বাড়ীতে ইতিমধ্যে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। টেলিভিশনের ক্যামেরা, রিফ্লেক্টর বোর্ড, বুম সবই তাদের কাছে নতুন। তাই তারা আগ্রহ নিয়েই এখানে জড়ো হয়েছে। রাকেশ এই ভীড়ের মাঝে মোটা স্বাস্থ্যবান মধ্যবয়সী একজনকে ডাক দিলো কথা বলতে।
স্লামাইকুম ভাইজান। আমি রাকেশ। আপনার সাথে একটু কথা বলব।
আমার সাথে! জি্ব জি্ব বলেন।
রাকেশ লোকটিকে নিয়ে একটু আড়ালে যায়। একটা সিগারেট নিজে ধরিয়ে লোকটাকে একটা দেয়।
আচ্ছা মঞ্জু দাস মানুষটা কেমন?
খুব ভাল। কারো আগে পিছে নাই।
তাঁর সংসার চলে কেমনে?
সপ্তাহ ধইরা পাটি বানায়। সপ্তাহ শেষে ৭০ টাকায় বিক্রি করে।
এই টাকায় কি সংসার চলে? ছেলে-মেয়ে কিছু দেয় না?
মেয়েতো শ্বশুরবাড়ী থাকে। আর ছেলেডা.... একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জামাইডা মইরা যাওয়ার পর ছেলেডা তারে মাঝে-মধ্যে পিটাইয়া ঘর থেইকা বাইর কইরা দেয়। ছেলে-ছেলের বউ দুইজনই তুই তুকারি কইরা গালি দেয়।
আচ্ছা মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে পড়লে কান্দে না?
তেমন কয় না। তয় কাকার কথা কইয়া মাঝে মধ্যে কান্দে।
না এমনিতে ৭১এ যে...
রাকেশ.... হুমায়নের ডাক। রাকেশ লোকটিকে দাঁড়াতে বলে হুমায়নের কাছে যায়।
ওই মিয়া, হে তো কিছু কয় না। খালি কয় মেলেটারীরা আইল আমরা দৌঁড়াইয়া পলাইলাম। পরে আমার বাড়ী পুড়াইয়া দিছে। হে রে যে চু.. অত্যাচার করছে তা তো কইতাছে না।
সবই তো বলার কথা। সব কিছু তো আগেই ঠিক করা ছিলো। দাঁড়ান দেখি।
রাকেশ মঞ্জুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আম্মা, কোন সমস্যা!
মঞ্জু একটু যেন কেঁপে উঠল আম্মা ডাক শুনে।
বাপ। একটু ঘরের ভিতর আয়। তরা আমার এ কি সর্বনাশ করতাছস! কেউ জানেনা এইসব কথা। এত মাইনসের সামনে আমি কেমনে কমু। আমার মাইয়ারে কাইলকা সকালেই বাইর কইরা দিবো শ্বশুরবাড়ী থেইকা। আমারে একঘরা কইরা দিবো। আমার পোলায় আমারে মাইরা বাইর কইরা দিবো ঘর থেইকা। কেউ আমার হাতের একগ্লাস পানিও খাইব না।
রাকেশের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো। লোকটির সাথে কথা শেষ করতে না পারার জন্য একটু আত্মতৃপ্তিও পেল। হুমায়নের কাছে গিয়ে জানালো সব। হুমায়ন চিনত্দিত। হঠাৎ এলাকার কিছু উৎসাহী লোক জিজ্ঞাসা করল- ভাইজান কিয়ের শুটিং? হুমায়ন রাকেশকে দেখিয়ে দেয়।
আমরা সারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহ করতাছি।
তাইলে এই জায়গায় ক্যান? লিডারদের কাছে যান।
আরে ভাই লিডাররা তো সবসময়ই বলে। যারা কখনো বলার সুযোগ পায় না, তাদের কাছ থেইকা গল্প সংগ্রহ করতাছি।
হঠাৎ একজন বলে উঠল, ভাইজান ভালো কাজ করছেন। হে রা অনেক নতুন তথ্য দিবো।
মঞ্জু হঠাৎ ডাক দিলো রাকেশকে। রাকেশ কাছে যেতেই বলল- আমার এক পরিচিত বাড়ী আছে সেইখানে গেলে সব বলতে পারমু।
কিন্তু তারা যদি বলে দেয়?
তারা বলব না। খুব ভাল মানুষ।

হুমায়নকে বললে সাথে সাথে হাসিমুখে রাজি হয়ে যায়। মঞ্জুকে বলল- মা, তাড়াতাড়ি রেডি হন। সূর্য ডুইবা গেলে আর কাজ হইবনা। মঞ্জু ছোট একটা পোটলা নিয়ে ইউনিটের সাথে রওয়ানা দিলো। মিনিট পাঁচেক লাগল গন্তব্যে পৌঁছতে।
হুমায়ন ভাই, আমি আগে কথা বলে আসি। আপনারা বসেন। আম্মা চলেন।
বাড়ীতে তখন তিনজন উপস্থিত। ছেলের বউ, শ্বাশুড়ি আর ছোট নাতী। তাদের সব খুলে বলতেই তারা রাজি হয়ে গেল। একটা চেয়ার এনে মঞ্জুকে বসতে দেয়। পানি দেয়। চায়ের পানি বসায়। রাকেশ অবাক হয়েই দেখে বীরাঙ্গনা পরিচয় জানতে পেরে এরা যেনো একটু বেশীই সমীহ করছে মঞ্জুকে। রাকেশ ইউনিটের সবাইকে ডেকে দ্রুত সব সেট করতে বলে।
ক্যামেরা রেডি। এ্যকশন......। মঞ্জু বলছে তার জীবনের কথা। কাপড় উঁচু করে দেখাচ্ছে তাঁর পায়ের মাংস ছিড়ে নেয়া অংশটুকু। বলতে থাকে,কিভাবে হাতের পর হাত বদল করা হয়েছে তাঁকে। কিভাবে একজনের হাত থেকে আরেকজন কেড়ে নিয়েছে তাকে। কিভাবে একসাথে পাঁচ,দশ কিংবা পনেরো জন তাঁর শরীরের মাংসে কামড়ে ধরেছে। কিভাবে তাঁর চোখের সামনে তাঁর শরীরের মাংস কামড়ে ছিড়ে চিবিয়েছে মিলিটারীরা। ঘটনার পর তাঁর স্বামী নিজে পাতলা জাও রান্না করে তাঁকে মুখে তুলে খাইয়েছে। মুখে কিছু লাগলেই জ্বলে। দুইদিন পর আবার আক্রমণ। গায়ে কোনরকমে একটা পাতলা শাড়ী জড়িয়ে স্বামী তাকে কাঁধে তুলে দৌঁড় দেয়। ছিড়ে নেয়া মাংসের স্থানে ক্ষত। সেই ক্ষতের উপর কাপড়ের ছোঁয়ার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠল। চিৎকার করে উঠে মঞ্জু। বাড়ীর পেছনে ধানক্ষেতে ধরা পড়ে দুজনই। তাঁর স্বামী বলল, ও অসুস্থ। ওরে নিয়া যাইতে দেন। মিলিটারীরা বলল, তুই পালা, তর বৌরে দিয়া যা। তারপর তার স্বামীকে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে কেড়ে নেয় তাঁকে। আবারো রক্তাক্ত হয় তাঁর দেহ। আবারো মাংস কামড়ে ছিড়ে নেয়া হয় তাঁর শরীর থেকে। তারপর তিনি বলে যান,স্বাধীন দেশে তাঁর স্বামী নিঁখোজ হয়ে যাবার ঘটনা। কথা শেষ হলে, রাকেশ চেয়ে দেখে উপস্থিত সবার চোখে পানি। সবাই যেনো ৭১'এর এই ঘটনাটা নিজের চোখে দেখল এতক্ষণ ফ্ল্যাসব্যাকের মাধ্যমে।
কাট্। প্যাকআপ। ইউনিটের সবাই কেমন যেনো কাজের ছন্দ হারিয়ে ফেলল। ব্যাগ গোছানো শেষ হলে, মঞ্জু রাকেশকে কাছে ডেকে হাতটা ধরল।
তুই তো আমার ছেলে। ছেলে না?
জ্বি আম্মা।
রাকেশের হাতটা নিয়ে পায়ের পুরানো ক্ষত,হাতের ক্ষত,কপাল,গাল সব স্পর্শ করালো। আমার এই জায়গাগুলি এখনো গর্ত হইয়া আছে। বাবা,আমার ভাত খাওয়ার পয়সা নাই। তরা আমার লাইগা কিছু কর।
হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন মঞ্জু। একবার রাকেশ,একবার হুমায়ন,একবার জসিম,একবার ইলিয়াসকে জড়িয়ে ধরছে আর চিৎকার করে কাদঁছেন। তরা আমার ছেলে না? বাবা,তরা আবার আইবি তো? আমার লাইগা একটা ব্যবস্থা কর বাবা। আমি ভাত পাইনা বাবা। আমার ছেলে আমারে ভাত দেয়না। আমারে মারে বাবা।
কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ করেই চুপ হয়ে গেলেন মঞ্জু। আমরা গাড়ীতে উঠলাম। গাড়ী ছাড়বে এমন সময় মঞ্জু বলে বসল, বাবা আমার কথা যে ভিডিও করলি এইডাতে তো সবাই আমারে দেখব, না?
আম্মা আপনারে কেউ চিনবনা, আপনের মুখ ঢাইকা দিমু, তাৎক্ষণিক জবাব দিল রাকেশ। এসময় হঠাৎ করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে হুমায়ন মঞ্জু দাসকে পাঁচশ টাকা দিল।

(ছয়)
সন্ধা প্রায় হয়ে এলো। গাড়ী ছুটছে ঢাকার পথে। টুকটাক কথা হচ্ছে গাড়ীতে। হঠাৎ হুমায়ন গম্ভীর হয়ে গেল।
আপনে যে কইলেন মুখ ঢাইকা দিবেন। আপনে মুখ ঢাকার কে? আপনের কাজ স্ক্রীপ্ট লেখা। আপনে স্ক্রীপ্ট লেখেন। মাতব্বরী করতে কে কইছে? আমি ডিরেক্টর আমি বুঝমু কি করতে হইবো। যোগ্যতা থাকলে নিজে ডিরেক্টর হইয়া পরে কথা কইয়েন।
রাকেশ চুপ হয়ে মাথা নিচু করে রাখে। খুব গোপন জায়গায় আঘাতটা লেগেছে। গভীর রাতে গাড়ী ঢাকায় প্রবেশ করল। রাকেশ নামার পথে হুমায়ন বলল, পরশু ক্যাপচার হবে। তারপর এডিটিং। চইলা আইসেন।

(সাত)
আজ ১৫ ডিসেম্বর। এডিটিং হবে। এডিটর সাকিব ভাই। কিছুক্ষণ পর পর সিগারেট টানছে। গল্পগুজব করছে। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এলো। এডিটিং হবে সারারাত। কাল দুপুরে অনএয়ার। ইতিমধ্যে টাইটেলের কাজ শেষ। গতকাল দেশের জনপ্রিয় একজন সেলিব্রেটি সাভার স্মৃতিসৌধে এ্যাংকর হিসেবে লিংক দিলেন। কাজ খারাপ হয়নি। তবে দেশের খুব পরিচিত একজন বীরাঙ্গনাকে নিয়ে তার নেতিবাচক মনোভাব শুনে রাকেশ নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি। এক চোট উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। সেজন্য হুমায়ন আজ রাকেশের উপর এক চোট নিল।
আপনে জানেন, এ্যাংকর কি বলছে?
কি বলছে? রাকেশ ভেবেছিল হয়ত স্ক্রীপ্টের প্রশংসা করবে।
বলছে কৈত্থে এই সব বেয়াদব আনছো? সিনিয়রদের সাথে কথা বলতে জানে না। বাড়ীর লোক কি ভদ্রতা শেখায় নাই?
আসলেই বলছে? তেমন কিছু তো হয় নাই।
তা... আমি কি মিথ্যা বলছি? আপনে যখন তখন উল্টাপাল্টা কথা কন। রসুলপুর যাওয়ার সময় একবার আমার সাথে ঝগড়া করছেন। এইখানে আবার এ্যাংকরের সাথে ঝগড়া করছেন। এমন ফাইজলামি করলে তো কাজ করতে পারবেন না। সারা জীবন দুই টাকার স্ক্রীপ্টই লেখবেন।
উনি কিভাবে একজন বীরাঙ্গনাকে অপমান করে কথা বলেন। উনি কি বলছে জানেন? উনি বলছে, এই মহিলারে নিয়া সবাই এমন ভাব দেখায় যে এই দেশ পুরাটা তার জন্যই হইছে। আর সেও এই চান্সে নাম কামাইতাছে। কত বড় বেয়াদব! উনি খালি সিনিয়র সেলিব্রেটি বইলা।
যাক। সব জায়গায় বেয়াদবী ভাল না। একবার যদি কমপ্ল্যান দেয়, জীবনে আর এই চ্যানেলে ঢুকতে পারবেন না।
রাকেশ চুপ হয়ে যায়। তারপর থেকেই এডিটর সাকিবের সাথে বসে আছে। কখনো সিগারেট টানছে বাইরে গিয়ে। মাগরিবের পর সাকিবকে বলল- বস চলেন, চা খেয়ে আসি। একটু কথাও আছে। চা খেতে খেতে বলি।
চলেন।
চা খেতে খেতে রাকেশ শুরু করে। বস, এডিটিংয়ের সময় একজনের মুখ ফ্যাড করে দিতে হবে।
কেন? গোপনে ভিডিও করছেন নাকি?
না না। আসলে সে খুব কান্নাকাটি করছে। পরে বলল যে তার আশেপাশের কেউ জানে না, উনি যে বীরাঙ্গনা। এইটা প্রকাশ পেলে তার মেয়েরে তালাক দিয়া দিবো। তারে একঘরা কইরা দিবো গ্রামের লোকজন। তার হাতের একগ্লাস পানিও কেউ খাবে না। আমরা তারে কথা দিয়া আসছি, তার মুখ কেউ দেখবো না।
তাহলে আর সমস্যা কি? মুখ ফ্যাড কইরা দিবো।
অবশেষে এডিটিং শুরু হলো। রাকেশ তার স্বপ্ন বাসত্দবায়ন করছে। এডিটরকে একটার পর একটা সিকোয়েন্স বলছে। ভয়েজের সাথে ফুটেজ সাজাচ্ছে। রাত এখন তিনটা। রাকেশ আর সাকিব এডিটিংয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। আবার কাজে বসছে। এদিকে হুমায়ন রিসিপশনে এসির নীচে বুকে,গলায় মাফলার পেঁচিয়ে ঘুমাচ্ছে। চারটার দিকে হুমায়ন একবার এসে আবার ঘুমাতে চলে গেল। সকাল ছয়টার দিকে যখন এডিটিং শেষ হয়ে এলো তখন হুমায়ন এসে হাজির।
দেখি কি বানাইলেন?
সাকিব প্রথম থেকে ছেড়ে দিয়ে বাথরুমে গেল। রাকেশ চুপ করে ভাবছে,আজ হয়ত হুমায়ন তার প্রশংসা করবে। কিন্তু যেই না মঞ্জু দাসের সিকোয়েন্স এলো অমনি ক্ষেপে উঠলো।
এই মাতব্বরী কে করছে?
ইতিমধ্যে সাকিব ফিরে এসেছে। সেই জবাব দিল।
ক্যান, রাকেশ বলল উনার মুখ নাকি ফ্যাড করে দিতে হবে। কি নাকি সমস্যা আছে? আপনারাও নাকি কথা দিয়া আসছেন?
আরে বাদ দেন কথা দেয়া। রাকেশ বলছে আর আপনে আমারে জিজ্ঞাসা না কইরাই মুখ ফ্যাড কইরা দিছেন।
আপনে তো কিছু বলেন নাই!
বলিনাই বইলাই তো আজাইরা কিছু করবেন না। নেন, এখনই চেহারা নিয়া আসেন। কাইন্দা কাইন্দা ভিক্ষা চাইব, আবার মুখ দেখাইব না। এত সুবিধা তো দেয়া যাইব না। তাছাড়া আমি তো পাঁচশ টাকা দিয়া আসছি। আর ঐ মহিলার মুখ ঢাইকা আমার কি লাভ?
সাথে সাথে রাকেশ প্রতিবাদ করে বসল।
ভাই, এইটা কি বলতাছেন? পাঁচশ টাকা দিয়া কি তারে কিন্না নিছেন নাকি? আমাদের কাছে সুযোগ আছে বইলা কি আমরা তার মিস ইউজ করবো! আর সব কিছুতে লাভ খোঁজেন ক্যান? ....ভাই, মহিলা তো পরে সুইসাইড করবো।
তা আপনের এত পিরিত ক্যান? শোনেন, যেখানে লাভ নাই সেইখানে আমিও নাই। মনে তো হইতাছে আপনে নিজেই সুইসাইড করবেন!
ভাই মুখ ফ্যাড থাকবো। নয়ত অনুষ্ঠান যাবে না। প্রয়োজনে আমি প্রোগ্রাম চীফকে কমপ্ল্যান করবো।
বাল ছিড়বেন আপনে।
অমনি সাকিব বলে বসল- হুমায়ন ভাই,মুখটা দেখায়েন না। আপনে কথা দিয়া আসছেন। এখন যদি মুখ দেখান,তাহলে আমাদের চ্যানেলের উপর বিশ্বাস নষ্ট হইয়া যাইব। আর মহিলার যদি কোন সমস্যা হয়,আর সেই খবর যদি চ্যানেলে আসে তাহলে কিন্তু চাকরী থাকবো না।
হুমায়ন চুপ করে গেল। দুপুর দেড়টায় অনুষ্ঠানটি প্রচার হলো। স্বাধীন বাংলা'র অফিসে বসেই সবাই একসাথে অনুষ্ঠানটি দেখল। অফিসের প্রায় সবাই-ই দেখল। অনুষ্ঠান শেষ হলে চ্যানেলের নিজস্ব এ্যাংকর শিরিন এসে হুমায়নকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলল, অনুষ্ঠানের এত সুন্দর নাম কে দিয়েছে?
তাই নাকি? ভাল হয়েছে! আর বলবেন না, দুই মাস ধরে ভাবছিলাম নাম নিয়ে। পরে মনে হলো এর চেয়ে ভাল নাম আর হতে পারে না- হুমায়নের উত্তর।
কি বলেন? এত সুন্দর নাম আপনি দিয়েছেন?
হ্যা.......
আর হ্যা, শেষেরটাতে যে মুখ ফ্যাড করলেন, দারুণ আইডিয়া। মনে হয়েছে, এঙ্ক্লুসিভ আইটেম।
না না, এঙ্ক্লুসিভ কিছু না। মহিলা খুব রিকোয়েষ্ট করেছিল তার মুখ না দেখাতে। আমাদেরও তো একটা দায়িত্ব আছে, তাই মুখটা ঢেকে দিলাম।
খুব ভাল করেছেন। শুনেন হুমায়ন ভাই, আমি উনাদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেবো। একটু পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েন।
অবশ্যই। আমিও তো নিজের পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা উনাদের দিয়ে আসছি। আসলে খুব মায়া হলো উনাদের দেখে।
রাকেশের কানে উত্তপ্ত শীশা যেন ঢেলে দিল কেউ। রাতজাগা লাল চোখ নিয়ে হলের রুমে ফিরল। রুমমেটরা হাসিমুখে বলল, ফাটাইয়া দিছ মামা। কিন্তু রাজু কড়া চোখে একবার তাকালো। তারপর বলল নোট গোছানো আছে। রাত্রে থেকে পড়তে বসিস। আধা ঘন্টার মধ্যে হুমায়নের মোবাইলে আট/দশটি কল আসল। চ্যানেলেও আসল। সারা দেশের যারা অনুষ্ঠানটি দেখেছে, অনেকেরই মনে গেঁেথ গেছে অনুষ্ঠানটির মর্ম। অনেকেই বীরাঙ্গনাদের সাহায্য করতে চায়।

এরপর রাকেশ আর কোনদিন হুমায়নের এ্যাসিসটেন্ট কিংবা স্ক্রীপ্ট রাইটার হিসেবে কাজ করেনি। তবে ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ হুমায়ন প্রথমে এস.এম.এস.'র মাধ্যমে একটা ফোন নাম্বার পাঠিয়ে কিছুক্ষণ পর কল দেয় রাকেশকে।
হ্যা... রাকেশ। শুনেন একটা ঝামেলা হইছে। অনেকেই বীরাঙ্গনাদের সাহায্য করতে চায়? কিন্তু টাকা আমার কাছে দিতে রাজি হইতাছে না। আপনে একটা নাম্বার পাইছেন না? ঐ নাম্বারে কথা বইলা দেখেন সাহায্যের টাকার কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা।
রাকেশ একটু চুপ থেকে বুঝে নিল,কি করা উচিৎ। বলল- তা এই কাজে আমার কি লাভ?
আপনার কি লাভ মানে!
আমি তো লাভ ছাড়া কাজ করি না।