রাত এখন কত হবে ? বোধহয় ১২ কিংবা কাছাকাছি। আমি কার্নিশে শুয়ে আছি। আকাশে বিশাল চাঁদ। আমাকে নিয়ে হাসছে। নিচ থেকে ভেসে আসছে করুন সানাইয়ের সুর। বুকের ভিতর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে সব কিছু। এমনই সময় টুম্পা ডাকতে এলো। নিচে চল জলদি। রুম্পা চলে যাচ্ছে। কি শুনলাম বুঝলাম না। কিন্তু জ্ঞান ফিরতেই বুঝলাম হাসপাতালে শুয়ে আছি। চারপাশে সবাই। বাবা, মা, চাচা, চাচী, টুম্পা শুধু রুম্পা নেই। বাবা অগ্নিশর্মা। কেন কার্নিশে শুয়েছিলি? দাড়া বাসায় যাই আগে, তারপর যদি তোর হাত না ভাঙ্গি। টুম্পা হেসে উঠে। হাত তো এমনিতেই ভাঙ্গা, আর কি ভাঙ্গবেন।
একই বাড়ীতে যৌথ পরিবারে মানুষ আমি। রুম্পা টুম্পা চাচাত বোন। রুম্পা ছিল সবচাইতে কাছের বন্ধু। সব কিছু শেয়ার করতাম আমরা। আর টুম্পা ছিল আমার কানমলা আর কিল খাওয়ার পার্টনার। অবশ্য আমি শুধু দিতাম আর ও খেত। আমার প্রেম ক্লাসমেট অদিতি। আর এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা রুম্পা। ও..ই সব রকম বুদ্ধি ,পরামর্শ, অর্থসহ যাবতীয় সকল প্রকার ত্রাণ দিত। অবশ্য সাথে আরেকজন ছিল। মনোজদা। ভয়াবহ স্মার্ট, সুদর্শন এবং টাকাওয়ালা মানুষ। এই মনোজদা আর রুম্পা ছিল চমৎকার এক জুটি। আর আমার চাকরি ছিল তাদের পরস্পরের খোঁজ খবর , মাঝেমাঝে চিঠি আনা নেয়া। বুঝতামনা এই মোবাইলের যুগে চিঠি কেন। জিজ্ঞাসা করলে দু’জনই হাসতো। বলত সময় হলে বুঝবা। সব তো আর মুখে বলা যায়না। যা মুখে বলা যায়না তা চিঠিতে লিখতে হয়। তুমিও লিখ মাঝেমাঝে অদিতিকে, দেখবে অনেক কঠিন কথা কেমন তরতর করে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু বুঝতামনা কি এমন কথা থাকতে পারে যা মুখে বলা যায়না, অথচ চিঠিতে লিখা যায়। ঠিক করলাম অদিতিকে লিখব। কিন্তু এমন কোন কথা খুঁজে পেলামনা যেটা বলতে পারিনা। বুঝলাম অবশ্যই জানতে হবে । টার্গেট নিলাম পরবর্তী চিঠিটা...।
অদিতির সাথে আমার সময় বেশ ভালই কাটছিল। হঠাৎই ওর লন্ডন ফেরত মামাত ভাই এসে সব গুবলেট করে দিল। বিয়ে করতে চায়। সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের ছাত্রী অদিতি। তবু তার মা বাবা একপায়ে খাড়া মেয়েকে বিদায় করতে। যেন ৫ টনি বস্তা, তাদের ঘাড়ে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আর অদিতিও খুশীতে লাফাতে আরম্ভ করল। যখন বললাম আমাদের এত দিনের সম্পর্ক ?
আগুন কন্ঠে জবাব, “কোনটাকে তুমি সম্পর্ক বল ? তোমাদের মিডল ক্লাসের এই এক সমস্যা। একটু ভালভাবে কথা বললে তোমরা তাকে প্রেম বল। তোমাকে তো বড় ভাই কিংবা বন্ধু ছাড়া আর কিছুই ভাবিনি কখনো।”
কিন্তু রুম্পাকে কি বলব?
এখন কিছুই বলতে হবে না। সমস্যা করবে। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালবেসে থাক তবে কেন চাচ্ছনা আমি সুখে থাকি।
আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে সুখে থাকো।
কত বড় স্বার্থপর তুমি! শুধু নিজেরটা দেখছ। তুমি আর আমার সাথে কথা বলবে না। চলে গেল অদিতি।
এখন গভীর রাত। ঘুম আসছে না। ভুলগুলো খোঁজার চেষ্টা করছি। পাচ্ছিনা। অদিতিকে ফোন দিলাম। ধরল না। কাগজ কলম নিয়ে বসে গেলাম চিঠি লিখতে। কোন কথা বেরুচ্ছে না কলম থেকে। কাঁদতে ইচ্ছে করছে তাও পারছিনা। ফোন দিলাম রুম্পাকে। ধরতেই জিজ্ঞাস করলাম, চিঠিতে কি লিখতে হয়? আমি অদিতিকে চিঠি লিখব।
এত রাতে এজন্য ফোন! খাবার সময় তো দেখা হল তখন বলিস নি কেন?
অদিতির বিয়ে। আর কিছু বলতে পারলাম না। হঠাৎ দেখি রুম্পা আমার ঘরে। খাটে বসে আমার হাত ধরে জিজ্ঞাস করল ঃ কি হয়েছে বলত? আমি সব জানিয়ে বললাম, এখন বল চিঠি কিভাবে লিখে।
তোকে চিঠি লিখতে হবেনা। আমি দেখছি।
না, আমিই দেখব। হঠাৎ রুম্পা আমাকে জড়িয়ে ধরল। তুই যাবি না। হু হু কেঁদে উঠলাম।
সকালে অদিতি আমাকে দেখেই হাসিমুখে বলল, কি ! বলিনি রুম্পা সব বুঝবে। ও খুব পজিটিভ মেয়ে। দেখ না মনোজদার সাথে কি রকম খালি ফ্ল্যাটে ঘণ্টার পর ঘনটা কাটায়।
বাজে কথা বলবে না।
বাজে কথা কি! বিশ্বাস না হয় জিজ্ঞাস করো। তোমাদের ক্লাসটাই এমন। তোমরা চাও যে কোন কিছুর বিনিময়ে বড়লোকের ছেলেমেয়েদের আটকে রাখতে।
মাথায় রক্ত চড়ে গেল। কখন যেন আমার হাতটা অদিতির গালে বসে গেল। দৌড়ে৴ বেড়িয়ে গেলাম। নাকি পালিয়ে এলাম। হাঁটা ধরলাম মনোজদার ফ্ল্যাটের দিকে। কলিং বেল বাজাতেই মনোজদা খুলে দিল। উদোম শরীর, এলোমেলো চুল, গালে লাল রং। ঢুকে গেলাম ভেতর। মাথায় বজ্রপাত পড়ল। অবাক হয়ে তাকালাম মনোজদার দিকে। মনোজদা রুক্ষকন্ঠে বলে: ”তোকে রুম্পা পাঠিয়েছে গোয়েন্দাগিরি করতে। বুঝলে সঞ্চিতা এই মিডল ক্লাসরাই বারোটা বাজালো। সময়ের সাথে আগাবে তা না শুধু পিছন টেনে ধরা।” আর কিছুই কানে গেলনা। মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলাম। পিছন থেকে দরজা বন্ধের শব্দ পেলাম।
বাড়ী ফিরেই রুম্পার ঘরে গেলাম। রুম্পা কোন কথা না বলে বের করে দিল ঘর থেকে। নিজের ঘরে বসে আকাশ দেখছি আর ভাবছি রুম্পা তো চিঠি লিখত। তবে ওর এমন হলো কেন? নাকি দুজনই ভুল করেছি। গভীর রাতে ছাদে গেলাম। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আমার জন্য না, কান্না আসছে রুম্পার জন্য। ছাদে যেতেই দেখি একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে কর্নারে। কাছে যেতেই দেখি রুম্পা কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলাম , কাঁদছ কেন ? অমনি আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আমি বললাম, আরে ছাড়ছাড়। তবু জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলল।
কেন এমন হল?
আমারটা বাদ দিলাম। তুমি তো চিঠি লিখতে।
কাঁদতে কাঁদতে রুম্পা হেসে দিল। তোর মাথা থেকে চিঠির ভুত এখনো যায়নি!
যাবেনা কখনো। হাসতে হাসতে আমি কেঁদে দিলাম।
কি রে তুই কাঁদছিস কেন আবার?
তোমাকে একটা কথা বলব, রাগ করবেনা তো?
না করবোনা। বল।
আমি তোমাকে ভালবাসি। চল আমরা বিয়ে করে ফেলি। বুঝার আগেই সজোরে একটা চড় এসে পড়ল গালে। রুম্পা ছিঃ বলে চলে গেল। তার কিছুদিন পর রুম্পার বিয়ের সম্বন্ধ এলো। বেশ ভালই। সবাই খুশী মনে তোড়জোড় শুরু করল। আমার সাথে রুম্পার আর কোন কথা হয়নি। দেখাও হয়েছে খুব কম।
গতকাল রুম্পার বিয়ে হয়ে গেল। পুরনো দিনের কথাগুলো যখন ভাবছি নিজের রুমে বসে, হঠাৎ দেখি আমার বইয়ের মাঝে একটা কাগজ। খুলতেই দেখি:
রুদ্র,
তুই যদি বয়সে আমার ছোট না হতি, তবে মনোজ না তোর সাথেই আমি প্রেম করতাম। বিয়েও। টুম্পা তোকে খুব ভালবাসে। ওকে আঘাত দিসনা প্লিজ।
রুম্পা
বি.দ্র: চিঠিটা পুড়ে ফেলিস।
চিঠিটা পুড়ে ফেললাম। কানে বাজতে লাগল: যা মুখে বলা যায়না তা চিঠিতে লিখতে হয়।