শুনেছি মানুষ প্রেমে পড়লে না কী কবি হয় ।কিন্তু প্রেমে পড়লে যে মানুষ চোরও হয় তা আমার এক বন্ধুকে না দেখলে কখনও বুঝতে পারতাম না ।আমার বন্ধুটির নাম ছিল সুমন ।আমার বন্ধুটি ছিল বাড়িতে কঠিন অনুশাসনের মধ্যে ।তাই প্রেম তো দূরের কথা প্রেমের বইও কোন দিন পড়তে পারেনি ।বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যখন তার বয়সী ছেলে-মেয়েরা একসাথে কথা বলে যেত, তখন তার কাছে মনে হতো ঐ দূর আকাশের তারাকে যেমন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া এগুলোর নাগাল পাওয়া অসম্ভব ।কোন মেয়ের সাথে কথা বলাও তাঁর পক্ষে অসম্ভব ।পড়ার তাগিদে যখন তাকে বাড়ি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আসতে
হয়-তখন থেকেই তার প্রেমের হাল খাতায় বসন্তের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে ।বসন্ত লাগতে লাগতে তার মন বসন্তের কোকিলের মতো গান গাইতেও শুরু করে ।ভালবাসার ফুলের গন্ধ পাওয়ার জন্য তার প্রথম চুরিটা হলো তার বিশ্ববিদ্যালয়ের মোবাইল ফোন দোকান থেকে একটি নাম্বার চুরি করে একটি মেয়েকে ফোন করা ।মেয়েরা স্বভাব সুলভ যে রকম হয়, অপরিচিত নাম্বার হলে একটু গম্ভীর হয়ে বলে কে বলছেন, প্লিজ? ছেলেটা তখন আদুরে কণ্ঠে বলে হ্যালো, আপনি কি শীলা বলছেন? মেয়েটা তখন রঙ নাম্বার বলে কেটে দেয়।আর ছেলেটা যখন বারবার ফোন দিতে থাকে ।তখন মেয়েটা ধমক দিয়ে আবার ফোন কেটে দেয়। কিন্তু প্রেমিকদের যতই ধমক দেওয়া হোক না কেন একটু পর বেড়ালের মত এসে বলবে মেও।আর এটা ছিল আমার বন্ধুর প্রথম প্রেম ।তাই সেও মেও পার্টির সদস্য ।আমার বন্ধু রাতের ঘুম হারাম করে, রাত-দিন মোবাইলে কসরত করে ঐ মেয়েটাকে প্রেমের জন্য রাজি করল ।এবার আসি আমার বন্ধু সুমন কীভাবে উর্মিলাকে প্রেমের উদ্যানের মাঝখানে নিয়ে আসল ।উর্মিলা ছিল মোটামুটি অলস প্রকৃতির তাই বইতো দূরের কথা পত্রিকায় হাত দিতে চাইত না ।আর তার সুযোগ নিয়ে আমার বন্ধু কবির আসনে বসেছিল ।সুমন যখন উর্মিলাকে ফোন করত তখন কিছু কবিতার বই নিয়ে বসত ।আর এগুলো দেখে দেখে কবিতা পাঠ করে তার উর্মিলাকে শোনাত ।এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার ।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই সে আবৃতি সংগঠনে ভর্তি হয়েছিল ।তাই তার আবৃতি ছিল ভালো ।কবিতাগুলো উর্মিলার কাছে তার নাম দিয়ে চালাত ।ইতোমধ্যে তাদের ভালবাসার গভীর জলে নামা হয়ে গেছে ।সুমন যখন আবৃতি করত তখন তার কবিতা শোনে উর্মিলা হকচকিয়ে যেত ।তার প্রেমিক এতো গুনি কবি ।তাই উর্মিলা আর অপেক্ষা করতে না পেরে তার প্রেমিক গুনি চোর কবিকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে ।ওরা সিদ্ধান্ত নীল কোন এক বিশেষ দিনে দুজন দেখা করবে ।তাই অপেক্ষার প্রহর শেষ করে ১৪ ফেব্রুয়ারি (বিশ্ব ভালবাসা দিবস) ওরা দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয় ।ঐ দিন নির্দিষ্ট একটি জায়গায় তারা দেখা করল ।প্রথম দেখা ও ভালবাসা দিবসের উপহার হিসেবে আমার চোর কবি বন্ধু প্রথম তার স্বহস্তে চুরি করে লেখা একটি কবিতা তার প্রেমিকাকে উপহার দিল ।কবিতা উপহার পেয়ে বন্ধর প্রেমিকা ভীষণ খুশি হয়েছিল ।আমার বন্ধু তার প্রেমিকাকে বিদায় দেওয়ার আগে কবি ও দার্শনিকের মতো ভাব নিয়ে বলেছিল পড়ালেখা কর না হয় দেশ ও জাতির উন্নতি করবে কি করে ।প্রেমিকের কথা শুনে মেয়েটি ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করে ।আর পড়ালেখা শুরু করে তার প্রেমিকের প্রিয় জিনিস কবিতা দিয়ে ।কবিতা পড়তে গিয়ে তার মনে হলো কোথায় যেন এই কবিতা শুনেছে কিন্তু সে তা মনে করতে পারছে না।আমরা জানি-যতক্ষণ বরফ ফ্রিজে রাখা ততক্ষণই তা জমাট থাকে।কিন্তু এটা যখন বাহিরে আনা হয় তখন স্বচ্ছ পানি হয়ে যায় ।মিথ্যাও এরকম যতক্ষণ এটা লুকিয়ে রাখা হয় ততক্ষণ সত্য হয়ে জমাট বেঁধে থাকে ।কিন্তু যখন মিথ্যা বেরিয়ে আসে তখন পানির মতো সবকিছু স্বচ্ছ হয়ে যায় ।একদিন উর্মিলা কবিতার বই পড়ছিল ।কবিতা পড়ার সময় তার মনে হলো তাকে তার প্রেমিক তার নাম দিয়ে তাকে কবিতাটি উপহার দিয়েছে ।তাই, তার প্রেমিকের উপহার দেওয়া কবিতার সাথে মিলিয়ে দেখল একই কবিতা কিন্তু বইয়ের কবিতার সাথে একটাই পার্থক্য তা হলো নামের ।তারপর কি হয়েছে পাঠক নিজ দায়িত্বে বুঝে নেবেন ।শুনেছি আমার বন্ধু কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবার পুরনো ধান্দায় নতুন করে নেমেছে ।গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত; কিন্তু পৃথিবীটা গোল তা একই কক্ষপথে ঘুরে আবার পূর্বের জায়গায় ফিরে আসে ।পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ ক্যাম্পাসে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম এমন সময় সুমন ও উর্মিলাকে দেখলাম একই রিক্সায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ।তখন উর্মিলার হাতে ও খোপায় ছিল লাল রঙের গোলাপ ।পরে সুমনকে জিঙ্গাস করেছিলাম-তুই, উর্মিলার সাথে আবার কীভাবে? উত্তরে সে বলেছিল আমি মিথ্যা হতে পারি আমার ভালবাসা মিথ্যা ছিল না ।তাই ফিরে পেয়েছি.!!! পৃথিবীতে মানুষ মরে যায়, কিন্তু ভালবাসা কখনও মরে না।কারণ ভালবাসা যে চিরদিনের....।।।