নতুন মোবাইল কিনেছে জাভেদ। নতুন নতুন সেট নিলে উঠতি তরুণদের যা হয় তারও তা-ই হল- কাজ না থাকলেই জানা-অজানা নম্বরে মিসকল দেয়া। কেউ কেউ কলব্যাক করে, কেউ বা করে না। মাঝে মধ্যে দু'একজন ঝাড়িও দেয়, 'ওই ব্যাটা মিসকল দিস ক্যান?' প্রথম প্রথম জাভেদ ঝাড়ির জবাব দিতে পারত না- সরি, ভুল হয়েছে ইত্যাদি বলত। এখন পাল্টা জবাব দেয়, 'ভাই ইচ্ছের কেজি লাখ টাকা! ইচ্ছে হল তাই দিলাম। মিসকল পেলেই কলব্যাক করতে হবে এমনকি কোন কথা আছে? নাকি ভাই ভাবছিলেন কোন মেয়ের মিসকল! মেয়েদের সাথে কথা বলার এত শখ ক্যান?' উল্টো ঝাড়ির সময় যত বাড়াতে পারে জাভেদের ততই আনন্দ- বাহ ব্যাটার অনেক টাকা খাইলাম!
আজকে জাভেদ নতুন প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে-এক একটা অপরিচিত নম্বরকে মিসকল দিতেই থাকবে যতক্ষণ না সেটা থেকে কেউ কলব্যাক করে। কোন কিছু চিন্তা না করেই জাভেদ মোবাইল বাটন টেপা শুরু করল, 0171867093...। এই তো রিং হচ্ছে। একবার, দুবার, তিনবার- টানা মিসকল দিল। কিন্তু কোন সাড়া নেই। আরেকবার দেই। এবার ব্যাটা বিরক্ত না হয়ে পারবে না। আশ্চর্য! ঘুমাচ্ছে নাকি? কিন্তু এই সন্ধ্যাবেলায় কেউ কি ঘুমায়? দাঁড়া! দেখাচ্ছি মজা! তুমি ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখেছ কিন্তু জাভেদ দেখো নাই! টানা ৩২ বার মিসকল দিল সে। ইয়েস! এবার কলব্যাক করেছে। তাও আবার নারীকন্ঠ!
-হ্যালো মিসকল দিচ্ছেন কেন?
-ইচ্ছে হল তাই দিলাম।
-ও তাই। বুঝতে পেরেছি নতুন সেট নিয়েছেন, তাই না?
-হাঁ। কিন্তু কি করে বুঝলেন?
-এটা না বোঝার কি আছে? একসময় আমারও তো আপনার মত বয়স ছিল। তা কোন ক্লাসে পড়েন? ফার্স্ট ইয়ার?
খাইছে! বয়স্ক কোন আন্টির সাথে ফাজলামি করে ফেললাম নাকি? জাভেদ মিথ্যা বলল না, হাঁ। অনার্স ফার্স্ট ইয়ার।
-কোন সাবজেক্ট?
-ইকোনমিক্স।
- ভেরি গুড। কোন ভার্সিটি?
-ঢাকা ভার্সিটি।
-ও তাই। আমিও তো ওখান থেকেই পাশ করেছি।
-তাই নাকি! কবে?
-এই তো ২০০৪ এ।
-আপনি আমার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র। সরি। সরি। আপু। আমার ভুল হয়ে গেছে।
-না ঠিক আছে। তা তোমার নাম কি?
-জাভেদ।
-দেশের বাড়ি কোথায়?
-বরিশাল।
-বরিশাইল্যা! আমার শ্বশুরবাড়িও ওখানে। জানো তোমার ভাইকে আমি কি বলে ক্ষেপাই-বরিশাইল্যা মুরগি চোর/ ব্যাড়া ভাইঙ্গা দিল দৌড়! কি রাগ করলে নাকি?
-না না। ব্যাপার না। আপু তা ভাইয়া কি করেন?
-কি আর করবে! রাস্তা সাফ করতে পারে। দোকানদারিও করতে পারে।
-মানে?
-মানে ও সাউথ আফ্রিকা থাকে। কি করে তা আমি জানি না।
-আপনি এখানে একা থাকেন?
-না। আমি আর আমার বাবুটা গলাগলি বেঁধে থাকি।
-বাবুটার নাম কি?
-তানিম।
-কোন ক্লাসে পড়ে?
-পড়ে না।
-খুব ছোট। তাই না?
-এই তো পাঁচ বছর হতে চলল।
-এখনো স্কুলে দেননি! এ বয়সে তো বাচ্চারা প্লেগ্রুপ শেষ করে ফেলে।
-কিন্তু আমার বাবুটা কোনদিন পড়তে পারবে না। কোনদিনও না। কি হবে ওর পড়াশুনা করে? কেউ তো ওকে কোনদিন ভালবাসবে না। কোনদিনও না। সবাই শুধু হাসবে। আর হাসবে। বড় হলে ও তো হাসির পাত্র হবে। ওর পড়াশুনা করে কি হবে?
কি ব্যাপার! আপুর কণ্ঠ ভেজা মনে হচ্ছে। জাভেদ কিছুটা থতমত খেয়ে গেল, সরি আপু। সরি। আমি আসলে কিছুই বুঝতে পারছি না।
-পারবে কি করে? তুমি তো কিছুই জান না। জান আমি না জীবনে কোন পাপ করিনি। তাহলে আল্লাহ আমাকে কেন এমন শাস্তি দিলেন? কেন?
জাভেদ কি বলবে কিছু বুঝতে পারছে না। তাই সে চুপ করে রইল। একটু থেমে আপু আবার বলল, তুমি আমার কথায় কিছু মনে কর না। আসলে তোমাকে কেন এসব বলছি তা আমি জানি না। তুমি আমার ডিপার্টমেন্টের ছোট ভাই। তাই হয়ত বলছি। আসলে আমার কষ্টগুলো কারও সাথে শেয়ার করা দরকার। আর তোমার ভাইও যেন কেমন হয়ে গেছে। যেদিন ডাক্তার বলল তানিম আর ভাল হবে না সেদিন থেকে ও কেমন যেন দূরে চলে গেছে। ভাল করে আমার সাথে কথা বলে না। আর তানিমের তো খোঁজই নেয় না। জান একবার ও কি বলেছিল-বাবুকে ওর মত লোকদের হাতে তুলে দিতে। ওদের নাকি নিজস্ব থাকার জায়গা আছে। সেখানে নাকি ও ভাল থাকবে। আর আমরা নতুন বাবু নেব। বল এটা কি সম্ভব? বাবুকে ছাড়া আমি বাঁচব কি করে?
-বুঝতে পারছি আপু আপনি খুব কষ্টে আছেন। সরি আপু। আমার খুব খারাপ লাগছে। আচ্ছা আপু আমি কি জানতে পারি তানিমের অসুখটা কি?
-হাঁ পারো। He is hermaphrodite.
-মানে?
আর কোন কথা শোনা গেল না। ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয়া হল। কিন্তু Hermaphrodite মানে কি? জাভেদ তাড়াতাড়ি ডিকশনারির পাতা উল্টাতে লাগল। শব্দটার মানে দেখে জাভেদের খুব খারাপ লাগল। হাঁ আপু, আমরা ওদের রাস্তায় প্রায়ই দেখি। ওদের নিয়ে হাসাহাসিও করি। কিন্তু একবারও ওদের নিয়ে ভাবি না। ওদের কষ্ট ওদেরই থেকে যায়। আর আমরা শুধু উপহাসই করি। কেননা আমরা যে মানুষ!!!
পরদিন। জাভেদ আবার মোবাইলটা হাতে নিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল- থাক আর অযথা কাউকে মিসকল দেব না।